প্রহসনের মুখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার | আলাপ | DW | 13.05.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

প্রহসনের মুখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার

গণঅধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে চারটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল৷

সেগুলো হলো প্রস্তাবিত বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন ২০১৬, প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৬, বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন ২০১৬ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ অপরাধ আইন ২০১৬৷ সেই সময়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ণ প্রক্রিয়া নিয়ে  নাগরিকদের একটি অংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিলেন৷ নাগরিকদের যথার্থ ও প্রয়োজনীয় অংশগ্রহণবিহীন সরকার কি কোনো আইন প্রণয়ণ করতে পারে কি? যদি করে থাকে তবে সেই আইন কি বৈধ? যদিও নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া আইন প্রণয়ণের প্রক্রিয়া আজও বিদ্যমান এবং প্রশ্নবিদ্ধ৷ পরবর্তীতে ২০১৬ সালে বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন এবং ২০১৮ সালে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয়, প্রস্তাবিত অপর দু'টি আইন (বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ অপরাধ আইন) সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের বাধার মুখে প্রণয়ণ করা সম্ভব হয়নি৷ যদিও বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ প্রণয়নে নাগরিকদের অংশগ্রহণ, প্রস্তাবিত আইন পর্যালোচনায় পর্যাপ্ত সময় ও সমতার সুযোগের পরিছন্নতা, এবং নাগরিকদের নিকট দায়বদ্ধতা ছিল শূন্য থেকে মহাশূন্যময়; যার নেতিবাচক ফল সরাসরিভাবে মানবাধিকার সংগঠনসমূহ এবং নাগরিকেরা ভোগ করেছেন, করছেন এবং সামনের দিনগুলোতে আরও করবেন বলে নাগরিকেরা মনে করেন৷ কারণ অবৈধ এবং নিপীড়নমূলক আইনসমূহ কার্যত রাষ্ট্র, শাসকশ্রেণি, ক্ষমতাধর, ও বিত্তবানদের স্বার্থই রক্ষা করে৷

ঠিক একই প্রক্রিয়ায়, ২০২১ এবং ২০২২ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনসমূহ, নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে সংবিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ রেখেই তিনটি নতুন আইন, প্রবিধান ও নীতিমালা প্রস্তাব করেছে৷ প্রস্তাবিত এই আইন, প্রবিধান ও নীতিমালা তিনটি হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রস্তুতকৃত প্রস্তাবিত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২২; বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রস্তুতকৃত প্রস্তাবিত ‘রেগুলেশন ফর ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড ওটিটি প্ল্যাটফরমস’ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘ওভার দ্য টপ’ (ওটিটি) কনটেন্টভিত্তিক পরিষেবা প্রদান ও পরিচালনা নীতিমালা, ২০২১৷

১৮ জানুয়ারি ২০২১, আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ কর্তৃক হাইকোর্ট বিভাগে আবেদনের প্রেক্ষিতে, বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ওটিটি থেকে অশ্লীলতা রোধ, রাজস্ব আদায় এবং এসব প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণে খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের আদেশ দেন৷ সেই প্রেক্ষাপটে, ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃক ইংরেজিতে প্রস্তুতকৃত রেগুলেশন ফর ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড ওটিটি প্ল্যাটফরমস’ খসড়া ইংরেজিতে প্রস্তুত করে কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে৷ খসড়া এ নীতিমালার ওপর নাগরিকদের পর্যবেক্ষণ, মতামত ও সুপারিশ বিগত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখের মধ্যে প্রেরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়৷ দুই সপ্তাহের মধ্যে কতজন নাগরিক এবং নাগরিক সংগঠনসমূহ এই রেগুলেশন সম্পর্কে জেনেছিলেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণ, মতামত ও সুপারিশ বিটিআরসি এর নির্দিষ্ট ইমেইলে পাঠিয়েছিলেন তা নাগরিকদের জানা প্রায় অসম্ভব৷ বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ীও রেগুলেশনটির প্রস্তুত প্রক্রিয়া অবৈধ, এবং বেআইনি৷ কেননা, বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭-এর ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে: ‘‘বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে৷’’ এবং ৩(২)-এ বলা হয়েছে: ‘‘উল্লিখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহা হইলে উহা বে-আইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে৷ সুতরাং, বিটিআরসি কর্তৃক ইংরেজিতে প্রস্তুতকৃত রেগুলেশনটি যদি বর্তমান অবস্থায় কার্যকর হয় তবে তা বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭ অনুযায়ী বে-আইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে৷’’

বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান ইতিমধ্যেই ১৪২ অনুচ্ছেদে জরুরি অবস্থা ঘোষণায় মৌলিক অধিকার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কি ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে তা বর্ণনা করেছে, কিন্ত, প্রস্তাবিত রেগুলেশনটির ধারা ১১ বাংলাদেশে জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য অবরুদ্ধ করার বিধান করেছে৷ অর্থাৎ, বিটিআরসি দ্বারা প্রদত্ত বিধান বিষয়টি আরও জোরালো করেছে৷ ধারা ১১ এর উপধারা ২ ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থার মহাপরিচালকের হাতে বিস্তৃত ক্ষমতাও প্রদান করে৷ একইভাবে মহাপরিচালককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং প্রস্তাবিত ডেটা সুরক্ষা আইনের অধীনেও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে৷ একজন ব্যক্তি তিনটি ভিন্ন আইনের অধীনে ক্ষমতা লাভ করলে এই ধরনের ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের জন্য ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়৷ রেগুলেশনেটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা ২১ এর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণার দণ্ড; ধারা ২৭ এর সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটনের অপরাধ ও দণ্ড, এবং ধারা ২৮ এর ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার সংক্রান্ত বিষয়ের মত অনুরূপ বিধান রয়েছে৷ এই বিতর্কিত অংশগুলির ব্যাখ্যার জন্য অস্পষ্টতার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে৷ পুনরাবৃত্তি দ্বিগুণ বিপদের কারণ হতে পারে৷ প্রবিধানে অফিসিয়াল তথ্য, পাবলিক তথ্য, ব্যক্তিগত তথ্য, সরকারি গোপনীয়তার লঙ্ঘন, বিভ্রান্তিমূলক, ভুল তথ্য এবং ফেইক-সংবাদের কোনও সংজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা নেই৷ তথ্যচিত্র এবং পডকাস্টের মতো বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিঘ্ন ঘটানোর অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়৷ ভিডিও আকারে শেয়ার করা যেকোনো কিছুই এই প্রবিধানের এখতিয়ারের মধ্যে আসে৷

অন্যদিকে, প্রস্তাবিত রেগুলেশনটি বিটিআরসি মত একটি নির্বাহী কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রদত্ত লাইসেন্সের সাপেক্ষে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের মাধ্যমে নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করতে পারবে৷ কেননা ধারা ২(১) ‘মধ্যস্থতাকারী’ সংজ্ঞায়িত করে, যা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে৷ এই রেগুলেশনটির সাংবিধানিকতা বিতর্কিত৷ কেননা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৮ তথ্য-উপাত্ত প্রাপ্তির ব্যবস্থা করার কারণে যেকোনো নাগরিকের সেবা প্রদানকারী মাধ্যমকে তাদের দায়ভার থেকে অব্যাহতি দেয়৷ কিন্তু প্রস্তাবিত রেগুলেশনটি ধারা ৬ এবং ৭ এ সেবা প্রদানকারী বা মধ্যস্থতাকারীদের উপর কঠোর দায়িত্ব আরোপ করে৷ একদিকে, এই ধরনের বিধানগুলি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এর সাথে সাংঘর্ষিক, অন্যদিকে, ইউরোপ বা আমেরিকান দেশগুলোর আদালতসমূহ  সেবা প্রদানকারী বা মধ্যস্থতাকারীদের উপর তাদের দায় দায়িত্ব, অধিকার ও সুবিধাদির স্পষ্ট মাত্রা নির্মাণ করেছে ফলে এই দায়িত্বশীলতা পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে মত প্রকাশ ও ইন্টারনেটের স্বাধীনতা মত গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকারের মাত্রাকে সমুন্নত রাখতে সহায়তা করেছে৷

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ওভার দ্য টপ (ওটিটি) কনটেন্টভিত্তিক পরিষেবা প্রদান ও পরিচালনা নীতিমালা, ২০২১ এর প্রস্তাবনায় কতগুলো বিষয় বিবেচনা করে ওটিটি (ওভার দ্যা টপ) কনটেন্টভিত্তিক পরিষেবা প্রদান ও পরিচালনা, এবং বিজ্ঞাপন প্রদর্শন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে৷ প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে ‘‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের সুবিধার্থে ওটিটি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করিবার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করিতে সরকার বদ্ধ পরিকর৷’’ নাগরিকের দিক থেকে আনন্দের কথা হলো চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের সুবিধার্থে রাষ্ট্র নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পর বিগত তিনবছর চার মাসে কমপক্ষে ২০০ জন সাংবাদিক চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা চর্চা করার কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা-জেল-জুলুমের ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন৷ মামলা-হামলা করা হয়েছে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক- শিক্ষার্থী,  প্রাপ্ত-অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে৷ ভুক্তভোগীসহ পরিবারের সদস্যদের জীবিকা নির্বাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, ক্ষুণ্ণ ও ভূলুণ্ঠিত হয়েছে মানবিক, সামাজিক মর্যাদা ও অবাধ স্বাধীনতা৷ ভুক্তভোগীদের পক্ষে আইনজীবীবৃন্দকর্তৃক মামলাগুলো পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সরকারের নিপীড়নমূলক কার্যক্রম এবং নাগরিক আন্দোলনের গতানুগতিক  চিত্র পাওয়া যায়৷ মামলাসমূহের বিচার প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, নাগরিক সংগঠনের পরিসংখ্যান বলে এখন পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলারও বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে নিষ্পত্তি হয়নি৷ বরং প্রচারমাধ্যমে খবর এসেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলার অভিযুক্ত নারীকে ফাঁদে ফেলে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক উপ-কমিশনারের (ডিসি) বিরুদ্ধে এবং বাসায় ডেকে নিয়ে গিয়ে ডিসির স্ত্রী তাকে বেদম প্রহার করেন৷ তাহলে স্বভাবত প্রশ্ন আসে, চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে কর্মরত নাগরিক সংগঠনসমূহ এবং মানবাধিকার কর্মীবৃন্দ কী  তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সংক্রান্ত মামলাসমূহের তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে পর্যাপ্ত, প্রয়োজনীয় এবং যথেষ্ট পরিমাণে সোচ্চার?

এছাড়াও, প্রস্তাবিত নীতিমালাটিতে বলা হয়েছে- ‘‘দেশি বিদেশি মালিকানায় পরিচালিত ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত কনটেন্টভিত্তিক পরিষেবা ও বিজ্ঞাপনে যাহাতে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পরিপন্থি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও অখণ্ডতার প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী তথা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের পরিপন্থি কোনো কনটেন্ট প্রচারিত না হয় তা নিশ্চিত করা এবং দেশীয় সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব৷’’ আইন করেছে রাষ্ট্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষা দেবার দায়িত্বও নীতিমালার মধ্য দিয়ে নিতে চাইছে রাষ্ট্র; কিন্তু খসড়া প্রণয়ন করছেন মূলত সরকারি কর্মকর্তারা৷ কিন্তু নাগরিকদের সাথে পর্যাপ্ত এবং যথার্থ প্রক্রিয়ায় আলাপ আলোচনা হয়েছে কী? যদি না হয়ে থাকে তবে সরকার কিংবা রাষ্ট্র দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে  মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, দেশীয় সংস্কৃতি, ও সামাজিক মূল্যবোধ কেমন করে কিংবা কোন নিক্তি দিয়ে নির্ণয় করবে? আইন- আদালত নীতিমালা দিয়ে বিশ্বের কোন রাষ্ট্রে আদর্শ, সংস্কৃতি, ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা করা গিয়েছে কি? প্রস্তাবিত নীতিমালায় কতগুলো সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে, এবং সংজ্ঞায়নের অস্পষ্টতা ও অপ্রতুলতা খুবই লক্ষণীয়৷ ধারা ২.১ বলছে ‘‘কনটেন্ট (Content) বা তথ্য উপকরণ অর্থ ওটিটি প্লাটফরমে ইন্টারনেট বা সমজাতীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া পরিবেশিত/সম্প্রচারিত/প্রদর্শিত যে কোন তথ্য বা অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন এবং অশ্লীল তথ্য উপকরণ ও উহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;’’ আবার ধারা ২.২ ‘‘অশ্লীল কনটেন্ট অর্থ প্রচলিত আইন ও এই নীতিমালা ও তার অধীনে প্রণীতব্য সংশ্লিষ্ট সকল নির্দেশিকার বহির্ভুত কনটেন্ট;’’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে সকল প্রচলিত আইন ও এই নীতিমালা ও তার অধীনে প্রণীতব্য সংশ্লিষ্ট সকল নির্দেশিকা কি অশ্লীল কনটেন্ট নির্ধারণ করেছে? প্রস্তাবিত নীতিমালা-২০২১ (খসড়া) প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ধারা ৩ বর্ণনা করেছে, কিন্তু অবাক বিষয়  ধারা ৩.৩ বলছে ‘বয়স ভিত্তিক উপকরণ (Content) নির্বাচনে ভোক্তাকে ক্ষমতায়িত করা’ কিন্ত বর্তমান সরকার বছর দুই আগ থেকে নির্বিচারে পর্নোগ্রাফি ও অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধন করেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য পর্নোগ্রাফি সাইট ব্যবহার করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি৷ সেপ্টেম্বর ০৬ ২০২১, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে ২২ হাজারের বেশি পর্নোগ্রাফি ও অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধ করা হয়েছে৷ এখন প্রশ্ন হলো এই নীতিমালা দ্বারা কি তবে প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফি সাইট দেখার সুযোগ করে দেওয়া হবে? নীতিমালা কি আইনের থেকে বড় হবে, এ যাবতকালের গৃহীত প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ তবে কি হবে?

একইসাথে, ধারা ৩.১ ও ৩.২ বলছে, সৃজনশীলতা লালন, সৃজনশীল শিল্পকর্ম তৈরিতে সহযোগিতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাসহ বাক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা;এবং ধারা ৩.২ বলছে ‘সৃজনশীল তথ্য উপকরণ (Content) নির্মাতা ও শিল্পীদের সৃজনশীল কাজের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’; নীতিমালার মাধ্যমে সৃজনশীল শিল্পকর্ম তৈরি কিংবা স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব? আবার ৩.৬ ধারায় বলছে ‘‘ওটিটি প্লাটফর্ম সেবাপ্রদানকারী, ওটিটি কনটেন্ট নির্মাতা ও দর্শকদের আইনি সুরক্ষা প্রদান করিয়া জাতীয় রাজস্ব আদায় কার্যক্রম সহজতর করা’’; আবার ধারা ৩.৭ বলছে ‘‘দেশীয় সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধকে রক্ষা করা’’? কিন্তু ওটিটি প্লাটফর্ম সেবাপ্রদানকারী, কনটেন্ট নির্মাতা ও দর্শকদের রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত নিবন্ধনমূলক ব্যবস্থা রেখে দেশীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ আদৌ সম্ভব এবং সম্ভব যদি হয় তবে কোন দেশে সম্ভব হচ্ছে?

অন্যদিকে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২২’ সম্পর্কে মতামত প্রদানের জন্য খসড়া আইনটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে এবং খসড়া আইনটি নিয়ে মতামত প্রদানের সময়সীমা ছিল ২৭ এপ্রিল ২০২২৷ একইভাবে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রস্তাবিত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২২ নিয়েও আছে নাগরিকদের শঙ্কা৷ প্রস্তাবিত আইনের সংজ্ঞায়নের দিকে যদি নজর দেওয়া হয় তবে দেখা যাবে অন্যান্য আইনের মতো সংজ্ঞায়নের অস্পষ্টতা ও অপ্রতুলতা খুবই লক্ষণীয়৷ প্রথমের যদি আমরা প্রস্তাবিত আইনের ধারা ২(৩) এর উপাও সংজ্ঞার দিকে লক্ষ্য রাখি তবে দেখতে পাবো যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর ধারা ২ (১০) এবং ডিজিটাল নিরাপওা আইনের ধারা ২৬ এর সাথে সমন্বয় করা হয় নাই এবং অন্যদিকে উপাত্ত চ্যুতির সংজ্ঞার দিকে যদি নজর রাখি তবে দেখা যাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং কর্মচারী দ্বারা যদি চ্যুতির ঘটনা ঘটে তবে সে বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব রয়েছে প্রস্তাবিত আইনটি৷ অন্যদিকে, প্রস্তাবিত আইনে ব্যক্তিগত তথ্য সংক্রান্ত ধারণার কোন প্রকার সংজ্ঞায়ন করা হয়নি৷

প্রস্তাবিত আইনের ৩৩ এবং ৩৪ ধারা অনুসারে, যে কোন তথ্য  নিয়ন্ত্রক বা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রমকে তথ্য সুরক্ষা আইনের বাধ্যবাধকতা থেকে নিষ্কৃতি দেয়াসহ আরও অধিকতর ছাড় দেবার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে৷ এই আইনের ৩৬(২) এর (ক)(২) ধারা অনুসারে তথ্য সুরক্ষা অফিস তাদের তথ্য নিয়ন্ত্রক কিংবা তথ্য প্রক্রিয়াকারী কিংবা প্রতিনিধিদের ওপর এই আইনের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় উপাত্ত সরবরাহের জন্য যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারেন কিংবা যে কোন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে৷ একইসাথে ৪২ ধারা অনুয়ায়ী সংবেদনশীল তথ্য, ব্যবহারকারীদের তৈরি তথ্য এবং গোপনীয় তথ্য বাংলাদেশের মধ্যে সংরক্ষণ করতে হবে, যা তথ্য স্থানীয়করণ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ কিন্তু জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা ২০১৮ এর ধারা ২(৯)(২) তথ্য স্থানীয়করণ সংক্রান্ত বিস্তারিত নীতিমালা রয়েছে, যার বাস্তবায়ন এই আইনে হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় নাই৷

রেজাউর রহমান লেনিন, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী

রেজাউর রহমান লেনিন, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী

একইসাথে, ধারা ২ (১৭) মহাপরিচালক বলতে কোন কর্তৃপক্ষ বোঝাবে তা বর্ণনা করেছে এবং বলেছে মহাপরিচালক বলতে বুঝাবে ডিজিটাল নিরাপওা আইনের গঠিত ডিজিটাল নিরাপওা এজেন্সির মহাপরিচালক, কিন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ মূলত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোগুলোকে বিভিন্ন ধরনের সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য তৈরি করা হলেও, কার্যত এর ভিন্ন উদ্দেশ্য দেখা যায়৷ নাগরিকদের ব্যক্তিগত সাইবার সুরক্ষা এর মূল লক্ষ্য নয়৷ বলা হয়েছে, এই সুরক্ষা প্রদানের কাজটি সম্পাদিত হবে একজন মহাপরিচালক ও দুজন পরিচালকের সমন্বয়ে গঠিত ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মাধ্যমে৷ এজেন্সি ডিজিটাল মাধ্যমে যেকোনো তথ্য অপসারণ করার নির্দেশ প্রদান করতে পারবে এবং যেকোনো কম্পিউটার সিস্টেমে পূর্বানুমতি ছাড়াই প্রবেশ করতে পারবে৷ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৮(১) ধারা অনুযায়ী, ‘মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো ব্লক করিবার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে,অতঃপর বিটিআরসি বলিয়া উল্লিখিত, অনুরোধ করিতে পারিবেন’ এবং ৮(২) ‘যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট প্রতীয়মান হয় যে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহা হইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার জন্য, মহাপরিচালকের মাধ্যমে বিটিআরসিকে অনুরোধ করিতে পারিবে৷' এই ক্ষেত্রে ৮(১) এবং ৮(২) ধারামতে, মহাপরিচালকের নিকট থেকে কোনো অনুরোধ এলে বিটিআরসি বিষয়টি সরকারকে অবহিত করে তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতে ব্লক করবে৷ এই ধারাটি বাংলাদেশের সাইবার পরিসরকে ব্লকিং, ফিল্টারিং, সেন্সরশিপের দিকে উদ্বুদ্ধ করবে, যা উদ্বেগজনক৷ সরকার কর্তৃক যেসব অভীষ্ট লক্ষ্য তুলে ধরা হয়, সেসব লক্ষ্যের প্রয়োজনে ব্লকিং ও ফিল্টারিং কতটা দরকারি সেটা পরিমাপ করাও কঠিন–এসব পদক্ষেপ ঘিরে স্বচ্ছতার অভাবের কারণে৷ এ পর্যন্ত সরকার যেসব ওয়েবসাইট ব্লক করেছে তার তালিকা এবং প্রতিটি ওয়েবসাইট ব্লক করে রাখার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে কী ন্যায্যতা আছে, তা প্রকাশে বিগত এবং বর্তমান সরকার ব্যর্থ হয়েছে৷ কোন বিষয়বস্তুটি ব্লক করে রাখা উচিত, তা নির্ধারণের কাজটি অবশ্যই কোনো বিচারিক কর্তৃপক্ষ বা যেকোনো রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক অথবা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাবের বাইরে থেকে স্বাধীন কোনো সংস্থাকে করতে হয়; কিন্তু এই আইনে সেরকম কোনো উল্লেখ নেই৷ প্রস্তাবিত তথ্য সুরক্ষা আইন  ২০২২ এর খসড়ার ৬৩ ধারা অনুসারে  সরকার জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা, জাতীয় নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে মহাপরিচালককে যে কোন আদেশ দিতে পারে যা প্রস্তাবিত খসড়াতে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি৷ এই আইনের ৬৩ ধারার অধীনে মহাপরিচালক কী ধরনের আদেশ দিতে পারেন তা প্রস্তাবিত খসড়ায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই৷

অন্যদিকে, ৬৬ ধারা তথ্য সুরক্ষা অফিসের মহাপরিচালক এবং কর্মচারীদের কিংবা নিয়ন্ত্রক বা প্রক্রিয়াকারী বা রিটেইনারকে ফৌজদারি এবং দেওয়ানি অপরাধের দায় থেকে দায়মুক্তি প্রদান করে যদি তারা সরল বিশ্বাসে কিছু করে৷ এই ধরনের বিধান সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী বিরুদ্ধে৷

সর্বশেষে বলা যায়, এই সকল প্রস্তাবিত নীতিমালা-আইনসমূহ হয়তো নাগরিকদের পরিপূর্ণ, প্রয়োজনীয়, যৌক্তিক এবং পরিছন্নতামূলক অংশগ্রহণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং হয়তো খুব শিগগিরই বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যাবে; নাগরিক এবং মানবাধিকার কর্মীরা এমনটাই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন৷ যদি তাই হয়ে থাকে তবে তিনটি প্রস্তাবিত নীতিমালা ও আইন বিদ্যমান হতাশাজনক মানবাধিকার এবং মৌলিক অধিকারসমূহ যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জীবন-জীবিকার অধিকার, সভা-সমাবেশ ও চলাফেরার অধিকার, ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং শৈল্পিক-বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতাসমূহ আরও সংকুচিত করবে

সংশ্লিষ্ট বিষয়