প্রয়াণ দিবসে মহাত্মার স্মৃতি আগলে অশীতিপর প্রবীণ | বিশ্ব | DW | 30.01.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সাক্ষাৎকার

প্রয়াণ দিবসে মহাত্মার স্মৃতি আগলে অশীতিপর প্রবীণ

প্রয়াণের ৭০ বছরে ভারতজুড়ে চলছে গান্ধি-স্মরণ৷ কলকাতায় মহাত্মার স্মৃতি তর্পণ করছেন এক প্রবীণ৷ তাঁর বাবা যশোরের হেমন্ত সেনগুপ্ত ছিলেন গান্ধিজির দেহরক্ষী৷ ১০০ নং বালিগঞ্জ বাড়িতে বসে সেই স্মৃতিই ভাগ করে নিলেন চণ্ডী সেনগুপ্ত৷

ডয়চে ভেলে: ১৯৪৭ সালে গান্ধিজি কলকাতায় এসেছিলেন৷ বেলেঘাটা অঞ্চলে আজকের গান্ধি ভবনেই কি আপনি গান্ধিজিকে দেখেছিলেন?

চণ্ডী সেনগুপ্ত: তখন গান্ধি ভবনের নাম ছিল হায়দারি মঞ্জিল৷ ঠিকানা ১৫০ বি বেলেঘাটা মেন রোড৷ আজকের মতো এমন সুন্দর সাজানোও ছিল না৷ মালকিন ছিলেন বৃদ্ধা বেগম আম্মা৷ বাড়িটার তখন জরাজীর্ণ অবস্থা৷ পিছনে একটা পুকুর৷ তখন তার নাম হলো গান্ধি ক্যাম্প৷

কত বছর বয়স তখন আপনার?

১২ বছর৷ আমার জন্ম ১৯৩৫ সালে৷

তখন কলকাতার কী অবস্থা?

১৯৪৬-এর দাঙ্গার স্মৃতি তখনও শুকোয়নি৷ পরের বছরই ফের কলকাতায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা৷ দিনটা ছিল ১৩ আগস্ট, ১৯৪৭৷ সেদিনই হায়দারি মঞ্জিলে আসেন বাপু৷

অডিও শুনুন 09:27
এখন লাইভ
09:27 মিনিট

‘স্বাধীন ভারতে আমার বাবাই ছিলেন গান্ধিজির প্রথম বাঙালি দেহরক্ষী’

সেই সময়ের গল্প তা হলে বলুন...

আসলে বেলেঘাটায় তখন টানটান উত্তেজনা৷ গান্ধিজিকে ঘিরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিল ক্যালকাটা পুলিশ৷ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমার বাবা হেমন্ত সেনগুপ্তকে৷ বাবা অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার বলে সর্বক্ষণ বাপুর পাশে পাশে থাকতেন৷ স্বাধীন ভারতে তিনিই গান্ধিজির সর্বপ্রথম বাঙালি দেহরক্ষী৷ সেই সুবাদে আমার গান্ধি ক্যাম্পে যাতায়াত ছিল৷

কতদিন নিরাপত্তার ভার ছিল তাঁর হাতে?

১৩ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর — এই ২৫ দিন কলকাতায় গান্ধিজির নিরাপত্তার ভার ছিল বাবার হাতে৷ হায়দারি মঞ্জিল থেকে প্রার্থনাসভা, প্রাক-স্বাধীন ও স্বাধীনত্তোর ভারতে বাবাই ছিলেন ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত অফিসার এবং বাপুর ছায়াসঙ্গী৷

তখনকার কথা কতটা মনে পড়ে?

অনেকটাই পড়ে৷ বাবার জিপ থাকত গান্ধিজির গাড়ির সামনে৷ সবার আগে চলত সেই ক্যালকাটা পুলিশের জিপ৷ নম্বর ছিল সিপি ৩৭৷ হুডখোলা জিপে বাবা দাঁড়িয়ে থাকতেন৷ বাপুকে দেখতে রাস্তার দু'পাশে জনতার ঢল৷ তারা যাতে গাড়ির সামনে চলে না আসে, তা দেখতেন বাবা৷ সমানে হাত নেড়ে চলতেন হুডখোলা জিপে দাঁড়িয়ে৷ গম্ভীর কণ্ঠ ছিল তাঁর৷ বার বার তিনি হাঁক দিয়ে জনতাকে সরে যেতে বলতেন৷

বাবার সঙ্গে আপনি যেতেন হায়দারি মঞ্জিলে?

কতবার গিয়েছি! গান্ধিজির কাছাকাছি মেঝেয় পাতা চাটাইয়ে বসে থাকতাম৷ একটা ঘরেই যাবতীয় কর্মকাণ্ড৷ সবাইকে জায়গা দেওয়া যেত না৷ জানলায় মাথা গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকত কত মানুষ৷ বাপু খাটো ধুতি পরে বসতেন৷ ঘরের দেওয়াল পিঠ দিয়ে৷ তাঁকে ঘিরে পারিষদরা অর্ধেক চাঁদের মতো বৃত্ত করে বসতেন৷ মানু ও আভা গান্ধি থাকতেন সর্বক্ষণ৷ থাকতেন বাপুর সচিব নির্মল বসু৷ রোজ তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন ডাক্তার মেহতা৷ সামনের সারিতে এসে বসতাম আমি৷

মহাত্মা কখনও আপনার সঙ্গে কথা বলেছিলেন?

 Indien Hemanta Sengupta (DW/P. Samanta)

গান্ধিজির দেহরক্ষী ছিলেন হেমন্ত সেনগুপ্ত

না, নিজে কখনও বলেননি৷ বার বার আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেন৷ আমি প্রার্থনাসভায় গিয়ে ভাঙা ক্যামেরা দিয়ে তাঁর ছবি তুলতাম৷ বাপু কথা না বললেও নির্মল বসু আমার সঙ্গে কথা বলেছেন টুকটাক, কতজন আদর করেছেন৷

কারা আসতেন গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করতে?

তখন কি আর দেখে বুঝতাম! পরে জেনেছি সে সব নাম৷ সুরাবর্দি থেকে রাজা গোপালাচারি, সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণ থেকে কৃপালিনী৷ বাংলার নেতা জ্যোতি বসু, ভূপেন গুপ্ত, প্রফুল্ল ঘোষ — কত নাম সেই তালিকায়৷

বাবার কাছে সাম্প্রদায়িকতার পরিস্থিতি নিয়ে কী শুনেছেন?

এটা পরে শুনেছি৷ গান্ধিজির অহিংসার আবেদন সত্ত্বেও বেলেঘাটায় গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়েছিল৷ হানাহানি শুরু হয়, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাপাতে থাকে দুষ্কৃতীরা৷ আবেদনে কাজ না হওয়ায় বাপু অনশন শুরু করেন৷ দুষ্কৃতীরা অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত তিনি কিচ্ছুটি মুখে তুলবেন না৷ কলকাতা পুলিশও অস্ত্র উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ নেতৃত্বে ছিলেন আমার বাবা৷ দুষ্কৃতীরা অস্ত্র জমা দিয়ে যায় বাবার কাছে৷ খবরের কাগজে বাবার ছবিও প্রকাশিত হয়েছিল৷ অস্ত্রগুলো রয়েছে আজকের গান্ধি ভবনে৷

বাপুর কথা আর কী শুনেছেন, কী দেখেছেন?

 খুবই নিয়মানুবর্তী ছিলেন বাপু৷ শেষ রাতে তিনি বিছানা ছাড়তেন৷ সূর্যের আলো ফোটার আগে প্রার্থনা সেরে নিতেন বাড়ির ভেতরেই৷ তারপর বাইরে বেরিয়ে খানিকটা পায়চারি করে কিছুক্ষণ ঘুমোতেন৷ উঠে ম্যাসাজ-স্নান ও প্রাতঃরাশ৷ এরপর হায়দারি মঞ্জিলের বাঁদিকের ঘরটায় গিয়ে বসতেন৷ ওখানেই হরিজন পত্রিকার কাজ হতো৷

পত্রিকার কাজ কীভাবে চলত?

আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে গান্ধিজি নিজের পত্রিকার কাজ সেরে নিতেন৷ তিনি বলে যেতেন, পার্শ্বচররা নোট নিতেন৷ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়ত৷ জনতার মধ্যে ছিল একদল অটোগ্রাফ শিকারী৷ হরিজন তহবিলে পাঁচ টাকা দিলে গান্ধিজির সই মিলত৷ সাদা কাগজে মহাত্মা শুধু লিখতেন ‘চিরঞ্জীব', তার নীচে অনুরাগীর নাম৷ আমাকেও অটোগ্রাফ দিয়েছেন বাপু৷ তাঁর জন্য অনেকেই ফল ও মিষ্টি নিয়ে আসতেন৷ রোজই তার ভাগ পেতাম৷

কখনও কোনো সভায় গিয়ে বাপুর কথা শুনেছেন?

হ্যাঁ৷ রোজ গান্ধিজি বিভিন্ন স্থানে প্রার্থনা সভা করতে যেতেন৷ সুরাবর্দি কয়েকদিন নিজেই গাড়ি চালিয়ে তাঁকে প্রার্থনাসভায় নিয়ে গিয়েছেন৷ শহরের ধনী ব্যক্তিরাও গাড়ি নিয়ে আসতেন বাপুর জন্য৷ স্থানীয় কোনো মাঠে বসত সেই সভা৷ প্রার্থনা সভা হয়েছে ময়দানের মনুমেন্টের নীচে৷ কাছেই মহামেডান স্পোর্টিংয়ের মাঠ৷ প্রবল বৃষ্টিতে থকথকে কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে কত মানু্ষ বাপুর কথা শুনেছে৷ যূথিকা রায়, বিজনবালার মত কণ্ঠশিল্পীরাও থাকতেন সভায়৷

এবার ১৫ আগস্টের কথা জানতে চাইব...

কালীঘাটে তখন আমাদের বাসা৷ ১৫ আগস্ট আমি হায়দারি মঞ্জিলে যাইনি৷ নিজের ভাঙা ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়েছিলাম শহরের রাস্তায়৷ যা দেখেছি, তার ছবি তুলেছি৷

আর বাপু?

নির্বাচিত প্রতিবেদন

শুনেছিলাম ওই দিন ভোর দুটোয় ঘুম থেকে উঠেছিলেন তিনি৷ মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রতিনিধি তখনই চলে এসেছেন হায়দারি মঞ্জিলে৷ তাঁদের একটাই ইচ্ছে, জাতির জনককে দর্শন করে রোজা ভাঙবেন৷ সেখানে হিন্দুরাও ছিলেন৷ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, পরবর্তীকালে যিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, তিনি বাপুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন৷ সুরাবর্দির অনুরোধে গাড়ি চড়ে শহর ঘোরেন তিনি৷ বাপু দেখলেন, হিন্দু-মুসলিম হাত ধরাধরি করে ঘুরছে৷ হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই স্লোগান উঠেছে৷ শহরের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় তিনি যখন যান, মহাত্মার নামে জয়ধ্বনি উঠেছিল৷

আজকে মৌলবাদীরা যখন উপমহাদেশে খুব সক্রিয়, সেই সময় গান্ধিজির বাণী কতটা কাজে আসতে পারে?

বাপু তাঁর কাজেই পথ দেখিয়েছেন৷ ১৩ আগস্টের ঘটনা বলি৷ সেদিন গান্ধিজি বেলেঘাটায় আসতেই কয়েকজন হিন্দু যুবক তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখায়৷ তাদের বক্তব্য, ১৯৪৬-এর ১৬ আগস্ট হিন্দুরা অত্যাচারিত হয়েছিল৷ সে সময় তাদের রক্ষা করার কেউ ছিল না৷ এখন কেন আপনি মুসলিমদের বাঁচাতে এসেছেন? তাদের শান্ত করে বাপু বলেন, আগেকার ঘটনার কথা তুলে এখন প্রতিশোধ নেওয়া উচিত নয়৷ যারা হত্যা করছে, আগুন লাগাচ্ছে, লুঠ করছে, তারা নিজেদের ধর্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে৷ নোয়াখালির মুসলিম নেতাদের আমি বলেছি, যদি ওখানে আবার দাঙ্গা শুরু হয়, তা হলে আমাকে আগে হত্যা করতে হবে৷ গত বছরের কথা তুলে কেন এই সময়কে আপনারা বিষাক্ত করছেন? আপনারা যতই প্রতিবাদ করুন, আমি এই এলাকা ছাড়ব না৷ আমার নাম, আমার কাজ, সবটাই প্রমাণ করে আমি হিন্দু৷ এ সব শুনে যুবকরা শান্ত হয়, গান্ধিজির পাশে দাঁড়ায়৷

সাত দশক আগে গান্ধিজিকে হত্যা করা হয়েছিল....১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারির কথা কিছু মনে পড়ে?

পড়ে বৈকি৷ হাজরার কালিকা হলে পুলিশের একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন৷ সময় পার হয়ে গেলেও পর্দা উঠছিল না৷ একজন এসে গান্ধিজির হত্যার খবর ঘোষণা করলেন৷ বাবা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন কাছের ভবানীপুর থানায়৷ মহাত্মার হত্যার খবরে শহরে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় ফোন ঘুরিয়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ মোতায়েনের কথা বলছিলেন৷ ব্যক্তিগত আবেগ ঝেড়ে ফেলে তিনি ছুটেছিলেন দায়িত্ব সামলাতে৷

সাক্ষাৎকারটি কেমন লাগলো? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন