প্রতিহিংসার রাজনীতি, প্রতিশোধের রাজনীতি | আলাপ | DW | 09.04.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

প্রতিহিংসার রাজনীতি, প্রতিশোধের রাজনীতি

বাংলাদেশে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতির প্রকাশ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ঘটেছে৷ আর এই ধারা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৭ বছর পরও অব্যহত আছে৷ প্রতিহিংসার এই রাজনীতির বড় শিকার হলো সাধারণ মানুষ ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী৷

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে হত্যা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমানকে৷ এরপর সামরিক বাহিনীর প্রধান জিয়াউর রহমান শাসন ক্ষমতা হাতে নিয়ে সাংবিধানিকভাবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার পাওয়ার পথও বন্ধ করে দেন৷ এমনকি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃতও করেন জিয়া৷ অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন করেন, রাজনীতি করার সুযোগ দেন৷ তাদের সঙ্গে জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির সুসম্পর্ক আছে আগের মতোই৷

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যত্থানে নিহত হন৷ এরপর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বিএনপির সাত্তার সরকারকে হটিয়ে তখনকার সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন৷ গণঅভ্যুত্থানে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন হয়৷ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে নিজের রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি গঠন করেন৷ এরশাদকে হটাতে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একইসঙ্গে আন্দোলন করে৷ পরবর্তীতে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে৷ ওই নির্বাচন হয় সবদলের সমর্থনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে৷

কিন্তু ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়ে একতরফাভাবে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করে৷ ভোটারবিহীন ঐ নির্বাচন আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করে৷ নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠন করলেও তা স্থায়ী হয় না৷ আন্দোলনের মুখে বিএনপি সংসদে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাশ করে সেই বছরেরই ১২ জুন নতুন নির্বাচন দেয়৷ সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২১ বছর পর আবার সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ৷ এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে৷

২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের সময়টা ছিল ঘটনাবহুল৷ তার আগে ক্ষমতাসীন বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে তখনকার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে৷ কিন্তু আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদত্যাগ করে৷ সেনা সমর্থনে ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যা এক-এগারোর সরকার নামে পরিচিত৷ ওই সময়ে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া উভয়কেই কারা অন্তরীণ করা হয়৷ পরে অবশ্য তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তখনকার সরকার৷ সেই সময়েই খালেদা জিয়ার দুই পুত্র তারেক রাহমান এবং আরাফাত রহমান আটক হন৷ পরে তাঁদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়৷ আরাফাত রহমান বিদেশেই মারা যান আর তারেক রহমান হত্যা ও দুর্নীতিসহ একাধিক মামলা নিয়ে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন৷

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে৷ ঐ মেয়াদে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়৷ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত ওই নির্বাচন বর্জন করে৷ তারা নির্বাচন প্রতিহতেরও ঘোষণা দেয়৷ একতরফা নির্বাচনে জয়ের পর আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে৷ মেয়াদ শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে৷  এই নির্বাচনের আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে খালেদা জিয়া এখন কারাগারে আছেন৷ বিএনপি তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত৷ তবে এবার তারা নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে৷

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতির এই সংক্ষিপ্ত তথ্য বিরোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি স্পষ্ট করে৷ শেখ হাসিনাকে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়৷ তিনি বেঁচে গেলেও নিহত হন আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতা-কর্মী৷ বিএনপি তখন ক্ষমতায় ছিল আর শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী৷ কিন্তু বিএনপি সরকার তখন ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত না করে উলটে আওয়ামী লীগকেই দায়ী করে৷ পরে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলার তদন্তে জানা যায় যে তৎকালীন (বিএনপি) সরকারের ইন্ধনেই জঙ্গিদের দিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল৷ খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান এবং তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরও পরে ঐ মামলার আসামি হন৷

প্রতিপক্ষকে শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, জীবনে শেষ করে দেয়ার এই প্রবণতা বাংলাদেশের প্রতিহিংসার রাজনীতির এক নগ্ন প্রকাশ৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. শান্তনু মজুমদার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রতিহিংসার চাইতে সহিংসার রাজনীতি কথাটা আমি ব্যবহার করব৷ তার কারণ, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী যে ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে ১৯৭৫ সালে গণতান্ত্রিক সরকারের যেভাবে অবসান ঘটে এবং তার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নতুন যে মতাদর্শের সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার একটি কর্তৃপক্ষের জন্ম হয়৷ অথবা আমরা বলতে পারি যে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী মতাদর্শ একটি রিনিউড ফোর্স হিসেবে এলো৷ আমরা যদি আবেগের জায়গা বাদ দিয়ে কথা বলি, তাহলে রাজনীতিতে সম্ভবত সহিংসা অবধারিত হয়ে এসেছিল এবং তা এখনো চলছে৷ কারণ, একটা অংশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তাদের অন্তরাত্মার মধ্যে এখনো প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি৷''

অডিও শুনুন 07:50
এখন লাইভ
07:50 মিনিট

‘সহিংসা থেকে বের হতে আরো সময় লাগবে’

তিনি বলেন, ‘‘এটাকে যদি আমরা শুধু একদল বনাম আরেক দলের সংঘাত বা প্রতিহিংসা বলি, তাহলে আলোচনাটা খণ্ডিত হয় বলে আমি মনে করি৷ যেমন ধরুন ২০১৩ সাল৷ এই সালটা বোঝবার জন্য বেশ ভালো৷ একদিকে শাহবাগ আন্দোলন, আরেকদিকে শাপলা আন্দোলন৷ এই দু'টো বিপরীতমুখী মতাদর্শের আন্দোলনের কোনটা কোনটার কাছে পরাজয় মানবে? তাই অনাকাঙ্খিত হলেও বাংলাদেশের যে বাস্তবতা, তাতে এই সহিংসা থেকে বের হতে আরো সময় লাগবে৷ যারা তাড়াহুড়া করেন, তারা হয়ত আতঙ্ক থেকে এখনই ‘সেটেল ডাউন' করার কথা বলেন৷ কিন্তু আমার বিবেচনায় আরো অনেক সময় লাগবে৷ দুই দলের মধ্যে আসন দখলের লড়াই, নির্বাচনকালীন সহিংসা – এগুলোর বাইরে বাংলাদেশে যে সহিংসা আমরা প্রত্যক্ষ করি, খেয়াল করবেন সেগুলোর মধ্যে মতাদর্শ খুব সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত৷....এই গোটা জিনিসটাকেই আমরা বলছি প্রতিহিংসা৷ কিন্তু কীসের প্রতিহিংসা? একটা হলো সরকারি দল বিরোধী দলের ওপর দমন নিপীড়ন চালায়৷ এই অংশটুকু বাদ দিলে, আমি ২০১৩ সালের কথা আবারো বলছি৷ ঐ সময় কে কার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা গড়ে তুলেছিল? পুরো বিষয়টাই তো ছিল মতাদর্শিক৷''

শান্তনু মজুমদার আরো বলেন, ‘‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়নি, এ ঘটনা স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের নাকটাকে ঘুরিয়ে দিয়েছে পেছন দিকে৷ আমাদের যে ‘কোর্স' তৈরি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ, চার মূলনীতি, তা ফিরিয়ে দিয়েছে৷ আজকে হয়ত অতি কথনের কারণে আবেদন হারিয়েছে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, কিন্তু রাজনীতিতে এটা প্রবলভাবে উপস্থিত৷ তাছাড়া বাংলাদেশে যে বড় সংঘাতগুলো হচ্ছে, তা নামেই হোক বা বেনামে, এই দু'পক্ষের মধ্যেই হচ্ছে৷''

প্রতিহিংসা আর এই বিরোধ দেখা যাচ্ছে কেন্দ্র থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত৷ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেবে গত চার বছরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষে ৫২৯ জন নিহত হয়েছেন৷ আর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে নিহত হয়েছেন ১১ জন৷ চার বছরে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ২,৮০০টি৷ এই হিসাব পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে৷

আসক-এর হিসাব মতে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৪টি৷ এই সংঘাতে নিহত হয়েছেন ৫২ জন আর আহত ৪,৮১৬ জন৷ ২০১৬ সালে সংঘাতের ঘটনা ৯০৭ টি৷ নিহত হয়েছেন ১৭৭ জন, আহত ১১,৪৬২ জন৷ ২০১৫ সালে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৮৬৫টি৷ নিহত ১৫৩ জন, আহত ৬,৩১৮ জন৷ ২০১৪ সালে মোট রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ৬৬৪৷ এ সব ঘটনায় ১৪৭ জন নিহত এবং ৮,৩৭৩ জন আহত হন৷

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে রাজনৈতিক সংঘাত হয়েছে ১০৯টি৷ এতে নিহত হয়েছেন ১১জন আর আহত হয়েছেন এক হাজার ৪৮৮ জন৷

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে একমাসেই রাজনৈতিক সংঘাতে নিহত হয়েছেন ৬৮ জন৷ এর মধ্যে বিএনপির ১৮, আওয়ামী লীগের ৭ এবং জামায়াতের ১১ জন নিহত হন৷ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন এমন ২৪ সাধারণ মানুষ ঐ এক মাসের রাজনৈতি সংঘাতে নিহত হয়েছেন৷ ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের নামে যানবাহন ও স্থাপনায় সবচেয়ে বেশি আগুন দেয়া হয়েছে৷ ২০১৩ সালে এই আগুনে ৯৭ জন দগ্ধ হন৷ তাদের মধ্যে ২৫ জন মারা যান৷ ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে বাংলাদেশে ব্যাপক সহিংসতা হয়৷

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতির অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের বড় দু'টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে৷ গত ২০ বছরের রাজনীতিতে এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রকট আকারে দেখা গেছে৷ এর কারণ হলো মানসিকতার সংকট৷ দু'টি দলই পরস্পরকে রাজনৈতিক শত্রুর পরিবর্তে ব্যক্তিগত শত্রু মনে করে৷ ফলে এই হিংসা-বিদ্বেষ উচ্চ পর্যায় থেকে দলের নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে৷ কর্মীরা বিভ্রান্ত হন৷ তাঁরা এই বিদ্বেষ এবং বৈরিতাকে এগিয়ে নিয়ে যান৷ এটা কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ভালো কথা নয়৷ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে একটা আস্থার সম্পর্ক রাখা দরকার৷ পারস্পরিক আস্থা এবং বিশ্বাসের সম্পর্ক যদি না থাকে, তাহলে কোনো দেশেই গণতন্ত্র বিকশিত হয় না৷ এই আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হলে পরস্পরের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাধাগ্রস্থ করা যাবে না৷ বরং এগিয়ে যেতে দিতে হবে৷ দু'টো বড় দল যদি ঐক্যবদ্ধভাকে ন্যূনতম বিষয়ে একমত না হতে পারে, তাহলে কিন্তু হিংসা-বিদ্বেষ-সংঘাত রাজনীতি থেকে দূর করা সম্ভব নয়৷''

অডিও শুনুন 04:50
এখন লাইভ
04:50 মিনিট

‘একটা আস্থার সম্পর্ক রাখা দরকার’

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আরেকটি প্রকাশ ঘটে মামলার মাধ্যমে৷ যারা যখন ক্ষমতায় আসে, তারা তখন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করে৷ আবার ক্ষমতার পরিবর্তন হলে সেই মামলা প্রত্যাহার করা হয়৷ ২০০১ সালে বিএনপির শাসনামলে এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট ১৫টি মামলা হয়৷ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হয় মামলাগুলো প্রত্যাহার, নয়ত খারিজ হয়ে যায়৷ এ সময় রাজনৈতিক মামলা বিবেচনায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সেসময়ে দায়ের করা কয়েক হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়৷ ২০০৯-১৩ মেয়াদে আওয়ামী লীগের মহাজোট সরকারের আমলে ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক' বিবেচনায় ৭ হাজার ১৯৮টি মামলা সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা করা হয়৷ এ আমলেও তা অব্যাহত আছে৷ ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারও একই কায়দায় ৫ হাজার ৮৮৮টি মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ৯৪৫টি মামলা থেকে কিছু আসামিকে অব্যাহতি দেয়৷ ঐ সময় মোট ৭৩ হাজার ৫৪১ জন আসামি এই প্রক্রিয়ায় বিচার এড়াতে সক্ষম হন৷

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এখন দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে আছেন৷ জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে গত ৮ ফেব্রুয়ারি৷ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো ৩৪টি মামলা আছে৷ এর মধ্যে ১৯টি মামলা বিচারাধীন, তদন্ত চলছে ১২টি মামলার এবং আদালতের নির্দেশে তিনটি মামলার কার্যক্রম স্থগিত আছে৷ বিচারাধীন ১৯টি মামলার মধ্যে ১৪টির বিচার কার্যক্রম বকশি বাজারের বিশেষ আদালতে পাঠানো হয়েছে৷ এই মামলাগুলোর মধ্যে চারটি মামলা দায়ের হয় গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে৷ বাকি ৩০টি বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে দায়ের করা হয়৷ জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্টের যে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে, সেই মামলাটিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই করা হয়৷ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর অভিযোগের মধ্যে আছে দুর্নীতি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তি, যানবাহনে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা, সহিংসতা, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ প্রভৃতি৷ বিএনপির দাবি, গত ৯ বছরে এই সরকার বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৩৮ হাজার মামলা করেছে৷

শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘‘আন্তঃদলীয় যে সহিংসা, তাতে যারা ক্ষমতায় থাকছে তারা কখনোই এটা মাথায় রাখতে পারছে না যে তাদেরকেও বিরোধী দলের আসনে বসতে হবে৷ এটা আমাদের দেশের মতো আরো অনেক দেশে আছে৷ সরকারি দল শুধু যে বিরোধী দলের ওপর চড়াও হওয়ার জন্যই সহিংসাতা করে, তা নয়৷ তাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে যে বিরোধী দলে গেলে তাদের কী অবস্থা হবে৷ সেই আতঙ্ক থেকেও তারা ক্ষমতার ব্যাপারে একেবারে ‘অ্যাডামেন্ট' হয়ে যায়৷ আর বিরোধী দল তখন ‘ডেসপারেট' হচ্ছে যে, ‘অ্যাট এনি কস্ট তারা ক্ষমতায় যাবে৷ এ অবস্থায় সহিংসা তো অনিবার্য৷''

বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুরা চাপে থাকেন৷ শুধু তাই নয়, নির্বাচনের পর বার বার সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন৷ ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং নির্যাতন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়৷ নির্বাচনে যে দল জয়ী হয়, সে দলই শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালায়৷

শান্তনু মজুমদার  জানান, ‘‘এভাবে সহিংসার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়৷ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয় নির্বাচনের পরে৷ তবে সব নির্বাচনের পর কিন্তু হামলা হয় না৷ এটাও বোঝার বিষয়৷ আমাদের মধ্যে উন্নত রাজনৈতিক কালচার গড়ে ওঠেনি৷ এই ‘রেসপনসিবিলিটি' সব বড় রাজনৈতিক দলকে নিতে হবে৷''

এ বিষয়ে তারেক শামসুর রহমান বলেন, ‘‘রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কিন্তু তেমন আক্রান্ত হন না৷ তাঁদের তেমন ক্ষতি হয় না৷ ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ মানুষ৷ ২০১৪ সালের পরবর্তী ঘটনায়, বাস পোড়ানোর ঘটনায়, বাসে বোমা হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষই মারা গেছেন৷ সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন৷ এই দায় দু'টো রাজনৈতিক দলেরই গ্রহণ করতে হবে৷ কারুর দায় বেশি, কারুর কম নয়৷ বিশেষ করে বিএনপি তো এর দায় এড়াতেই পারে না৷ কারণ, নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা তো বিএনপিই দিয়েছিল৷ তবে সরকারকেই অভিভাবক হিসেবে একটি সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব নিতে হবে৷ এই সমঝোতার পরিবেশ যদি সৃষ্টি না হয় তাহলে সামনের নির্বাচনে আবারো সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে৷''

এহেন সংঘাত বন্ধ করা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য জরুরি৷ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও তার প্রয়োজনীয়তা আছে৷ তারেক শামসুর রাহমানের কথায়, ‘‘এই সংঘাত আমরা যদি বন্ধ করতে না পারি, তাহলে উন্নয়নশীল দেশের পথে আমাদের যে পথ চলা, তা মুখ থুবড়ে পড়বে৷ বাংলাদেশে বড় দু'টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আস্থার সংকট প্রকট৷ এখানে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে৷ আমি মনে করি এটা ভালো৷ জনগণ চাইলে কাজ দেখে তাদের পছন্দ পরিবর্তন করতে পারে৷ সরকার পরিবর্তন করতে পারে৷ কিন্তু যদি হানাহানি থাকে, বিদ্বেষ থাকে, তাহলে আমরা এই গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব না৷''

আর ড. শান্তনু মজুমদারের কথায়, ‘‘এই গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি গড়ে ওঠা এত সহজ নয়৷ আমাদের মতাদর্শিক বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির জায়গায় এক হতে হবে৷ কিন্তু সেটা হতে অনেক সময় লাগবে৷ তুড়ি বাজালেই এটা চলে আসবে না৷''

সহিংসার এই সংস্কৃতি দূর করতে কী করা উচিত বলে মত আপনার? লিখুর নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়