প্রায় সব দলই ধর্মকে হাতিয়ার করে | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 02.04.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

প্রায় সব দলই ধর্মকে হাতিয়ার করে

সীমারেখা মাঝে মাঝেই মুছে যায়। ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির। ভারতে প্রায় সব দলের ক্ষেত্রেই এটা সত্যি।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। দিল্লির বিধানসভা ভোটের প্রচার চলছে। সেখানেই এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মোক্ষম স্লোগান দিলেন। তিনি বললেন, ‘দেশ কে গদ্দারো কো’, আর সমনে বসা কর্মী-সমর্থকরা আওয়াজ তুললেন, ‘গোলি মারো ... কো’। কোনো নাম উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু কাদের উদ্দেশে এই স্লোগান, সেটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। রাজনৈতিক দলের জনসভায় এই স্লোগান ওঠার পর তা নিয়ে সোরগোল কম হয়নি। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। নির্বাচন কমিশন ওই মন্ত্রীকে বাকি দিনগুলিতে প্রচার করতে দেয়নি এই মাত্র। ওই মন্ত্রী বা সমর্থকদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সেই শোরগোল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে।

ভারতে নিয়ম হলো ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে মেশানো যাবে না। রাজনীতির সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতাকে মেশানো যাবে না। মেশালে সেই দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হতে পারে। নিয়ম তো আছে। আর ভারত সহ এই উপমহাদেশের দস্তুর হলো, নিয়ম থাকলে তার ফাঁকও থাকবে। ওই মন্ত্রী তো কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেননি। তা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কী করে? নিয়ম ও তার ফাঁক দিয়ে তাই সবকিছু গলে যায়। ফলে এই ধরনের স্লোগান দেয়ার পরেও কিছু হয় না।

একেবারে সাম্প্রতিক একটা ঘটনার কথা ধরুন। ১ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোট চলছে। একটি বুথে বিজেপি-র একজন এজেন্ট গেরুয়া ফতুয়া পরে কপালে ও নাকে চন্দনের তিলক কেটে এসেছিলেন। সাধারণত বৈষ্ণবেরা এই ধরনের তিলক, যাকে রসকলি বলে, তা পরেন। তৃণমূলের এজেন্ট গেরুয়া পোশাক নিয়ে আপত্তি জানান। প্রিসাইডিং অফিসার বিজেপি-র এজেন্টকে বলেন, গেরুয়া পোশাক বদলে আসতে হবে। ঘটনা হলো, কোনো দলের এজেন্ট গেরুয়া পোশাক পরে আসতে পারবেন না এমন কোনো নিয়ম নেই। তিনি রসকলি এঁকে আসতে পারবেন না এরকমও কোনো কথা নেই।

একেবারে ঠিক কথা। বামেরা লাল শার্ট, বিজেপি গেরুয়া পোশাক, তৃণমূল নীল-সাদা রঙের শাড়ি পরতে পারবেন না, অর্থাৎ দলের ঘোষিত রঙের পোশাক পরা না পরা নিয়ে কোনো কথা নির্বাচন কমিশনের নিয়ম বা সংবিধানের অনুচ্ছেদে বলা নেই। তা সত্ত্বেও তৃণমূলের অভিযোগ হলো, ওই ব্যক্তি পোশাকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন। তাই তাকে পোশাক বদলে আসতে বলা হয়েছিল। সেই নিয়ম ও ফাঁকের গল্প।

১৯৯২ সালে দিল্লিতে একটা সম্মেলন হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে। সেখানে ঠিক হয়, ভি কে কৃষ্ণ আইয়ারের নেতৃত্বে একটি কমিটি এই বিষয়ে নির্বাচনী সংস্কারের প্রস্তাব দেবে। কমিটি দুইটি প্রস্তাব দিয়েছিল। যে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধর্মীয় নাম আছে, সেগুলি বদলে ফেলতে হবে। সে জন্য তাদের নির্দিষ্ট সময় দেয়া হবে। দ্বিতীয়টি হলো, কোনো দল যদি ভোটে সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা নেয়, তা হলে তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল হবে। সেই প্রস্তাবে সুপ্রিম কোর্টের দুইজন সাবেক বিচারক, হাইকোর্টের সাতজন সাবেক বিচারক, শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবীসহ অনেকে সই করেন। তারপর তা নির্বাচন কমিশন, সরকার ও সব সাংসদের কাছে পাঠানো হয়। ফল? শূন্য। সরকার তো নয়ই কোনো দলই এই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখায়নি।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ পি পি রাও বলেছেন, আশির দশকেও একই উদ্যোগ হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনারের কাছে একটি প্রতিনিধিদল দাবি জানিয়েছিল, ধর্মীয় নামওয়ালা দলগুলিকে নাম পরিবর্তন করতে বলা হোক। তখন এই ধরনের তিনটি দল ছিল, অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ, অল ইন্ডিয়া হিন্দু সভাসভা এবং ইন্ডিয়া খ্রিস্টান পার্টি। নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দেন, তার এই ক্ষমতা নেই। সরকারের আছে। সরকার নড়েচড়ে বসেনি। ফলে নাম পরিবর্তন হয়নি। পরে ধর্মীয় নাম সহ আরো দল ভারতে তৈরি হয়েছে। ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা রাখতে গেলে, প্রথম শর্তই তো হওয়া উচিত কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধর্মীয় নাম থাকবে না।

সোমনাথ মন্দির তৈরি করা নিয়ে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের বিরোধ তো আজ ইতিহাস। নেহরুর মত ছিল, ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সেখানে সরকারের খরচে কোনো মন্দির বা ধর্মস্থান তৈরি হবে না। কিন্তু রাজেন্দ্র প্রসাদ বলেন, সরকারের খরচেই সোমনাথ মন্দির নির্মাণ করতে হবে। এই নিয়ে নেহরু ও রাজেন্দ্র প্রসাদের মধ্যে অনেকগুলি চিঠি বিনিময় হয়। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজেন্দ্র প্রসাদের দাবি মানতে বাধ্য হন নেহরু। এই ঘটনাকে ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে প্রথম বিচ্যুতি বলেন অনেকে।

যত সময় এগিয়েছে, ততই বিভিন্ন দল ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে মিশিয়েছে।  অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের দাবি নিয়ে বিজেপি আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নেয় হিমাচল প্রদেশের পালানপুর অধিবেশনে, ১৯৮৯ সালে। আর তার তিন বছর আগে রাজীব গান্ধীর আমলে ১৯৮৬ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদে রামলালার পুজোর অনুমতি দেয়া হয়। তার আগে শাহবানু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিপরীত আইন করার জন্য বিল নিয়ে আসেন রাজীব গান্ধী। এভাবেই তিনি তাঁর ধারণামতো একবার মুসলিম ও একবার হিন্দুদের তুষ্ট করতে চাইলেন।  বিজেপির উত্থানই মন্দির আন্দোলনকে হাতিয়ার করে। যে বিজেপি  একসময় লোকসভায় দুইটি আসন পেয়েছিল, মন্দির আন্দোলনের পর ৮৯টি আসনে জেতে। তার কিছুদিনের মধ্যে তারা কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। আর নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে তারা তো একের পর এক রাজ্যে নির্বাচনে জিতছে।

গৌতম হোড়

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে, নতুন দিল্লি

এখন প্রতিটি রাজনৈতিক দল তার সুবিধা ও সুযোগমতো ধর্মীয় ভাবাবেগকে হাতিয়ার  করতে চায়। পশ্চিমবঙ্গের চলতি বিধানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনী প্রচারে জনসভায় কখনো চণ্ডীপাঠ করেছেন, কখনো নিজের গোত্র জানিয়েছেন, কখনো মন্দির দর্শন করেছেন। রাজীব গান্ধীর মতো তিনি একবার ইমামদের ভাতা দিলেন, তারপর পুরোহিতদেরও ভাতা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে চাইলেন।

রাহুল গান্ধী ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধী যে কতবার বারাণসীতে বাবা বিশ্বনাথ এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন মন্দিরে  দর্শন করে প্রতিদিন ভোট প্রচার শুরু করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। আর যোগী আদিত্যনাথ সহ অনেক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের ভাষণে মসৃণভাবে মিশে যায় ধর্ম ও রাজনীতি। নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গের ভোটের প্রচারে গিয়ে প্রশ্ন করেন, তিনি বাংলাদেশে গিয়ে হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে গিয়েছিলেন, যশোরেশ্বরী মন্দিরে গিয়েছিলেন বলে মমতা প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি কি মন্দিরে যেতে পারবেন না? আবার মনমোহন সিংয়ের মতো চিরকাল বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে চাওয়া মানুষও বলে বসেন, দেশের সম্পদের উপর প্রথম অধিকার সংখ্যালঘুদের। সংবিধান যেখানে সব বিষয়ে সকলের সমানাধি্কার দিয়েছে, সেখানে কী করে সংখ্যালঘুদের সম্পদের উপর প্রথম অধিকার জন্মায় তা বোঝা দায়।

এভাবেই চলছে ভারতের রাজনীতি।

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়