1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

বাংলাদেশের লোক সংগীত চর্চার বর্তমান অবস্থা

Professor Abul Hasan Chowdhury
আবুল হাসান চৌধুরী
২ অক্টোবর ২০১৭

লোক সংগীতপ্রেমী লেখক-গবেষকগন খানিকটা আবেগ তাড়িত হয়ে বলে থাকেন হাজার নদীর কূলধ্বনি আর পাখপাখালির কলকাকলির মতোই বাঙালির কন্ঠে আবহমান কাল ধরে তার গানের সুর খেলে যাচ্ছে৷

https://p.dw.com/p/2l1MB
Baul Festival Bangladesch
ছবি: Allison Joyce/Getty Images

বাঙালির গোলা ভরা ধান আর গলায় গলায় গান-এমন একটা প্রবাদপ্রতিম কথা লোকগীতির আলোচনা প্রসঙ্গে প্রায়শই বলা হয়৷ অতিরঞ্জন থাকলেও একথা একেবারে মিথ্যে নয় যে, অতীতে বাংলাদেশে প্রায় হাজার জাতের ধান ফলতো৷ সেসব ধান এখন আর নেই৷ ধানের সাথে বাঙালির কতরকম গানও যে হারিয়ে গেছে তার খবর ক'জন রাখে? কোনো কোনো গবেষকের মতে প্রায় দু'শো পঞ্চাশ রকম লোকগানের নাম পাওয়া যায়৷ দু'শো তো দূরের কথা, এখন পঞ্চাশটি গানেরও প্রচলন নেই৷ ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, বাউল-মুর্শিদি, মারফতি, কবিগান, কীর্তন-এরকম প্রধান কয়েকটি লোক সংগীতের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হলেও এর সবকটি ধারা কিন্তু এখন সমানভাবে বহমান নয়৷

একসময় যে ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে লোকমনন-ভাবনা-দার্শনিকতায় জারিত হয়ে লোকগীতির উদ্ভব, বিকাশ ও বিস্তার ঘটেছিলো কালের নিয়মে, যুগধর্মের প্রভাবে সে পরিবেশ-পরিস্থিতি এখন পালটে গেছে৷ সেসঙ্গে লোকগীতিও তার কনটেক্সচুয়াল পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে৷ যেমন এখনকার প্রতিটি নদ-নদী, খাল-বিলে চলছে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা৷ সুতরাং সে ইঞ্জিনের কান-ফাটানো ভটভট-ফফটফট শব্দের মধ্যে 'নির্জন এককের গান' ভাটিয়ালি গাওয়া এবং শোনা দু-ই অসম্ভব৷ ভাওয়াইয়াও এখন আর গাড়িয়াল বন্ধু, মৈষাল বন্ধু কিংবা খরস্রোতা নদীর নাইয়া বা মাঝির গান নয়৷ কেননা, আগের সেই গরু-মহিষের গাড়িও নেই, বৈঠা বা দাঁড়টানা নৌকাও নেই৷ ক্ষেত্রবিশেষে নৌকাবাইচ থাকলেও নৌকার সারি গান নেই বললেই চলে৷ খেতনিড়ানি দেওয়ার সময় একদল কৃষক-কামলা যে সারি গান করতো সেও বিলুপ্ত হয়ে গেছে ৷ এখন খেত-খামারে যারা কাজ করে তারা মোবাইল ফোনে সিনেমার গান শোনে৷ ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়াসহ অনেক গানই বহু কাল আগেই মাঠ-ঘাট, বিল-বাওর, হাওর-নদী ছেড়ে উঠে এসেছে শহরের আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে, ইলেট্রনিক মিডিয়ায় তারকাখ্যাতি-প্রত্যাশী হঠাত্‍ আবির্ভূত শিল্পীদের কন্ঠে৷ বেতারে একসময় ‘পল্লীগীতি' নামেও প্রচুর লোকগানের প্রচার হতো৷ গ্রামের সাধারণ কৃষক-শ্রমিক-মজুর সে গান শুনতো বিশেষ আগ্রহ নিয়ে৷ সংস্কৃতিমনা শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষও সে গান শুনে আনন্দ পেতো৷ সে বেতার বা রেডিও এখন চলে গেছে জকিদের দখলে-সেখানে জোকারি যতোটা হয়, ইঙ্গ-বঙ্গ বা বাংরেজি ভাষায় শুধু কথার ক্যারিক্যাচার যতোটা হয়, যতোটা সময় ধরে হয়, ততটা সময় নিয়ে কখনোই কোনো লোকগীতির আসর বসে না৷ সেখানে সিনেমার চটুল গানই বেশি বাজানো হয়৷ অবশ্য বর্তমানে কোনো কোনো টিভি চ্যানেলে সংগীতপ্রতিভা অন্বেষণের জন্য যেসব প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় তাতে লোকসঙ্গীতকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়৷ 

দেশে এখন সঙ্গীত শিক্ষা/ চর্চার নানা প্রতিষ্ঠান/ একাডেমি গড়ে উঠেছে৷ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগও খোলা হয়েছে অনেককাল আগেই৷ তবে সেই প্রাতিষ্ঠানিক খোপের ভেতর থেকে একজন আব্বাসউদ্দীন, আবদুল আলীম, কছিমুদ্দিন, কি একজন নীনা হামিদ, ফেরদৌসী রহমান, ফরিদা পারভীন কিংবা হালের মমতাজ-এর মতো নিবেদিতপ্রাণ জনচিত্তজয়ী শিল্পীর আবির্ভাব ঘটছে না৷ বরং ভুল সুরে, ভুল উচ্চারণে (কখনো বা শুদ্ধ উচ্চারণে অর্থাৎ আঞ্চলিক ভাষার টোনালবৈশিষ্ট্যকে ভুল মনে করে!) হরহামেশাই গাওয়া হচ্ছে লোক সংগীত৷ উল্লেখ্য যে, প্রাতিষ্ঠানিক বা গুরুমুখী শিক্ষার দ্বারা এক ধরনের সাঙ্গীতিক দক্ষতা হয়তো অর্জিত হয়, কিন্তু লোকসঙ্গীতে গায়কী ছাড়াও আঞ্চলিক ভাবানুষঙ্গ বা বিশেষ ঢং ও উচ্চারণ রপ্ত করা কঠিন৷ লোকসঙ্গীত আসলে কোনো প্রথাগত সঙ্গীত চর্চা নয়; এতে লোকসাধারণের প্রাণের আকুতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত হয়৷ গায়কের মেজাজ,অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত ও পরিবেশের উপর লোকগীতির গায়নরীতি অনেকটাই নির্ভর করে৷ প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী ও গবেষক হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছেন, ‘লোক সংগীতের ঘরানা নেই, আছে বাহিরানা৷' বাংলাদেশে বর্তমানে লোকসঙ্গীতকে ঘরবন্দী করে বাইরের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটানো হয়েছে৷ ‘বাহিরানা' প্রসঙ্গে আরো বলতে হয়, এখনো গ্রাম-গ্রামান্তরে অনেক প্রতিভাবান লোকসঙ্গীত স্রষ্টা ও শিল্পী পড়ে আছে যাদেরকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসতে পারলে বাংলা লোক সংগীতের প্রসার বাড়তে পারে৷

বর্তমান বাংলাদেশে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাউল গানই সবচেয়ে জনপ্রিয়৷ প্রায় সব বয়সের শ্রোতাই সবটা না বুঝলেও এ গান শুনে আন্দোলিত ও আপ্লুত হয়৷ অন্যদিকে বাউলসাধক ও গীত রচয়িতার সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে৷ এ গানের সাধনতত্ত্বের কথা জেনে-বুঝে, নিজের জীবনাচারে তা মেনে, পালন করে এখনকার শিল্পীরা এ গান করেন না৷ সুতরাং এখনকার বাউল শিল্পীর কন্ঠে ভক্তের আকুল আবেদন-নিবেদনের কোথায় যেন খানিকটা খামতি থেকে যাচ্ছে৷ বাউল তো মূলত আখড়ার গান- যেখানে গুরু কিংবা সাঁইজি গানের তত্ত্বকথার ভেতর দিয়ে তাঁর শিষ্যদেরকে দেহকেন্দ্রিক সাধন-ভজনের ক্রিয়া-করণ বুঝিয়ে দেন৷ কখনোবা সাধক তাঁর একানত্ম আপন প্রার্থনা বা আত্মনিবেদনে নিমগ্ন হন গানের অতলস্পর্শী সুরের আমেজে৷

তখন বাউলের আখড়ায় যে সাঙ্গীতিক আবহ তৈরি হয় সেটি এখনকার শহরের চোখধাঁধানো, বিচিত্র বর্ণিল এবং হুল্লোরে ভরা মঞ্চে নানা ধাতব বাদ্যযন্ত্রের উচ্চগ্রামের কর্ণপীড়ক শব্দের মধ্যে পাওয়া যায় না৷ এমন পরিবেশে নিবিড় নিমগ্ন অনুভবে ভক্ত-শ্রোতার হৃদয়ে রসের আস্বাদন নয়,শুধুই তথাকথিত শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের গানের মর্ম না-জেনে মাথা-দোলানো,মেটালিক বাদ্যের তালে নাচানাচি কিংবা চটুল, চটকদার আদিরসাত্মক গান শুনে শিহরিত উল্লাস৷ এ কালের বাউল শিল্পীদেরও তেমন গুরুদীক্ষা নেই, সাধন-ভজনেও মন নেই৷ যেনতেন প্রকারে একটা গানের বই, ক্যাসেট কিংবা সিডি বের করে বাজারে ছাড়তে পারলেই নিজেকে ধন্য মনে করছেন অনেকেই৷ এভাবে বাউল গানে নানা বিকৃতি ও পরিবর্তন আসছে ৷ তা সত্ত্বেও প্রবীণ বাউল গুরু যাঁরা এখনো গান করছেন তাঁরা তাঁদের সাধনমার্গের অঙ্গ হিসেবেই তা করছেন৷ তাঁরা গুরুপরম্পরায় পাওয়া বাণী ও সুর মেনেই গান গেয়ে চলেছেন৷ তবে নতুন প্রজন্মের বাউল গায়করা রাতারাতি খ্যাতিলাভ এবং নিজেকে তারকাশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সপ্নে বিভোর৷ নানা কালোয়াতি করে শ্রোতাসাধারণের মন মাতানোই তাদের কাছে মুখ্য-বাউল গানের আদি সুর-বাণী এবং বক্তব্য নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথা নেই৷ ইদানিং ব্যান্ড বা রক মিউজিক যারা করছেন তারা তাদের নিজস্ব স্টাইলে ইচ্ছেমতো সুর পরিবর্তন করে বাউল গানও গাইছেন৷ কখনোবা আদি বাউল গানের বিলম্বিত তাল-লয়ের বদলে দ্রুত তাল-লয় দিয়ে বেশ খানিকটা রিদমিক করে গাওয়া হচ্ছে-যাতে গানের বাণীর ব্যঞ্জনার চাইতে বড় হয়ে উঠছে দর্শক-শ্রোতাদের উত্তেজিত করে একটা উন্মত্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রবণতা৷ এমন উত্তেজনা শিল্পী নিজেই মাঝে মাঝে উস্কে দেন৷ আবার কোনো কোনো শিল্পী বাউল গানের ফিউশনও করছেন -যা মঞ্চে এবং টেলিভিশনে প্রচারিতও হচ্ছে৷ এসব কারণে বাউল গানের আদি সুরকাঠামো ভেঙে যাচ্ছে৷ তরুণ প্রজন্ম ঢিমে তালের গানে মজা পায় না বলেই নাকি এমনটি করতে হচ্ছে৷ এজন্যে নানা আর নাতির গানে গায়কি, পরিবেশনা এবং পরিবেশ-পরিস্থিতিগত পার্থক্যও পরিলক্ষিত হচ্ছে৷

একে বলা যেতে পারে প্রজন্মগত ব্যবধান কিংবা জেনারেশন গ্যাপ৷ তাই এখন ঐতিহ্যবাহী গেরুয়া আলখাল্লা পরিহিত বাউলের পাশাপাশি জিন্স-টিশার্ট-পরা (নারী-পুরুষ উভয়ই) অনেক বাউল শিল্পীর দেখা মিলছে৷ আরো যা বাস্তবতা তা হলো, আগেকার দিনে বাউল-বয়াতিরা টাকার বিনিময়ে গান গাওয়াকে পাপ মনে করতেন৷ কারণ গান স্বর্গীয়, পবিত্র৷ এখনকার কোনো গায়ক মোটেই এরকম পাপবোধে আক্রান্ত হন না৷ এখন একটু সুপরিচিত কিংবা নামকাম-করা বাউল শিল্পী (শুধু বাউল শিল্পীই নন, যেকোনো রকম সঙ্গীত শিল্পীই) কোনো বায়না আসলে রীতিমতো দর কষাকষি করেন৷ এর অন্তর্নিহিত বড় একটা কারণ সম্ভবত এই যে, অতীতে যুগ যুগ ধরে বহু শিল্পী দারিদ্র্যবশত অনাহারে, অর্ধাহারে জীবন ধারণ করেছেন, বিনা চিকিত্‍সায় মারা গেছেন৷

তাই এখনকার সচেতন সংসারী শিল্পীরা সম্মানের চেয়ে হয়তো সম্মানীকেই প্রাধান্য দেন৷ এমন বাস্তবতার ভেতর দিয়েই বর্তমান বাংলাদেশে শিল্পীরা সংগীত চর্চা করে যাচ্ছেন৷ লোকসঙ্গীতের অন্যসব প্রকরণের চেয়ে বাউল গানের শিল্পী ও শ্রোতা বেশি৷ জাতীয় নানা দিবস ও উত্‍সব উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাউল গানের জমজমাট আসর বসে৷ লোকে এ গান অতোটা বুঝুক না বুঝুক,অন্তরে এর মর্মবাণী ধারণ করতে পারুক বা না পারুক - তারা মজা পায় এর মনমাতানো সুরে ও কথার ধাঁধা বা হেঁয়ালিতে৷

দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলা ছাড়া এখন বাংলাদেশে কোথাও কবিগানের আসর বসে বলে শোনা যায় না৷ অথচ স্বধীনতা উত্তরকালেও এদেশের মানুষ কবির লড়াই উপভোগ করেছে৷ অবশ্য এখন যোগ্য কবিয়াল বা কবির সরকারেরও অভাব আছে৷ কীর্তন,অষ্টক ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষঙ্গের গানগুলোও উঠে যাচ্ছে প্রায়৷ গম্ভীরা থেকে শিব প্রসঙ্গ উঠে গেছে অনেক আগেই৷ শিব তো ছিলেন আসলে কৃষক৷ সুতরাং গম্ভীরায় একসময় কৃষির কথা, কৃষকের কথা থাকতো৷ এখন তাও আর তেমন থাকছে না৷ নানা-নাতি কৃষক সেজে মাথাল মাথাল দিয়ে লড়ি হাতে গান করে বটে তবে সে গানে এখন প্রাধান্য পায় সরকারি প্রকল্পের প্রচারণা৷ সমসাময়িক জনপ্রিয় কিংবা সমাজচেতনামূলক নানা বিষয়কে অবলম্বন করে এ গান এখন এক ধরনের প্রচারমাধ্যমে পরিণত হয়েছ৷ লোকে আসলে মজা পায় গম্ভীরাগায়ক নানা-নাতির ঠাট্টা-মশকরা বা রঙ-তামাশায়৷

পটগানেরও ধর্মীয় অনুষঙ্গ এখন আর সমাদর পায় না৷ এখন এটি পরিবেশ বিপর্যয়, ভোটের প্রচার, সামাজিক নানা সমস্যা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত হয়৷ দক্ষিণবঙ্গে এগানের চর্চা বেশি হলেও বিভিন্ন এনজিও এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এ গানের আয়োজন চোখে পড়ে বিশেষত নানা উত্‍সব-অনুষ্ঠান উপলৰে৷ এক সময় পালাগান ও বিচার গানের সমাদর ছিলো তত্ত্বভাবুক শ্রোতাদের কাছে৷ সৃষ্টিতত্ত্ব, আদম-হাওয়া,আল্লাহ-রসুল, শরীয়ত-মারেফত, নারী-পুরুষ ইত্যাদি বিষয়ে তত্ত্বাশ্রিত বিতর্কমূলক গানের আয়োজন এখন আর তেমন একটা দেখা যায় না৷ এসব গানের বয়াতি বা গায়েন হয়ে-ওঠার জন্য যে শাস্ত্রজ্ঞান,তত্ত্বজ্ঞান এবং চর্চাগত নিষ্ঠা ও একাগ্রতা থাকা দরকার এখনকার গায়কদের মধ্যে তার বড় অভাব৷ যাকে-তাকে নিয়ে এসে আসর বসালেই শ্রোতারা আসবে না৷ অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের রুচিরও পরিবর্তন ঘটেছে৷ তারা এখন তত্ত্বভারাক্রান্ত বা গভীর মরমি ভাবাপন্ন গান শুনতে চায় না৷ তারা পছন্দ করে দ্রুততালপ্রধান যৌন আবেদনময় হালকা, চটুল প্রেমের গান৷

Professor Abul Hasan Chowdhury
আবুল হাসান চৌধুরী, অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ছবি: privat

নিরক্ষর গ্রামীণ নারীরা একসময় বিয়ে, মুসলমানী কিংবা অন্নপ্রাশন উপলক্ষে নিজেরা একত্র হয়ে গান করতো -যার কেতাবি নাম মেয়েলি গীত৷ এখন ওসব আনুষ্ঠানিতায় আড়ম্বর বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মেয়েদের মুখে আর সেই গান নেই৷ কেবল গ্রামজীবনভিত্তিক কোনো কোনো নাটক-সিনেমায় মাঝে-মধ্যে ‘লীলাবালি লীলাবালি ভর যুবতী সই গো/ কি দিয়া সাজাইমু তরে' গানটি শোনা যায়৷ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এখন মাইকে বা আধুনিক সাউন্ডসিস্টেমে হিন্দি সিনেমার গান বাজলেও বিয়ের গান শোনা যায় না৷ কট্টর ধর্মীয় মৌলবাদীদের হুমকি-ধমকি ও অনুশাসনও এর জন্যে অনেকটাই দায়ী৷

এসব নেতিবাচক অবস্থা বা পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্যেও লোকসঙ্গীতের চর্চা চলছে৷ অনেক গানেরই ধারা স্তিমিতপ্রায়৷ কিছু আবার একেবারেই থেমে গেছে৷ আসলে সামাজিক মানুষের প্রয়োজন বা চাহিদার ওপর নির্ভর করে লোকসংস্কৃতির বিশেষ কোনো উপাদানের টিকে থাকা৷ সে কারণে একটা সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী কোনো উপাদানের বিলুপ্তি যদি ঘটেই যায় সেজন্য হাপিত্যেশ করে লাভ নেই৷ আশার কথা হলো, কতকগুলো উপাদান আবার খানিকট রূপ বদল করে টিকে থাকে৷ গম্ভীরা এবং পটের গান এর বড় উদাহরণ ৷ বাউল গান তার দেহতত্ত্ব ও মরমিভাবনার অনন্যতার জন্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমাদৃত হয়েছে এবং ক্রমশ তার চর্চাও বাড়ছে৷ অন্য আরো অনেক গান বিশেষত মানবীয় প্রেমের চিরনত্মন আকাঙ্খা ও আকুতি ভরা যে গান সে গানের আবেদন কখনোই ফুরাবে বলে মনে হয় না৷ কেবল তাকে উপযুক্ত শিল্পীর আকর্ষণীয় গায়কির ভেতর দিয়ে পরিবেশন করতে পারলেই হয়৷ গানপাগল বাঙালি স্বকীয় সংস্কৃতিকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই তার বহুবিচিত্র রসেভরা লোকসঙ্গীতের পুনরোজ্জীবন ঘটাবে বলেই আশা করি৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

স্কিপ নেক্সট সেকশন সম্পর্কিত বিষয়
স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

গত সপ্তাহে তীব্র ঠান্ডায় বরফে ঢেকে যায় রাজধানী কাবুল

তীব্র শীতে আফগানিস্তানে ১৬০ জনের মৃত্যু

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ

ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ

প্রথম পাতায় যান