বারবার ‘ছোট′ হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 29.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

খেলাধুলা

বারবার ‘ছোট' হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট

‘ব্যক্তিগত', ‘পারিবারিক' বলে এড়ানোর চেষ্টা ঢের হয়েছে৷ একের পর এক ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে ব্যতিক্রমই যে নিয়ম হয়ে যাবার জোগাড়! ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত/পারিবারিক জীবনের কেলেঙ্কারি ক্রিকেটকেই কাঁপিয়ে দিচ্ছে বারবার৷

মোসাদ্দেক হোসেনের বিপক্ষে তাঁর স্ত্রীর নির্যাতন ও যৌতুক দাবির মামলা এ জাতীয় ঘটনার সমুদ্রে সর্বশেষ ঢেউ মাত্র৷ মোসাদ্দেকের বয়স মাত্র ২২ বছর৷ বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলা শুরু করেছেন বছর দুয়েক আগে৷ দুই টেস্ট, ২১ ওয়ানডে ও আট টি-টোয়েন্টির একাদশে ছিলেন৷ জায়গাটা পাকা করতে পারেননি এখনো৷ অথচ এর মধ্যেই ভুল কারণে সংবাদ শিরোনামে চলে এলেন এই ব্যাটসম্যান৷

তাঁর বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের আদালতে নির্যাতন ও ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবির মামলা করেছেন স্ত্রী সামিয়া শারমীন৷ তাতে উল্লেখ রয়েছে, ছয় বছর আগে, ২০১২ সালে তাঁদের বিয়ের কথা৷ খালাতো বোনের সঙ্গে এই বিয়ে গোপন রাখেন মোসাদ্দেক৷ স্ত্রীকে ঢাকায় না এনে ময়মনসিংহেই রাখতেন৷ এদিকে জাতীয় দলে সুযোগ পাবার পর অন্য মেয়েদের সঙ্গে তিনি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বলে এই ক্রিকেটারের স্ত্রীর অভিযোগ৷ ফলে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তেই থাকে, যার পরিণতিতেই এই মামলা৷ যদিও আত্মপক্ষ সমর্থনে মোসাদ্দেকের দাবি, বনিবনা না হওয়ায় দিন দশেক আগেই সামিয়াকে তালাক দিয়েছেন তিনি৷

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-তে তাই আবার বসেছে ‘পারিবারিক আদালত'৷ বিচার-সালিশের জন্য যে কাজটি তাদের করতে হচ্ছে প্রায়ই৷ সেই রুবেল হোসেন থেকে শুরু করে আরাফাত সানি, মোহাম্মদ শহীদ, শাহাদাত হোসেন– তালিকাটা ছোট নয় মোটেও৷ এর সঙ্গে রয়েছে ক্রিকেটারদের আচরণগত নানা অভিযোগ৷ ফিরিস্তির পাহাড় জমে যাবার পর সেসবের সুরাহাও করতে হচ্ছে সেই বিসিবিকে৷ বাংলাদেশ ক্রিকেট ভাবমূর্তিতে কলঙ্কের ছোপ পড়ছে তাই বারবার৷

ঘটনা পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে মিরপুরে বিসিবির সুরম্য অট্টালিকার দেয়ালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি৷ এ সূত্র ধরে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করা তিন-তিনজন ক্রিকেটারের জেল পর্যন্ত ঘুরে আসতে হয়েছে৷ ভাবা যায়! কেলেঙ্কারির শুরু রুবেল হোসেনের মাধ্যমে৷ এই পেসারের বিপক্ষে চিত্রনায়িকা নাজনীন আক্তার হ্যাপী ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মামলা করেন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে৷ মামলার জের ধরে জেলে যেতে হয় রুবেলকে৷ ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপের জন্য দেশ ছাড়ার আগে নিতে হয় আদালতের অনুমতি৷ পরবতর্তীতে হ্যাপীর করা মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান রুবেল৷ সেটি আদালতের রায়৷ কিন্তু জনতার রায়ে ক্রিকেট ঠিকই হয় কলুষিত৷

বাঁ হাতি স্পিনার আরাফাত সানীর বিপক্ষে নাসরিন সুলতানা নামে একজন মামলা করেন ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি৷ মামলাটি তথ্যপ্রযুক্তি আইনে৷ ওই তরুণীর দাবি, ২০১৪ সালে সানির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়৷ পরবর্তীতে এই ক্রিকেটার আরেকজনের সঙ্গে সংসার করেন৷ নাসরিনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ছবি ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে তাঁকে সানি পাঠান বলে অভিযোগ৷ সেসব ছবি অন্তর্জালে ছড়িয়ে দেবার হুমকিও দেন৷ এসব কারণেই মামলা৷ সানি গ্রেফতার হন ওই বছরের ২২ জানুয়ারি৷ তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলার পর যৌতুক এবং শিশু ও নারী নির্যাতনের আরো দুটি মামলা করা হয় তাঁর বিরুদ্ধে৷ ৫৩ দিন কারাগারে থাকার পর ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ অবশেষে জামিনে মুক্তি পান সানি৷ কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরেক কালো অধ্যায় ততদিনে রচিত হয়ে গেছে৷

জেলের চার দেয়ালে যাওয়া তৃতীয় ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন৷ শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় এই পেসার ও তাঁর স্ত্রী জেসমিন জাহানের বিপক্ষে মামলা হয় ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর৷ দুজন আত্মগোপনে চলে যান৷ স্ত্রীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ৪ অক্টোবর৷ পরদিন, অর্থাৎ ৫ অক্টোবর শাহাদাত আদালতে আত্মসমর্পন করে জামিন চান৷ আদালত জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়৷ জামিন হয় ৮ ডিসেম্বর, যার অর্থ, দুই মাসের বেশি সময় শাহাদাতকে থাকতে হয়েছে জেলে৷ ওই শিশু গৃহকর্মীর পরিবারের সঙ্গে ‘সমঝোতায়' পরবর্তীতে রক্ষা পান এ ক্রিকেটার৷ ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর মামলা থেকে অব্যাহতি মেলে শাহাদাতের৷

আরেক পেসার মোহাম্মদ শহীদের বিপক্ষে অভিযোগ নিয়ে বিসিবি যান তাঁর স্ত্রী ফারজানা আক্তার৷ বোর্ডের কাছে লিখিত অভিযোগে জানান, ২০১১ সালে বিয়ে হওয়া এ দম্পতির দুটো সন্তান৷ জাতীয় দলে সুযোগ পাবার পর শহীদের আচরণ বদলে যেতে শুরু করে৷ অন্য মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, শুরু হয় নির্যাতন৷ পরে বাড়ির ছাদে নিয়ে এ পেসার ধাক্কা মেরে স্ত্রীকে ফেলে দিতে চান বলেও অভিযোগ৷ এ নিয়ে বোর্ডের দেনদরবারে কাজ না হওয়ায় মামলা করবেন বলে মনস্থির করেন ফারজানা৷ ওই মামলার ভয়েই আবার সংসার শুরু করেন শহীদ৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

শুধু বিবাহিত জীবনে নয়, এমনিতেও ‘গুরুতর শৃঙ্খলাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড'তে ক্রিকেটারদের নাম জড়িয়েছে বারবার৷ যে কারণে ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয় আল আমিন হোসেনকে৷ ২০১৬-র বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) চলার সময়ে তাঁকে ও সাব্বির আহমেদকে করা হয় মোটা অঙ্কের জরিমানা৷ চট্টগ্রামে নিজেদের হোটেল কক্ষে ‘নারী অতিথি' নিয়ে রাত্রিযাপন করার অপরাধে৷ সিসি টিভির ফুটেজে এর অকাট্য প্রমাণ পেয়ে আল আমিনকে বিপিএল চুক্তির ৫০ শতাংশ এবং সাবি্বরকে ৩০ শতাংশ জরিমানা করা হয়, অর্থের অঙ্কে যা যথাক্রমে প্রায় ১২ লাখ ও ১৩ লাখ টাকা৷ বিসিবি অবশ্য দুজনের ‘অপরাধ' প্রকাশ্যে আনেননি৷ তবে তা কারো জানতেও বাকি থাকেনি৷

ওই ঘটনা থেকে সাব্বির শিক্ষা নিয়েছেন, তা বলা যাবে না৷ তাহলে গেল বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় লিগের ম্যাচ চলাকালীন কিশোর দর্শককে পিটিয়ে আবার বোর্ডের আদালতে হাজিরা দিতে হতো না৷ শাস্তি হিসেবে বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ পড়েছেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞার খড়গ নেমে এসেছে এবং গুণতে হয়েছে ২০ লাখ টাকা জরিমানা৷ বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান তখনই বলেছিলেন, সাব্বিরের এটা শেষ সুযোগ৷ শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ আবার করলে তাঁকে অনির্দিষ্টকালের জন্যও নিষিদ্ধ করা হতে পারে৷ কিন্তু তাঁর মধ্যে শোধরানোর লক্ষণ কই! কিছু দিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ চলার সময়ে ফেসবুকে দুই সমর্থককে অকথ্য গালিগালাজ করে আবার সমালোচনার ফুটন্ত কড়াইয়ে এই ব্যাটসম্যান৷ ব্যাপারটি নজরে এনেছে বিসিবিও৷

এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাসির হোসেনকে নিয়েও তোলপাড় সম্প্রতি৷ নিজেকে ওই ক্রিকেটারের বান্ধবী পরিচয় দেয়া এক তরুণীর সঙ্গে নাসিরের ফোন কথোপকথনের অডিও রেকর্ড হয়ে যায় ভাইরাল৷ এরপর সেই তরুণী ফেসবুক লাইভে এসেও করেন নানা অভিযোগ৷ এসব ঘটনার রেশ কাটার আগেই মোসোদ্দেক-ইস্যুর মুখোমুখি বিসিবি৷

ক্রিকেটারদের ভেতর একই রকম ঘটনার পুণরাবৃত্তিতে তিতিবিরক্ত বোর্ড৷ এবার কঠোর সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে তারা৷ বিসিবি প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর কথায় তা স্পষ্ট, ‘‘এটি একান্তই তাঁদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যাপার৷ এখন ক্রিকেটারদের অভিভাবক হিসেবে আমাদের দিক থেকে যা করণীয়, তা অবশ্যই আমরা করব৷ এসব ব্যাপারে বোর্ডের অবস্থান যে খুবই কঠোর হবে, এটুকু বলতে পারি৷ বোর্ড সভাপতি দেশের বাইরে আছেন৷ উনি যাবার আগেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ মোসাদ্দেকের ইস্যু আসার আগেও আরো কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷

এসব ব্যাপারে কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যেগুলো শীঘ্রই জানতে পারবেন৷'' আগের সিদ্ধান্তগুলোর চেয়ে তা আরো কঠোর হবে বলে দাবি তাঁর, ‘‘পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ দৃশ্যমান বলতে, খেলোয়াড়দের যে শাস্তি হয়েছে, তা দেখেছেন৷ বড় পরিমাণে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে৷ তারপরও ব্যাপারটির উন্নতি যখন হচ্ছে না, তখন বোর্ড হয়ত আরো কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে৷'' মোসাদ্দেকের বক্তব্য শোনার জন্য তাঁকে বোর্ডে ডাকা হবে বলেও জানান তিনি, ‘‘মোসাদ্দেকের ব্যাপারে আমরা মিডিয়ায় জেনেছি, ওনার স্ত্রী একটি মামলা করেছেন৷ যেহেতু বিষয়টি আদালতে চলে গেছে, আদালতেই নিষ্পত্তি হোক৷ কিন্তু বিষয়টি আমরা আমাদের মতো করে দেখব৷ খুব শিগগিরই এটি নিয়ে আমরা বসব৷ যেসব খেলোয়াড়কে নিয়ে এসব ঘটছে, তাঁদেরও বক্তব্য শোনার জন্য সেখানে ডাকা হবে৷''

অডিও শুনুন 00:20

‘উন্নতি যখন হচ্ছে না, বোর্ড হয়ত আরো কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে’

একের পর এক এমন ঘটনায় প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে৷ প্রবলভাবেই পড়ছে৷ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন তাই ভীষণ ক্ষুব্ধ, ‘‘ক্রিকেটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কী হওয়া উচিত? ক্রিকেট৷ কিন্তু একের পর এক ঘটনা দেখে তো মনে হচ্ছে না যে, ক্রিকেটটা ওদের মূল মনোযোগের জায়গা৷ সাব্বিরের ব্যাপার দেখুন৷ ওকে তো বেশ কয়েকবার শাস্তি দেয়া হয়েছে৷ তবু শোধরাচ্ছে না৷ তাহলে তো অবশ্যই এটি বুঝতে হবে যে, ক্রিকেটটা ওর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ না৷ মাঠের বাইরের ব্যাপারগুলোর গুরুত্ব এর চেয়ে বেশি৷ আর তা যখন হবে, পারফরম্যান্সে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য৷''

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এ জাতীয় ঘটনার সংখ্যা৷ এটি ক্রমশ বড় ইস্যু হয়ে যাচ্ছে বলে তাই স্বীকারও করছেন বিসিবি প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, ‘‘আমি আবারও বলছি, বোর্ড এ ব্যাপারে খুবই কঠোর হবে, কেননা, এখন এটি আমাদের জন্য বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে৷''

তা হচ্ছে৷ আর ওই বড়-ইস্যুতে বারবার ‘ছোট' হচ্ছে ক্রিকেট৷ বাংলাদেশের ক্রিকেট!

নোমান মোহাম্মদ, ক্রীড়া সাংবাদিক

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন