বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন: বাস্তবায়নের বিতর্ক, পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ | বিশ্ব | DW | 28.04.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন: বাস্তবায়নের বিতর্ক, পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ

বিয়ের বয়স কমানোর আইনের বিতর্ক তুঙ্গে উঠে যখন ফেব্রুয়ারিতে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সংসদে পাশ হয়৷ সরকারের দাবি, এই আইন ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে বাল্যবিবাহমুক্ত করবে৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাল্যবিবাহ বাড়বে৷

২০১৪ সালের গার্লস সামিটের পর থেকেই, বাংলাদেশে বিবাহের নূন্যতম বয়স কমিয়ে আনার বিষয়টি আলোচনায় আসে৷ এ বছর ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে সংসদে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭' পাশ হয়৷ এ আইন পাশের ফলে, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত, ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেইন্ট অ্যাক্ট-১৯২৯' বাতিল হয়ে যায়৷

নতুন আইন পাশের পরপরই আইনটির ধারা-১৯ নিয়ে নানান বিতর্ক ওঠে৷ বর্তমান সরকার বাল্যবিবাহে, ধর্ষকের সাথে বিবাহে অনুমোদন দিচ্ছে– এমন বক্তব্য উঠে আসতে থাকে বিভিন্ন মহল থেকে৷ হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ঢাকায় একটি সেমিনারে আইনটিকে সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক' অভিহিত করে তা সংশোধনের আহ্বান জানান৷ এরপর জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ও নারীপক্ষ হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে৷

রিটের প্রেক্ষিতে, বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও জেবিএম হাসানের বেঞ্চ হাইকোর্টে ১০ এপ্রিল, ২০১৭ তারিখে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ বিধান সংবিধানের সঙ্গে কেন ‘সাংঘর্ষিক' ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দেন৷ তবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী জনাব আনিসুল হক জানান, ‘‘এই বিশেষ বিধান নতুন আইনকে সুরক্ষা দেওয়া এবং কেউ যদি অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান ধারণ করে ফেলে, তাহলে সন্তানটি যেন পিতামাতার বয়সজনিত কারণে অবৈধ হয়ে না যায়, তাই রাখা হয়েছে৷''

কী আছে নতুন আইনে?

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ পাশের আগে বাল্যবিবাহ রোধে, ব্রিটিশ সরকার প্রণীত ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেইন্ট অ্যাক্ট-১৯২৯' ছিল, যাতে বলা হয়েছিল কোনো নারী ১৮ বছরের আগে এবং কোনো পুরুষ ২১ বছরের আগে যদি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ এই শাস্তির সময়কাল এবং অর্থদণ্ড বর্তমান সময়ের সাপেক্ষে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম ছিল৷ ফলে এই আইনটি এক অর্থে অনুপযুক্তই হয়ে পরে৷

বর্তমান আইনে বয়সের সীমা একই রেখে, শাস্তির সময়কাল এবং অর্থদণ্ডের পরিমাণ সর্বোচ্চ দুই বছর এবং এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে৷

পাশাপাশি, নতুন আইনে শাস্তির আওতায় কারা আসবে, তার পরিষ্কার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে৷ যারা বিয়ে পরিচালনা করেন এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে৷ অর্থাৎ শুধু অপ্রাপ্তবয়স্ক বর, কনে বা তাদের পরিবার না, সংশ্লিষ্ট সবাই আইনভঙ্গের শাস্তি পাবে৷

নতুন আইনের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, বয়স নির্ধারণকারী সনদগুলো ‘নির্দিষ্ট' করা হয়েছে৷ সহজলভ্য নোটারি পাবলিক দিয়ে আর বয়সের জালিয়াতি করা যাবে না বলে আশা করা যাচ্ছে৷

তাছাড়াও, একটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ ধরণের পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বিচারের জন্য মোবাইলকোর্ট যুক্ত করা হয়েছে৷

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন বলেন, ‘‘আপাততদৃষ্টিতে নতুন আইনটির কিছু ভালো দিক রয়েছে৷ মূল সমস্যাটা হয় ধারা-১৯ নিয়ে৷ যখন এ আইন প্রণয়ন হচ্ছিল তখন থেকেই এই ধারাটি আলোচনায় ছিল, যার ফলে এর ভালো দিকগুলো অনুচ্চারিত থেকে যাচ্ছে৷''

কী আছে ধারা ১৯- এ?

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭'র ধারা-১৯ মূলত একটি বিশেষ বিধান৷ এতে বলা হয়েছে, ‘‘এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না৷''

কেন বিধানটিকে ত্রুটিপূর্ণ ভাবা হচ্ছে?

ধারা-১৯ কীভাবে আইনি প্রেক্ষাপটে ত্রুটিপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করেন তাসলিমা, ‘‘আইন প্রণেতাদের এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, বাল্যবিবাহ বন্ধের সাথে বিশেষ বিধানের সম্পর্ক কী তা স্পষ্ট করা৷ যেহেতু নতুন আইনের উদ্দেশ্য ছিল বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনা, ধারা-১৯ সেটি কীভাবে করবে তা স্পষ্ট নয়৷ অন্যান্য যেসব দেশের উদাহরণ এই আইনের ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে আইনটি, বিয়ে করার সর্বনিম্ন বয়সের আইন, আমাদের জন্য এটি বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনার আইন৷ এ দুটির বিষয়ের মধ্যকার পার্থক্য বোঝা খুবই জরুরি৷''

‘‘এক্ষেত্রে বিশেষ বিধানে মানে দাঁড়ায়, বাল্যবিবাহ দণ্ডনীয়, কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে তা দণ্ডনীয় নয়৷ এটি একটি ব্যতিক্রম৷ আমি মনে করি, বাল্যবিবাহ রোধের সাথে ধারা ১৯-এর কোনো সম্পর্ক নেই৷'' যোগ করেন তিনি৷

ভিডিও দেখুন 03:33

কুষ্টিয়ার কিশোরী তমার সাহসী সিদ্ধান্ত

ধারা ১৯-এর অপপ্রয়োগ হতে পারে আশঙ্কা করে তাসলিমা জানান, ‘‘আমাদের দেশে ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দেওয়ার একটি সাধারণ প্রবণতা রয়েছে৷ গ্রাম্য সালিশে অহরহ এমন ঘটনা ঘটে৷ নতুন আইনে সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় দণ্ড মকুফ করা হয়েছে৷ সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করতে, পারিবারিক এবং সমাজের চাপে ধর্ষণের অপরাধ ধামাচাপা দিতে এই আইন ব্যবহার করা হবে না তা নিশ্চিত করা হয়নি৷ এখানে অপ্রাপ্ত বয়স্কের সম্মতি গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়নি৷ ফলে অপপ্রয়োগের একটি পথ পুরোপুরি অরক্ষিত থাকছে৷''

বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্ত বয়স্ককে বিবাহ দিতে হলে, আদালতের অনুমতির বিধান রাখা হয়েছে৷ তবে অন্য দেশের মতো আমাদের দেশে বিয়ের আগে কোনো অনুমতি বা ‘ম্যারেজ লাইসেন্স' নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই৷

অপ্রাপ্ত বয়স্কদের নূন্যতম বয়স উল্লেখ না করায় সেটা নূন্যতম কত কম হতে পারে তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকে৷

আইনে সর্বোত্তম স্বার্থের প্রেক্ষিতে শাস্তি মওকুফের উল্লেখ থাকলেও আদালত কীভাবে সর্বোত্তম স্বার্থ নির্ধারণ করবেন বা একটি বিয়েতে সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা হয়েছে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় আনবেন, তা এই আইনে পরিষ্কার বলা নেই৷

মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক৷ তিনি গবেষণা করছেন বাল্যবিবাহের প্রভাব নিয়ে৷ প্রথমেই তিনি অপ্রাপ্ত বয়স্কদের প্রেমজনিত কারণে বিয়ে এবং তার ফলে সন্তান অবৈধ্যের যুক্তিকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে রোধ করার আরও অন্য পথ থাকতে পারত৷ এখানে অপ্রাপ্ত বয়সে বিবাহ এবং সন্তান ধারণের স্বাস্থ্যগত সমস্যা বিষয়ে তাদের জ্ঞান দেওয়া যেত, পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে এই শিক্ষাকে সুসংহত করা যেত, পাশাপাশি আইনের বাধ্যবাধকতা দিয়েও এমন ঘটনা রোধ করা যেত৷ তা না করে, এসব ঘটনাকে সহযোগিতার আশ্বাস বিশেষ বিধানে দেওয়া হচ্ছে৷

২০১৩ সালে আইসিডিডিআরবি ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বাল্যবিবাহের মূল কারণগুলো হচ্ছে, দরিদ্রতা, নিরাপত্তার অভাব, পারিবারিক সমস্যা, বয়স বাড়লে যৌতুক বেড়ে যাওয়া, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক চাপ, আইন না জানা, বেকারত্ব ইত্যাদি৷ এখানে নিজে বিয়ে করার মতো কোনো ঘটনা বিরল, তাই কোনো পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বিশেষ বিধানে স্থান পেল, এমন প্রশ্নও বিল্লাল হোসেন রেখেছেন৷

বিল্লাল হোসেন তার গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল থেকে জানান, ‘‘যতগুলো কারণে মেয়েরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে, তার মধ্যে ৭৭% বাল্যবিবাহ৷ বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি মহিলাদের গড় সন্তানের হার মহিলা প্রতি ২.৩ জন৷ এ সংখ্যায় ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের অবদান ২৫%৷ শুধুমাত্র এই বয়সে সন্তানধারণ রোধ করা গেলেই জনসংখ্যা অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে৷''

কেন রিট?

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭'র ১৯ ধারার প্রেক্ষিতে নারীপক্ষ এবং বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি রিট আবেদন করেন৷ এই রিট আবেদনে বলা হয়, এই আইনের ১৯ ধারাটি দেশের প্রচলিত আইন এবং সংবিধানের পরিপন্থী৷ 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলীর কথা, ‘‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের বিশেষ ধারাটি ১৯৭৯ সালের সিডও সনদ এবং ১৯৮৯ সালের শিশু অধিকার সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক৷ বাংলাদেশ অনেকগুলো আন্তর্জাতিক সনদ ও আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ৷ এতে সেসব চুক্তি ও সনদের লঙ্ঘন করা হয়েছে৷''

তিনি মনে করেন, ‘‘আইনে যে নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে তা না-ও হতে পারে৷ আইনের চাপে বিয়ের পরবর্তি পরিণতি ধারা-১৯ নিশ্চিত করবে না৷''

নীতি-নির্ধারকদের বক্তব্য কী?

বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী জনাব আনিসুল হক বলেন, ‘‘বাল্যবিবাহ আইনটির সংশোধন সরকারের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ৷ প্রচলিত বাল্যবিবাহ আইনটি এতদিন ধরে সংশোধনহীন ও প্রয়োগহীন ছিল৷''

ভিডিও দেখুন 02:23

বাল্যবিবাহের শিকার শাবনাজ

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘‘আমরা কখনও বলিনি ১৮ বছরের নিচে বিয়ে সিদ্ধ৷ নির্ধারিত বয়সের নিচে কেউ যদি বিবাহ করেন, তাহলে তাকে অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে৷ তবে কোনো কারণে যদি অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান ধারণ করেন, তবে সামাজিক চাপে তাকে যেন আত্মহত্যার পথ অথবা ভ্রুণ হত্যার পথ বেছে নিতে না হয়, তাই আমরা এই আইনে কিছুটা শিথিলতা রেখেছি৷ এগুলো ধর্মে তো নিষিদ্ধই, তাছাড়াও স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে৷''

তিনি আরো জানান, ‘‘বিশেষ অবস্থা বলতে মোটেই বাবা মা চাইলো বা ধর্ষিত হলো, তাকে বিয়ে দিতে হবে, এমন কোনো বিধান নয়৷ বরং এ ধরণের সমস্যায় কেউ যেন গোপনে বিয়ে করিয়ে পার পেতে না পারে সে জন্য বিয়ে রেজিস্ট্রি করার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে এবং আদালতের সম্মতি গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে৷''

কীভাবে এই বিধান কার্যকর করা হবে এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, ‘‘নতুন আইনে নিকাহ রেজিস্টারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে শাস্তির বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে৷ সেটি বাস্তবায়নে কাজীদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও করা হয়েছে৷ প্রতিটি স্তরে এটি পর্যবেক্ষণের জন্য লোক নিয়োগ করা হয়েছে এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে৷ আইন প্রয়োগে কড়াকড়ির কারণে কেউ যেন আইন থেকে পালিয়ে না গিয়ে বরং আইনের আশ্রয়ে আসে তাই এই বিশেষ বিধান৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন