ফসলের মাঠে কেন আগুন দিচ্ছে কৃষক? | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 14.05.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদশ

ফসলের মাঠে কেন আগুন দিচ্ছে কৃষক?

বাংলাদেশে  চলতি মাসেই ধানের ক্ষেতে কৃষকের আগুন দেয়ার অন্তত দু'টি ঘটনা ঘটেছে৷ কৃষকরাই নিজেদের ফসলের মাঠে আগুন দিয়েছেন৷ প্রতিবাদ করেছেন কম দাম বা লোকসানের৷ তাঁরা বলছেন, ধান চাষ আর সম্ভব নয়৷

এরকমই আরেক কৃষক আব্দুল মালেক৷ তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার পাইকড়ার বানকিনা গ্রামে৷ ৫৬ শতক জমিতে ধান চাষ করেছিলেন৷ কিন্তু ধান কাটার আগেই ১২ মে তিনি তাঁর ফসলের ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দেন৷ ধান কাটার জন্য মজুরের পারিশ্রমিক দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে ধান চাষ করতে খরচ হয় কমপক্ষে ১৪ হাজার টাকা৷ ধান পাওয়া যায় ১৫-১৬ মন৷ ধানের মন এখন ৫শ' সাড়ে ৫শ' টাকা৷ ফলে ১৬ হাজার টাকা খরচ করে যে ধান হয়, তার দাম কোনোভাবেই ১০ হাজার টাকার বেশি নয়৷ তাহলে আমরা পোষাবো কিভাবে?''

তিনি একটা হিসাবও দেন৷ এক বিঘা জমি চাষের খরচ কমপক্ষে ১০০ টাকা, বীজ ও রোপণের খরচ ২৫০০, প্রথম দফায় সার ১৫০০, দ্বিতীয় দফায় সার, কীটশাক নিড়ানি ২০০০, ফসল কাটতে ৬ জন দিনমজুরের জন্য ৬০০০ টাকা,  এরসঙ্গে আছে দিনমজুরদের খাওয়ানোর খরচ৷

এই কৃষক নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের শ্রম এবং নিজের জমি হওয়ায় জমির ভাড়ার হিসেব এখানে দেননি৷ তাহলে খরচের হিসাবটি আরো বাড়বে৷

তিনি জানান, ‘‘এখন এই ধান কাটার মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের চাহিদা বেশি৷ তাঁদের মজুরিও বেশি৷ ৯শ' থেকে এক হাজার টাকার নীচে কোনো মজুর পাওয়া যায় না৷ আর এক কিঘা জমির ধান কাটতে ৬-৭ জন মজুর লাগে৷ একজন দিনে সর্বোচ্চ ৫ শতক জমির ধান কাটতে পারেন৷''

অডিও শুনুন 05:45

‘আমরা পোষাবো কিভাবে’

এদিকে মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার আরো একজন কৃষক তাঁর ধানের ক্ষেতে আগুন দিয়েছেন৷ তাঁর নাম নজরুল ইসলাম৷ তিনি একজন সম্পন্ন কৃষক৷ কিন্তু এবার ধানের শীষ আসার পর চিটা রোগে আক্রান্ত হয় ফসল৷ ফলে বিঘা প্রতি ৩-৪ মন ধান হয়নি৷ এই ধান কাটতে প্রতিদিন এক হাজার টাকার বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এমনিতেই আমার ফসল কম হয়েছে, তার ওপর ধানের দাম অনেক কম৷ ফলে একজন মজুরকে এক হাজার টাকা করে দিয়ে এই ধান কাটালে আমার লোকসান আরো বাড়বে৷ তাই ফসলের মাঠে দুঃখে আগুন দিয়েছি৷ এছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই৷''

এবার সরকার প্রতিমন ধানের দাম নির্ধারণ করেছে ১০৪০ টাকা৷ প্রতি কেজি ২৬ টাকা৷ কিন্তু বাস্তবে বাজারে সাড়ে ৫শ' টাকার বেশিতে কোথাও ধান বিক্রি করতে পারছেন না কৃষকরা৷ তাতে প্রতি কেজির দাম পড়ে ১৩ টাকা ৭৫ পয়সা৷ এটা সর্বোচ্চ দর৷ আর সরকারের হিসাবেই প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা ৩০ পয়সা৷ সরকারের হিসাব মেনে নিলেও প্রতি কেজি ধান উৎপাদন করে কৃষককে  ১১ টাকা ৫০ পয়সারও বেশি লোকসান গুনতে হয়৷

সরকার যে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই দামে কৃষকের কাছ থেকে  সারাদেশে খাদ্য কর্মকর্তাদের ধান কেনার কথা৷ কিন্তু  কৃষক যত ধান বেচতে চায়, তত ধান কেনা হয় না৷ আর কৃষকরা সরসরি বেচতেও পারেন না৷

অডিও শুনুন 02:54

‘কৃষককে তালিকাভূক্ত হতে হবে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে’

এবারের বোরো মৌসুমে সরকার সাড়ে ১২ লাখ মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ আগামী ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান চলবে৷ এরমধ্যে ধান সংগ্রহ করা হবে দেড় লাখ মেট্রিক টন৷ বাকিটা চাল ও গম৷ এটা মোট উৎপাদনের ৫ শতাংশের বেশি নয়৷ আর চাল সরকার কৃষকের কাছ থেকে কেনে না, কেনে মিল মালিকদের কাছ থেকে৷

তবে ধানও কি কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হয়?এই প্রশ্নের জবাবে কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‘‘আমি চেষ্টা করেও কখনো বিক্রি করতে পারিনি৷ আমি বার বার যোগাযোগ করেছি৷ কৃষি অফিসে গিয়েছি, খাদ্য অফিসে গিয়েছি, তারা আমার ধান  কখনোই কেনেনি৷'' আর কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘সরকার কোথায় ধান কেনে তা আমার জানা নেই৷'' টাঙ্গাইলের সাংবাদিক বিজয় কুমার সাহা বলেন, ‘‘আসলে কৃষকরা সরাসরি সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেন না৷ বিক্রি করার দালাল আছে৷ তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে বেশি দামে সরকারি গুদামে বিক্রি করে৷ আর এই মধ্যবর্তী লাভের ভাগ নেয়ার জন্য একটি চক্র আছে৷ এই চক্রের সাথে খাদ্য গুদামের কর্মকর্তারাও জড়িত৷''

আর কৃষকরা চাইলেই সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন না৷ বাসাইল উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক কণককান্তি দেবনাথ জানান, ‘কৃষককে তালিকাভূক্ত হতে হবে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে, ধানে নির্দিষ্ট আর্দ্রতা থাকতে হবে আর তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে৷ তালিকাভুক্তিরণ কাজ করে কৃষি অফিস৷''

অডিও শুনুন 03:21

’আড়াইশ টাকার কৃষি শ্রমিক এখন এক হাজার টাকা’

তিনি দালালের মাধ্যমে ধান কেনার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘‘এবার আমার উপজেলায় ৩৪৩ মেট্রিক টন ধান কেনার অনুমতি আছে৷ তাই সবার ধান তো কিনতে পারবো না৷ তাই যাঁরা আগে আসবেন, তাঁদের ধান আগে কিনবো৷ তবে এখন পর্যন্ত কেউ আসেননি৷''

২০১৮ সালে বাংলাদেশে বোরো ধান উৎপাদনে নতুন রেকর্ডসৃষ্টি হয়েছে৷ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান  ব্যুরোর তথ্য মতে গত বছর বাংলাদেশে ৪৮ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ  হয়েছে৷ উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৯৫ লাখ টন ধান, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি৷ বোরোর এই বাম্পার ফলনের বদৌলতে গত বছর মোট ধান উৎপাদন ৩ কোটি ৬২ লাখ টনে পৌঁছে গেছে৷ আর দেশে মোট ধানের চাহিদা ৩ কোটি ৩০ লাখ টন৷ সেই হিসাবে দেশের মোট চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থেকে যায় ৩০ লাখ টন৷ এবারো বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে৷

২০১৭ সালে হাওরে বন্যার কারণে সরকার চাল আমদানিতে ২৬ ভাগ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়৷ ফলে দেশে অতিরিক্ত আরো ২৮ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়৷ কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. এম আসাদুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘দেশে ধানের যে বাম্পার ফলন হবে তা আগেই বোঝা গেছে৷ আর ২০১৭ সালের হাওরে বন্যার কারণে শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধায় ২৭-২৮ লাখ মেট্রিক টন চাল এসেছে বাইরে থেকে৷ কিন্তু আপদ কেটে গেলেও সরকার আর চাল আমদানির ট্যারিফ বাড়ায়নি৷ এটা আসলে অ্যাডজাস্ট করা উচিত ছিল৷ আগের খাদ্যমন্ত্রী তো খাদ্য ছাড়া আর সব বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন৷ আর এখনকার খাদ্যমন্ত্রী তো আগে নাকি চালকলের মালিক ছিলেন৷ আর এখন চালকল না থাকলেও শোনা যায় তিনি চালকলের মালিকদের দ্বারা পরিচালিত৷ ধানের একদিকে বাম্পার ফলন এবং চালকল মালিকদের হাতে ধান মজুদ থাকার কারণে চালকল মালিকরা ধান কিনছে কম৷ ফলে ধানের দাম পড়ে গেছে৷ এটা সরকারের আগেই দেখা উচিত ছিল৷''

অডিও শুনুন 05:26

‘দাম না পাওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র কৃষকরা’

তিনি বলেন, ‘‘এটা আমরা অনেক বছর আগেই বলেছিলাম যে, দেশে কৃষি শ্রমিকের সংকট দেখা দেবে৷ এখন সেটা দেখা দিয়েছে৷ আর কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে অনেক৷ আড়াইশ টাকার কৃষি শ্রমিক এখন এক হাজার টাকা৷''

তাঁর মতে, ‘‘কৃষক যদি এখন ধান বিক্রি না করে ধরে রাখতে পারত তাহলে দাম পেতো৷ কিন্তু সেই ব্যবস্থা তো সরকার করেনি৷ আর ধানের মান ভালো রাখার জন্যও তো কৃষকদের  কোনো সহায়তা দেয়া হয় না৷ কৃষিমন্ত্রী রপ্তানির চিন্তা-ভাবনার কথা বলছেন৷ কিন্তু সেটা কবে? চিন্তা করে সময় কাটালে তো কৃষক সর্বশান্ত হয়ে যাবে!''

বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নজনীন আহমেদ বলেন, ‘‘দাম না পাওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র কৃষকরা৷ তাঁরা চালকল মালিকসহ নানা সূত্র থেকে সুদে টাকা নিয়ে চাষ করেছেন৷ এখন তাঁদের এই ধান বিক্রি করে টাকা শোধ করতে হবে৷ তাঁদের পক্ষে এই ধান দুই-তিন মাস ধরে রাখা সম্ভব নয়৷ যদি তাঁরা পারতেন তাহলে কিন্তু দাম পেতেন৷ তাই সরকার যদি তাঁদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতো, তাহলে এই সংকট মোকবেলা করতে পারত৷ এই ঋণ চাষের আগে-পরে দুই সময়ই দিতে হবে৷ আর উৎপাদন খরচ কমাতে হবে৷ ধান কাটা, মাড়াই করা এসব কাজে যন্ত্রের ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে৷ এটার ব্যবস্থাও সরকারকে করতে হবে৷ এই অবস্থা কিন্তু বছরের পর বছর চলছে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘সরকার ধান কেনে সামান্যই, বেশি কেনে চাল৷ আর এই চাল কেনে চালকল থেকে৷ কৃষকের কাছ থেকে তো কেনে না৷ তাই কৃষকের ধানের সঠিক মূল্য দিতে হলে তাঁকে ধান মজুদের সক্ষমতার ব্যবস্থা করতে হবে৷''

 

 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন