প্রশ্নবিদ্ধ আম্পায়ারিংয়ে দায়িত্বের যোগ-বিয়োগ | আলাপ | DW | 18.06.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

প্রশ্নবিদ্ধ আম্পায়ারিংয়ে দায়িত্বের যোগ-বিয়োগ

কেউ কেউ মনে করেন, সাকিব সঠিক কাজটিই করেছেন। তার লাথিটা আসলে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে চলতে থাকা যাবতীয় অন্যায়ের প্রতিবাদ।

কেউ কেউ মনে করেন, সাকিব লাথি মেরে খুব অন্যায় করেছেন, যা শাস্তি হয়েছে তার চেয়েও বেশি হওয়া উচিত ছিল। আর প্রতিবাদ-টতিবাদের কোনো ব্যাপারই এর মধ্যে নেই।

দুই মত যখন তখন তর্ক-বিতর্ক শুরু হবে। ফেসবুক যখন আছে তখন আর কেউই বসে থাকতে রাজি নয়। কিন্তু বাংলাদেশে বহু ব্যাপার যেমন দ্বিমুখী তর্কের আড়ালে হারিয়ে যায়, খুব সম্ভব এখানেও খুব ব্যতিক্রম হবে না

আমার বরং মাথায় অন্য প্রশ্ন আসে। কেন সাকিবের লাথির মাধ্যমেই আমাদের জানতে হবে যে, ঘরোয়া ক্রিকেট ঠিকমতো চলছে না। এটা এত চর্চিত আর ওপেন সিক্রেট যে না জানাটা একরকম দোষের। এর চেয়েও বড় প্রতিবাদ হয়েছে এবং সত্যি বললে সাকিবের প্রতিবাদটা তো আত্মঘাতী। ধরনের কারণে বরং তার অপরাধের দিকে বিষয়টা চলে যাওয়ার সুযোগ আছে এবং একভাবে দেখলে গেছেও। এর চেয়েও অনেক স্মার্ট প্রতিবাদ করেছিলেন দ্বিতীয় বিভাগের সুজন মাহমুদ, যিনি নির্লজ্জ আম্পায়ারিংয়ের প্রতিবাদে রাগ-ক্ষোভ দেখানোর বদলে ৪ বলে ৯২ রান দিয়ে প্রায় চিরকালীন নির্বাসনে চলে গেছেন। এর আগে-পরে আরো বিস্তর লেখা হয়েছে। লেখা বা বলা হতো আরো। কিন্তু সত্যি বললে, লেখার উপকরণ পাওয়া যায়নি। সুজন মাহমুদের ঐ ঘটনার পর আমাদের কারো কারো ধারণা হয়েছিল যে, এটাকে ঘিরে একটা মুভমেন্ট তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু হায়! বহু চেষ্টা করেও সাবেক বা বর্তমান তারকাদের অনেকের কোনো মন্তব্য বের করা যায়নি। পত্রিকা বা মিডিয়া লিখে, কিন্তু তাদের লেখার জন্য রসদ লাগে। প্রথম বিষয়টা আসে খবর হিসাবে। এরপর হয়ত বিশ্লেষণ। তারপর সংশ্লিষ্ট মানুষজনের বক্তব্য লাগে। সেখানেই আসে ধাক্কাটা। এর আগেও মিডিয়া ব্যর্থতার পরিচয় দেয় কোথাও কোথাও, কিন্তু পুরো বিষয়টা দূর থেকে বুঝলে ভুলই থেকে যাবে। মিডিয়া নিজে কিছু বানাতে পারে না। তার সহযোগিতা লাগে অংশীজনদের। এই ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এবারও যেমন মেলেনি। এই যে সাকিব কাণ্ডের পর এত প্রতিবাদ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সব দলই নাকি জানিয়েছে যে, এবার তেমন কোনো অনিয়ম তাদের চোখে পড়ছে না। কাজেই....।

কর্তাব্যক্তিরা যে বারবার পার পেয়ে যান তাতে তাদের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের দায়টাও ক্রিকেট খেলোয়াড় আর দলগুলোর মেনে নেয়ার সময় এলো।

সুজন মাহমুদের জীবন যে এরপর ঝঞ্চাবিক্ষুব্ধ হয়ে ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে গেল কেউ পাশে দাঁড়িয়েছিলেন! তার পক্ষে কোনো তারকার প্রকাশ্য বিবৃতি? না, অনেক ঘেঁটে এবং সেই সময় গভীরভাবে মাঠে থেকে জিনিসটা অনুসরণ করা রিপোর্টারদের কাছ থেকেও পেলাম না। বরং আগে-পরে অভিযোগ যখন ওঠে তখন সাকিবসহ অন্য তারকারা সেই সব দলে খেলেছেন। আম্পায়ারিং, পছন্দের মাঠ এসব সুবিধা পেয়েছেন। কেউ আপত্তি করেননি। এবারও ধরা যাক, আবাহনী সুবিধা পাচ্ছে। সেখানেও প্রতিষ্ঠিত তারকারা আছেন। কই, কোনো আওয়াজ শুনেছেন? যতদূর জানি, ঘটনার পর বোর্ড সভাপতি প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারদের সবার সঙ্গে কথা বলেছেন। অনেকেই নাকি জানিয়েছেন, সব ঠিক আছে। বরং মিডিয়া বা মানুষ একটু বাড়াবাড়ি করছে। দু-একজন যা আপত্তি করেছেন, তারাও নাকি বলেছেন অন্যবার এসব অনেক বেশি হতো। এবার অনেক কম হচ্ছে।

কম হচ্ছে কিনা জানি না, কিন্তু এটা জানি গত কয়েক বছর ধরেই আবাহনী বা ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নানারকম সুবিধা পাচ্ছে। এই আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে কেন, তুলনামূলক অভিজ্ঞ আম্পায়ারদের দায়িত্ব দেয়া হলো না! বোর্ডের রাজনীতি-নির্বাচনে ভোটের হিসাব মিলিয়ে পছন্দের ক্লাবগুলোকে হাতে রাখতে আম্পায়ার-সূচি-মাঠ দিয়ে ম্যানেজ করার ঘটনা ঘটে।

দুঃখ করে বছর দুয়েক আগে একটা কলামও লিখেছিলাম ‘হায় আবাহনী' শিরোনামে। লিখেছিলাম, যে আবাহনী লড়াই করে তৈরি হয়েছে, নিজেরাই বরং নানা অন্যায়ের শিকার হয়ে মানুষের মনে ঢুকেছে, সেই আবাহনী আজ অন্যায়কারী হিসাবে কাঠগড়ায়। এবারও দেখছি আবাহনীকে নিয়ে কত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। না, আবাহনীর মোহামেডানকে হারানো বা শিরোপা জেতার জন্য যদি আম্পায়ার বা অন্যায় লাগে, তাহলে সেই শিরোপার দরকার আবাহনীর নেই। আমরা আবাহনীকে সেভাবেই ভালোবেসেছিলাম। আবাহনী জিতবে না জেনেও কৈশোরে গলা ফাটাতাম আর ভাবতাম কোনোদিন দিন বদলালে, এই অন্যায়ের শিকার আর হতে হবে না। স্বপ্নেও ভাবিনি, আবাহনীই বরং...।

আসলে পুরো দেশের সমাজ কাঠামো থেকে খেলা তো আর আলাদা না। একমুখী ক্ষমতার চর্চা এখানেও। আরো অদ্ভুত ব্যাপার, দেশের মতো এখানেও কর্তাকে খুশি রাখতে সঙ্গীরা এমন সব অন্যায় করেন, যেগুলো শেষপর্যন্ত যে কর্তাব্যক্তিকেই ডোবায়, সেটা বোঝেন না। কৈফিয়ত কিন্তু নাজমুল হাসানকে দিতে হয়৷ দায়ও কিন্তু তাকেই নিতে হয়।

কিন্তু এসবও নয়, পুরো ঘটনাপ্রবাহে আরেকটা বিষয় আমার মনে হয় আমরা মিস করে যাচ্ছি। এই যে ঘরোয়া ক্রিকেট, সেটা নিয়ে আমাদের তেমন কোনো আগ্রহই নেই। আগ্রহটা হলো সাকিব লাথি মারায়। তারও আগের খানিক আগ্রহ সাকিব-তামিম-মুশফিকরা খেলায়। কেউ কেউ এর মধ্যে আবাহনী-মোহামেডানের উত্তেজনা দেখেছেন। সেই সোনাঝরা বা অগ্নিগর্ভা লড়াইয়ের আবহ নাকি। এখানেও বিরাট অঙ্কের ভুল। যদি সত্যিই আবাহনী-মোহামেডানের সেই দিন হতো, তাহলে সমর্থকরা ভাগ হতেন অন্যভাবে। আবাহনীর লোকজন বলতো সাকিব ভুল, মোহামেডান বলতো সাকিব ঠিক, দু-একজন ব্যতিক্রম বাদে। কিন্তু এখানে বিভাজনের লাইনটা আবাহনী-মোহামেডানকেন্দ্রিক নয় মোটেও, একেবারে পাঁড় মোহামেডান সমর্থককে দেখেছি সাকিবের সমালোচনা করতে, যখন এককালের অন্ধ আবাহনী সমর্থক বলছেন, সাকিবের লাথিটা একেবারে জায়গামতো পড়েছে। মোটের উপর আবাহনী-মোহামেডান, দেশের ক্রিকেট এগুলো বরং গৌণ। ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে গেছে তারকা। তারকাপ্রীতি। তাই সুজন মাহমুদ প্রতিবাদ করলে বেখেয়ালে উপেক্ষা করি, সাকিব লাথি মারলে সাড়ম্বরে উদযাপন করি। গত কয়েক বছর ধরেই খেয়াল করছি অতি তারকামুখীতা দলবোধটাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। আবার একভাবে তারকাদেরও আসলে পেছনের দিকেই ঠেলছে। মানে দাঁড়ায় এরকম যে, তারকাদেরই সব দায়িত্ব। সাকিবকে লাথি মেরে ঘরোয়া ক্রিকেট টিকিয়ে রাখতে হবে। অধিকারের আন্দোলনেও তাদেরকে নেতৃত্ব দিতে হবে। তারা কিছু না করলে কিছুই ঠিক হবে না। এবং কে জানে, এজন্যই কিনা বোর্ড তারকাদের আলাদা চোখে দেখে। ওদের দেখভাল এত বেশি করে যে, এভাবেও আবার অন্য ক্রিকেটাররা দ্বিতীয় সারিতে চলে যান। সব মিলিয়ে এই ঘটনায় তারকাপ্রীতি এবং তারকাভীতি নিয়েও ভাবার আছে নতুন করে।

তাহলে ঘরোয়া ক্রিকেটের সমাধান! এভাবেই চলবে? খেলোয়াড়রা তো তদন্ত কমিটি বা বোর্ডকে বলেছেন সব ঠিকই আছে। সেই খেলোয়াড় বা কর্তারা যারা কিন্তু অফ দ্য রেকর্ড ফাটিয়ে ফেলেন। ঐ যে বললাম, দায় সবাইকেই নিতে হবে। ও, হ্যাঁ, মুল দায় অবশ্যই কর্তৃপক্ষের, কিন্তু তাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর যে সম্মিলিত শক্তি দরকার, সেটারই চর্চা নেই দেশের ক্রিকেটে। পত্রিকার লেখা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় তদন্ত কমিটি হবে, তদন্ত কমিটি বাংলাদেশে লোক দেখানো সবসময়ই। কিন্তু তদন্ত কমিটি যে লোক দেখানো সেটা প্রমাণেরও দায়িত্ব আছে। সেটা কীভাবে প্রমাণ করা যাবে, যদি সবাই গিয়ে বলে, সব ঠিক আছে।

সাংবাদিক মোস্তফা মামুন

সাংবাদিক মোস্তফা মামুন

শেষে আম্পায়ারিং নিয়ে একটা গল্প বলি। মোহামেডান ফুটবলে লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, আমার অ্যাসাইনমেন্ট ক্লাবে গিয়ে উৎসব নিয়ে একটা স্টোরি করা। স্বাভাবিকভাবেই উদ্দাম নৃত্য চলছে। ভীড়ের মধ্যে একজনকে দেখি চেনা লাগছে, কিন্তু তার এখানে থাকার সম্ভাবনা এমন অবিশ্বাস্য যে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। হঠাৎ মনে হলো, খটকাটা দূর করা তো দরকার। কাছে গিয়ে দেখি, তিনিই। একজন প্রতিষ্ঠিত আম্পায়ার। মোহামেডানের সমর্থকদের সঙ্গে উল্লাস করছেন। আমাকে দেখেই তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘‘দেখেন তো কী অবস্থা? আমার বাসা পাশে, একটু দেখতে এলাম আর এরা ধরে নিয়েছে আমি মোহামেডান সমর্থক। আমাকে রং মাখাচ্ছে...‘‘

এর মধ্যেই একজন আবার তাকে রং মাখাতে এসেছিল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘‘আমি একজন আম্পায়ার। তোমাদের মতো সমর্থক নাকি...খবরদার।''

সেই মানুষটির চেহারায় তখন রাজ্যের বিস্ময়। যিনি তাদের একজন, তিনি হঠাৎ এমন বদলে গেলেন কেন বুঝতে পারছে না।

গল্পটা কেন বললাম! আম্পায়াররা সবসময় এরকম এটা বোঝাতে? না, পরের অংশটা শুনুন। দিন দুয়েক পর তিনি একা পেয়ে এগিয়ে এসে বললেন, ‘‘আম্পায়ারিংয়ের সময় কিন্তু আমি একশ ভাগ নিরপেক্ষ।''

‘‘তাই নাকি?'' হাসলাম।

‘‘উপায় নেই। মোহামেডানের সঙ্গে আমার একটু সম্পর্ক আছে, এটা সবাই জানে। কাজেই কোনো কোনো ফিফটি-ফিফটি সিদ্ধান্তও পক্ষে দিলে খবর আছে। আবাহনী গ্যালারি তেড়ে ওঠে। উপায় থাকে না রে ভাই।''

‘‘কিন্তু ছোট ম্যাচে, যে ম্যাচে সমর্থকরা থাকে না।''

‘‘উফ। ওখানে আরো ভয়ংকর অবস্থা। অফিসিয়ালরা আছে না! মেরে ফেলবে একদম।'

এখন সমর্থকরা মাঠে থাকে না। অফিসিয়ালরা কিছু বলতে ভয় পান। বোর্ড বলে, আমাদের কাছে তো কেউ অভিযোগ করে না।

কাজেই...

সংশ্লিষ্ট বিষয়