বইয়ের পাঠক কি কমছে? | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 03.03.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

বইয়ের পাঠক কি কমছে?

ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে যখন লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের লেখালেখি, গ্রন্থ প্রকাশ, গ্রন্থ পাঠ এবং বই কেনার মহাযজ্ঞ চলে, বিশেষ করে তখন এই প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসে।

এক কথায় এই সরল প্রশ্নটির উত্তর দেয়া বেশ কঠিন। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, বই মেলা ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়গুলোতে আমাদের প্রকাশকেরা কী পরিমাণ বই বিক্রি করছেন তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। দ্বিতীয়ত কাগুজে বইয়ের বাইরে কতজন পাঠক অনলাইনে বা ডিজিটাল মাধ্যমে বই পড়ছেন তার হদিস মেলানো প্রায় অসম্ভব। 

আমাদের কৈশোরের দিনগুলোতে ফিরে যাই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে, তখনো ক্লাশে দুই-একজন ছাড়া বাকিরা সেই অর্থে গল্পের বইয়ের পাঠক ছিল না। স্কুলে আমাদের প্রাণের বন্ধু ছিল অনেক, কিন্তু একটু মনে করে দেখুন তো, তাদের মধ্যে কতজন নিয়মিত ‘আউট বই' পড়তো? এখন বই বিমুখ হওয়ার পেছনে আমরা ইন্টারনেট, সেলফোন, টেলিভিশনে শত শত চ্যানেলকে দোষারোপ করছি। বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের ছেলেবেলায় যখন হাতের নাগালে বিনোদনের এত এত অপশন ছিল না, তখনো কিন্তু অল্প কিছু মানুষই বই পড়তো। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কম ছিল বলেই তখন পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরিগুলো থেকে ভাড়া করে এনে বই পড়ার চল ছিল। তবে সেসব লইব্রেরিগুলোর ব্যবসাও যে খুব রমরমা ছিল, এমনটি বলা যাবে না। কারণ, বইয়ের পাঠক সব সময়, সব কালেই ছিল সীমিত, হাতে গোনা। 

স্কুল জীবনে যারা ছিলেন সিরিয়াস পাঠক, তাদের অনেকেই সময়ের সাথে পাঠাভ্যাস ত্যাগ করেছেন। নানা কারণেই এটি ঘটেছে। লেখাপড়ার চাপ, বই পড়ার চেয়ে অন্যান্য বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয়া, সাংসারিক জীবনের টানাপোড়েন, জীবন জীবিকার চাপে বা অন্য কোনো কারণে। তবে এ কথা সত্যি, নতুন প্রজন্মের মধ্যে এখনো বই পড়ার আগ্রহ রয়েছে। হতে পারে সংখ্যার দিক থেকে সেটি অত বড় নয়, কিন্তু শিশু-কিশোর-তরুণরা বই পড়ছে। প্রতিবছরএকুশের বইমেলায় গেলে এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে। 

আমার মেয়ে আদৃতা রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। তাকে রীতিমতো বইপোকা বলা যায়। প্রতিদিনই তার পড়ার বইয়ের বাইরে কোনো না কোনো একটি বই পড়তেই হবে। অনেক সময় দেখি সে স্কুলের বন্ধুদের সাথে বই অদলবদল করছে। কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলাম, তাদের ক্লাসে কতজন আছে তার মতো পড়ুয়া? সে জানালো এই সংখ্যা খুবই কম, সে ছাড়া মাত্র ৩ জন। আমার তখন মনে পড়ে গেল, আমাদের কৈশোরেও সংখ্যাটি এর থেকে খুব বেশি ছিল না। 

Bangladesch Golam Kibria (Privat)

গোলাম কিবরিয়া, সাংবাদিক

তাই বলে ইন্টারনেটের প্রসার এবং সহজলভ্যতা কি আমার পাঠাভ্যাসকে প্রভাবিত করছে না? অবশ্যই করছে। আমরা যারা পরিণত বয়সের পাঠক, তারা অফিসের ঝামেলা শেষ করে, সংসারের হাজারো কাজ সামলে, সামাজিকতার দায় মিটিয়ে যেটুকু অবসর মেলে তার কিছু অংশ ব্যয় করি বইপাঠে। এখন কথা হচ্ছে, ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স কি আমাদের অবসরের মহার্ঘ্য সময়টুকুতে ভাগ বসাচ্ছে না? আগে যেমন আমার অবসরের বিনোদন বলতে ছিলো শুধুই বই পড়া, সেখানে এই বই পাঠের এখন অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী। স্বভাবতই পাঠের ইচ্ছে থাকলেও সময় কমে গেছে।

  যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ‘স্ট্যাটিস্টা' এর ২০১৯ সালের শুরুতে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটিতে ১৯ থেকে ২৮ বছর বয়সি ব্যক্তিদের মধ্যে ৮১ শতাংশ এর আগের ১২ মাস সময়ের মধ্যে কোনো না কোনো ফর্ম্যাটে অন্তত একটি বই বড়েছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এর চেয়ে বেশি বয়সের পাঠকদের চেয়ে উল্লেখিত বয়সসীমার তরুণ পাঠকেরা ১২ মাসের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি বই পড়েছেন। 

আমাদের প্রতিবেশী ভারতের দিকে যদি তাকাই সেখানেও চিত্রটি বেশ আশাব্যঞ্জক। নিউইয়র্কভিত্তিক একটি অনলাইন বিজনেস নিউজ পোর্টাল ‘পাবলিশিং পারসপেকটিভ'-এর দেয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতে  প্রতি চারজনে একজন তরুণ শিক্ষিত। এই তরুণদের মধ্যে ২৫ শতাংশ বই পড়ছে। এই পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ।  

এবারের বই মেলায় বেশ কয়েকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এর পাশাপাশি পেশাগত কারণেই লেখক-পাঠকদের সাথে কথা বলেছি। প্রকাশকরা যেটি বলছেন, বইয়ের পাঠক সব সময়ই সীমিত। একটি সমাজের বেশিরভাগ মানুষ বই পড়বে এটা আশা করা ভুল। তবে পাঠকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেলে সেটিও একটি অশনি সংকেত। আশার কথা হচ্ছে, এ দেশে মানুষ এখনো বই পড়ছে, বই কিনছে। তবে এর পরিমাণ বা সংখ্যাটি কত, সেটি নির্ণয় করার জন্য সেই অর্থে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়নি। 

প্রকাশকদের অনেকেই জানালেন, এবার বই মেলায় বিক্রি ভালো হয়েছে। তবে তাদের আশা ছিল আরো বেশি। বই মেলায় যত মানুষ আসেন, বের হওয়ার সময় তাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকের হাতেই বইয়ের ব্যাগ শোভা পায়। কিন্তু এতে হতাশার কারণ দেখছেন না প্রকাশনার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, এখনো যে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ বই পড়ছে, বই কিনছে, বই নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে, এটাই বড় কথা। 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, এ বছর বাংলা একাডেমির হিসাবে বই বিক্রি হয়েছে ৮২ কোটি টাকার। এটি এ পর্যন্ত বই মেলায় বিক্রির সর্বোচ্চ রেকর্ড।গত বছর মেলায় ৮০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। ২০১৮ সালের মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল ৭০ কোটি টাকার। ২০১৭ সালে বিক্রি হয়েছিল ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই, ২০১৬ সালে ৪২ কোটি, ২০১৫ সালে বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২২ কোটি টাকার। আর ২০১৪ সালে মাস জুড়ে বই বিক্রি হয়েছিল মাত্র সাড়ে ১৬ কোটি টাকার। এবার মেলা উপলক্ষে নতুন বই প্রকাশের সংখ্যাও রেকর্ড ছাড়িয়েছে, ২৮ দিনের মেলায় প্রকাশিত হয়েছে মোট ৪ হাজার ৯১৯টি নতুন বই। 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন