প্রযুক্তির হাত ধরে সুরের সেতু বাংলা ও বার্লিনের | বিশ্ব | DW | 26.12.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত-জার্মানি

প্রযুক্তির হাত ধরে সুরের সেতু বাংলা ও বার্লিনের

সংগীত মুছে দেয় দেশ-কাল-ভাষার গণ্ডি৷ প্রযুক্তির হাত ধরে আজ সংগীতচর্চারও বিশ্বায়ন হয়েছে৷ স্কাইপের মাধ্যমে প্রাচ্যের শিক্ষক গান শেখাচ্ছেন পাশ্চাত্যের শিক্ষার্থীকে, জার্মান তরুণ-তরুণী অক্লেশে গেয়ে উঠছেন রবীন্দ্রনাথের গান৷

যে কোনো ব্যবধান জয় করতে পারে সংগীত৷ গানের বাণী যাই হোক না কেন, সুরের মূর্চ্ছনা সব অর্থেই আন্তর্জাতিক৷ সুরের কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই৷ তাই বাঙালি মেতে উঠতে পারে বেটোফেনের সংগীতে৷ রবীন্দ্রনাথের সুর কানে পৌঁছালে ভেসে যেতে পারেন কোনো জার্মান৷ এই বিষয়টি স্বতঃসিদ্ধ হলেও সংগীত সম্পূর্ণরূপে অনুধাবনের ক্ষেত্রে ভাষা একটা বাধা তৈরি করে বৈকি৷ গানের বাণী বোঝা না গেলে তাকে আত্মস্থ করা যায় না৷ এ জন্য একটা ভাষা অনেকটাই শিখতে হয়৷ গানের কথা শিল্পীর ভাষায় লিখিয়ে নিয়ে তাঁকে দিয়ে গাইয়ে নেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে৷ বাঙালি না হয়েও কত অমর গানের শিল্পী মারাঠি লতা মঙ্গেশকর৷ সলিল চৌধুরীর সুরে তিনি যখন গেয়ে উঠেছেন, কে বিচার করেছে এই গান বাঙালির গাওয়া কিনা৷

অন্য ভাষাভাষী শিক্ষার্থীদের গান শেখাতে এই পদ্ধতিতেই ভাষার ব্যবধান দূর করেছেন এই সময়ের শিক্ষকরা৷ হুগলি জেলার চন্দননগরের শিক্ষয়িত্রী ছন্দা এ ভাবেই জার্মান ছাত্র-ছাত্রীদের গানের পাঠ দিয়েছেন৷ তাঁদের যেমন পাশে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান শিখিয়েছেন, এখন তেমন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রাচ্যের শিক্ষিকা ঘরে বসে পাশ্চাত্যের ছাত্র-ছাত্রীকে গানের পাঠ দিচ্ছেন৷ এটা সম্ভব হয়েছে স্কাইপের মাধ্যমে৷ শুধু ইউরোপ নয়, বাংলাদেশেও ছন্দা দত্তের শিক্ষার্থী রয়েছেন৷ রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে তাঁদের নজরুলগীতিও শেখাচ্ছেন তিনি৷

অডিও শুনুন 05:27
এখন লাইভ
05:27 মিনিট

‘ঠোঁটস্থ করার সঙ্গে সেটা যে তাঁরা আত্মস্থও করেছেন, তা তাঁদের অভিব্যক্তি দেখলেই বোঝা যায়'

জার্মানদের বাংলা গান শেখানোর দুরূহ কাজটা কীভাবে শুরু করলেন ছন্দা? চন্দননগর লালবাগানে নিজের বাড়িতে বসে ডয়চে ভেলেকে নিজের অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন তিনি৷ তাঁর দাদার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে৷ সেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অন্যান্য দেশের মানুষেরা৷ সেই দাদার পরিচয়ের সূত্রে চন্দননগরের বাড়িতে আসেন কয়েকজন জার্মান তরুণ-তরুণী৷ ছন্দা বলেন, ‘‘ওরা আমার গান শুনেই শিখতে চায়৷ সুরের সঙ্গে ওদের আগে পরিচয় ছিল না, মানে ওরা গান জানত না৷ যেহেতু জার্মান ভাষা আমার জানা ছিল না, তাই আমাকে ইংরেজিতে এসএমএস-এর মতো গানের বাণী লিখে দিতে হয়েছে৷ তবে নিছক তোতাপাখির মতো গান মুখস্থ করেনি শিক্ষার্থীরা৷ শব্দের মানে বুঝে হৃদয়ঙ্গম করেই তা শিখেছে৷ ঠোঁটস্থ করার সঙ্গে সেটা তাঁরা আত্মস্থও করেছেন৷ সেটা তাঁদের অভিব্যক্তি বা আবেগ দেখলেই বোঝা যায়৷''

বাঙালি শিক্ষয়িত্রী শিখিয়েছেন, জার্মান তরুণ তরুণীরা শিখেছেন৷ এই গল্পে কোথাও ‘সাউন্ড অফ মিউজিক'-এর ছোঁয়া আছে কি? শিক্ষয়িত্রী হাসতে হাসতে বলেন, ‘‘মিলান, মার্কুস, জুলিয়ারা শান্ত, ধীরস্থির, অনুভূতিপ্রবণ৷ আমার বাড়িটাই এঁদের বাড়ি হয়ে উঠেছিল তখন৷ আমি এঁদের স্টুডেন্ট হিসেবে পেয়ে গর্বিত, ধন্য৷ বাঙালি হয়েও বলছি, একজন বাঙালির থেকেও  রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি এঁদের অনুরাগও নিষ্ঠা আমাকে মুগ্ধ করেছে৷ মিলান বা মার্কুসদের ডেডিকেশন অনেক বেশি৷''

এ জন্য ছন্দাকে অবশ্য কম পরিশ্রম করতে হয়নি৷ বাংলা উচ্চারণ শিখিয়েছেন ধরে ধরে৷ তালুতে জিভ ঠেকাতে হবে নাকি দাঁতে জিভ ঠেকাতে হবে, সবটাই ধরে ধরে শিখিয়েছেন স্নেহের ছাত্রছাত্রীদের — মিলান, মার্কুস, সারা, জুলিয়া, বেঞ্জামিন, মিল্স, সোফিয়া, হানিস, মিরা, জোহানাদের নাম গড়গড় করে বলে যান তিনি৷

অডিও শুনুন 02:56
এখন লাইভ
02:56 মিনিট

‘জার্মানিতে নিত্যদিন আমার কাজের ফাঁকে রবীন্দ্রসংগীত মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে’

ভিন্ন দেশ, ভাষা, উচ্চারণরীতির পর্বতসমান বাধা অতিক্রম করেছেন মিলান, মার্কুস, সোফিয়ারা৷ ২০১১ থেকে বছর দুয়েকের মতো তাঁরা চন্দননগরে ছিলেন৷ ছন্দার গানের পাঠশালাতে ১৭ জন জার্মান শিক্ষার্থী ছিলেন, দু'জন মার্কিন৷ বাংলা কিছুটা শিখে ওঁরা গান ধরেছেন কণ্ঠে৷ কিন্তু তারপর? দেশে ফিরে যাওয়ার পরেও কি তাঁরা চর্চা চালাচ্ছেন? এই প্রশ্নের জবাবে শীতার্ত বার্লিন থেকে মার্কুস গাইসলার ডয়চে ভেলেকে যা বললেন, তা অবাক করার মতো৷ মার্কুসের বক্তব্য, ‘‘জার্মানিতে নিত্যদিন আমার কাজের ফাঁকে রবীন্দ্রসংগীত মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে৷ তাঁর গানের সুন্দর সুর আমাকে প্রকৃতির সঙ্গে জুড়ে রাখে৷ তাই আমি রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করি৷ এই শীতে বার্লিনে বসে যখন টেগোরের গান গাই, আমার হৃদয় উষ্ণ হয়ে ওঠে।  বাংলা ভাষার মাধুর্যও আমি এই গানের সূত্রে বুঝতে পেরেছি।' এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন মার্কাস। তাঁর ভাষায়, ‘একদিন ছন্দার কাছ থেকে গান শিখে চন্দননগরে আমার বাসস্থানে ফিরছিলাম রিকশা চেপে। তখনও গুনগুন করছি ওরে গৃহবাসী গানটি। রিকশাচালক সেটা শুনে আমার দিকে ফিরে তাকালেন, অবাক হলেন৷ তারপর প্যাডেল করতে করতে নিজেও গাইতে লাগলেন সেই গানটি৷''

বাঙালির বসন্তোৎসবের মঞ্চও রঙিন হয়ে উঠেছিল জার্মান তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে৷ প্রতি বছর সাবেক ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরের ঐতিহ্যশালী স্ট্র্যান্ড রোডের ভাষা শহিদ মিনারের সামনে বসন্তোৎসবের আয়োজন করেন সংস্কৃতি কর্মী অজিত মুখোপাধ্যায়৷ সেখানে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে দর্শকদের চমকে দিয়েছেন মিলান-মার্কুসরা৷ সেই মঞ্চে তাঁরা বাঙালিদের মতোই পাঞ্জাবি, শাড়ি, উত্তরীয় পরে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছিলেন৷ বসন্তোৎসবের আয়োজক অজিত মুখোপাধ্যায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাঙালিদের থেকে কোনো অংশে কম যায় না মিলানরা৷ সুন্দর উচ্চারণে তাঁদের গাওয়া বাংলা গান আমাদের রঙের উৎসবের অন্যতম আকর্ষণও ছিল৷''

অডিও শুনুন 03:42
এখন লাইভ
03:42 মিনিট

‘মিলান একদিন জার্মানিতে নিজের বাড়িতে বসে খালি গলায় ওরে গৃহবাসী গাইছিল’

এই অনুষ্ঠানের সূত্রে মিলানের সঙ্গে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে অজিতের৷ জার্মান তরুণকে উদ্ধৃত করে দারুণ একটি অভিজ্ঞতার কথা শোনান তিনি৷ বলেন, ‘‘মিলান আমাকে গল্পটা বলেছিল, যেটা শুনলেই রোমাঞ্চ হয়৷ ও একদিন জার্মানিতে নিজের বাড়িতে বসে খালি গলায় ওরে গৃহবাসী গাইছিল৷ সেই সুরটা মিলানের মায়ের ভারী পছন্দ হয়৷ তিনি জিজ্ঞেস করেন, এটা কার গান? মিলান সে দিন মায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় করিয়ে দেয়৷ তারপর ওই জার্মান প্রবীণা দিনভর সেই গানটিই ছেলের কণ্ঠে অজস্রবার শুনেছিলেন৷''

ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে নিজের দেশে ফিরে গিয়েও বাংলা গানের চর্চা চালিয়ে যেতে পারে, সেই লক্ষ্যে অনলাইন ক্লাস শুরু করেন ছন্দা৷ শুধু ইউরোপীয়রা নন, প্রবাসী বাঙালি ও বাংলাদেশের মানুষদের গান শেখাতেও কাজে আসছে স্কাইপ৷ নজরুলগীতির বিশিষ্ট শিল্পী পূরবী দত্তের ছাত্রী ছন্দা অনলাইন ক্লাসে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নজরুলের গান শেখাচ্ছেন৷ এভাবেই প্রযুক্তির ভরসায় ইচ্ছে করলেই গানের দিদিমণির নাগাল পাচ্ছেন মার্কুস-মিলানরা৷ হয়ত ‘সাউন্ড অফ মিউজিক'-এর টানেই তাঁরা আবার ভারতে আসছেন আগামী সেপ্টেম্বরে, কলকাতা ও বেঙ্গালুরুর কনসার্টে যোগ দিতে!

বন্ধু, প্রতিবেদনটি নিয়ে আপনার মন্তব্য জনতে চাই৷ তাই লিখুন নীচের ঘরে৷

 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও