বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে জার্মান রাজনীতিবিদের মন্তব্য এবং বাস্তবতা | বিশ্ব | DW | 03.01.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে জার্মান রাজনীতিবিদের মন্তব্য এবং বাস্তবতা

কেমন দেখলেন বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন? এই প্রশ্ন অনেকেই করছেন আমাকে৷ কেউ কেউ জানতে চেয়েছেন আমার মতামত৷ ঢাকা ঘুরে এসে তাই জানাচ্ছি কেমন দেখলাম নির্বাচন, কী শিখলাম আর যা বুঝলাম!

‘‘বাংলাদেশের নির্বাচনে যেভাবে জালিয়াতি হয়েছে তাতে আমি বিস্মিত! দেশটি কার্যত একটি একদলীয় ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে৷ ইউরোপের সরকারগুলোর উচিত সেখানকার নির্বাচনি কার্যপ্রণালীর সমালোচনার ক্ষেত্রে অটল অবস্থানে থাকা এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অবশিষ্ট গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর প্রতি সমর্থন জানানো,'' জার্মান সংসদের ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স' কমিটির প্রধান নরবার্ট ব়্যোটগেন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এই মন্তব্য করেছেন৷

জার্মানিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো সাধারণত বড় ধরনের তথ্যপ্রমাণ না পেলে এমন কঠোর মন্তব্য করে না৷ ব়্যোটগেনের বক্তব্য যদিও এখন অবধি জার্মান সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়৷ তবে, আন্তর্জাতিক বিষয়াদি সংসদের যে অংশের দেখভাল করার কথা, সেই অংশের প্রধান হিসেবে এটা তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য৷

ব়্যোগটেনের এই বক্তব্যের সঙ্গে আমার পর্যবেক্ষণের অনেকটা মিল খুঁজে পাই৷ কেনো সেটাই বলছি৷

‘‘ভোটটা আমি নৌকাকেই দিতাম, কিন্তু তারপরও আমাকে ভোট দেয়ার সুযোগ দিলো না,'' বলছিলেন এক নারী ভোটার৷ নারায়ণগঞ্জে ভোট দিতে গিয়েছিলেন তিনি৷ নির্বাচনের পরের দিন আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খানিকটা ইতস্তত করছিলেন৷ পাছে আবার সত্য কথা বলায় চাকুরিটা হারান৷

বাংলাদেশের একাদশ সংসদ নির্বাচন কভার করতে এক সপ্তাহ কাটিয়েছি ঢাকায়৷ নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন, নির্বাচনের পর অনেক সাধারণ ভোটারের সঙ্গে কথা হয়েছে৷ রাস্তায় হঠাৎ তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি তাঁদের মনের অবস্থা বুঝতে৷ কেউ সাহস নিয়ে কথা বলেছেন, কেউ এড়িয়ে গেছেন৷ তা সত্ত্বেও সাধারণ ভোটারের একটি অবস্থা বোঝা গেছে৷

যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের একটি বড় অংশই স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগ অবকাঠামোগত দিক থেকে গত এক দশকে অনেক প্রকল্প হাতে নিয়েছে৷ এই সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে৷ তবে, সেই উন্নয়নের সুফল নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা গরিব মানুষরা পেয়েছেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে৷ মূল কথা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ দেশের এই উন্নয়ন সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছে৷ 

নির্বাচনের আগে ভোটারদের কেউ কেউ এমনও বলেছেন, ভোটটা তাঁরা আওয়ামী লীগকেই দেবেন৷ কেননা, দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকুক এটা তাঁরা চান৷ তবে সুযোগ পেলে ধানের শীষে ভোট দিতেন এমন ভোটারও কম ছিলেন না৷ 

ভোটাররা কি ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন?

এটা সত্য যে, বাংলাদেশে অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল হারেনি৷ আর সেসব জয়ের এক বড় কারণ হচ্ছে সাংবিধানিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিয়ে কারচুপির মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নেয়া৷ তারপরও এবার মনের মধ্যে একটু আশা ছিল যে দলের প্রধানের নেতৃত্বে একসময় দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই দল এই ডিজিটাল যুগে এসে দলীয় সরকারের অধীনে খানিকটা হলেও অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার চেষ্টা করবে৷

কিন্তু আমার সেই ধারণা ভুল ছিল৷ বরং নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে, বিরোধী দলের মনোনয়নপ্রার্থীদের অনেকের প্রার্থিতা বাতিল কিংবা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁদের প্রার্থিতার অবস্থা ঝুলিয়ে রেখে বিরোধী দলকে শুধু দুর্বলই করে দেয়া হয়নি, একটি ‘সাজানো নির্বাচন' করার নানা পন্থা আগে থেকেই তৈরি করে রাখা হয়েছিল বলে ঢাকায় গিয়ে মনে হয়েছে৷ আর এই কাজে ক্ষমতাসীন দলকে আপাতদৃষ্টিতে সর্বাত্মক সহায়তা করেছে সাংবিধানিক এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা৷

ফলে নির্বাচনের আগের রাতেই প্রশাসনের সহায়তায় ভোটকেন্দ্রের ভেতরে নির্বিঘ্নে ক্ষমতাসীন দলের এবং মহাজোটের প্রার্থীদের পক্ষে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করার অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে৷ আমি নিজে সেই রাতে ঢাকার দু'টি ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়েছি৷ যদিও আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি, তবে ক্ষমতাসীন দলের ব্যাজ পরা সমর্থকদের দেখেছি কেন্দ্রের আশেপাশে অবস্থান করতে৷ তাঁদের কেউ কোনো বাধা দেয়নি৷ বরং ‘‘এখানে কী করছেন'' জানতে চাওয়ার পর মুচকি হেসেছেন কেউ কেউ৷ 

ভোটগ্রহণের দিনেও পরিস্থিতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি৷ কোনো কোনো কেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি, আবার কোনো কোনো কেন্দ্রে গিয়ে দেখেছি বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের কোনো এজেন্ট নেই৷ শুধুমাত্র একটি কেন্দ্রে আমরা অবস্থান করার এক পর্যায়ে একজন বিএনপি এজেন্টের দেখা মিলেছিল৷ হন্তদন্ত হয়ে তিনি প্রবেশ করেছিলেন বটে কিন্তু তিনি যে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের কার্ড আমাদের দেখিয়েছিলেন তাতে কোনো নাম বা ছবি ছিল না৷

ভোটগ্রহণের দিন ঢাকা শহরের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে এবং কয়েকজন সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকের সঙ্গে কথা বলে আমার কাছে তিনটি বিষয় মনে হয়েছে৷ সেগুলো হচ্ছে:

০১. সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোট দেয়ার আগ্রহ ছিল৷ কেউ কেউ প্রাতঃভ্রমণ শেষে ভোটকেন্দ্রের লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোট দিতে৷

০২. সাধারণ ভোটারের আগ্রহ থাকলেও তাঁদের ভোট দিতে নানাভাবে বাধা দেয়া হয়েছে৷ জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও ‘সিরিয়াল নম্বর নেই' এমন অজুহাতে অনেক ভোটারকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানো হয়েছে৷ ইভিএমভিত্তিক ভোটকেন্দ্রগুলোতে অনেকের আঙুলের ছাপ মেলেনি বলে ভোট দিতে দেয়া হয়নি, কিংবা সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা নিজের আঙুলের ছাপ দিয়ে ভোটারকে ভোট দেয়ার সুযোগ দিয়েছেন৷ বলাবাহুল্য, জরুরি পরিস্থিতির জন্য এমন ব্যবস্থা প্রযোজ্য হলেও তার অপব্যবহারের সুযোগ অনেক৷ মোটের উপর ‘মধ্যাহ্নভোজনের' বিরতি নিয়েছিল অনেক কেন্দ্র, যা আসলে নিয়ম অনুযায়ী নেয়ার কথা না৷ 

০৩. অনেক ভোটারই অভিযোগ করেছেন যে, তাঁদের ভোট আগেই দেয়া হয়ে গিয়েছে কিংবা নির্দিষ্ট দলের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে৷ আর সেই নির্দেশনা না মানার ‘শাস্তি' পেয়েছেন এমন এক নারীর কথা তো এখন আমরা সবাই জানি৷

নির্বাচন কমিশন কি নিরপেক্ষ ছিল?

তবে ভোটারদের বক্তব্যের কোনো প্রতিফলন নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে পাওয়া যায়নি৷ বরং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু এবং ভোটারদের উপচে পড়া ভিড়ের নির্বাচন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন৷ বিরোধী দল যে কোনো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' পায়নি সেটা নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা দেখা যায়নি৷ নির্বাচন কমিশনের এই আচরণ নিরপেক্ষতার ধারেকাছেও ছিল না৷

Arafatul Islam Kommentarbild App

আরাফাতুল ইসলাম, ডয়চে ভেলে

আরেকটি বিষয় চোখে পড়েছে৷ সেটা হচ্ছে, নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা হিসেবে কিছু ‘বিদেশি পর্যবেক্ষকের' বক্তব্য বারবার তুলে ধরেছে ক্ষমতাসীন দল৷ তবে সেই পর্যবেক্ষকদের কারো কারো প্রকৃত পরিচয় এবং তাঁদের বক্তব্যের আন্তর্জাতিক স্তরে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে৷ বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক না পাঠানো, মার্কিন নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের একাংশকে ভিসা না দেয়া এবং দেশীয় পর্যবেক্ষকদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নানাভাবে বাধা দেয়ায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে পর্যবেক্ষকরা অতীতে যে ধরনের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়েছিলেন, এবার সেটা হয়নি৷

বিএনপির নীতি কী ছিল?

এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণের আগে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টকে নানাভাবে দুর্বল করে দেয়া হয়েছিল সত্যি, কিন্তু ভোট গ্রহণের দিন দলটি বা জোটটি জনসমর্থন কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার যে সম্ভাবনার কথা বলেছিল, সেটি একেবারেই দেখা যায়নি৷ এমনকি ঢাকায় মির্জা আব্বাস, এবং তাঁর স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের নির্বাচনি এলাকাগুলোতেও ভোটের দিন বিএনপির তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি৷ বরং দুপুর নাগাদ একের পর এক প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন৷ এটা কি দলটির কৌশল ছিল, নাকি আসলেই সামর্থের অভাব, সেটা আমার কাছে স্বচ্ছ হয়নি৷

আমি যতটুকু বুঝেছি, বিএনপির মধ্যে নেতৃত্ব সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে৷ খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দলটির হাল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ধরেছেন বটে, তবে সেটা তৃণমূল পর্যায় অবধি হয়ত ততটা আশার সঞ্চার করতে পারেনি৷ মোটের উপর দলটির মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর উপর কিছুটা নির্ভরতা রয়েছে বলে মনে হয়েছে৷ সেই বিবেচনায় বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে একটি নির্বাচন যে কোনোভাবেই সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না - সেটা প্রমাণের সক্ষম হয়েছে দলটি৷

তবে পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনের অনিয়ম, জালিয়াতি নিয়ে বক্তব্য, বিবৃতি দেয়ার বাইরে বিশেষ কিছু করবে বলে মনে হয় না৷ বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের প্রতি ইতোমধ্যে ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তি এবং চীনের মতো পরাশক্তির সমর্থন পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ত এই সমর্থন পছন্দ করছে না, কিন্তু সেটাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে দেশটিতে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে বড় ধরনের চাপ প্রয়োগ করবে - এমন লক্ষণ এখন অবধি নেই৷

আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন হয়ত বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে, যেখানে গণতন্ত্রের বিষয়টি তেমন একটা গুরুত্ব পাবে না৷ এখানে বোঝার বিষয় হচ্ছে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিদেশি বড় শক্তিগুলোকে নানা রকম বাণিজ্যিক সুযোগসুবিধা দিয়ে ইতোমধ্যেই ঠান্ডা করে রেখেছে৷ যে কারণে, ত্রিশ ডিসেম্বরের নির্বাচন যে সাজানো ছিল সেটা বোঝা গেলেও সবদিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের নতুন সরকার বড় কোনো চাপে পড়বে এমন সম্ভাবনা এই মুহূর্তে দেখছি না৷ তাই, একজন নরবার্ট ব়্যোটগেনের কঠোর মন্তব্যের বাস্তব কোনো ফল নাও মিলতে পারে৷

আরেকটি কথা না বললেই নয়৷ ত্রিশ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে যখন কেউ আওয়ামী লীগের সত্তরের নির্বাচনে জয় কিংবা আপামর জনতার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ জয়ের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন খানিকটা ব্যথিত হই৷ সত্তরে আওয়ামী লীগ জিতেছিল জনগণের প্রকৃত ভোটে আর একাত্তরের যুদ্ধ জয়ও ছিল জাতির জনকের আহ্বানে, আপামর জনতার পাকসেনাদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে৷ লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা৷ সেসবের সঙ্গে ত্রিশ ডিসেম্বরের সাজানো নির্বাচনের তুলনা করে জাতির জাতীয় দু'টো গর্বের অর্জনকে খাটো করবেন না, প্লিজ!

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন মন্তব্যে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন