বাঙালি নারীর সবচেয়ে নান্দনিক পোশাক শাড়ি | আলাপ | DW | 06.09.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

বাঙালি নারীর সবচেয়ে নান্দনিক পোশাক শাড়ি

সম্প্রতি দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোতে ‘শাড়ি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে৷ শাড়ি বিষয়ক সেই প্রবন্ধ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়৷

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বিশিষ্ট্য সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ রচিত সেই প্রবন্ধে উঠে এসেছে বাঙালি মেয়েদের দৈহিক গঠনের অসমতা, আর শাড়ি তাদের কতটা আবেদনময়ী করে তোলে সেই আলাপ৷ তাতেই ক্ষেপেছেন পাঠক সমাজ৷ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই প্রবন্ধ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ পাঠকদের একাংশ দাবি করছেন, পোশাকের স্তুতি করতে গিয়ে বাঙালি নারীদের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ করেছেন লেখক৷ কেউ কেউ বলছেন এটি যদি সাহিত্য হয় তবে সাহিত্যে এমনটি লেখা যেতেই পারে, সেক্ষেত্রে লেখকের কথা আমলে নেওয়ার কিছু নেই৷

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পক্ষ-বিপক্ষের দ্বন্দ্বে শাড়ির নন্দনতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব বা হাজার বছরের ঐতিহ্য যেন একটু চাপা পড়েই গেছে৷ ঠিক কবে থেকে বাঙালি নারীর বসন হিসেবে শাড়ি ঠাঁই পেয়েছে সেসব প্রশ্ন সামনে আসছে বারবার৷ একইসঙ্গে সাহিত্য বা প্রবন্ধের ভাষা কেমন হওয়া উচিত, কিংবা আদৌ একজন নারীর পোশাক কিসের ভিত্তিতে হবে কিংবা শাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী পোশাককে গণমাধ্যম কেমন করে তুলে ধরছে এসব আলাপও উঠছে৷ 

শাড়ির ইতিহাস প্রসঙ্গে লোকশিল্প ও শাড়ি গবেষক শাওন আকন্দ বলেন- আমাদের পোশাক শিল্পের ইতিহাস বুঝতে হলে প্রথমত বুঝতে হবে আমাদের আবহাওয়া কী আর এই অঞ্চলে কী পাওয়া যায়৷ ইতিহাস বলে, এখানে তুলা উৎপাদন হতো৷ আর বাংলাদেশ ট্রপিক্যাল আবহাওয়ার দেশ৷ যেকোনো দেশের পোশাক শিল্প গড়ে এই দুটো জিনিসের ওপর নির্ভর করে৷ যেহেতু গরমের দেশ আমাদের প্রয়োজন ছিল সূক্ষ্ম সুতার কাপড়ের৷ যেটা ইউরোপে হয়নি৷ ওরা মোটা মোটা কাপড় ব্যবহার করে ওদের আবহাওয়ার কারণে৷ আমাদের দেশের যে আবহাওয়াকে শীত বলি সেটি ইউরোপের জন্য গরম৷ তাই আবহাওয়ার কারণেই এ অঞ্চলে পাতলা সুতি কাপড় তৈরির চল শুরু হয়েছিল৷ এখনকার বঙ্গ নারীরা যেভাবে শাড়ি পরছেন সেটি বড়জোর ১০০ বছরের চল, ঠাকুর বাড়ির স্টাইল থেকে এমন শাড়ি পরার চল এসেছে৷ প্রাচীন আমলে বাঙালি নারীরা এভাবেই শাড়ি পরতো কিনা সেটি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে৷ শাড়িকে আসলে কাপড় হিসেবে দেখতে হবে৷ লজ্জা নিবারণের জন্য প্রাচীন আমলে এই কাপড় ব্যবহার করতো৷ তবে আগে এমনটি হতো না, শুধুমাত্র নিচের অংশ ঢাকতেই কাপড় ব্যবহৃত হতো৷ বিহারে একটি যক্ষী মূর্তি পাওয়া যায়, রাজশাহী বরেন্দ্র যাদুঘরেও এমন একটি যক্ষ্মী মুর্তি পাওয়া যায় যার কোমর থেকে পা পর্যন্ত শাড়ি পরা৷ ওপরের অংশ কোনো কাপড় নেই৷ তবে ওপরে এমন প্যাচ দিয়ে কবে থেকে শাড়ি পরা হচ্ছে সেটি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন৷ পাল যুগের দেবিমূর্তিতে আমরা শাড়ি দেখতে পাই৷ আবার ভদ্রস্থ নারী পোশাক হিসেবে শাড়ি উঠে এসেছে৷ কারণ বাঙালি নারীরা একসময় অন্তঃপুরে থাকতো৷ বাইরে যাওয়ার ভদ্রস্থ নারী পোশাকের প্রয়োজন পড়েনি৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে যাবার কাজ বেড়েছে নারীদের পোশাকের পরিবর্তন হয়েছে৷

এই মুহূর্তে যেসব শাড়ি ঐতিহ্য ধরে রেখেছে সেসব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঐতিহ্য বলতে তো আমরা সেটাই বুঝি যা এখনো চলমান সেটিই৷ সেই হিসেবে জামদানির কথা বলতে পারি৷ আমাদের দেশে মূল ঘটনা যেটা ঘটেছে সেটি হচ্ছে আমরা আসলে কাপড় বুনতে পারি সেটিকেই ধূতি বানিয়ে পরেছে মানুষ, শাড়ি হিসেবে পড়েছে৷ সেলাই-ফোড়াই বা কস্টিউম বিষয়টি মুসলমানদের আগমনের সঙ্গে ঘটেছে৷ এখনো খেয়াল করলে দেখা যায় হিন্দুদের অনেকে এবং বৌদ্ধদের একাংশ সেলাইবিহীন কাপড় পরে৷ সেভাবে হিসাব করলে সুলতানী আমল থেকে জামদানির ইতিহাস পাওয়া যায় এবং জামদানিটাই টিকে আছে৷ জামদানির চার/পাঁচশ' বা ৭০০ থেকে ১ হাজার বছরের একটা ইতিহাস পাওয়া যাবে৷ আরেকটি শাড়ি রয়েছে হ্যান্ডলুম যেটা ড্যানিশ কলোনিতে শেখা জ্যাকার্ড মেশিনে তৈরি৷ যেটার ইতিহাস একশ' বছরের বেশি না৷ স্বাধীনতার পর সেই জ্যাকার্ডে বোনা শাড়ি নারীরা লুফে নেয়৷ যেটাকে আমরা টাঙ্গাইলের শাড়ি হিসেবে চিনি৷ সেটার ইতিহাস অল্প দিনের হওয়ায় ঐতিহ্য বলতে জামদানিই টিকে আছে৷ 

অডিও শুনুন 06:23

‘এখন শাড়ি একটি ভীষণ এলিগেন্ট পোশাক’

যুগে যুগে শাড়ি আমাদের ফ্যাশনের অংশ হয়েছে, শাড়ি নিয়ে লেখা হয়েছে গল্প কবিতা৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান কাবেরি গায়েন মেয়েদের ফ্যাশন সচেতনতা ও নিজেদের প্রেজেন্টেবল করে তোলার চর্চা ও এর সঙ্গে শাড়ির সম্পর্কের রসায়ন প্রসঙ্গে বলেন- প্রত্যেকটা জাতির নিজস্ব ঢংয়ে তার পোশাক গড়ে ওঠে৷ তার আবহাওয়া থাকে, নৃতাত্ত্বিক বৈশ্যিষ্টে পোশাকের ঢং গড়ে ওঠে৷ আমাদের এই অঞ্চলে শাড়ি দীর্ঘদিন ধরে মেয়েরা পরে আসছে৷ এটি ভীষণ সুন্দর একটি পোশাক৷ খুবই নান্দনিক একটি ড্রেস শাড়ি৷ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যে প্রবন্ধ লিখেছেন তাতে যদি তিনি সেইসব বিশেষণ না ব্যবহার করতেন, সেক্সিস্ট চোখে না দেখতেন তাহলে আমাদের এত আপত্তির কিছু থাকতো না৷ তবে একটু খেয়াল করলে দেখবেন একসময় ইউরোপের মেয়েরা বড় বড় ঘাগড়া পরতো, কিমোনো পরতো জাপানিরা৷ এসব পোশাক পরে কাজ করা সুবিধার হয় না বলে তারা বদলে নিয়েছে৷ কিন্তু শাড়ি এমন একটা পোশাক, যেটা পরে বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলের মেয়েরা, শহরে নারী শ্রমিকরা কাজ করে যাচ্ছেন৷ সবাই সহজেই কাজ করে যাচ্ছে৷ এই পোশাকটা শুধুই পুরুষের চোখে বিভ্রম তৈরির জন্য বলে যে প্রস্তাব করা হয়েছে সেই প্রবন্ধে আমাদের আপত্তির স্থান সেখানেই৷

তিনি আরও বলেন, শাড়ি খুব আরামদায়ক পোশাক, তাই আমরা ভালোবেসেই পরি৷ শুধু আমরা নই, ভারত, শ্রীলংকা এমনকি পাকিস্তানের অনেকাংশের মেয়েরা শাড়ি পরে৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের সেই ভালোবাসার পোশাক নিয়ে একজন এসে হঠাৎ বললেন, বাঙালি মেয়েরা যথেষ্ট সুন্দর না, যথেষ্ট লম্বা না, এবং তাদের শরীরে অসমতা রয়েছে সেটিকে কেবল ঢাকতে পারে শাড়ি, এটি ভীষণ প্রবলেমেটিক৷ আমাদের পোশাকের ওপর যখন যৌনআবেদনময় তকমা লাগানো হয়, তখন সব স্তরের নারীদের আবহমানকাল ধরে ব্যবহার করা এই পোশাকটির ওপর অবিচার করা হয়৷

তিনি অধ্যাপক সায়ীদের প্রবন্ধ প্রসঙ্গে বলেন, শাড়ির গুণগাণ করতে গিয়ে বাঙালি মেয়েদের শারিরীক খামতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন৷ এবং তিনি বলার চেষ্টা করেছেন ইউরোপ বা আমাদের আশেপাশের দেশের মেয়েদের তুলনায় বাঙালি মেয়েরা কত অসুন্দর৷ এই বডিশেমিংটা ভীষণ নিন্দনীয় একটি বিষয়৷ 

একই সঙ্গে তিনি চলমান কর্পোরেট বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিলিয়ন ডলারের ইন্ড্রাস্টি চলছে নারীকে তার অসম্পূর্ণতাকে গিলিয়ে ব্যবসা করা৷ এটা শুধু আমাদের দেশে না, সারাবিশ্বেই চলছে, নারীকে পণ্য করে তোলা হয়েছে৷ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রবন্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আবার বলেন, এই প্রবন্ধে নারীকেও তিনি বলছেন নমনীয়, শাড়িকেও বলছেন নমনীয়- এই যে ভাষার রাজনীতি, এটা কর্পোরেট বিশ্ব লুফে নিয়েছে৷ নারীর মনোজগতে ঢোকানো হয়েছে তোমার উচ্চতা বেশি না হলে তুমি সুন্দর না, তোমার গায়ের রঙ ইউরোপীয়দের মতো না হলে তুমি সুন্দর নও৷ এসব কিছুরই বেসিক উদ্দেশ্য হচ্ছে বাণিজ্য করা৷

আমাদের মনোজগতে ইউরোপীয়ান স্ট্যান্ডার্ড গড়ে উঠেছে৷ আর সেইটিকে কাজে লাগিয়ে আরও নতুন চাহিদা তৈরি করে কর্পোরেট বিশ্ব নারীর মনোজগতে নিজের শরীর সম্পর্কে একধরনের খারাপবোধ জন্ম দিয়ে পণ্য সামগ্রী ব্যাবহারে বাধ্য করছেন৷ এটি অত্যান্ত নিন্দনীয়৷ তবে সময় বদলাচ্ছে, মেয়েরা জেগে উঠছে এসবের বিরুদ্ধে৷

শাড়িকে জনপ্রিয় বা অজনপ্রিয় করে তোলার পেছনে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ক্যানভাসের প্রকাশক ও সম্পাদক কানিজ আলমাস খান বলেন, এখন শাড়ি একটি ভীষণ এলিগেন্ট পোশাক, যেকোনো মেয়েকে শাড়ি পরলে অন্য যেকোনো পোশাকের তুলনায় ভীষণ সুন্দর লাগে৷ কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলায়, আমাদের জীবনধারাও বদলেছে৷ মেয়েরা এখন অনেক বেশি বাইরে কাজে চলে এসেছে৷ শুধু একজন হাউজ ওয়াইফ বা বাসায় শাড়ি পরাটা যতটা ম্যানেজেবল হয়, কিন্তু বাইরে ততটা কমফোর্টবেল হয় না৷ আমাদের ফ্যাশন ইন্ড্রাস্টিও চেষ্টা করছে শাড়িকে জনপ্রিয় করে যেতে৷ ব্রাইডাল কালেকশনের কথা ধরাই যায়, সেখানে আমরা অনেক এলিগেন্ট জামদানি, বেনারশির দেখা পেলেও এক্সক্লুসিভ কিছু পাই না, তাই মেয়েরা লেহেঙ্গার মতো পোশাকের দিকে ঝুঁকে৷ অথচ আমাদের মিডিয়াগুলো সবসময় শাড়ি নিয়ে সোচ্চার৷ আমার ক্যানভাস প্রসঙ্গেই বলতে পারি- শাড়ি নিয়ে প্রচুর সংখ্যা, কাভার স্টোরি অনেক কিছু করা হয়েছে এবং করা হয় নিয়মিত৷ মোদ্দাকথা আমরা শাড়ি পরতে ভালোবাসি, শাড়ি দেখতে ভালোবাসি৷ গণমাধ্যম শাড়ি নিয়ে সোচ্চার বলেই এখনো শাড়ি জনপ্রিয় পোশাকের তালিকায় রয়েছে৷ কিন্তু ব্যক্তি জীবনে যারা ভোক্তা তারা সবকিছুর মাঝে কমফোর্টকে প্রাধান্য দিচ্ছেন বলে শাড়ির চাহিদা একটু কমেছে৷ আমাদের ছেলেবেলায় কলেজে উঠলেই শাড়ি পরার সুযোগ খুঁজতাম৷ সবাই শাড়ি ভালোবাসে, বিভিন্ন উৎসবে শাড়ির বিকল্প কোনো পোশাকই নেই৷ পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি এসব স্থানে শাড়িই মূল পোশাক৷ কিন্তু এখন সেসব উৎসবে একটা মেয়ে উৎসবের থিম রঙ ঠিক রেখে একটা টপস বা কামিজ পরে নিচ্ছে, যেমন পহেলা বৈশাখে প্যান্টের সঙ্গে লাল টপস পরছে৷ যেটা আমরা ভাবতেই পারতাম না৷ শাড়িটা এখন আমাদের উৎসবের জন্য নির্ধারিত পোশাক হয়ে যাচ্ছে৷ সময়ের প্রয়োজনে মেয়েদের ব্যস্ততার কারণে ইজি উইয়ারিং ক্লথ পরেন৷ কিন্তু শাড়ি অপছন্দের বিষয়টা এমন না৷ শাড়ি নিয়ে সবারই আগ্রহের জায়গা আছে৷ গণমাধ্যমও চেষ্টা করে যাচ্ছে৷

ঠিক কোন ভাবনা থেকে নারী-পুরুষের পোশাকের ডিজাইন করেন, ছেলে আর মেয়েদের পোশাক তৈরির দৃষ্টি ভঙ্গি ঠিক কোথায় পালটে যায়? শাড়ি ডিজাইন করার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টা মাথায় রাখেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ফ্যাশন হাউস দেশালের কর্ণধার ও প্রধান নকশাকারী ইশরাত জাহান বলেন, তিনি এমন কোনো রঙ বা ম্যাটেরিয়াল ব্যাবহার করতে চান না যেটি মানুষের ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে যায়৷ সেটা শাড়ি হোক বা অন্য যেকোনো পোশাকই হোকনা কেন৷ ছেলেদের পোশাক ডিজাইনের ক্ষেত্রে তিনি চড়া রঙকে এড়িয়ে চলেন৷ তিনি আরও বলেন, শাড়ি ডিজাইনের ক্ষেত্রে একজন ডিজাইনার হিসেবে তিনি রঙটাকে প্রাধান্য দেন, জমিন এবং পাড়ের রঙ অবশ্যই কনট্রাস্ট হতে হবে৷ তিনি চান তার ডিজাইন করা শাড়িতে জমিনের রঙ এক রঙা হবে৷ আর নকশা থাকলেও ভীষণ হালকাটাই তার পছন্দ৷ পাড় আর জমিনের রঙ নির্ধারণ হওয়ার পর পাড়ে নকশা নিয়ে কাজ করেন৷

শাড়ির নকশা বুনন যেমনই হোক আলাপ এখন শাড়ি পরা নারীর বর্ণনা নিয়ে৷ আসলেই আমরা এই একুশ শতকে এসে এমন আচরণ করতে পারি কিনা যা বডি শেমিং হয়, এমন সাহিত্য রচনা করতে পারি কিনা যেটি নারীর অমর্যাদা করে বা নারীকে শুধুই ভোগ্য বলে মনে হয়৷ এসব বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও জেন্ডার বিষয়ক গবেষক সিউতি সবুর বলেন, তিনি শাড়ি ও নারী নিয়ে চলমান বিতর্কটিকে একদমই ভিন্নভাবে দেখছেন৷ তিনি বলেন, নারী বা পুরুষের পোশাক কী হবে সেটাতে কেমন লাগবে সেটি নির্ধারণটা একধরনের মোরাল পুলিশিং৷ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একজন বড় মাপের ব্যক্তিত্ব কিন্তু তিনি বা অন্য যে কেউই নির্ধারণ করতে পারেন না নারীদের পোশাক কী হবে৷ এই পোশাক নির্ধারণ করে দেওয়ার মতো মোরাল পুলিশের আচরণ শুধু যে পুরুষ করছেন তা নয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অংশ নিচ্ছে৷ 

অডিও শুনুন 05:32

‘‘সবাই সহজেই কাজ করে যাচ্ছে’’

এক ধরনের আদর্শ সামনে রেখে নারী পুরুষ বিতণ্ডায় লিপ্ত হচ্ছে৷ ফলে আমরা আমাদের বিতণ্ডায় একজনকে সেক্সিস্ট, রেসিস্ট মিসোজেনিস্ট নানা ভাবে আখ্যা দিচ্ছি৷ এই শাড়ি ইস্যুতে প্রতিবাদের ভাষাটাও মিসোজেনিক হয়ে সমস্যার সৃষ্টি করছে৷ আসলে আমরা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতার জায়গা থেকে একটা ভাষা নির্মান করছি৷ কিন্তু সেখানে ভুল ত্রুটিগুলো খেয়াল রাখছি না৷ পোশাকের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা সৃষ্টি করছি আমরা স্লিভলেস বা বোরকা কোনোটাই নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখি না আমরা৷ কে কি পরছে না পরছে সেটিকে ভিত্তি করে বডিশেমিংয়ের মতো বিষয় গ্রহণযোগ্য না৷

যুগে যুগে আমরা সাহিত্যের ভাষা নির্মাণ ও সামাজিক শরীর নির্মাণের যে চল দেখে আসছি সেটা একই৷ নারীরা মায়াবতী হবেন না কোমল হবেন সেটা হুমায়ুন আহমেদ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদরা সাহিত্যে নির্মাণ করে এসেছেন৷ ইমদাদুল হক মিলন বা সুনীল কিংবা আমাদের যত শিল্পী সাহিত্যিকেরা যুগে যুগে নারীর শরীর নির্মাণ করে এসেছেন৷ এটা ভীষণ পুরান গল্প৷ আজকেই কেন এই প্রতিবাদ? তবে একইসঙ্গে এটি ভীষণ ভালো লাগার যে দেরিতে হলেও এইসব নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে৷ তবে প্রতিবাদের ভাষা সবার সমান হয় না এটিও মাথায় রাখতে হবে৷ পাশাপাশি এটিও বুঝতে হবে নারীবাদেরও  ভিন্ন ভিন্ন ধরন রয়েছে৷ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রবন্ধ প্রসঙ্গে যে প্রতিবাদ হচ্ছে তা ভীষণ যৌক্তিক কিন্তু তারও ভক্তকূল রয়েছে যারা পালটা প্রতিবাদ করবে৷ আশার দিক হচ্ছে পোশাক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক আলাপে বিতর্ক সবসময় কথা বলার নতুন নতুন জায়গা তৈরি করে৷ ৫০/৬০ এর দশকের লেখকদের ভাষায় নারীরা নমনীয় কমনীয় হবে এসব আলাপ নারীরা গ্রহণ করেছে এবং তাদের ঘনিষ্ঠ হয়েছে নতুবা দূরে থেকেছে৷

আমাদের আসলে পলিটিক্যাল কারেক্টনেস নিয়ে ভাবার সময় এসেছে৷ সাহিত্যেও ভাষা পরিবর্তনের সময় এসেছে৷ আমরা অন্যকে অপদস্ত, অপমান না করে সাহিত্যের ভাষায় যদি শ্রদ্ধার জায়গাটা তৈরি করতে না পারি তাহলে তো হবে না৷ এটি মনে রাখতে হবে সাহিত্য বা প্রবন্ধ কোনোটাই স্বেচ্ছাচারিতার জায়গা না৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন