‘প্রাণক্ষয় এড়ানোয় সফল বাংলাদেশকে সম্পদ রক্ষার দিকেও নজর দিতে হবে’ | আলাপ | DW | 27.05.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘প্রাণক্ষয় এড়ানোয় সফল বাংলাদেশকে সম্পদ রক্ষার দিকেও নজর দিতে হবে’

সিলেটের বন্যায় বেসিন ব্যবস্থাপনায় ভারতের দায় আছে বলে মনে করেন বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের পরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম৷

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার দিকগুলোও উঠে এসেছে তার বক্তব্যে৷

ডয়চে ভেলে: সিলেটে বন্যা হচ্ছে৷ কেউ এটাকে ২০০৪ সালের বন্যার সাথে তুলনা করছেন৷ কেউ বলছেন, গত ৩০ বছরেও  একম বন্যা হয়নি৷ আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

একেএম সাইফুল ইসলাম: সিলেট অঞ্চলে একটা জিওলোজিক্যাল ফর্মেশন আছে৷ এখানে বছরের একটা সময় পানির নীচে থাকে, আরেকটা সময় সেখানে শস্য হয়৷ এটা হাওরের জীবপ্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য,  সেই হিসাবে বর্ষায় পানি থাকবে বা বন্যা হবে- এটা স্বাভাবিক ব্যাপার৷ কিন্তু এবারে বর্ষা আসার আগেই বন্যা এসেছে৷

এবারের বন্যাটা হাইড্রোলোজিক্যালি বড় বন্যা না৷ আবার কত দ্রুত এসেছে, কত সময় ধরে শহরে পানি থেকেছে, সেই দিক থেকে চিন্তা করলে ২০০৪ সালে এরকম ঘটনা ঘটেছে৷ সেভাবে চিন্তা করলে হয়ত ২০ বছর পরে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে৷

এই বন্যায় ভারতের নদী ব্যবস্থাপনার দায় আছে? নাকি এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ কারণে হয়েছে?

বাংলাদেশে সিলেট অঞ্চলে আমরা মেঘনা বেসিনে আছি৷ সেখানে যে নদীগুলো আছে, সেগুলোর উৎপত্তি মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং বরাক৷ পুরোটাই অনেক উঁচু৷ চেরাপুঞ্জি পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা বা অন্যান্য… সেখানে বৃষ্টি হলে পাহাড় থেকে ঢল নামে৷ এখানে ভারতের দায় যদি চিন্তা করেন, সেটা বেসিন ব্যবস্থাপনায়৷ গাছ কেটে ফেলা এবং মাইনিংয়ের ফলে মাটি আলগা হয়ে সহজেই  পলি আসে৷ ব্যবস্থাপনা না করতে পারায় এটা আসে৷ বাংলাদেশেও নগরায়ন এবং অন্যান্য কাজের ফলে পানি দ্রুত বঙ্গোপসাগরে নেমে যাওয়ায় একটা বাধা পড়ছে৷ দুটো দেশই অন্তঃনদী প্রবাহ, পানি ব্যবস্থাপনা- এখানে অনেক বেশি কাজ করতে হবে৷ পাশাপাশি পূর্বাভাসসহ অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোকেও শক্তিশালী করতে হবে৷ বাড়িঘর ব্যবস্থাপনা, আশ্রয়কেন্দ্র এগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে৷ বন্যাকে সার্বিকভাবে চিন্তা করতে হবে৷ ড্রেজিং করে বা বাঁধ নির্মাণ করে বন্যা সমস্যার সমাধান করা যাবে না৷

বেড়িবাঁধ কিন্তু বড় সাইক্লোনের জন্য ডিজাইন করা হয়নি

বন্যা ক্ষতিকর পর্যায়ে যে হয়, এটা ঠেকাতে আমরা কী করতে পারি?

বর্ষায় যে স্বাভাবিক বন্যা হয়, সেটা আমাদের দেশের জন্য জরুরি৷ কারণ, এখানে পলি নিয়ে আসে, গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ হয় এবং বর্ষায় আমাদের নদীগুলো প্রাণ ফিরে পায়৷ কিন্তু যখন অস্বাভাবিক পানি আসে, তখনই আমাদের সমস্যাটা হয়৷ সেক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার অনেকগুলো দিক আছে৷

আমাদের পানি নীতিতে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, যেমন ঢাকা সিটি, সিলেট সিটি, সেখানে আমরা প্রোটেক্ট করতে পারি৷ কিন্তু অন্য জায়গায় বাঁধ নির্মাণ করে-প্রটেক্ট করে আমরা আসলে বন্যার ব্যবস্থাপনা করবো না৷ আমরা নদীগুলোকে স্বাভাবিকভাবে তার প্রবাহে যেতে দেবো৷ সেক্ষেত্রে আমরা যদি দেখি, নদী ভরাট হয়ে গেছে, তাহলে আমরা ড্রেজিং করবো৷ কৃষির এই ক্ষতি সব সময় হয় না৷ এ ধরনের বন্যার রিকারেন্ট পিরিয়ড সাধারণত ২০ বছর থাকে৷ সেক্ষেত্রে আমরা অন্যান্য যে মেথড আছে, যেমন, সাবসিডি দেয়া, ক্রোপ ইনসুরেন্স করা- সেগুলো আমরা করবো৷ এখানে কনসেপ্ট হচ্ছে, ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট, নট কনট্র্রোল, যেটা আমরা নেদারল্যান্ডসে দেখি৷ কিন্তু আমাদের বন্যা ভিন্ন৷ শহরের নদী-নালা কাজ না করলে নগরবন্যা হয়, সেটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে৷ পাশাপাশি সেডিমেন্ট নিয়েও কাজ করতে হবে৷

উত্তরাঞ্চলের একজন বললেন, তাদের সেখানে এখন প্রতি বছর বন্যা হয়৷ এটার কারণ কী?

এখন তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা বেসিনে প্রতিবছর অস্বাভাবিক বন্যা হচ্ছে৷ এর অনেকগুলো কারণ আছে৷ আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি আসে৷ এই পানি যেখান থেকে আসে, সেখানে আমাদের চেয়ে বড় বন্যা হয়৷ কিছুদিন আগে আসামে রেড অ্যালার্ট জারি হয়৷ এটার কারণ নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, নদীর চারদিকে যে জলাধার থাকে, সেখানে আমরা পানি যেতে দিচ্ছি না৷ বন্যা প্রবাহ এলাকায় আমরা বাঁধ দিয়ে পানি যেতে দিচ্ছি না৷ফ্লাড প্ল্যানে নগর গড়েছি, কৃষিক্ষেত্রে পরিণত করেছি, যার ফলে সার্বিকভাবে নদীস্বাস্থ্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে৷ এখন একটু বৃষ্টি হলেই দুইতীর প্রবাহিত হচ্ছে৷ নদী ব্যবস্থাপনায় সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে৷ ভবিষ্যতে বন্যা ব্যবস্থাপনা আরো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে৷

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ে বৃষ্টি দেখছি৷ এসব কারণে এ ধরনের ঘটনা হয়ত আমরা প্রতিনিয়তই দেখবো৷

বুড়িগঙ্গার পর ধলেশ্বরী দূষণ হচ্ছে, চট্টগ্রামে পিলার সেতু করার কারণে কর্ণফুলী ভরাট হচ্ছে, সম্পতি বলা হয়েছে, হাওড়ে আর রাস্তা করা যাবে না৷ কারণ তাতে পানি প্রবাহ বিঘ্নিত হয়৷ আমরা কেন প্রকল্প নেয়ার আগে বুঝতে পারি না৷ ক্ষতি হওয়ার পর বুঝতে পারি কেন? আমাদের সীমাবদ্ধতাটা এখানে কোথায়?

একটা হচ্ছে নদী দূষণ, যেটা আমরা ঢাকা আশেপাশে চার নদীতে দেখছি, কর্ণফুলীতে দেখছি, এমনকি পদ্মা নদীতেও দেখছি৷ নদী দূষণের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবশ্যই দূষণ কমাতে হবে৷ ইটিপি স্থাপন করতে হবে৷ ট্যানারি সরিয়েছি, কিন্তু ডায়িং এবং অন্যান্য শিল্প কিন্তু প্রতিনিয়ত ঢাকা এবং বড় বড় শহরের পাশের নদীগুলোকে দূষণ করছে৷ এর ফলেও সেখানে তলদেশ ভরাট হচ্ছে৷

অবকাঠামোর ক্ষেত্রে আরেকটা যেটা বললেন যে, আমরা কেন পরিকল্পনাটা আগেই করিনি, সেটা আমাদের ব্যর্থতা৷ অনেক ক্ষেত্রে সম্পদের ব্যর্থতাও ছিল৷ যেমন, দুইশ' মিটারের একটা ঝুলন্ত সেতু আর ত্রিশ মিটার স্প্যানের পিলার বেইজড সেতু, সেখানে কিন্তু বাজেটেও হেরফের হয়৷ কিছুদিন আগে বড় বাজেটের যে লেবুখালি ব্রিজ করেছি, সেখানেও কিন্তু আমরা বৈদেশিক সাহায্য বা ডোনেশন নিয়ে করেছি৷ আমাদের এখানে একটা টেকনিক্যাল ডিজাইনেরও একটা ডিফিকাল্ডিজ আছে৷ আমাদের রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ ডিপার্টমেন্ট কিংবা এলজিইডি তারা পছন্দ করে বা তাদের টেকনিক্যাল নো-হাও এতদিন ৫০ মিটার ছিল, এখন হয়ত তারা আরেকটু ইনক্রিজ করেছে৷ সেই জায়গায় আমাদের পরিকল্পনা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা এক সময় ছিল, যেটা এখন আমরা উপলব্ধি করছি যে, আমরা নেভিগেশন বা নদীর স্বাস্থ্যে আমরা ব্যাঘাত করেছি৷

আমরা হাওরে যে রাস্তাঘাট করেছি, সেখানে নিজ থেকে পানি চলে যাওয়ার ব্যবস্থাপনা করিনি৷ এখন সরকার বলছে, সেখানে বড় রাস্তাঘাটগুলো এলিভেটেড হবে৷ আশা করি, যে ভুলগুলো আমরা করেছি, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো করতে পারবো৷

যে কোনো প্রকল্পের পরিবেশগত দিক খতিয়ে দেখার নিয়ম আছে৷ এখানে কি আমাদের কোনো পদ্ধতিগত গলদ আছে? নাকি এটা অন্য কোনো কারণ?

কিছু কিছু জায়গায় ছোট স্প্যানের ব্রিজ করলে নৌচলাচলে বা নদীর তলদেশ ভরাটে সাহায্য করে৷ সেই ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল, যেটা বললাম, অনেক সময় আমাদের  বড় স্প্যানের সেতু করার ক্ষেত্রে আগে আমাদের অর্থনৈতিক বা কারিগরি সক্ষমতা ছিল না৷ এই জন্য সেখানে যে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন অ্যাসেসমেন্ট হয়েছে, সেটা আমাদের সক্ষমতা বা দক্ষতা চিন্তা করেই করেছে৷ এখন আমরা ১০০মিটার বা এর চেয়ে বড় স্প্যানের ব্রিজ করছি৷

যমুনা ব্রিজের সময়ও দৈর্য্য আমরা কমিয়ে এনেছি৷ পদ্মা ব্রিজের সময় সেটা করা যাবে না বলে প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছিলেন৷ এখানে অর্থনৈতিক এবং কারিগরি দিকের বাইরে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার একটা সীমাবদ্ধতা ছিল, যেটা এখন আমরা উপলব্ধি করছি, এটা পরিবেশগত প্রভাব পড়ছে, নদীর স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ছে, বিভিন্ন ধরনের নদী অনেক সময় মরে যাচ্ছে, বন্যা তৈরি করছে, সেডিমেন্টেশন হচ্ছে, নদীর তীর ভাঙছে৷ যথাযথভাবে অবকাঠামো ডিজাইন না করলে এটা হতে পারে৷

লক্ষ্মীপুরে আমরা দেখেছিলাম অনেক উঁচু উঁচু বেড়িবাঁধ৷ খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলে গিয়ে দেখি তারা যেটাকে বেড়িবাঁধ বলছে আসলে সেটা সাধারণ রাস্তার মতোই৷ আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে? কী রকম বেড়িবাঁধ আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে দরকার?

বেড়িবাঁধগুলো তৈরি হয়েছিল সারাবছর ঝড়, টাইডাল ফ্লাড, ছোট সাইক্লোন ইত্যাদি থেকে রক্ষার জন্য৷ সিডর বা বড় সাইক্লোনের জন্য বেড়িবাঁধ ডিজাইন করা হয়নি৷ মানুষের মধ্যে এটা নিয়ে ভুল ধারণা আছে৷ বড় সাইক্লোন থেকে রক্ষার বিষয়টা কিন্তু ডিজাইনে নেই৷ বড় সাইক্লোন হলে সাইক্লোন শেল্টারে গিয়ে রক্ষা পেতে হবে৷

সমস্যা হচ্ছে, এই বাঁধগুলো ৬০ বা ৭০ দশকে তৈরি হয়েছে৷ এর মাঝে বিভিন্ন রকম সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছে, নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে, অবৈধভাবে লোনা পানি এনে চিংড়ি চাষ করা হয়েছে৷ যার ফলে এই বাঁধগুলি অনেকটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে৷ বাংলাদেশের জলবায়ুসংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের এখনই একটা এডাপটেশন ফান্ড দিতে হবে৷ কারণ, এখনই উদ্যোগ না নিলে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা আমরা অর্জন করতে পারবো না৷ বিশ্বের উন্নত দেশগুলি প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল৷

কিন্তু আমরা দেখছি, অ্যাডাপটেশন ফান্ড এখনো সেভাবে রিলিজ হয়নি৷ আমাদের দেশে বন্যা-সাইক্লোন যেগুলো বারবার সংঘটিত হচ্ছে, সেখানে আমাদের যে ভর্তুকি বা অ্যাডাপটেশনের জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য বৈদেশিক সাহায্য আমরা ঠিকভাবে পাচ্ছি না৷ সরকার তার নিজস্ব অর্থায়নে করছে, সেখানে অনেক সীমাবদ্ধতা এবং চ্যালেঞ্জ আছে৷

এখানে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫,৭০০ কিলোমিটারের মতো বেড়িবাঁধ আছে৷ এগুলো সংস্কারে অনেক বেশি সক্ষমতা লাগবে৷ বহুমাত্রিক উদ্দেশ্যে বেড়িবাঁধগুলোকে ডিজাইন করার জন্য পরিকল্পনা করে এগোলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ অনেকটাই ‘রেজিলিয়েন্ট' হবে৷ সেক্ষেত্রে যে সমস্ত দেশের কারণে আমরা বিপদাপন্ন, সেই দেশগুলার আমাদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনেক বেশি সহায়তা করতে হবে৷ শুধু ফান্ড না, প্রযুক্তিসহ নানা ক্ষেত্রে৷ কিন্তু প্রযুক্তিগত সহযোগিতাটাও আমরা সেভাবে পাই না৷

পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে পরিকল্পনার শুরু থেকেই মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং বাস্তবায়নেও তাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে৷ এখন হাওর এলাকায় স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা হয়৷ উপকূলীয় অঞ্চলের কমিউনিটিকেও একইভাবে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করতে হবে৷ মনিটরিংয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম৷ বৃষ্টির পানিতে বাঁধ ভেঙে গেলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও বাঁধগুলো টেকসই থাকে৷

এখন বড় ঝড় তো প্রতিবছরই আসছে৷ এখন কি বাঁধ বড় ঘূর্ণিঝড় মাথায় রেখে নির্মাণ করবো, নাকি টাইডাল ফ্লাডকে মাথায় রেখে নির্মাণ করবো?

এখন বাঁধ বড় করে নির্মাণ করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হবে না৷ একটা উদাহরণ দিচ্ছি, ভোলা সাইক্লোনে ১০ মিটার স্টর্ম সার্জ হয়েছিল৷ এখন ১০ মিটার করে ১:৩ স্লোব দিতে বিশাল আর্থিক খরচ প্রয়োজন হবে৷ এরকম দুর্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ৫,৭০০ কিমি উপকূলীয় পোল্ডারকে ঐ ৩৫-৪০ ফুট উচ্চতায় করতে হলে জিডিপি'র একটা বিরাট অংশ এখানে ব্যয় হবে, যা করা যাবে না৷ আমাদের ২৫ থেকে ৫০ বছরের বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রে শেল্টারেই আশ্রয় নিতে হবে৷ অপরদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে৷ গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন, মেরু অঞ্চল, অ্যান্টার্কর্টিকা এবং গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলছে- এসবের প্রভাবে আগামীতে ১০০ বছরে ১ মিটারের মতো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যেতে পারে৷ ঐ চিন্তা করে ডিজাইন ভাবনায় এনে বাঁধগুলোকে সাড়ে তিন ফিটের মতো অধিক উঁচু করে নির্মাণ করতে হচ্ছে৷ তার মানে এই নয় যে, আমরা পোল্ডারগুলো ১০০ বছরের রিটার্ন পিরিয়ডে স্টর্ম সার্জের উপযুক্ত করে নির্মাণ করবো৷ তাহলে সেটা টেকনিক্যাল টার্ম অনুযায়ী ‘ওভার ডিজাইন' হয়ে যাবে৷ পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রাখার পাশাপাশি বন্যা বা সাইক্লোনের কথাও মাথায় রাখতে হবে৷

বিশ্বমানের এই ব্যবস্থাপনা যদি নিশ্চিত করতে হয় সবক্ষেত্রে, তাহলে করণীয় কী? আমরা  কি তা করতে পারছি?

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সারা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন একটি রোল মডেল৷ সাম্প্রতিক কিছু সাইক্লোনে বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশের হিউম্যান ফ্যাটালিটি'র হার তুলনা করলে দেখা যায়৷ কিন্তু জীবন রক্ষায় আমরা যতটা সফল হয়েছি, অন্যান্য ক্ষেত্রে সেভাবে সফলতা দেখাতে পারছি না৷ এর কারণ হচ্ছে, আমাদের প্রাকৃতিক এবং জিও মরফোলজিক্যাল কন্ডিশন৷ যেমন, আমাদের দেশে প্রায় ৬০০০ কিলোমিটারের মতো বাঁধ আছে যা মাটির তৈরি৷ আমরা চাইলে এখানে এখন এটা কংক্রিট দিয়ে করতে পারছি না৷ এখানে ডেল্টা উপকূলীয় অঞ্চলে নদীগুলো জালের মতো৷ ফলে শক্ত-উঁচু বাঁধ কংক্রিট দিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে না৷ এতে জীববৈচিত্রতেও মারাত্মক প্রভাব পড়বে৷ আমরা যদি ইকো-ফ্রেন্ডলি প্রাকৃতিক ডিজাইন না করি, সেক্ষেত্রে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে ইকোলজিক্যাল ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে৷ আমাদের ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে, প্রাকৃতিক সমাধান নিয়ে আসতে হবে৷ বনায়ন ইত্যাদি করতে হবে৷ বাঁধগুলোকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে৷ পানি সংরক্ষণ, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বন কাটা, জলাধারগুলোকে কৃষিজমিতে পরিণত করা, যত্রতত্র খাল-বিল, নদী-নালা ভরে ফেলা- ইত্যাদি যাবে না৷ এগুলো বন্যা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলে৷ বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর প্রতিশ্রুত অনুদান যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে৷ কিন্তু এখনো বাংলাদেশ সেইভাবে সহযোগিতা পায়নি৷ নিজের অর্থায়নে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে লোন নিয়ে বাংলাদেশ এগুলো করছে৷

কৃষিক্ষেত্রে এখনো ইনস্যুরেন্স বা ঝুঁকি মোকাবেলার পরিকল্পনা করতে পারিনি৷ আমাদের পূর্ব সতর্কতা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে৷ এবং দুই দেশের মধ্যে আন্তঃবেসিন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে হবে এবং তথ্য-উপাত্ত আদান প্রদানে কাজ করতে হবে৷ বেসিনভিত্তিক চিন্তা করতে হবে৷ নদী-স্বাস্থ্য রক্ষায় সমস্ত বেসিনের দেশগুলোকে একসাথে বেসিনভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার দিকে আগাতে হবে, না হলে নদীর একটি অংশ নিয়ে উন্নয়ন করলে দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাবো না৷ আশেপাশের সবগুলি দেশই উন্নয়নশীল দেশ৷ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে৷ বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জও রয়েছে৷ এজন্য প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে৷ সার্বিকভাবে আগামীর যে চ্যালেঞ্জ, ২০৪০ সালের উন্নত বিশ্বের দিকে যেতে এই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন দ্রুত গতিতে করতে হবে, তা না হলে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো না৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়