ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্ট, পূজার আগে ভোলায় হিন্দুরা আতঙ্কে | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 02.10.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্ট, পূজার আগে ভোলায় হিন্দুরা আতঙ্কে

ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্টকে কেন্দ্র করে আবারও ভোলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে৷ দুর্গাপূজার আগে এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা৷

প্রতীকী ছবি৷

প্রতীকী ছবি৷

ভোলা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গৌরাঙ্গ চন্দ্র দের ফেসবুক মেসেঞ্জার থেকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর জয়রাম নামে এক ব্যক্তির সাথে চ্যাটিংয়ের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে৷ সেখানে ইসলাম ধর্মের মহানবীকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক কথাবার্তা রয়েছে৷

ঘটনাটি জানার পর রাতেই ভোলা সদর থানায় নিজের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে দাবি করে সাধারণ ডায়েরি করেন গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে৷ তার দাবি, এই ধরনের কোনো কথাবার্তা তিনি কারও সঙ্গে বলেননি৷

এদিকে, এমন স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে৷ পরদিন সকালেই ভোলা জেলা মুসলিম ঐক্য পরিষদের ব্যানারে মুসল্লিরা আন্দোলন শুরু করেন৷

তবে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত আছে বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলা প্রশাসক মো. তৌফিক-ই-লাহী চৌধুরী৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পরিস্থিতি এখন শান্ত৷ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে৷’’

আর কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার৷ তাছাড়া ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে তা জানতে প্রশাসন ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছেন বলেও জানান তিনি৷

তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রশাসন সতর্ক অবস্থায় আছে৷ গৌরাঙ্গের বাড়িতে পুলিশ পাহাড়া দেওয়া হয়েছে৷ ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে, সেটা বের করতে আমরা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছি৷ জবাব পেলে আসল ঘটনাটি বুঝতে পারবো৷’’

কারাগারে গৌরাঙ্গ, আতঙ্কে পরিবার

এদিকে, পুলিশ গৌরাঙ্গকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে৷ ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারেই আছেন গৌরাঙ্গ৷ আর নিরাপত্তার ভয়ে ওই দিন থেকে তার পরিবারের কেউই বাড়ির বাইরে যাচ্ছেন না৷ তাদের বাড়িতে পুলিশ পাহারাও বসানো হয়েছে৷

অডিও শুনুন 03:56

‘পূজার ঠিক আগ মুহূর্তে সবাই আতঙ্কের মধ্যে আছেন’

গৌরাঙ্গের ছোট ভাই রাম চন্দ্র দে ভুট্টু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ওই দিনের পর থেকে আমরা বাড়ির বাইরে যাই না৷ অনেকে অনেক কথা বলছে৷ আসলে শুধু আমরা না, আমাদের কমিউনিটির সবাই আতঙ্কের মধ্যে আছে৷ বাজারে আমাদের দোকানও সেই দিন থেকে বন্ধ৷ একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে আছি আমরা৷’’

গৌরাঙ্গের আরেক ভাই রাজ কুমার দে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছি৷’’

এদিকে, গৌরাঙ্গের বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে দেখভাল করছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জি৷ দূর্গাপূজার কয়েকদিন আগে এমন ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন বলে জানান তিনি৷

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের এই নেতা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘দূর্গাপূজার মাত্র কয়েকদিন আগে ভোলার এই ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে৷ আমি কয়েক দফা ভোলার প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি৷ তারা আশ্বাস দিয়েছেন, পূজায় পরিবেশ নির্বিঘ্ন থাকবে৷ এখন ভোলার এই ঘটনা যদি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তো এর প্রভাব পড়বেই৷ তাই আমরা আশা করছি, নির্দোষ গৌরাঙ্গ পূজার আগেই মুক্তি পাবেন৷ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ধরনের ঘটনা সত্যি আমাদের চিন্তিত করে৷’’

গৌরাঙ্গের সঙ্গে কথপোকথনকারী কে এই জয়রাম?

ভোলা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অসীত সাহা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘জয়রাম নামে কাউকে আমরা চিনি না৷ এ নামে আদৌ কেউ আছে কি না, তাও আমরা জানি না৷ ঘটনার পর গৌরাঙ্গ দাদার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে৷''

তিনি বলেন, ''তার (গৌরাঙ্গ চন্দ্র দের) ফেসবুক আইডি হ্যাকড হয়েছে এবং কারা এটা করেছে তা গৌরাঙ্গ জানেন না৷ নিরাপত্তা চেয়ে ওই দিন রাতেই তিনি জিডি করেন৷ তারপরও তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷’’

এই ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র' আখ্যা দিয়ে অসীত সাহা বলেন, ‘‘ভুয়া একজন মানুষের সঙ্গে তিনি কেন এমন কথা বলবেন৷ আর ৮/১০ দিন পর দূর্গাপূজা৷ ভোলায় ১১৫টি মন্দিরে এবার পূজা হচ্ছে৷ যদিও এখন পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি৷ কিন্তু পূজার ঠিক আগ মুহূর্তে সবাই তো আতঙ্কের মধ্যে আছেন৷ আমি গত পরশুদিনও এসপির সঙ্গে দেখা করেছি৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমরা বারবার বলেছি, যে অপরাধ করেছে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসেন৷ সে যেই হোক৷ কিন্তু পূজার আগে পরিস্থিতি শান্ত হওয়া দরকার৷ বারবার ফেসবুকে বিতর্কিত পোস্টকে কেন্দ্র করে ভোলায় সংখ্যালঘুরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন৷’’ 

অডিও শুনুন 00:55

‘ওই দিনের পর থেকে আমরা বাড়ির বাইরে যাই না’

গৌরাঙ্গের ‘শাস্তি' চায় মুসলিম ঐক্য পরিষদ

ঘটনার পর থেকে আন্দোলন শুরু করেছে ভোলা জেলা মুসলিম ঐক্য পরিষদ৷ সংগঠনের সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ মোবাশ্বিরুল হক নাইম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বারবার ভোলায় রাসুলকে নিয়ে কটুক্তি করা হবে, আর আমরা আন্দোলন করব না এটাতো হয় না৷ গত ২৭ সেপ্টেম্বর আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি৷ আমরা বলেছি, এটা নিয়ে সংসদে আইন করতে হবে৷ শুধু মুসলিম না, যে কোন ধর্মের বিরুদ্ধে কটুক্তি করলে একই শাস্তি হতে হবে৷

তিনি বলেন, ‘‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছি৷ কিন্তু মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ আছে৷’’

কেন গৌরাঙ্গের শাস্তি চাইছেন আপনারা এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা মোবাশ্বিরুল হক বলেন, ‘‘ঘটনার পরপরই গৌরাঙ্গ থানায় জিডি করে বলল, তার আইডি হ্যাকড হয়েছে৷ ভালো কথা৷ কিন্তু কয়েক ঘন্টা পরই তিনি আবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বললেন, আমার আইডি হ্যাক হয়েছে৷ হ্যাকড হলে তিনি আবারও প্রবেশ করলেন কীভাবে? ফলে আমরা বলছি, এই ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা আছে৷ আর যদি ধরেও নেই, তিনি এটা করেননি, তাহলে কে করেছে সেটা প্রশাসন বলুক৷’’

তিনি বলেন, ‘‘২০১৯ সালে বোরহানউদ্দিনে একটা ঘটনা ঘটল, ২০২০ সালে মনপুরায় ঘটল, এবার সদরে একই ঘটনা৷ কিন্তু কোনো ঘটনারই তো সুরাহা হচ্ছে না৷ যদি আইডি হ্যাক হয় তাহলে যে হ্যাক করেছে তাকে প্রশাসন ধরুক, বিষয়টি সবার সামনে প্রকাশ করুক, তাহলে তো আর সমস্যা থাকবে না৷’’

ভোলায় বারবার একই ঘটনা 

গত কয়েক বছর ধরে প্রায়ই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ভোলায় সাম্প্রদায়িক হামলার খবর পাওয়া যায়৷

২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবর বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নে ‘বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য শুভ' নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে মহানবীকে কটুক্তি করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া হয়৷ তখন বিপ্লব দাবি করেছিলেন, তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে একটা পোস্ট দেওয়া হয়েছে৷ এই ঘটনার প্রতিবাদে ২০ অক্টোবর বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মসজিদের সামনে ‘মুসলিম তৌহিদী জনতার' ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু হয়৷ পরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ৪ জন মারা যান৷

অডিও শুনুন 06:25

‘যে হ্যাক করেছে তাকে প্রশাসন ধরুক’

মাওলানা মোবাশ্বিরুল হক বলেন, ‘‘এই ঘটনায়ও পোস্টটি কে করেছিলেন আমরা জানতে পারিনি৷ অথচ চারজন নিরীহ মুসল্লিকে জীবন দিতে হয়েছে৷’’

এ বিষয়ে ভোলা জেলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, ‘‘ওই ঘটনাটিতে কে সম্পৃক্ত ছিল, সেটা আমরা বের করেছি৷ ওই হ্যাকারকে আমরা গ্রেফতার করেছি৷ তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন৷ আদালতে তার বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এগুলো তো প্রকাশ্যে বলা যায় না৷ এই কারণে ওই হ্যাকারের পরিচয়ও আমরা প্রকাশ করিনি৷’’

পরের বছর ২০২০ সালের ১৩ মে মনপুরা উপজেলার সিতাকুন্ডে ‘শ্রীরাম চন্দ্র দাস' নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে মহানবীকে কটুক্তি করে পোস্ট দেওয়া হয়৷ এই ঘটনায়ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে৷ কোন হাতাহতের ঘটনা না ঘটলেও কয়েকদিন ধরে সেখানে উত্তেজনা চলমান ছিল৷ পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, এই ঘটনাটিও আমরা শনাক্ত করেছি৷

তবে সাম্প্রদায়িক এমন হামলার পেছনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি থাকে বলেও মনে করেন কেউ কেউ৷ ভোলার একজন প্রবীণ সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সবগুলো ঘটনার পেছনেই রাজনীতি আছে৷ সরকার দলীয় রাজনীতির নানা গ্রুপ, উপ-গ্রুপ এখানে কাজ করে৷ সর্বশেষ যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটার পেছনের ঘটনা দেখলেই বুঝবেন৷’’

তিনি বলেন, ‘‘গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে’তো আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতি করেন৷ আগে কার সঙ্গে রাজনীতি করতেন, ঘটনার আগে তিনি কেন কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলেন? কারা তাকে শিক্ষা দিতে চাইছে? এই বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করলেই পুরো ঘটনা পরিস্কার হয়ে যাবে৷’’

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়