বাধা অনেক, তবে ধীরে আসছে পরিবর্তন | আলাপ | DW | 22.01.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

বাধা অনেক, তবে ধীরে আসছে পরিবর্তন

শবরীমালায় এখনো ঋতুমতী নারীর ঢোকার অধিকার নেই৷ আবার সেই ভারতেই নারী পুরোহিত, নারী পাদ্রীরা পরিবর্তনের সূচনা করেছেন৷

তিন নারী পুরোহিত

বিয়ের আসরে তিন নারী পুরোহিত

ফুল দিয়ে সাজানো মণ্ডপ৷ গোল হয়ে বসে আছেন তারা৷ দেখে বোঝার উপায় নেই, বর-বউয়ের ছাদনাতলায় তিনজন নারী কী করছেন! 

বোঝা যাবে একটু পরেই৷ বিয়ের মূল অনুষ্ঠান যখন শুরু হবে৷ বেদমন্ত্র পাঠ করতে শুরু করবেন একজন৷ পাশে বসে তার বাংলা অনুবাদ শোনাবেন আরেকজন৷ আর তার পাশে বসে থাকা সর্বশেষ নারী গাইবেন রবিগান (রবীন্দ্রসংগীত) আর ছোট ছোট শ্লোক৷ যাদের কথা বলছি, তারা পুরোহিত৷ ৷ পশ্চিমবঙ্গ কেন, গোটা ভারতে এমন দৃশ্য কিছু বছর আগেও কার্যত অকল্পনীয় ছিল৷

নারীরা কি পুরোহিত হতে পারেন? এ বিতর্ক নতুন নয়৷ পৌরোহিত্যের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মনে করেন, নারীরা পুজো করতে পারেন ঘরের অন্দরে৷ কিন্তু বেদমন্ত্র পাঠ করার তাদের কোনো অধিকার নেই৷ হোম-যজ্ঞও করতে পারেন না তারা৷ বিয়ে দেয়া, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান এ সব কোনো কিছুতেই তাদের কোনো অধিকার নেই৷ কে বলেছে এমন কথা? কোথায় লেখা আছে? বিতর্ক বাড়তে থাকে৷ একই বিতর্ক রয়েছে ভারতের অন্যান্য ধর্মেও৷ খ্রিশ্চান ধর্মে নারী পাদ্রী, বৌদ্ধ ধর্মে নারী উপাসক কতটা গ্রহণযোগ্য? পুরুষরা যতই বিতর্ক তৈরি করুন, সব ক্ষেত্রেই শাস্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের অধিকার দাবি করতে শুরু করেছেন নারীরা৷ সংখ্যায় কম হলেও তাঁদের যুক্তি ফেলে দেওয়ার নয়৷

'শাস্ত্রে আছে’ বলে দীর্ঘদিন ধরে যারা নারীদের পৌরোহিত্যের কাজ করতে দেননি, তাদের বিরুদ্ধে কার্যত জেহাদ ঘোষণা করেছেন রোহিণী ধর্মপাল, মৌ দাশগুপ্তরা৷ অবশ্য তারাই যে এমন কাজ প্রথম করলেন, তা নয়৷ রোহিণীর মা গৌরী ধর্মপাল ছিলেন বিশিষ্ট সংস্কৃত শিক্ষক৷ একাধারে তিনি গল্পকার, লেখক এবং সংস্কৃত পণ্ডিত৷ গৌরী ধর্মপাল পশ্চিমবঙ্গে সেই ষাট-সত্তরের দশকেই প্রথা ভেঙেছিলেন৷ একাধিক বিয়ের অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করেছিলেন৷ বাণী বসুর সন্তান, অপর্ণা সেনের সন্তানের বিয়েতে তিনি পুরোহিতের কাজ করেছেন৷ 

গৌরী একটি বই লিখেছিলেন৷ বৈদিক বিয়ের পদ্ধতি নিয়ে৷ সেখানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছিল৷ মেয়েকে সম্প্রদানের যে রীতি সাধারণ হিন্দু বিয়েতে প্রচলিত, গৌরী তার বিরোধিতা করেছিলেন৷ শাস্ত্র ঘেঁটে দেখিয়েছিলেন, এমন বিষয় বৈদিক বিয়েতে নেই৷ সেখানে মেয়ে সসম্মানে শ্বশুরবাড়ি যান৷ শুধু তাই নয়, বৈদিক বিয়ে যে বাল্যবিবাহ স্বীকার করে না, বিয়ে হয় দুইজন সাবালকের মধ্যে, তা-ও প্রমাণ করে দিয়েছিলেন গৌরী৷ গৌরী ধর্মপালের সেই রীতি মেনেই ২০১৮ সালে পুরোহিত্যের কাজ শুরু করেছেন তার মেয়ে রোহিণী এবং ছাত্রী মৌ৷ মৌয়ের ছাত্রীরাও একই কাজ শিখছেন৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের শিক্ষক মৌ দীর্ঘদিন ধরে বেদ নিয়ে কাজ করছেন৷ বহু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানিয়েছেন, বেদ পড়লে বোঝা যায়, সেখানে নারীরা পৌরোহিত্য করতে পারবেন না, এমন কোনো কথার উল্লেখ নেই৷ বরং বেশ কিছু নারী পুরোহিতের সন্ধান মেলে সেখানে, যাদের মুখের মন্ত্রোচ্চারণ গুরুত্বপূর্ণ নথি৷ ‘‘মেয়েরা পৌরোহিত্য করতে পারবেন না, এ নিয়ম অনেক পরে তৈরি করা হয়েছে৷ এমন কোনো বিধান বেদে নেই৷ পেশার তাগিদে, সময়ের নিরিখে এসব ব্যাখ্যা তৈরি করা হয়েছে৷ ফলে যারা এসব কথা বলেন, তাদের শাস্ত্রজ্ঞান আছে বলে মনে করি না৷’’ নিজের অভিমত স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন মৌ৷

রোহিণী, মৌরা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে আরো বেশ কিছু নারী পুরোহিত কাজ করছেন৷ উচ্চবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত অনুষ্ঠানে তারা ডাকও পাচ্ছেন৷ কিন্তু সমাজে নারী পুরোহিতদের সংখ্যা প্রচুর নয়৷ সমাজের সমস্ত স্তরে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নাতীত নয়৷ কিছুদিন আগে মফস্বলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে তা বুঝেছেন মৌ-রোহিণীরা৷ 

বৃন্দাবনের ভাগবত শাস্ত্রী নবল কিশোর গোস্বামী ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘শাস্ত্রে কোনোভাবেই এ কাজের সমর্থন মিলবে না৷ নারীরা বাড়িতে পুজো করতেই পারেন৷ কিন্তু গায়ত্রী মন্ত্রপাঠ কিংবা বেদমন্ত্র উচ্চারণের কোনো অধিকার তাঁদের নেই৷’’ কোন শাস্ত্রমতে এ কথা তিনি বলছেন, তার উপযুক্ত প্রমাণ অবশ্য নবল ডয়চে ভেলেকে দিতে পারেননি৷ বরং বিষয়টিকে প্রথা বলেই উল্লেখ করেছেন তিনি৷ 

পশ্চিমবঙ্গ সনাতন ব্রাহ্মণ ট্রাস্টের কর্মকর্তা শ্রীধর মিশ্রের বক্তব্য, পুরোহিত দর্পণে নারী পুরোহিত বলে কোনো বিষয়ের উল্লেখ নেই৷ প্রাচীনকাল থেকে পুরুষরাই পুজো করে আসছেন৷ এটাই রীতি, এটাই নিয়ম৷ নারীরা লক্ষ্মীপুজো, মনসা পুজো করতেই পারেন৷ কিন্তু গায়ত্রী মন্ত্র তারা উচ্চারণ করতে পারেন না৷ মৌ অবশ্য বলছেন, বৈদিক আমলে নারীর পৌরোহিত্যের প্রমাণ স্পষ্ট৷ ফলে শ্রীধরদের কথা ধোপে টেকে না৷ 

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী পুরোহিতদের ছোট-বড় সংগঠন তৈরি হয়েছে৷ পুনাতেও এ ধরনের সংগঠন কাজ করছে৷ নারী পুরোহিতরা বিয়ে, গৃহপ্রবেশ, শ্রাদ্ধে পৌরোহিত্য করছেন৷ 

ভারতে খ্রিষ্টানদের মধ্যেও নারী পাদ্রী তৈরি হয়েছে৷ ১৯৮৯ সালে কেরালায় মারাঠাকাভেল্লি ডেভিড প্রথম নারী পাদ্রী হয়েছিলেন৷ দক্ষিণ ভারতে বিশপ হয়েছেন এগ্গনি পুষ্পা ললিতা৷ তবে খ্রিষ্টানদের মধ্যেও নারী পাদ্রীর সংখ্যা খুব বেশি নয়, খুব প্রচলিতও নয়৷

এক দিকে শবরীমালা, অন্য দিকে নারী পুরোহিত-- এটাই সম্ভবত ভারতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্য৷ এখনো শবরীমালা মন্দিরে ঢুকতে পারেন না ঋতুমতী নারীরা৷ কোনো কোনো মন্দিরের গর্ভগৃহে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশ নিষেধ৷ কোনো কোনো মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয় না ভিনধর্মের মানুষকে৷ জাতপাত এখনো গ্রাস করে রেখেছে কোনো কোনো ধর্মীয় স্থানকে৷ আবার সেই ভারতেই গৌরী ধর্মপালদের জন্ম হয়েছে, বেদ, শাস্ত্র যারা গুলে খেয়েছেন৷ বেদমন্ত্রের সঙ্গে যারা মেলাতে পেরেছেন রবীন্দ্রনাথের গান৷ মৌ, রোহিণীরা সেই ঐতিহ্যই বহন করছেন৷ এমনও বিয়ের অনুষ্ঠানে তারা বেদমন্ত্র পাঠ করেছেন, যেখানে নারী হিন্দু, পুরুষ মুসলিম৷ ধর্মের এক নতুন ব্যাখ্যা তারা তৈরি করতে পেরেছেন৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন