বর্তমান বিশ্বে প্রয়োজন ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বোঝা-পড়ার | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 04.07.2009
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সমাজ সংস্কৃতি

বর্তমান বিশ্বে প্রয়োজন ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বোঝা-পড়ার

ধর্মের উৎপত্তি যে ভাবেই হোক না কেন, বিশ্বসমাজে তার বিকাশ হয়েছে মূলত একই ভাবে - সামাজিক কাঠামোকে ভিত্তি করে৷ বলা হয়েছে, ধর্ম হলো এমন একটি প্রথা - যা সমাজকে ধরে থাকে৷ আর সে জন্যই সংস্কৃত ভাষায় তার নাম ধর্ম!

default

পরবর্তীকালে অবশ্য যখন শ্রেণী বিভক্ত সমাজ তৈরি হয়েছে, তখন সমাজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থেই ধর্মকে সমাজের প্রকৃত রূপ বলে প্রচার করে এসেছে৷ আর বর্তমানে সেই ধর্মের নামে শুরু হয়েছে রাজনীতি৷ রাজনীতির স্বার্থে ধর্ম এবং ধর্মের স্বার্থে রাজনীতির ব্যবহার আজ আর নতুন কিছু নয়৷ তার ওপর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জঙ্গিবাদ৷ রাজনৈতিক ফায়দা লাভের আশায় ইসলামকে জঙ্গিবাদের অপর এক নাম হিসেবে দেখতে শুরু করেছে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেকেই৷ আর সেখানেই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে সেতুবন্ধের৷ প্রয়োজন হয়েছে ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বোঝা-পড়ার৷

কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর রুবি সেইন ঠিক এমনই একটা বোঝা-পড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা অনুভব করছিলেন গত প্রায় দু-তিন বছর ধরে৷ তাই সম্প্রতি তাঁরই উদ্যোগে তিনদিনব্যাপী একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হলো জেইউ-তে৷ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদরা সেখানে ধর্মের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করলেন৷ আলোচনা হলো সমাজ গঠনে ধর্ম ও সমাজতত্ত্বের ভূমিকা নিয়ে৷

Indien Conference on Interface between east and West

প্রফেসর এন সিং

আকাশ ভরা সূর্য-তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ

তাহারই মাঝখানে আমি পেয়েছি, পেয়েছি মোর স্থান

বিস্ময়ে তাই জাগে, জাগে আমার গান...

কবিগুরুর এই গান দিয়েই শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি৷ বিষয় - প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য : সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এবং আত্ম পরিচয় : ধর্ম এবং সমাজতত্ত্ব কিভাবে সুষ্ঠু সুশীল সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে৷ আলোচনার প্রথমেই যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব পেল - তা হলো ধর্ম আদৌ কি ? দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রফেসর এন সিং জানালেন : ধর্ম হচ্ছে এক ধরণের জীবনবিধান, আবার বড় আঙ্গিকে নির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধও৷ এর ভেতরে সংস্কৃতি আর ইতিহাসও রয়েছে৷ আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক ভূমিকাও রয়েছে ধর্মের৷ একদিকে আপনি পাচ্ছেন আত্মনিষ্ঠা, স্বার্থত্যাগ, ঈশ্বরে ভয় অন্যদিকে হানাহানি -- সুতরাং আধুনিক বিশ্বে ধর্ম যা দিচ্ছে তাতে স্ববিরোধিতা রয়েছে৷

Indien Conference on Interface between east and West

প্রফেসর গেভিন ফ্লাড

স্বাভাবিকভাবেই, ধর্মের এ সংজ্ঞা প্রশ্ন তোলে সংস্কৃতির পরিধি নিয়েও৷ এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা প্রফেসর গেভিন ফ্লাড বললেন : ধর্ম সংস্কৃতির বাইরের কিছু নয়৷ ধর্ম সংস্কৃতির নিগড়েই গাঁথা৷ তবে সংস্কৃতির আওতা অনেক বিশাল, তাতে রাজনীতি, সমাজ, সমাজকাঠামো -- সবই থাকতে পারে৷ ধর্ম মূলত সংস্কৃতিরই অংশ৷ ধর্ম হচ্ছে আত্মজিজ্ঞাসার আইনসিদ্ধ স্থান, যা কখনই সংস্কৃতির বহির্ভূত নয়৷

তাই একটি উন্নততর বিশ্ব গড়ার জন্য যেটা সবচেয়ে আগে প্রয়োজন - তা হচ্ছে একে অপরকে জানা৷ দরকার সংলাপ ও সহিষ্ণুতার৷ আর দরকার এক দেশের সঙ্গে অপর দেশের শান্তি স্থাপন৷ ধর্মের যৌক্তিক বিচার সমাজে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে পারে৷ আর এর ফলে যে নীতি নির্ধারিত হয়, সমাজে সহিষ্ণুতা তৈরিতে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে৷

প্রফেসর ফ্লাডের কথায় : তুমি নিজেই একমাত্র সত্যের বাহক বা তোমার পথই সঠিক - এটা অন্যকে জোর করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই৷ প্রয়োজন যৌক্তিক সংলাপের৷ ভারতবর্ষে সেই ঐতিহ্য আছে৷ সহিষ্ণুতা ও সংলাপের দার্শনিক ঐতিহ্যও আছে৷ তাই একজনকে অন্যজনের সঙ্গে একমত হতে হবে - এমন কোন ব্যাপার নেই৷

Indien Conference on Interface between east and West

প্রফেসর পিয়ালী পালিত

অথচ সংলাপের, আলোচনার এই ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, গোধরার মতো ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে ভারতে৷ প্রত্যক্ষ করা গেছে জঙ্গিবাদের সঙ্গে ধর্মকে, বিশেষত ইসলামকে জড়িয়ে ফেলার প্রবণতাকে৷ স্বভাবতই সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নটি উঠেছে কলকাতায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সেমিনারে৷ কিন্তু কি এই সন্ত্রাসবাদ ?

হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রফেসর এন সিং জানালেন : সন্ত্রাসবাদ হচ্ছে সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ৷ জনগণের বিরুদ্ধে নয়৷ সন্ত্রাসবাদ অন্যকে দুর্বল করে দেওযার মন্ত্রণা৷ যেমনটি হয়েছে নাইন-ইলেভেনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে, অথবা ভারতে মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার সময়৷

তাহলে ধর্মই কি সন্ত্রাসবাদকে উসকে দেয় ? জার্মানির এরফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মিশায়েল ডুশে মনে করেন, ধর্ম একদিকে যেমন আপনা-আপনি জঙ্গিবাদকে উসকে দেয় না, তেমনই এতে ধর্মের যে একেবারেই কোন ভূমিকা নেই - সে কথাও বলা সাজে না৷ কারণ, আর যাই হোক ধর্মীয় নেতাদের এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না৷

Indien Conference on Interface between east and West

ড. মিশায়েল ডুশে

ইউরোপে মোট মুসলমানদের সংখ্যা বর্তমানে ৩ থেকে ৪ শতাংশ৷ কোন কোন বড় শহরে আবার তা ১০ শতাংশেরও বেশি৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসী সংক্রান্ত ইস্যুগুলিতে ইউরোপ গত ২০ বছর ধরে মূলত তিনটি মডেল নিয়ে কাজ করছে৷ এগুলি হলো ব্রিটিশ, জার্মান এবং ফরাসি-সুইডিশ মডেল৷ তা এর মধ্যে কোন মডেলটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর ?

সুইডেনের গোটেবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত প্রফেসর আকে সান্ডার বললেন : ঐতিহাসিকভাবে কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, এর মধ্যে কোনটাই ঠিকভাবে কাজ করে নি৷ বরং দিন-দিন চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতিই প্রভাব বিস্তার করেছে ইউরোপে৷ আর নাইন-ইলেভেনের পর যে যন্ত্রটি তারা ব্যবহার করছে - সেটা হলো ইসলাম অতঙ্ক৷ দুঃখের বিষয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বে নতুন এই এজেন্ডা একরকম সফলই বলা চলে৷

Indien Conference on Interface between east and West

প্রফেসর আকে সান্ডার

তাই আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগের এই বিশেষ জায়গাটি দক্ষিণ এশিয়া বা ভারতবর্ষের মতো দেশে কি সম্ভব ? সুইডেনের গোটেবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফের্ডিনান্ডো সার্ডেলার কথায় : ভারতে বহু ধর্মের সম্মিলন৷ এখানে দীর্ঘদিন ধরে এ চর্চা হচ্ছে৷ তবে ভারতের ধর্মনিররপেক্ষতা ও ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষতা এক নয়৷ ক্যাথলিক-প্রোটেস্টান্ট ভাগ থাকলেও, ইউরোপের সংস্কৃতি মূলত খ্রিষ্টধর্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে৷ তবে অভিবাসন সহ নানা কারণে ইউরোপে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছে৷ সেক্ষেত্রে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার বিষয়টির ওপর খেয়াল রাখা দরকার৷ বিশেষ করে বহু জাতি ও ধর্মের সমন্বয় সাধনের বিষয়টি৷ কারণ, ২০-৩০ বছর পর ইউরোপকেও যে এ ধরণের পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হতে পারে৷

প্রতিবেদক: দেবারতি গুহ , সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন