1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

বারবার অগ্নিকাণ্ড থেকে কি নিষ্কৃতি নেই?

২৭ জানুয়ারি ২০২৬

​কলকাতায় ফের আগুনের গ্রাস। আট জন মারা গিয়েছেন। অনেকে নিখোঁজ। কেন রোখা গেল না মৃত্যু?

https://p.dw.com/p/57VgZ
কলকাতার আনন্দপুরে পুড়ে ছাই একটি গোডাউন
কলকাতার আনন্দপুরে পুড়ে ছাই একটি গোডাউনছবি: Subrata Goswami/DW

আনন্দপুরের নাজিরাবাদে আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় একাধিক গুদাম। একটি মোমো তৈরির কারখানা, ডেকোরেটিং সংস্থার গুদামে আগুন লাগে। এই ঘটনায় আটজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা গিয়েছে। ২১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আগুন লাগার দেড় দিন পরেও পকেট ফায়ার রয়েছে ঘটনাস্থলে।

কেন লাগল আগুন

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ফের একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, কলকাতা কার্যত এক 'জতুগৃহে' পরিণত হয়েছে।

​আনন্দপুরের বসতি এলাকায় শর্ট সার্কিট বা রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিক অনুমান। দাহ্য পদার্থের মজুতদারি এবং ঘনবসতি হওয়ার কারণে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সরু গলি হওয়ায় দমকলের ইঞ্জিন পৌঁছাতে দেরি হওয়া এবং জলের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি করলেও ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে।

বারবার অগ্নিকাণ্ড

​আনন্দপুরের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। গত কয়েক বছরে কলকাতা ও শহরতলিতে বেশ কিছু বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে যা জনমানসে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

​পার্ক স্ট্রিটের একটি নামী রেস্তোরাঁ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। দুপুরের ব্যস্ত সময়ে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটায় গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রেস্তোরাঁর চিমনি থেকে ছড়ানো এই আগুন দ্রুত ওপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছিল। যান্ত্রিক ত্রুটি এবং অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার ঘাটতি এই ঘটনায় প্রকট হয়ে উঠেছিল।

কসবায় অ্যাক্রোপলিস মলে ভয়াবহ আগুন লাগে। মলের ফুড কোর্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত। মলের ভিতর আটকে পড়া কয়েকশ মানুষকে উদ্ধার করতে দমকলকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। আধুনিক শপিং মলেও যে ধোঁয়া বেরোনোর সঠিক পথ বা 'স্মোক এক্সট্রাক্টর' কাজ না করলে কতটা বিপদ হতে পারে, তা এই ঘটনা বুঝিয়ে দিয়েছিল।

​তপসিয়া এলাকায় একটি প্লাস্টিক ও রবার জাতীয় পণ্যের গুদামে বিধ্বংসী আগুন লাগে। এলাকাটি অত্যন্ত ঘিঞ্জি হওয়ায় দমকলের ইঞ্জিন পৌঁছতে দেরি হয়। দাহ্য বস্তুর কারণে আগুন দ্রুত পাশের ঝুপড়িগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। প্রায় ১০টি ইঞ্জিনের চেষ্টায় কয়েক ঘণ্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

​কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাজার চাঁদনি চকের একটি পুরনো ভবনে আগুন লাগে। পুজোর ঠিক পরেই এই ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম ভস্মীভূত হয়ে যায়। সংকীর্ণ গলি এবং তারের জঞ্জাল এখানেও অগ্নি-নির্বাপণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

​চলতি বছরের শুরুতেই স্ট্র্যান্ড রোডের একটি শতাব্দী প্রাচীন গুদামে আগুন লাগে। বড়বাজার এবং স্ট্র্যান্ড রোড সংলগ্ন এই এলাকায় পুরনো কাঠের কাঠামো এবং মজুত করা দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। দমকলের ১৫টি ইঞ্জিন দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

​এই ঘটনায় শর্ট সার্কিট এবং পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বা হাওয়া চলাচলের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

দমকলের ডিজি ঘটনাস্থলে

দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমার মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে যান। তিনি স্বীকার করেন, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থায় খামতি ছিল।

পুড়ে যাওয়া গুদাম পরিদর্শন করে তিনি বলেন, "অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ঠিকঠাক ছিল না, একথা বলে দেয়া যায়। পুরো বিষয়টা আমরা খতিয়ে দেখছি। ফায়ার অডিট করা হয়। খামতি থাকলে নোটিস করা হয়। নজরদারি চালানো হয়, কিন্তু এই জায়গাটা কোনো কারণে বাদ পড়ে গিয়েছে। আইনমাফিক যা ব্যবস্থা নেয়ার তা করা হবে। এর পরের পার্টে যে তদন্তের কাজ সেটা পুলিশ করবে।"

যদিও তিনি এটাকে বিভাগীয় ব্যর্থতা বলে স্বীকার করতে রাজি হননি। ডিজি ফায়ার বলেন, "এটা বিভাগের ব্যর্থতা নয়। মানুষের গাফিলতির জন্য এটা হয়েছে। এখানে জলাজমি ছিল কি না, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আগুন লাগলে সেটা নেভানো আমাদের দায়িত্ব। এ ধরনের সমস্যা থাকবে। সেটা কমিয়ে আনা আমাদের লক্ষ্য।"

দমকলমন্ত্রীর পরিদর্শন

ঘটনার পর চব্বিশ ঘন্টা কেটে গেলেও কেন দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু নাজিরা বাদে যাননি তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল মঙ্গলবার সকালে তিনি বিপর্যয়ের জায়গাটি পরিদর্শন করেন।

দমকলমন্ত্রী বলেন, "দমকলের প্রায় ১০-১২টি ইঞ্জিন এখানে এসে পৌঁছয় এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু হয়। ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ার কারণে কাজটা কিছুটা কঠিন ছিল।"

তিনি বলেন, "আগুন কীভাবে লাগল, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। শর্ট সার্কিট থেকে এই ঘটনা কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। আমি আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট জমা দিতে।"

অগ্নিসুরক্ষার প্রশ্ন

কলকাতার বসতি ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আনন্দপুর হোক বা বড়বাজার, বারবার একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

অবৈধ নির্মাণ বারবার অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ। যত্রতত্র প্লাস্টিক ও দাহ্য বস্তুর শেড গড়ে উঠেছে। এখানে দাহ্য বস্তু মজুত রাখা হয়। সেই সঙ্গে রয়েছে সরকারি নজরদারির অভাব

সম্প্রতি কলকাতায় ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অধ্যাপক পার্থপ্রতিম বিশ্বাস ডিডাব্লিউকে বলেন, "জলাজমি ভরাট করে গড়ে ওঠা অবৈধ নির্মাণ এবং নকশা-বহির্ভূত গুদামগুলো অগ্নিকাণ্ডের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইসব ক্ষেত্রে স্মোক ডিটেক্টর বা স্প্রিঙ্কলারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।"

তিনি অভিযোগ করেন, "জলাভূমি বুঝিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে তৈরি হওয়া বাড়িগুলো অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভবনগুলো তৈরির সময় প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয় না, ফলে সেখানে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা আছে কি না, তা দেখার কোনো আইনি দায়বদ্ধতাও সরকারের থাকছে না।"

তার মতে, "ধোঁয়া শনাক্তকারী অ্যালার্ম বা স্প্রিঙ্কলার সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। বড় অগ্নিকাণ্ডের পরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর একে অপরের ওপরে দোষ চাপাতে ব্যস্ত থাকে। দমকল দপ্তর, নগরোন্নয়ন দপ্তর, ভূমি সংস্কার বা জলসম্পদ দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।"

মানসিকতার সমস্যা?

কলকাতার পরিকাঠামো এবং শহরজুড়ে ঘটে চলা অগ্নিকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিপর্যয় মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক তুহিন ঘোষ। তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "যে কোনো পরিবর্তনের মূলে থাকে মানসিকতা এবং সদিচ্ছা। মানসিকতার দিক থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। আমরা কি আদৌ চাই, এই পরিকাঠামোকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে, যাতে আগুন না লাগে?"

​কলকাতার বস্তি এবং বাজারগুলোতে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড নিয়ে অধ্যাপক ঘোষ "আমার কাছে যেটা সবথেকে বড় প্রশ্ন, তা হল, সব আগুন রাত্রিবেলাই লাগে কেন? এবং মূলত শীতকালে লাগে কেন? কলকাতাতে তো ঠান্ডার জন্য ঘরে আগুন জ্বালানোর রেওয়াজ নেই। খুব বেশি হলে আমরা হয়তো হিটার ব্যবহার করতে পারি। কাশ্মীর বা হিমাচলে আগুনের পাত্র (কাঙ্গরি) ঘরের মধ্যে রাখা হয়, সেখান থেকে কাঠের বাড়িতে আগুন লেগে যেতে পারে। কিন্তু কলকাতার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।"

পার্থপ্রতিমের মতে, "একটি শহরের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি তিন স্তরে থাকা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার আগে, সেই পরিস্থিতি চলাকালীন এবং তার ভিত্তিতে শিক্ষা গ্রহণ। কিন্তু কলকাতায় এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। কলকাতা শহরে বছরে গড়ে ১২টি বড় মাপের অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও সরকার তা থেকে শিক্ষা নিতে পারছে না। এর অন্যতম বড় কারণ হলো সদিচ্ছার অভাব।"

তার বক্তব্য, "গত ৩০ বছরে শহরের জনঘনত্ব ও বহুতলের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়লেও দমকল বিভাগে প্রায় ৫০ শতাংশ পদ খালি পড়ে আছে। লোকবল না থাকায় সঠিক 'ফায়ার অডিট' করা সম্ভব হচ্ছে না।"

​অধ্যাপক ঘোষের মতে, এই অগ্নিকাণ্ডগুলোর পেছনে গভীর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তিনি বলেন, "কলকাতাতে একটা অন্যরকমেরই সিস্টেম চলছে। যে সিস্টেমটা হয়তো চাইছে যে এই পুরনো সিস্টেমটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নতুন করে কিছু একটা তৈরি করে ফেলা। আর সেগুলো কেন এই বস্তিতে এবং বাজারেই মূলত লাগে, সেটা আমাদের একটু ভাবতে হবে।"

পুরনো বনাম নতুন

পুরনো ও নতুন কলকাতা, দুই ক্ষেত্রেই অগ্নিকাণ্ডের বিপদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান জিওগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক লক্ষ্মী শিবরামকৃষ্ণন ডিডাব্লিউকে বলেন, "মূলত পুরনো কলকাতাতেই আগুন লাগছে। যেখানে রাস্তা সরু, এলোমেলো বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে। এর ফলে গুদামে আগুন লাগার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা বহুতল ভবনগুলিতে অগ্নি সুরক্ষার ব্যবস্থা হয়তো থাকছে। কিন্তু সেগুলি একটি অন্যটির গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। অনেক বহুতল গড়ে উঠেছে ঝুপড়ির আশপাশে। তবে শহরে অনেক পুরনো বহুতল আছে যেগুলির অগ্নিসুরক্ষা ততটা ভালো নয়। এখানে আগুন লাগলে বাসিন্দাদের চট করে বেরিয়ে আসার উপায় নেই।"

তার পরামর্শ, "প্রশাসনের উচিত বিদ্যুতের সংযোগগুলিকে খতিয়ে দেখা, যাতে সেখান থেকে কোনো বিপদের আশঙ্কা না থাকে। প্রয়োজনে সেগুলোকে বদলে ফেলতে হবে। এর ফলে শর্ট সার্কিট বা বিদ্যুতের সংযোগ থেকে আগুন লাগার ঘটনা কমে যাবে। কেরোসিন, পেট্রোলের মতো জ্বালানি মজুত করা যাতে না হয়, সেটাও দেখতে হবে। শীতকালে এটা বেশি খেয়াল রাখতে হবে, যেহেতু এই সময় রাস্তায় আগুন জালানো হয়।"

ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি পায়েল সামন্ত৷
পায়েল সামন্ত ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি৷