বারবার দুর্ঘটনা আর সুপারিশ সত্ত্বেও চলছে ছোট লঞ্চ | বিশ্ব | DW | 21.03.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

বারবার দুর্ঘটনা আর সুপারিশ সত্ত্বেও চলছে ছোট লঞ্চ

শীতলক্ষ্যা নদীর যে জায়গায় রোববার  কার্গো জাহাজ ‘এমভি রূপসী-৯'-এর ধাক্কায় ‘ এম এল আফসার উদ্দিন' নামের ছোট লঞ্চটি ডুবে গেছে ওই এলাকায়ই এক বছর আগে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছিল যাতে প্রাণ হারান ৩৫ জন।

এ পর্যন্ত আফসার উদ্দিন লঞ্চের আট জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন নারী, দুইটি শিশু এবং দুইজন পুরুষ। ১৫-২০ জন যাত্রী এখনো নিখোঁজ রয়েছে। ডুবে যাওয়া লঞ্চটিকে সোমবার উদ্ধার করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে কার্গো জাহাজের ১৪ জনকে। জাহাজটি সিটি গ্রুপের মালিকানার সিটি নেভিগেশনের বলে জানা গেছে। এই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। নৌ আদালতেও মামলা করা হবে।

নৌ পরিবহণ অধিদপ্তর থেকে জানাগেছে ওই জাহাজটির জন্য অনুমোদিত মাস্টার ও ড্রাইভার ঘটনার সময় জাহাজে ছিলেন কী না তা নিয়ে তাদের সন্দেহ আছে। যারা ছিলেন তারা উপযুক্ত কী না বিষয়টি তারা তদন্ত করে দেখছেন।

অন্যদিকে যে ছোট লঞ্চটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে সেটিরও ফিটনেস ও বৈধ কাগজপত্রের কোনো হদিস এখনো পায়নি নৌ পরিবহণ অধিদপ্তর।

তবে বিআইডাব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ বন্দরের উপ-পরিচালক বাবু লাল বৈদ্য দাবি করেন,"ছোট লঞ্চটির ফিটনেস, রুট পারমিটসহ সব বৈধ কাগজপত্র আছে। মাস্টারেরও বৈধতা আছে। যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৮০ জন। আর ছাড়ার আগে ফিটনেস পরীক্ষাও করা হয়েছে। তারা ৩৪ জন যাত্রীর ডিক্লারেশন দিয়ে লঞ্চ ছেড়েছে।”

আর কার্গো জাহাজটির ব্যাপারে বলেন,"জাহাজে মোট ১৪ জন নাবিক ছিলেন। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির তিনজন মাস্টার ছিলেন। মাস্টারদের খামখেয়ালির জন্যই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাদের কাগজপত্র সবই ঠিক আছে। ওই ১৪ জনকেই আমরা মামলার আওতায় এনেছি।”

‘লঞ্চটির যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৮০ জন, ফিটনেস পরীক্ষার পর ৩৪ জন যাত্রীর ডিক্লারেশন দিয়ে লঞ্চ ছেড়েছে’

বারবার কেন শীতলক্ষ্যায়?

শীতলক্ষ্যায় শুধু এবার নয়, এর আগেও একাধিক দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। গত বছর ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ‘এসকেএল-থ্রি নামে একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ‘সাবিত আল হাসান' নামে একটি যাত্রাবাহী ছোট লঞ্চ ডুবে যায়। ওই ঘটনায় ৩৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই জাহাজটি ছিলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্যের। বিআইডাব্লিউটিএর কোনো অনুমতি ছাড়াই জাহাজটি চলছিল। ওই সময় জাহাজের ১৪ জন স্টাফকে আটক করা হলেও কয়েকদিনের হাজতবাস ও জরিমানা ছাড়া তাদের কোনো শাস্তি হয়নি এখনও।

২০২০ সালের ২৯ জুন ঢাকার সদরঘাটের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে ‘ময়ূর-২ লঞ্চের' ধাক্কায় মুন্সীগঞ্জ থেকে যাত্রী নিয়ে আসা ছোট লঞ্চ ‘মর্নিং বার্ড' ডুবে যায়। ওই ঘটনায় ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। মালিকসহ সাতজনের নাম দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায়  মামলা হলেও কোনো বিচার এখনো হয়নি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে গত দুই বছরে শুধু শীতলক্ষ্যায়ই নৌ দুর্ঘটনায় ৮০ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।

ব্যস্ত নৌরুটে ছোট লঞ্চ চলতে পারে না

বিশ্লেষকেরা বলছেন শীতলক্ষ্যা- বুড়িগঙ্গা নৌ রুটে ছোট ছোট লঞ্চগুলোই বেশি বিপজ্জনক। মালিক সমিতি মিলে কোনোভাবে ফিটনেস ও রুট পারমিট জোগাড় করলেও লঞ্চগুলো এই ব্যস্ত নৌরুটে কোনোভাবেই চলাচলের উপযোগী নয়।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন,"বাংলাদেশে সড়ক পথের তুলনায় নৌপথ এখনো পাঁচগুণ বেশি ঝুঁকিমুক্ত। তবে নৌ ট্রাফিক দিন দিন বাড়লেও নৌ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নৌ রুট ব্যবস্থাপনার কোনো উন্নতি নেই। ফলে নৌপথে ঝুঁকি বাড়ছে। নৌ রুটে সিগন্যালিং ব্যবস্থা, রুট আলাদা করা, নৌ টহল ও নৌ নিরাপত্তার দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই।”

‘ছোট ছোট নৌযান এয়ার টাইট নয়, এয়ার টাইট হলে ধাক্কা লেগে উল্টে গেলেও লঞ্চটি ভেসে থাকতো’

বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যার মত ব্যস্ত নৌরুটে ছোট নৌযান চলাচল বন্ধ বা আলাদা নৌরুট করে দিতে বললেও তা করা হয়নি। রোববারের ঘটনায় স্পষ্ট যে একটু সতর্ক হলে দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। একটিকে আরেকটি ক্রস করতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

ছোটলঞ্চে কেন তাদের এত আগ্রহ

আর বুয়েটের নৌযান ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর তারেক আলী বলেন," এইসব ছোট ছোট নৌযানের খোলের মধ্যে যাত্রী বহন করা হয়। এগুলো এয়ার টাইট নয়। এয়ার টাইট হলে ধাক্কা লেগে উল্টে গেলেও লঞ্চটি ভেসে থাকত। যাত্রীবাহী লঞ্চের ফিটনেসের প্রধান শর্ত হলো এগুলো ধাক্কা লাগলে ডুবে যাবে না। আর হেলে পড়লেও ভেসে থাকবে। কিন্তু সেটা মানা হচ্ছে না।”

তিনি আরো বলেন,"আমি একাধিক তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলাম। আমরা বার বার  সুপারিশ করেছি যে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যার মত ব্যস্ত নৌরুটে এই জাতীয় ছোট লঞ্চ বন্ধ করার জন্য।কিন্তু কাজ হয়নি।”

বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে এই ছোট লঞ্চই বিআইডাব্লিউটিএ'র এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার অবৈধ আয়ের প্রধান উৎস। সারাদেশে ছোট লঞ্চগুলোর মালিক সমিতির কাছ থেকে তারা মাসিক ভিত্তিতে মাসোহারা নেন। ফলে বাস্তবে ফিটনেস আছে কী না তা তারা দেখেন না। টাকা পেলেই হলো।

বাংলাদেশে নদী রক্ষা ও নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকরি সংগঠন হলো ‘নোঙর”। সংগঠনটির প্রধান সুমন শামস বলেন,"প্রতিবছরই আমরা বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যায় ছোট লঞ্চকে বড় লঞ্চ বা জাহাজের ধাক্কায় ডুবতে দেখছি। অনেক মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। আমরাও এখানে ছোট লঞ্চ বন্ধ করে বিকল্প ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না।  এগুলো চলার অনুমোদন পাওয়ার মত লঞ্চ না হলেও কীভাবে অনুমোদন পায় তা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়