বাংলাদেশে ‘রাইড শেয়ারিং′ প্রতারণা | বিশ্ব | DW | 11.06.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

বাংলাদেশে ‘রাইড শেয়ারিং' প্রতারণা

যাত্রাপথে নিজের যানবাহনের খালি আসনে একই যাত্রাপথের অন্য যাত্রীকে পরিবহন করে নিয়ে যাওয়াই রাইড শেয়ারিং৷ কিন্তু বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং সেবার নামে যা চলছে, সেটি বিশুদ্ধ ব্যবসা৷ বাংলাদেশের জন্য নতুন, তাই দেখা দিচ্ছে জটিলতা৷

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটরবাইক চালকেরা নামেমাত্র হেলমেট দেন যাত্রীদের

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটরবাইক চালকেরা নামেমাত্র হেলমেট দেন যাত্রীদের

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বজুড়ে জ্বালানী সংকট বেশ প্রকট হয়ে দেখা দেয়৷ আর তখনই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে রাইড শেয়ারিং-এর ধারণা৷ কোনো কোনো দেশে এটি কারপুলিং, কস্ট শেয়ারিং নামেও পরিচিত৷ জ্বালানী, সময়, অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি কমানোও হয়ে ওঠে এর জনপ্রিয়তার কারণ৷

কোনো কোনো দেশে রাইড শেয়ারিংকে সরকারিভাবে সহায়তা করার চেষ্টা চলেছে দীর্ঘদিন ধরে৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্যে কারপুলিং-এর জন্য আলাদা সড়ক করে দেয়া হয়েছিল৷ এমন অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছে আরো নানা দেশ৷

পরিবেশের কথা বাদই দিলাম৷ অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও গণপরিবহন ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক৷ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এখন গুগল ম্যাপই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার রুট, বাস, ট্রাম বা অন্য সব ধরনের বিকল্প আপনাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানিয়ে দেয়৷ বাংলাদেশে কখন, কোথায়, কোন বাস যায়, তা হয়তো চালকেরাও ঠিকমতো বলতে পারেন না৷

নৈরাজ্য তো আছেই৷ বিদেশি বাদ দিলাম, অন্য শহর থেকে ঢাকায় নতুন আসা কারো পক্ষেও গণপরিবহনের রুট, সময়সূচি, ভাড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া অসম্ভব৷

বিকল্প ব্যবস্থায় যাদের সামর্থ্য রয়েছে, তারা গাড়ি কিনছেন৷ এমন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার আছে, যাদের সামর্থ্য না থাকলেও প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি থেকে বাঁচতে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে হলেও কিনছেন ব্যক্তিগত গাড়ি৷

দরকারের সময়ে সিএনজি অটোরিকশা, ট্যাক্সি, রিকশা, কোনোকিছুই হাতের নাগালে পাওয়া ঢাকা শহরে সম্ভব না৷ আর বৃষ্টি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সমাবেশ, বা বড় কোনো পরীক্ষা থাকলে ঢাকা শহরের যাত্রীদের অবস্থা হয় পাগলের মতো৷

এই অবস্থায় যাত্রীদের আশীর্ব্বাদ হয়ে আসে উবার৷ এরপরই পাঠাও এবং পরে আরো বেশ কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান গণপরিবহনের নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে সে জায়গা দখল করে৷ হাতের নাগালে অ্যাপ৷ বাসায় বসে অনুরোধ পাঠালে গাড়ি এসে হাজির হয়৷ কোনো দামদর করতে হয় না৷ নিশ্চিন্তে পৌঁছে যাওয়া যায় গন্তব্যে৷

পাঠাও নিয়ে এলো যানজটের সমাধানও৷ শুরু হলো কারপুলিং-এর আদলে মোটরসাইকেলপুলিং৷

কিন্তু রাইড শেয়ারিং নাম দিলেও, রাইড কি শেয়ার করছেন এই সেবা দানকারী চালকেরা? না, অন্তত ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই না৷ কোনো যাত্রী নিজে কোথাও যাচ্ছেন, এমন ক্ষেত্রে সে পথের কাউকে নেয়া হলো শেয়ারিং৷ কিন্তু এখন পাঠাও-উবার যা করছে, তা কোনোভাবেই শেয়ারিং না৷ বরং কথ্য বাংলায় যাকে ‘খ্যাপ' বলা হয় যাকে, মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য সেই বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে এরা৷

নানা সুবিধার কারণে পাঠাও-এর মোটরসাইকেল আমার কাছেও বেশ প্রিয় ছিল৷ সে সূত্রেই চালকদের কাছ থেকে জানা, পাঠাও জনপ্রিয় হওয়ার পর হঠাৎ করেই ঢাকা শহরে বিভিন্ন শোরুমগুলোতে বেড়ে গেছে মোটরসাইকেল বিক্রি, সড়কে প্রতিদিনই নামছে নতুন নতুন যান৷

একবার একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যিনি মাত্র আগের দিন ঢাকায় এসেছেন৷ নিজের মোটরসাইকেল তো নেইই, ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই৷ যা আছে, তা হলো পরিচিত এক বড় ভাই যিনি কাজ করেন পুলিশে৷ ফলে দিব্যি মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে একদিনেই তিনি কয়েকশ টাকা কামিয়েছেন, যাত্রাপথের দিকও চিনে নিয়েছেন যাত্রীর কাছ থেকেই৷

গাড়িতেও একই যন্ত্রণা৷ গাড়ি কিনলে পাওয়া যাচ্ছে বাড়তি আয়ের সুযোগ৷ ফলে অনেকে গাড়ি কিনে সেটা নিবন্ধন করছেন উবার-পাঠাওয়ে৷  ফলে যানজট কমার বদলে, তাতে আরো নতুন যন্ত্রণা যোগ হচ্ছে৷

এসব গাড়ি বা মোটর সাইকেলে নেই কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ৷ একটা নীতিমালা হলেও অন্য সব খাতের মতো এটিও অকার্যকর৷

নিরাপত্তা, জবাবদিহিতাসহ নানা বিষয়ে যাত্রীদেরও রয়েছে অভিযোগ৷

ফেসবুকে বন্ধুদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম রাইড শেয়ারিং নিয়ে তাঁদের মন্তব্য৷ অনেকে খুঁত থাকা সত্ত্বেও এসব সেবাকে স্বাগত জানিয়েছেন৷ কেউ কেউ তুলে ধরেছেন নিজেদের অভিজ্ঞতা৷

বেলাল হাসান নিসার গতি ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটরবাইক চালকেরা নামেমাত্র হেলমেট দেন যাত্রীদের৷

নূসরাত হক প্রশ্ন তুলেছেন চালকের ব্যবহার নিয়ে৷ একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক ওবায়দুর মাসুম এক কথায় জানিয়ে দিয়েছেন, ‘‘সবগুলো অবৈধভাবে চলছে৷'' সৈকত সাদিক রাস্তায় চালকদের কোনো আইন না মানার বিষয়টিকে বড় সমস্যা বলে মনে করছেন৷

HA Asien | Anupam Deb Kanunjna

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

রিফাত লোপা ভাড়া নির্ধারণে সেবাগুলোর স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কথা তুলে ধরেছেন৷ ‘‘রাইড শেয়ারিং এর কারণে কিছুটা ভোগান্তি মধ্যবিত্তের কমেছে'' মানছেন জান্নাতুল ফেরদৌস৷ কিন্তু পাশাপাশি বলছেন, ‘‘যেসব কারণে সিএনজিতে চড়া বন্ধ করছিলাম, এখন উবার পাঠাও তা শুরু করছে। ঈদে ভাড়া ৪ গুণ! আবার মোড়ে দাঁড়িয়ে বাইকগুলো চুক্তিতে যেতে চায়!''

কারপুলিং বা রাইড শেয়ারিং-এ কোনোভাবেই একজন চালকের মুনাফা করার কথা না৷ শুধু যাত্রাপথে জ্বালানির খরচের এক অংশ দেয়ার কথা সহযাত্রীর৷ কিন্তু বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং-এর নামে রীতিমতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন চালকেরা৷ শুধু চালক নন, একটা অ্যাপ বানিয়ে আর কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই কামাচ্ছেন নগদ টাকা৷

আমার মন্তব্যে মনে হতে পারে আমাকে ‘সুখে থাকলে ভূতে' কিলাচ্ছে৷ কিন্তু একটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় এমন নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে সে দেশ কখনও উন্নত হতে পারে না৷

যদি রাইড শেয়ার করতে হয়, সেটা অবশ্যই দারুণ উদ্যোগ৷ আর যদি এখন যা চলছে তাই চলতে দিতে হয়, তাহলে শেয়ারিং-এর মুখোশ ছেড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই তাদের নিবন্ধন করতে হবে৷ একদিকে শেয়ারিং-এর নামে দু'পয়সা বাড়তি কামিয়ে ট্যাক্স ফাঁকি, অন্যদিকে জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যাচ্ছেতাই করার সুযোগ ব্যবসায়ীরা চিরদিনই নিয়ে এসেছেন, সে চেষ্টা তারা চালিয়েও যাবেন৷

সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের পক্ষ নিয়ে সবকিছুকে একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা৷ এক্ষেত্রে অবশ্য তথাকথিত রাইড শেয়ারিং সেবায় হাত দেয়ার আগে গণপরিবহনে হাত দেয়ার পক্ষেই থাকবো আমি৷

আপনি কী মনে করেন? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন