বাংলাদেশে ‘ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে’ | আলাপ | DW | 04.12.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

বাংলাদেশে ‘ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে’

বাংলাদেশ অনেক দিক দিয়েই বিশ্বের চোখে সমাদৃত৷ শিশুমৃত্যু হার কমানো, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়৷ তারপরও ঘাস চাষ শিখতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ যেতে হয় কেন?

সরকারি কর্মকর্তাদের অনেককেই বলতে দেখলাম ‘এটা ভুলভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে৷ আসলে ঘাস চাষ শেখাটা উদ্দেশ্য নয়, দুগ্ধশিল্পের উন্নয়ন আসল কারণ৷’

কর্মকর্তাদের এই মন্তব্য শতভাগ সঠিক বলে মেনে নিলাম৷ তারপরও আমার কিছু কথা রয়েছে, একটু ইতিহাস এবং কিছু প্রশ্ন৷

এক- স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭৩ সালে সরকার ‘সমবায় দুগ্ধ প্রকল্প’ নামে দুগ্ধ শিল্প উন্নয়নের প্রকল্প শুরু করে৷ কেবল দুগ্ধ উৎপাদন বাড়নোই নয়, দুগ্ধচাষীদের স্বার্থ রক্ষাও ছিল এর লক্ষ্য৷ পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে এটির নাম পালটে করা হয় দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড- মিল্ক ভিটা প্রতিষ্ঠিত হয় ৷ একসময় মিল্ক ভিটার দুধ ছাড়াও ঘি, মাখন, আইসক্রিম, দই, এমনকি চকলেটও পৌঁছে যেত বাংলাদেশের আনাচেকানাচে৷ এখন মিল্ক ভিটার পণ্য কোথায় যায়?

এরই মধ্যে ব্র্যাক, আকিজ, প্রাণের মতো বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে দুধ কিনে বাজারজাত করায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে৷ সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাকে হটিয়ে বাজার দখল করছে তারাই৷ কিন্তু কেন?

এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো কিছুটা জানা যাবে বাংলা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদন থেকে৷ ২০১৮ সালের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরে মিল্ক ভিটার সমবায়ী খামারিদের গরুর জন্য বরাদ্দ ৪৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে৷ গরুর জন্য বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয় না, গরু কেনার জন্য ঋণ দেয়ার কথা থাকলেও সেটাও দেয়া হয় না৷ খামারিদের এমন নানা অভিযোগ রয়েছে মিল্ক ভিটার পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে৷ এবং যথারীতি, মেলেনি কোনো সদুত্তর৷

এই যে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র পুরো দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে, এর বিরুদ্ধে কোনো প্রকল্প নেয়া যায় না? খামারিদের টাকা কিভাবে নিজের পকেটে না ঢুকিয়ে খামারিদেরকেই ফেরত দেয়া যায়, সেটা শেখার জন্যও কি বিদেশে আসতে হবে?

দুই- দেশের দুগ্ধশিল্পের এখন কী অবস্থা? ইত্তেফাকের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে কিছু তথ্য পড়লে কিছুটা অনুমান করা যায়৷ 'দুধে স্বনির্ভর হচ্ছে দেশ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা উল্লেখযোগ্যভাবে না পেলেও নীরবে শিল্পটির বিকাশ ঘটছে।’ কিভাবে? সরাসরি প্রতিবেদন থেকেই কিছু তথ্য তুলে ধরছি৷

‘দেশে রেজিস্ট্রার্ড ও আনরেজিস্ট্রার্ড মিলিয়ে দুধের খামার আছে ১২ লাখের মতো৷ আর এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি লোক জড়িত৷ দেশে এখন দুধের চাহিদা রয়েছে এক কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন৷ এর মধ্যে দেশে উৎপাদন হয় ৭০ শতাংশ৷ বাকিটা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়৷ গত ১০ বছরে দেশে দুধের উৎপাদন প্রায় চারগুণ বেড়েছে৷’

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

শুধু তাই নয়৷ প্রতিবেদনে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তরের এক ছাত্রের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খামার তুলে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে৷ ডেইরি ফারমার্স এসোসিয়েশনের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, সংগঠনের ৮১ হাজার সদস্যের মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি স্নাতক পাস৷ কী দারুণ একটি তথ্য!

খুব সহজ একটি প্রশ্ন৷ এই যে উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা নিজেরা খামার করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ না দিয়ে, তাদের উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত না করে কয়েক ডজন সরকারি কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরে পাঠানোর মানে কী?

১০১ কোটি টাকার ‘ঘাস চাষ শেখা’ প্রকল্পের বদলে এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুললে ক্ষতি কী? যারা এরই মধ্যে নিজেরা শিক্ষা ও শ্রম দিয়ে সাফল্য পেয়েছেন, তাদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলে ক্ষতি কী?

সাভারে প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে৷ শুনেছি সেখানে কেবল হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগলসহ অন্যান্য প্রাণীই নয়, ঘাসসহ পশুখাদ্য নিয়েও দারুণ দারুণ সব গবেষণা হয়৷ ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম চলমান গবেষণা কার্যক্রমের সবশেষ তালিকা দেয়া হয়েছে ২০১৮-১৯ সালের৷ সেখানে ৪০টি প্রজেক্টের তালিকা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে কৃষক ও খামারিদের প্রশিক্ষণের প্রকল্পও রয়েছে৷

এরপরও উন্নত ঘাস খাইয়ে উন্নত গরু গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ নিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ যেতেই হবে? আমরা ‘বিদেশ’ হব কবে?

সংশ্লিষ্ট বিষয়