বাংলাদেশ-ভারতের ৫০ বছর: ‘অনন্য’ সম্পর্কে সীমান্ত হত্যা আর তিস্তার বড় অস্বস্তি | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 17.12.2021

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ-ভারতের ৫০ বছর: ‘অনন্য’ সম্পর্কে সীমান্ত হত্যা আর তিস্তার বড় অস্বস্তি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেরও ৫০ বছর হলো। দুই দেশেরই শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত হত্যাসহ কিছু বিষয় এখনো বড় অস্বস্তি।

দুই দেশের সম্পর্ক ‘অনন্য উচ্চতায়' থাকার পরও সীমান্ত হত্যা কেন বন্ধ হচ্ছে না? আসলে সংকটটা কোথায়? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এটা রীতিমতো অন্যায়। কারণ, হত্যাগুলো সব এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং। এর সমাধানও রয়েছে। ১৯৯৬ সালে চীন-ভারত চুক্তি করেছে যে সীমান্তের দুই কিলোমিটারের মধ্যে তারা কোনো অস্ত্র বহন করবে না, দু'দেশ এটা মেনে নিচ্ছে। গালওয়ান ভ্যালিতে যে সংঘর্ষ হয়েছে, সেখানে কিন্তু কোনো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। চীনের সঙ্গে ভারত এ চুক্তিটি করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্তকে তারা হয়ত এখনো পাকিস্তানের সীমান্ত হিসেবে দেখে। এর মানে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। চীনের মতো বাংলাদেশের সীমান্তেও ভারত চুক্তিটি করতে পারে৷ দুই কিলোমিটারের মধ্যে যদি কেউ ধরা পড়ে, তাহলে তাকে ধরে নিয়ে জেল-জরিমানা করুক, কিন্তু জিরো লাইনে কাউকে পেলে গুলি করে হত্যা করবে কেন? ফেলানি তো মারা গেছে জিরো লাইনে। ফেলানির কাছে তো অস্ত্র ছিল না, সে এপাশে আসছিল। এর মানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের মানসিকতাই হলো- এরা সব শত্রু। ভারতের গবেষণা থেকেই জানা যায়, পাকিস্তান সীমান্তে পাহারা দেওয়া সৈন্যদেরই কোনো পুনঃপ্রশিক্ষণ ছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে আসা হয়। ভারতের বোঝা উচিত, বর্ডার কিলিং ইজ কিলিং ইওর সেলফ।’’ 

অডিও শুনুন 04:31

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া চাই না: হুমায়ুন কবীর

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিব বর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বুধবার ঢাকায় আসেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। শুক্রবার তিনি ফিরে গেছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হয়ে ঢাকায় আসা ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধণ শ্রিংলা বুধবার ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, ‘‘দুই দেশের সম্পর্ক এখন যে পর্যায়ে আছে, সেটা অন্য দেশগুলোর জন্য শিক্ষনীয়। দুই দেশ স্বর্ণালী সময় অতিক্রম করছে। ভারত সব সময় বাংলাদেশের পাশে আছে।’’

যেখানে ইউরোপে সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ৫০ বছর পর এত চমৎকার সম্পর্কের মধ্যেও সীমান্তে ভারত কাটাতারের বেড়া দিচ্ছে। এখনও সীমান্তে হত্যা নিয়ে প্রতিনিয়ত কথা বলতে হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো কিভাবে পার করা সম্ভব? এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের আরেকটু সৃজনশীল হতে হবে। আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক যে অনন্য উচ্চতায় সেটা যতটা না নীতি নির্ধারকদের কাছে পরিস্কার, জনগণের কাছে কিন্তু ততটা পরিস্কার না। এই সম্পর্ক যদি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই করতে হয়, তাহলে ৭১ সালে যেমন ভারত সরকার একসাথে কাজ করেছে, দুই দেশের জনগণও একসঙ্গে সহমর্মীতার সঙ্গে কাজ করেছে, এখনও সেভাবে করতে হবে। আমরা যদি উভয় পক্ষের মধ্যে উপাদেয় সম্পর্ক চাই, তাহলে আমার ধারণা দুই দেশের সরকারের মধ্যে যে সম্পর্ক, সেটা জনগণের মধ্যে, অর্থাৎ জনগণ বোঝে যে সম্পর্কটা, সেই জায়গাটাতে আমাদের মনোযোগ দেওয়া দরকার। জনগণের মধ্যে যদি বোঝার অসুবিধা থাকে, তাহলে সেটাকে কিন্তু টেকসই করা মুশকিল। আমরা কিন্তু একে অপরের উপর নির্ভরশীল। আমি তো সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া চাই না। আমি চাই সীমান্ত জুড়েই অর্থনৈতিক অঞ্চল হোক। তাতে দুই দেশের সীমান্তের পিছিয়ে থাকা বাসিন্দারা একসঙ্গে কাজ করে খেতে পারে। ফলে আমাদের আরো কীভাবে সৃজনশীল হওয়া যায় সে জায়গায় চেষ্টা করতে হবে। ভবিষ্যতে এমন কিছু জিনিস তৈরি হচ্ছে যে জায়গায় আমরা একসঙ্গে কাজ না করলে দু'পক্ষই ক্ষতিগ্রস্থ হবো। আর যদি একসঙ্গে কাজ করে যেতে পারি, তাহলে আমরা দু'পক্ষই উপকৃত হবো।’’

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ৫০ বছরে নিকটতম প্রতিবেশীর কাছ থেকে কী কী পেয়েছে বাংলাদেশ? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, ‘‘প্রাপ্তি বলতে গেলে প্রথমেই আমাদের বলতে হবে, আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা পেয়েছি, সেটা তাদের সহযোগিতায় পেয়েছি। এখানে ভারত শুধু এককভাবে সহযোগিতা করেছে তা নয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তখন আমরা যেটা পেয়েছি, তার পেছনেও ভারতের একটা বড় ভূমিকা ছিল। এরপর স্বাধীন দেশে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তার পেছনেও ভারতের ব্যাপক সহযোগিতা ছিল। স্বাধীনতার পর অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে ভারত এখান থেকে তাদের সৈন্য সরিয়ে নিয়ে গেছে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূত্র ধরেই কিন্তু সম্পর্কটা বিকশিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের বঙ্গোপসাগর এবং স্থল সীমান্তে যে সমস্যা ছিল, সেটাও সমাধান হয়ে গেছে। অথচ জাপানের সঙ্গে রাশিয়ার আইল্যান্ড নিয়ে যে বিরোধ, সেটির এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধেরও নিষ্পত্তি হয়নি। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। চীনের সঙ্গেও ভারতের হয়নি। সেই জায়গা থেকে চিন্তা করলে আমরা অনেক কিছুই সমাধান করতে পেরেছি। আমি মনে করি, প্রাপ্তির জায়গা যেমন আছে, অপ্রাপ্তির জায়গাও আছে। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে অনেক সময় টানাপোড়ের ছিল, বিশেষ করে ৭৫-এর পরে। সবকিছু বিবেচনা করলে দেখা যাবে, আমাদের সম্পর্কের মধ্যে চ্যালেঞ্জটা এখনও রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ইস্যু যেটা, পানি সমস্যার এখনও সমাধান হয়নি। সীমান্তে হত্যা এখনও বন্ধ হয়নি। এসব সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা ভারতের আরো বড় ভূমিকা চাই।’’

অডিও শুনুন 03:56

সীমান্ত হত্যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়: মো. তৌহিদ হোসেন

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ৫০ বছরে দাঁড়িয়েও এমন কিছু বিষয় অমীমাংসিত থাকার কারণ জানতে চাইলে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ডেপুটি হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করা সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে অমীমাংসিত ইস্যু এখন আছে, আপনি যদি কালকেই সব সমস্যার সমাধান করে দেন, তাহলে দেখবেন, দুই দিন পর পর নতুন ইস্যু তৈরি হবে। তবে কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর সমাধান এতদিনে হয়ে যাওয়া উচিত ছিল বলে আমি মনে করি। যেমন সীমান্ত হত্যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়। গ্রহণযোগ্য না এই কারণে যে, আমাদের দুই দেশের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হচ্ছে না। ভারত-চীনের তো মোটামুটি বৈরী সম্পর্ক। সেখানেও কিন্তু গোলাগুলি করা নিষেধ। গত বছর যে ঘটনা ঘটে গেছে, সেখানেও কিন্তু কেউ কাউকে গুলি করিনি। বর্ডারে সাধারণ মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলা পৃথিবীর কোথাও শান্তিপূর্ণ দুইটা দেশের মধ্যে নেই। একমাত্র এখানে ছাড়া। কেউ যদি চোরাকারবারিতে জড়িত থাকে, তার শাস্তি কিন্তু আমাদের দুই দেশের কোনো দেশেই মৃত্যুদণ্ড না। অন্য যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেখানে দেখা গেছে, যে সব কিছুতেই ভারতের অগ্রগামী হওয়ার গতি খুব শ্লথ। সীমান্তে যে সমস্যা ছিল, সেটা দূর করতে তারা ৪২ বছর নিয়েছে। অথচ আমরা সেটা কয়েকদিনের মধ্যে করেছি। বাংলাদেশ সবকিছু খুব তড়িৎ গতিতে করে, সেটাই দু'টো বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে হওয়া উচিত। আর পানিবন্টন নিয়ে যে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না, এটা খুবই ক্ষোভের বিষয়। তিস্তা নিয়ে চেষ্টা করতে করতে এখন সেটা কোল্ড স্টোরেজে চলে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হচ্ছে না। আমাদের ব্যবসায়ীদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, তাদের সেটুকু দেওয়া উচিত।’’

দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন। দুই দেশের জনগণের সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি এ কে এম শামসুল আরেফিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত সুন্দর। কিন্তু কিছু সংকট এখনও রয়ে গেছে। বাংলাদেশের ৬০ ভাগ মানুষ পশ্চিমবঙ্গের বাইরের মানুষের সম্পর্কে কিছুই জানে না। আবার ভারতের বহু এলাকার মানুষ বাংলাদেশ কোথায় সেটা জানে না। ফলে আমাদের সম্পর্কটা হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক। এর মধ্যে ভারত এনআরসি শুরু করার পর আমাদের মধ্যে কিন্তু উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তারা আসলে পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশকে টার্গেট করে এটা করেছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে উদ্বেগে পড়েছে বাংলাদেশের মানুষ। সম্পর্কের এত বছর পর এসে এগুলো না হলেই ভালো। সম্পর্ক তো আর কখনোই একপাক্ষিক না, দু'জনকেই দু'জনের প্রয়োজন। সেটা ভারত সরকারকে বুঝতে হবে। আমরা চাই আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক আরো উঁচুতে যাক।’’