বাংলাদেশের ১০ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা | বিজ্ঞান পরিবেশ | DW | 09.11.2009
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞান পরিবেশ

বাংলাদেশের ১০ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে কেবল ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশেরই ১৩ কোটি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাস করছেন, এ কথা ইতিমধ্যেই আমরা জেনেছি নানা গবেষণার ফল থেকে৷

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমে গ্রিন হাউস গ্যাসের নির্গমন প্রয়োজনীয় মাত্রায় হ্রাস করতে ব্যর্থ হলে এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের তাপমাত্রা ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে৷ শুধু তাই নয় উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সুমেরু অঞ্চলে গলতে শুরু করেছে হিমবাহ, যার অবধারিত পরিণতি সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি৷ আর তা এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব নেতৃত্বের সামনে৷ আর এই পরিবর্তন সৃষ্টি করবে উদ্বাস্তু মানুষ৷ যাকে বলা হচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু৷

জলবায়ু উদ্বাস্তু বলতে সাধারণভাবে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়ে থাকে যিনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কোনো না কোনো কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন৷ এ সবের মধ্যে রয়েছে খরা প্রবণতা বৃদ্ধি, নদীর ভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, হারিকেন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা টর্নেডো ইত্যাদি৷ যুদ্ধ বা সংঘাতের কারণে বাস্তচ্যুত মানুষের তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত কারণে বেশি সংখ্যক মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন, তারা সারা জীবনের জন্য তাদের ভিটেমাটি, চাষের জমি ও জীবনধারণের উপায় হারিয়ে ফেলছেন৷

গ্রীনহাউস গ্যাস বায়ুমন্ডলে পুঞ্জিভূত হওয়ার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সমুদ্রস্ফীতি ঘটতে শুরু করেছে৷ আন্ত:রাষ্ট্রীয় জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেল (আইপিসিসি)-এর ২০০৭ সালে প্রকাশিত চতুর্থ মূল্যায়ন থেকে জানা যায়, এটি প্রায় নিশ্চিত যে, বিগত শতাব্দীর শেষ দিকের তুলনায় বর্তমান শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের গড় উষ্ণতা ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সমুদ্রস্ফীতি ১৮ সেন্টিমিটার থেকে ৫৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে৷ দেখা যাচ্ছে, মনুষ্যসৃষ্ট এই জলবায়ু পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে এবং দ্রুততর হচ্ছে৷ এর ফলে সারা বিশ্বেই বিরূপ প্রভাব পড়বে তবে দরিদ্র দেশসমূহই বেশি আক্রান্ত হবে বলে আশঙ্কা৷ গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্র-মেঘনা এই তিনটি বৃহৎ নদী অববাহিকার সর্বনিম্নে অবস্থিত বাংলাদেশের এক বিশাল অংশ সমুদ্র থেকে সামান্য উঁচুতে অবস্থিত৷ অত্যন্ত ঘনবসতির (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১০০০ জন) এদেশে দারিদ্র্য প্রকট, জনসক্ষমতায় ঘাটতি ব্যাপক, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও ব্যাপক, এবং সমন্বিত উন্নয়ন ও জলবায়ু নীতি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর বিভিন্ন দিক অনুপস্থিত অথবা দুর্বল৷

এছাড়া তিনটি অববাহিকায় বছরে যত পানি উৎপাদিত হয় তার ৯২ শতাংশ বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে আর এদেশের দীর্ঘ উপকূল এবং দেশের অভ্যন্তরে অনেক নিম্নাঞ্চল রয়েছে৷ এসমস্ত কারণেই বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন-উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম৷ জার্মান ওয়াচ-এর 'বৈশ্বিক জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকির সূচক ২০০৮' থেকে দেখা যায়, প্রাকৃতিক ক্ষয়-ক্ষতির কারণে ১৯৯৭-২০০৬ সময়ের বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়৷ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচটি দেশ যথাক্রমে: হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ডোমিনিকান রিপাবলিক৷ বাংলাদেশে ২০০৭-এ দুটি বিধ্বংসী বন্যা ও একটি খুবই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ঘটে গেছে৷ এগুলো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঘটেছে একথা বলা না গেলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যে রয়েছে তা জোর দিয়ে বলা যায়৷ ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশে অতিবৃষ্টি ও বন্যা, মারাত্মক ঘূর্ণঝড় এবং কোনো কোনো অঞ্চলে খরা আরো ঘনঘন ঘটবে তা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা৷

সমুদ্রস্ফীতির ফলে উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়তে পারে এবং প্রবল বন্যার কারণে নদীর আরো ব্যাপক ভাঙন ঘটবে; ফলে লাখো মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে৷ বাংলাদেশে একদিকে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে এবং অপরদিকে ২০৫০ সাল নাগাদ কৃষিখাতে উৎপাদনক্ষমতা অনেক কমে যাবে বলে আইপিসিসির মূল্যায়ন থেকে প্রতীয়মান হয়৷ ফলে যেমন চলছে তেমন চলতে থাকলে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ বাংলাদেশে এক ভয়াবহ রকমের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিবে৷ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে ফসল, ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ঘন ঘন ধ্বংস হওয়ার ফলে একদিকে ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ব্যস্ততা ও সম্পদ ব্যয় বাড়বে এবং অপরদিকে দেশে উন্নয়ন ব্যাহত হবে৷ দরিদ্র মানুষ নিঃস্ব এবং অদরিদ্র দরিদ্র হতে থাকবে৷ বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করেছে; ভবিষ্যতে তা আরো দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ঘটতে পারে৷ কাজেই পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখোমুখি হতে থাকবে৷

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের সামনে এখন বিরাট চ্যালেঞ্জ৷ ২০১৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়বে ৫০ শতাংশ৷ আর ২০২০ সাল নাগাদ সমুদ্রে পানির উচ্চতা এমন পর্যায়ে পৌঁছবে যার ফলে বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ এলাকা অধিক হারে বন্যার ঝুঁকিতে পড়বে৷ বাংলাদেশের ওপর সম্পাদিত গবেষণা থেকে জানা গেছে, ২০৩০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ বর্তমানের তুলনায় বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যথাক্রমে ১ ও ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সাল নাগাদ ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে৷

একই সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ২০৩০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বর্তমানের তুলনায় যথাক্রমে ১৪ ও ৩২ সেন্টিমিটার এবং ২১০০ সাল নাগাদ ৮৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে৷ এর ফলে বাংলাদেশের কমপক্ষে ১০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে৷ যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়বেন বলে অনুমান করা হচ্ছে৷ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৭ সেন্টিমিটার বাড়লে গোটা সুন্দরবনই পানিতে তলিয়ে যাবে৷ ইতিমধ্যে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে অবস্থিত 'লোহাচরা'ও 'সুপারিভাঙ্গা নামের দুটি দ্বীপ হারিয়ে গেছে৷ লোহাচরা দ্বীপের মাত্র ১ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত প্রায় দেড় লাখ জনসংখ্যার 'সাগরদ্বীপের ৩৩.৬২ বর্গকিলোমিটার এলাকা গত ৩০ বছরে সমুদ্রে তলিয়ে গেছে৷ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ভোলা দ্বীপও গত চার দশকে প্রায় ৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা হারিয়ে বর্তমানে ১৯৬৫ সালের তুলনায় অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে৷

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল হিসেবে বাংলাদেশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা এবং ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে৷ গত বছরের প্রবল বন্যা ও ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরে ফসল এবং অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার৷ যে কারণে সারা বছরই দেশে লেগেছিল খাদ্য সমস্যা ও পণ্যের উচ্চ মূল্য৷

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ইউনাইটেড নেশনস ইন্টার-গভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইন (আইপিসিসি) আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট ভূমির শতকরা ১৭ ভাগ সমুদ্র গ্রাস করে নেবে৷ এর ফলে অন্তত ২০ মিলিয়ন মানুষ হয়ে পড়বে গৃহহীন৷ সমুদ্র গ্রাস করে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের যে সব অঞ্চল ছেড়ে এরই মধ্যে লোকজন চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বিজ্ঞানীরা এবং আইপিসিসি তাদের বাংলাদেশের প্রথম জলবায়ু শরণার্থী বলে অভিহিত করা হয়েছে৷ উপকূলবর্তী নিচু ভূমিগুলো ক্রমেই সমুদ্র গ্রাস করে নেয়ায় পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে বলে তারা ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে৷

প্রতিবেদক: সাগর সরওয়ার

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন