বন্যায় পাওয়া শিশুপাঠ্যের শিক্ষা | আলাপ | DW | 24.06.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

বন্যায় পাওয়া শিশুপাঠ্যের শিক্ষা

এই পর্যায়ের বন্যার প্রথম দিন যে মূলধারার মিডিয়া খবরটাকে খুব গুরুত্ব দেয়নি তার কারণ বাৎসরিক অভ্যাস৷ আমরা জানি যে, প্রতি বছর একবার বন্যা হবে, কোনো বছর কম, কোনো বছর বেশি, এই তো নিয়ম৷

তা এবার এক মাস আগে যখন বন্যা হয়ে গেছে, তখন যতই বৃষ্টি বাদলা হোক, আবহাওয়া অফিস যতই ভয় ধরানো পূর্বাভাস শোনাক, আমরা ধরেছিলাম বন্যা তো বছরে একবার হওয়ার নিয়ম৷ এ বছরের হিসাব চুকিয়েছে৷ আবার এ নিয়ে কথা কেন?

এবার আসলে অন্যথা হলো৷ এমনই যে দেশের একটা বিভাগীয় শহর ডুবে আছে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে, একদিন তো প্রায় বিশ্ব ভূগোলের বাইরেই চলে গিযেছিল৷ ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক নেই, বিদ্যুৎ নেই, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগহীন হয়ে এই যুগে থাকা আর না থাকা তো এক কথাই৷ এই যোগাযোগের যুগে এ-ও সম্ভব৷ বন্যার শক্তি আছে জানতাম৷ তবে এতটা যে বহুকাল দেখা হয়নি৷ যদিও অবিশ্বাস্য রকম ক্ষতিতে পড়ে সিলেট হাঁসফাঁস করছে, কিন্তু সব মন্দেরই এক-আধটা সুবিধার দিক থাকে৷ সিলেটের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি জানিয়েও বলছি, সিলেট শহর এভাবে আক্রান্ত হয়েছে বলেই বন্যা নিয়ে এত কথা হচ্ছে৷ এত আলোচনা৷ শুদ্ধিকরণের শত চিন্তা৷ নইলে প্রত্যন্ত এলাকা, সিলেটের নীচু এলাকা প্রতি বছর বর্ষার সময় তো এভাবেই ডুবে যায়৷ আমরা খবরটা শুনি হয়ত, তারপর এক-আধটু উহ-আহ৷ আমাদের নির্ধারিত সভ্যতার নীচের লাইনের লোকদের জন্য আমাদের অতটুকুই বরাদ্দ সাধারণত৷ সেই লাইনটা টপকে বন্যার পানি উপরে চলে এলো৷ ডোবাডুবির বেলায় বাছবিচার হলো না৷ নীচুদের সঙ্গে উঁচুদের ডোবার এই সাম্যবাদিতায় এখন সবাই নড়ে চড়ে বসেছি৷ বন্যা যে কিছু মানুষের বাৎসরিক দুঃখের রুটিন নয়, বরং সামগ্রিক দুশ্চিন্তার বিষয়- সেই বোধটা জাতীয়ভাবেই তৈরি হয়েছে৷

আবার কারণও কি দুঃখ সীমানার উপরে থাকা মানুষের যথেচ্ছাচার নয়! উন্নয়ন শব্দটা এমন বুলেটশক্তির হয়েছে যে, এটা দিয়ে অনেক অযুক্তির পিঠেও যুক্তির লেবাস পরিয়ে দেয়া যায়৷ উন্নয়নের জোয়ার বইছে৷ গাছ-বন উজাড় হচ্ছে৷ অসহায় প্রকৃতির অদেখা কান্নাকে অগ্রাহ্য করে গড়ে উঠছে নাগরিকতা৷ বিদ্ধ হয়ে সে অপেক্ষা করে৷ সময়মতো এভাবেই প্রতিশোধ নেয়৷ প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কহীনতার ছবিও এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়৷

সমস্যা হলো, এগুলোকে আবার সরলীকরণ করে ফেলা হয়৷ রাজনীতির অঙ্কও চলতে থাকে৷ নিজেদের দ্বিচারিতাও দায়ী৷ এক বন্ধুকে কয়েক মাস আগে দেখলাম, ইটনার রাস্তায় গিয়ে ফেসবুক ভাসিয়ে দিয়ে লিখেছে, ‘‘দেখে মনে হয়, বাংলাদেশ নয়, ভেনিসে আছি৷’’ তারপর যে বা যারা এটা করেছে, তাদের প্রশংসা করতে করতে শব্দ প্রায় শেষ করে থেমেছে৷ বন্যার সময় আবার তার জ্বালাময়ী ফেসবুক স্ট্যাটাস৷ সেই রাস্তার ছবি দিয়ে লিখেছে, যে বা যারা প্রকৃতির বুক চিড়েছে এই বন্যা হচ্ছে তাদের প্রতি প্রকৃতির নিষ্ঠুর উপহার৷ এবং সত্যি বললে, এই দ্বিমুখিতায় সে একা নয়৷ যে মানুষ, উন্নতি-উন্নয়নের জন্য পাহাড়-জঙ্গল কাটাকে হাততালি দেয়, সে-ই একটুখানি বিপর্যয় দেখলে বলে, বলেছিলাম না...৷ প্রকৃতি বদলা নেবেই৷ উন্নয়নপ্রেমীই নিমিষে প্রকৃতিপ্রেমী৷ সত্যি বললে, দুটোরই দরকার৷ দরকার দুটোর সমন্বয়৷ সুসম্পর্ক৷

প্রথমে মূল যে বিভ্রান্তি সেটা নিয়ে দুটো কথা বলি৷ হাওরের যে অনিন্দ্যসুন্দর রাস্তাটা সত্যিই নীচু ভূমির মানুষকে সংযুক্ত করেছে মূল ধারার সঙ্গে, সেটাকে আসামির খাতায় সরাসরি দাঁড় করানো অন্যায়৷ মেঠো সমালোচনা ছাপিয়ে একটু গভীরে গেলে দেখা যাচ্ছে, এই রাস্তাটা সরাসরি বাধা নয়৷ পানি আটকে রাখার কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই৷ বরং নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সরাসরি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখাচ্ছেন এই রাস্তায় পানির প্রবাহ আটকাচ্ছে না মোটেও৷ অন্য কোনো গবেষণা না পাওয়া পর্যন্ত এতে বিশ্বাস রাখি৷ কিন্তু এই নির্দিষ্ট রাস্তা বা রাজনৈতিক অঙ্ক থেকে সরকারি সব প্রচেষ্টাকে দোষারোপ না করে বাস্তবতা বিজ্ঞান দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি একটু৷ দেখবো প্রকৃতির খেয়াল আর মানুষের বেখেয়াল মিলে তৈরি হওয়া ফাঁদটা এখন অনেক বিস্তৃত৷

প্রথমত, সিলেট অঞ্চল মানচিত্রগতভাবে আলাদা হয়ে বাংলাদেশে যুক্ত হলেও, এটা একসময় আসামের অংশ ছিল৷ ভূপ্রকৃতিগতভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে একীভতূ প্রায়৷ ভারতের সেই অঞ্চল মারাত্মক রকম বৃষ্টিপ্রবণ৷ সিলেটও কাছাকাছি৷ এখন বর্ষা মৌসুমে ভারতে বৃষ্টিপাত হলে সে-ই পাহাড়ি ঢল নেমে আসে সিলেটের দিকে৷ সঙ্গে যোগ হয় সিলেটের নিজস্ব বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টিও৷ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবার ভারতের সেই অংশে অবিশ্বাস্যরকম বৃষ্টি হয়েছে৷ আবার ভারতের এই অঞ্চলে গত কয়েক দশক ধরে নানারকম বাঁধ-সংস্কার ইত্যাদি কারণে বনাঞ্চল কাটা হচ্ছে নির্বিচারে৷ ফলে, সেখান থেকে পানি গড়িয়ে আসে খুব দ্রুত৷ বনাঞ্চল বেশি হলে পানি নামে আস্তে, বন উজাড় হয়ে পানি নামছে দ্রুত৷ আবার বন কমে যাওয়াতে সেখানে পাহাড়ধ্বসও হয় প্রচুর, তাতে পলি জমে গিয়ে নদ-নদীর নাব্য কমে যায়৷ ফলে পানি নেমে আসে দ্রুত, আবার যাওয়ার পথে পলি আর নাব্য কমে যাওয়ার বাধা৷ আবার এই অঞ্চলে, মানে সিলেট অঞ্চলে এলে সেখানেও বন উজাড় করা, জলাশয়-খাল বিল ভরাট করার আয়োজন চলছে বাংলাদেশের নিয়মে৷ ফলে, এখানেও বাধা৷ তাই যে পথ দিয়ে এই পানি এসে মেঘনা অববাহিকা হয়ে বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার কথা, সেই পথ আটকে আছে বলে সেটা উপচে গিয়ে বইয়ে দেয় এমন বিনাশী বন্যা৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনকি মেঘনায় তৈরি হওয়া কয়েকটি সেতুও দায়ী৷ রেল বা সড়ক সেতুর জন্য নদী শাসন হয়, আবার পিলারের কারণে পলি জমে, চর তৈরি হয়, পানি পথে তৈরি হয় বাধা৷ আর তাই, পুরো বিষয়টা ঠিক একজন-দুজনের দায় নয়৷ এবং একদিন-দুই দিনে সমাধানের বিষয়ও নয়৷ ভয়ঙ্কর কথা হলো, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টি বাড়বে৷ আমাদের প্রকৃতির স্বাভাবিকতাকে আক্রান্ত করে তৈরি হতে চলা নির্মাণ কাজও থামবে না৷ ফলে, আগামী কয়েক বছরের জন্য এটাই বোধহয় হতে চলেছে স্বাভাবিকতা৷ পরিত্রানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা আর পরিকল্পনা দরকার৷ এবং শুধু বাংলাদেশ চাইলেই হবে না৷ ভারতের বৃষ্টির পানি বাংলাদেশে আসাকে তো ভিসা-ইমিগ্রেশন দিয়ে আটকানো যাবে না, যেমন অভিন্ন নদীগুলোর বেশিরভাগেরই উৎপত্তিস্থল ভারত বলে তাদের সঙ্গে সমন্বয়ও জরুরি৷ পানি আর পলি কূটনীতির কথা এই বন্যায় সামনে আসা নতুন সমীকরণ৷ সেটা মেলাতে হবে৷

মোস্তফা মামুন, সাংবাদিক

মোস্তফা মামুন, সাংবাদিক

অন্য দেশ চলবে তাদের নিয়মে৷ সেখানে নিজেদের মতো কিছু করা যে কঠিন তা তো আমরা খুব ভালো জানি৷ সেই চাপ চালু রেখে নিজেদের দিকটায় মন দিতে হবে৷ আগামী বছরও মেঘালয়-আসামে বৃষ্টি হবে, বাংলাদেশে গড়াবে, কিন্তু এরপর যেন দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা করা যায় তার জন্য প্রকৃতি আর উন্নতির একটা ভারসাম্য আনতে হবে৷ সেতু করতে হবে৷ না হলে জীবন এগোবে না৷ রাস্তা বানাতে হবে৷ নইলে পিছিয়ে পড়ারা পিছিয়েই থাকবে৷ কিন্তু দুটোর কোনোটাতেই পাগুলে হওয়া যাবে না৷ উন্নয়নের স্লোগানে মাতোয়ারা হয়ে মূলটা ভুললে চলবে না, আবার ‘প্রকতি বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে সব রুদ্ধ করে ঘরে দরজা আটকে বসেও থাকা যাবে না৷ প্রকৃতির কাছ থেকে নিতে হবে৷ কিন্তু তাকে ভালোও বাসতে হবে৷

অনেক বছর আগে এক রাতে বৃষ্টি হচ্ছে৷ এক সহকর্মী দেখে প্রায় আত্মহারা হয়ে বললেন, ‘‘উফ আজ যে ঘুমটা হবে না!’’ পাশে দাঁড়ানো ছিলেন অফিসেরই নীচু পর্যায়ের একজন কর্মী৷ তিনি কথাটা শুনে বিষণ্ণ গলায় বললেন, ‘‘আমিও বৃষ্টির কথাই ভাবছি৷ ঘরের টিন ছিদ্র হয়ে গেছে, পানি পড়ে খুব৷ কীভাবে যে ঘুমাবো!’’

প্রথমজন স্তব্ধ হয়ে গেলেন৷ স্তব্ধ সবাই৷

মন খারাপ হয়ে গেল৷ গল্পটা বললাম, মন খারাপ করাতে নয়৷ বোঝাতে৷ প্রত্যেক গল্পেরই দুটো দিক আছে৷ আমরা শুধু একদিক দেখি৷ নিজেদের জায়গা থেকে৷ দেখতে হবে দুই দিক বা সবদিক থেকে৷ তাহলেই শুধু সমাধান৷ 

প্রকৃতিকে জয় করে এগোলে আবার পেছাতে হয়৷ প্রকৃতিকে সঙ্গে করে চললে সেটাই আসলে প্রকৃত জয়৷

এবারের বন্যা শিশুপাঠ্যের মতো সহজ করে এই শিক্ষা দিলো৷ নিলে রক্ষা৷ নইলে পরের ধাক্কার অপেক্ষা৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়