বাংলাদেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 26.09.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

বাংলাদেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা

বাংলাদেশে গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে৷ বাদ যায়নি প্রতিবন্ধী কিংবা ছয় বছরের শিশুও৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে এসব নারী ও শিশুকে৷ বিচার না হওয়াকে এই পরিস্থিতির জন্য দুষছেন মানবাধিকারকর্মীরা৷

সিলেটের এমসি কলেজে শুক্রবার সন্ধ্যার পর স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তারা সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত৷ রোববার ভোররাতে মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷

দুই দিন আগে খাগড়াছড়িতে ডাকাতি করতে ঘরে ঢুকে এক প্রতিবন্ধী তরুণীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ এছাড়াও সম্প্রতি দেশের বিভিন্নস্থানে এমন আরো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে৷ ছয় বছর ও ১৩ বছরের শিশুকেও ধর্ষণ করেছে দুর্বৃত্তরা৷

সিলেটে ছাত্রলীগ কর্মীদের ধর্ষণের শিকার তরুণী

শুক্রবার সন্ধ্যার পর স্বামীর সঙ্গে সিলেটের এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক তরুণী৷ সেখানেই কয়েক যুবক স্বামীকে গাড়িতে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে৷ এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী বাদী হয়ে সিলেট নগরীর শাহপরাণ থানায় মামলা করেছেন৷ মামলায় ছাত্রলীগের ছয় কর্মী ও অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করা হয়েছে৷ আসামিরা হলেন, এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাছুম, রবিউল হাসান, তারেক আহমদ ও অর্জুন৷

এর মধ্যে রোববার ভোররাতে সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে পুলিশ সাইফুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে৷ বাংলাদেশে ডয়চে ভেলের কনটেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সুনামগঞ্জ ‌জেলা পু‌লিশের বিশেষ শাখার ও‌সি আনোয়ার হোসেন মৃধা খবরটি নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘‘গোপন সংবাদের ভি‌ত্তিতে মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে সিলেট পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্র‌ক্রিয়া চলছে৷’’

এর আগে শনিবার সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়া ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বিষয়টি আমরা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি৷ একাধিক টিম অভিযান শুরু করেছে৷ এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারিনি সত্যি, কিন্তু আমাদের তৎপরতা অব্যাহত আছে৷ আমরা ভিকটিমের জবানবন্দি নিয়েছি৷ অভিযুক্তদের শিগগিরই গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আমি আশাবাদি৷’’

অডিও শুনুন 02:20

আমি লজ্জিত, আমার মাথা নিচু হয়ে গেছে: সালেহ আহমেদ

এদিকে এই ধর্ষণের ঘটনার পর এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ‘ছাত্রলীগের দখলে’ থাকা হিসেবে পরিচিত একটি কক্ষে অভিযান চালিয়ে পুলিশ একটি পাইপগান, চারটি রামদা ও দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করে৷ কক্ষটি ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানের৷ পরে তার নামে অস্ত্র আইনেও শনিবার আরেকটি মামলা হয়েছে৷ এই ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন সিলেটের ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিার্থীরা৷ জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী কলেজের সামনে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন৷ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ থাকার পরও ছাত্রাবাস কীভাবে খোলা রাখে কলেজ কর্তৃপক্ষ৷ এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ অবগত থাকার পরও কেন ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয়া হলো না৷ এজন্য কর্তৃপক্ষেরও দায় আছে বলে মনে করেন তারা৷

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই হোস্টেলটি একটি অরক্ষিত হোস্টেল৷ কোন সীমানা প্রাচীর নেই৷ আমরা কয়েকবার সেখান থেকে বখাটেদের বের করে দিয়েছি৷ এমনকি রুমের তালাও পরিবর্তন করেছি৷ কিন্তু তারপরও এই ঘটনা ঘটে গেল৷ এই ঘটনায় আমি লজ্জিত, আমার মাথা নিচু হয়ে গেছে৷ আমি অসহায়৷ একটা ঐতিহ্যবাহি কলেজে এমন ঘটনা অপ্রত্যাশিত৷’’

খাগড়াছড়িতে প্রতিবন্ধী মেয়েকে ধর্ষণ

খাগড়াছড়িতে গত বুধবার রাতে এক আদিবাসী পরিবারের বাড়ির দরজা ভেঙে গৃহকর্তা, তার স্ত্রী ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়ের হাত-মুখ বেঁধে ফেলে দুর্বৃত্তরা৷ পরে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়েকে পাশের রুমে নিয়ে দলবেঁধে ধর্ষণ করে৷ এসময় বাড়ির আলমারি থেকে তিন ভরি স্বর্ণ, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যায় তারা৷ পরদিন সকালে গৃহকর্ত্রীর চিৎকারে স্থানীয়রা এসে তাদের উদ্ধার করে৷ এ ঘটনায় ধর্ষণের শিকার নারীর মা বাদী হয়ে অজ্ঞাত নয়জনকে আসামি করে মামলা করেন৷ শুক্রবার জেলা সদরে মানবন্ধন করেছেন সাধারণ মানুষও৷

প্রতিবন্ধী তরুণী বর্তমানে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন৷ শনিবার কথা বলতে একজন সাংবাদিক হাসপাতালে গেলে তরুণীর মা জানান, ‘‘ডাক্তাররা জানিয়েছেন, মেয়েটির শরীরিক অবস্থা খুবই খারাপ৷ কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে কিছুই জানি না৷ পুলিশ আমাদের কারো সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছে৷ আমরা ভয়ের মধ্যে আছি৷ আমি দোষীদের বিচার চাই৷’’

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আব্দুল আজিজ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ঘটনার পরপরই অভিযানে নামে পুলিশ৷ আমরা ইতোমধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছি৷ এখনও অভিযান চলছে৷ খুব শিগগিরই আমরা বাকিদের গ্রেপ্তার করবো৷’’

গাইবান্ধায় দুই দিন ধরে তরুণীকে ধর্ষণ

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে এক তরুণীকে (২০) দুইদিন ধরে আটকে রেখে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে৷ এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ গত বুধবার ফরিদপুর থেকে গোবিন্দগঞ্জে আসেন ওই তরুণী৷ এ সময় কয়েকজন যুবক তাকে গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের একটি বাড়িতে আটকে রেখে ধর্ষণ করে৷ সেখানে দুইদিন আটকে থাকার পর শুক্রবার কৌশলে পালিয়ে ওই তরুণী সরাসরি গোবিন্দগঞ্জ থানায় উপস্থিত হন৷ তার কথা শুনে অভিযান শুরু করে পুলিশ৷ পরে শাহাদৎ হোসেন (২০), জহুরুল সরকার (২৬), জাহাঙ্গীর মিয়া (৩৫) ও জাহিদ হাসান (২৭) নামে চারজনকে গ্রেফতার করে৷

নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে শিশু ধর্ষণ

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী এলাকায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (১৪) ধর্ষণ করেছে তার ‘প্রাইভেট শিক্ষক’ মাজহারুল ইসলাম রায়হান৷ গত শুক্রবার ছাত্রীর বাবা-মা বাসার বাইরে থাকার সুযোগে প্রাইভেট পড়াতে এসে ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন তিনি৷ বাবা-মা বাড়িতে ফিরলে ওই ছাত্রী বিষয়টি তাদের জানায়৷ তারা পুলিশকে বিষয়টি জানালে পুলিশ ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে৷ ওই ছাত্রী বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন৷

গত সাত সেপ্টেম্বর রাতে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার কাদিরজঙ্গল ইউনিয়নের সাঁতারপুর গ্রামে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক দরিদ্র রিকশাচালকের ছয় বছরের শিশুকন্যা৷ বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় ঘরের সিঁদ কেটে তাকে  নিয়ে যাওয়া হয়৷ একই গ্রামের আলী হোসেন ধর্ষণের পর শিশুটিকে বাড়ির পাশে একটি ধানেক্ষেতে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে৷ সকালে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে শিশুটিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়৷ গত বৃহস্পতিবার ৫৫ বছর বয়সি আলী হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ৷ পুলিশ জানিয়েছে, আলী হোসেনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের একাধিক অভিযোগ রয়েছে৷

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ১৩ বছরের এক শিশুকে জোর করে তুলে নিয়ে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে মো. মাসুদসহ তিন যুবকের বিরুদ্ধে৷ বর্তমানে টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক৷ টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এই শিশুটির যৌনাঙ্গে গভীর ক্ষত হয়েছে৷ আমরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষনে রেখেছি৷ মেডিকেল টিম কাজ করছে৷ পুলিশ মাসুদকে গ্রেফতার করলেও অন্য দুই যুবক এখনো পলাতক৷ মাসুদ সিংহরাগী গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে৷

অডিও শুনুন 01:42

ক্ষমতাশালীরা জড়িত থাকায় তাদের বিচার হয় না: খুশি কবীর

ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২ জন৷ অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় গত বছর ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি৷ ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হন ৮১৮ জন নারী৷ ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে৷ আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী৷ 

এইসব ঘটনার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করে আসছেন মানবাধিকার কর্মীরা৷ নারী নেত্রী খুশি কবীর ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এইসব ধর্ষণ বা গণধর্ষণের ঘটনাগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাশালীরা জড়িত থাকায় তাদের বিচার হয় না৷ আবার অনেক সময় পুলিশ এইসব ক্ষমতাশালীদের গ্রেফতারও করে না৷ আমি তাদের কথা বলছি, যারা রাজনৈতিকভাবে বা আর্থিকভাবে ক্ষমতাশালী৷ কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও তারা আবার জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে৷ ফলে এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে সমাজে খুব ভালো বার্তা যাচ্ছে না৷ এই কারণে এদের থামানোও যাচ্ছে না৷ এই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অবশ্যই অপরাধ কমে যাবে৷’’

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন