প্রচ্ছদ ‘শিল্প′ হয়ে উঠুক   | বিশ্ব | DW | 04.02.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

প্রচ্ছদ ‘শিল্প' হয়ে উঠুক  

যখন পড়তে শিখিনি, তখন বই হাতে নেওয়ার প্রধান কারণ ছিল প্রচ্ছদ বা বইয়ের মলাট আর ভেতরের ছবি৷ যেসব আঁকিয়েরা বইয়ের প্রচ্ছদে অনেক দূরের গ্রাম আঁকতেন, তাঁদের প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা ছিল৷

আর যাঁরা কয়েকটা শব্দ বা সংখ্যা বা কোনো অবয়ব দিয়ে প্রচ্ছদ আঁকতেন, তাঁদের প্রতি নিদারুণ ক্ষোভ ছিল৷

বেশ বড় হওয়ার পর নীল জমিনে লাল ছাতার নীচে দাঁড়ানো এক মেয়েকে দেখেছিলাম হুমায়ুন আহমেদের ‘বৃষ্টি বিলাস' বইয়ের প্রচ্ছদে, প্রচ্ছদ করেছিলেন ধ্রুবএষ৷ কতবার সেই মেয়েটির মুখ দেখতে ইচ্ছে হয়েছে! ছোটছোট কিছু স্মৃতি সবারই বইয়ের মলাট নিয়ে আছে৷

এই মলাট-শিল্প চাঙা হয়ে ওঠে বই মেলা এলে৷ যেহেতু আমাদের প্রকাশক, লেখক ও বই-সংশ্লিষ্ট সবার ঠিক বইমেলার আগেই সব কাজ শুরু হয়, বছর জুড়ে কাজ গুছিয়ে রাখার রীতি নেই, তাই মেলার সময় আর সবার মতো প্রচ্ছদশিল্পীরা ভীষণ  ‌ব্যাস্ত হয়ে ওঠেন৷ ফলাফল – প্রচ্ছদের মানে ঘাটতি৷

একজন শিল্পী কখনোই পুরো বই পড়ে প্রচ্ছদ করার সুযোগ পান না৷ এমনকি অনেকে জানারই সুযোগ পান না বইটি কী নিয়ে৷ নাম ও লেখকের ফরমায়েশমতো বইয়ের প্রচ্ছদ করার রীতি চলছে এখন৷ অথচ এই দেশের প্রচ্ছদশিল্পের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধই বলা যায়৷

বাংলাদেশের বইয়ের জগতে প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে এক অবিসংবাদিত পুরুষ কাইয়ুম চৌধুরী৷ প্রচ্ছদশিল্পের ইতিহাসের অনেকটা জুড়ে রয়েছে তাঁর নাম৷ এমন একটি সময় ছিল, তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদের কথা ভাবাই যেতো না৷ পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন৷ তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ১৯৫২ সালে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘বুনোবৃষ্টির গান' বইটির প্রচ্ছদ দিয়েই তিনি প্রচ্ছদ-জীবন শুরু করেছিলেন৷ তবে সেই সময় বইটি প্রকাশ হয়নি৷

শামসুর রাহমানের ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে' বইয়ের প্রচ্ছদ তাঁর করা৷ জসীম উদ্দীনের সাড়াজাগানো বই ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্প'-এর প্রচ্ছদও তিনি করেছিলেন৷ হুমায়ুন আহমেদের ‘নন্দিত নরক'-এর প্রচ্ছদও করেছেন তিনি৷ অসংখ্য তরুণ লেখকের বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিয়েছেন এই প্রতিথযশা শিল্পী৷ একটা নির্দিষ্ট ঘরানায় আটকে থাকেননি প্রচ্ছদ নিয়ে৷ শিল্পবোদ্ধারা বলেন, একজন প্রচ্ছদকার হিসেবে বারবার ফরম্যাট ভেঙেছেন তিনি৷ নিজেই একটা ধারা তৈরি করে আরেক ধারায় কাজ করেছেন৷

কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ বা ইলাস্ট্রেশনের কাজ নিয়ে ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা বলার লোভ সামলাতে পারছি না৷ ২০১৪ সালে জননন্দিত লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মৃত্যুর পর দেশের একটি দৈনিক আমাকে একটি গল্প অনুবাদ করে দিতে বলেছিল৷ গল্প অনুবাদ করার সময়ই জানতে পারলাম, এই গল্পের ইলাস্ট্রেশন করবেন কাইয়ুম চৌধুরী৷

Fatema Abedin, Intern, DW Bangla section.

ফাতেমা আবেদীন নাজলা, ডয়চে ভেলে

তিনি পত্রিকার একজনের মাধ্যমে আমার কাছে অনুদিত গল্প চেয়ে পাঠালেন৷ গল্পটি পড়ে ইলাস্ট্রেশন করে পাঠালেন৷ এবং সেই ইলাস্ট্রেশনের একটি জায়গা চিহ্নিত করে  লিখলেন, ‘‘এখানে লেখক নাম টাইপ করে বসবে৷'' কোন মাপে টাইপ হবে সেটিও তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন৷ ২২০০ শব্দের গল্পের প্রতিটা মুহূর্ত তিনি আধপাতা ইলাস্ট্রেশনে তুলে ধরেছিলেন৷ তাঁর কাছেই শুনেছিলাম– প্রচ্ছদ কখনো বই না পড়ে করা যাবে না, বই পড়তে হবে৷

এখন লেখকরা যখন জানুয়ারির ২০ তারিখে পাণ্ডুলিপি দেন, প্রকাশকের প্রুফরিডার ২ ঘণ্টায় বই পড়ে এডিটের দায়িত্ব শেষ করেন, তখন শিল্পীকে বই প্রকাশের আগেই প্রচ্ছদ তৈরি করে ফেলতে হয়৷ আর এর ফলাফল– শিল্পমানহীন বইয়ের প্রচ্ছদ, কিংবা বইয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রচ্ছদ৷

অনেক শিল্পী দাবি করেন, লেখক ও প্রকাশকদের নানা আবদার প্রচ্ছদের মান নষ্টের জন্য দায়ী৷ বইয়ের প্রচ্ছদকে সমৃদ্ধ করতে সবাই চান৷ কারণ, এতে শিল্পীর নামযুক্ত থাকে৷ কিন্তু হালের দৌরাত্ম্য পাড়ি দিয়ে শিল্পমান রক্ষা আর হয় না৷ লেখক-প্রকাশক এবং শিল্পীরা সবাই যদি বইমেলার আগ মুহূর্তের দৌঁড় বন্ধ করে বছরজুড়ে কাজটি করেন, তবে মনে হয় প্রচ্ছদশিল্প  সেই কাইয়ুম চৌধুরী, সমর মজুমদারদের দাঁড় করানো স্ট্যান্ডার্ডে ফিরবে৷

তবে আশার কথা এই যে, এত অভিযোগের মধ্যে সব্যসাচী হাজরা, মাসুক হেলাল, তৌহিন হাসান, মোস্তাফিজ কারিগর, চারুপিন্টু, সব্যসাচী মিস্ত্রিসহ আরো অনেক প্রচ্ছদশিল্পীর প্রচ্ছদ দেখে থমকে যেতে হয় ভালো লাগায়৷ এরা নাম উল্লেখ করার মতো ভালো কাজ করছেন বলেই দাবি করেন শিল্পবোদ্ধারা৷

ভালো প্রচ্ছদ প্রসঙ্গে  শিল্পীরা দাবি করেন, বই পড়ে, সময় নিয়ে ভেবে-চিন্তে প্রচ্ছদ করার সুযোগ থাকলে সেটি ভালো হবে নিশ্চিত৷ নতুবা ফোনে লেখকের সঙ্গে কথা বলে আগাম বা তড়িৎ প্রচ্ছদের মান খারাপ হবেই৷

তবে একজন প্রচ্ছদপ্রেমী হিসেবে ব্যক্তিগত চাওয়া এই যে, সব প্রচ্ছদ শিল্পীর মলাট ‘শিল্প' হয়ে উঠুক৷ ছবি বা কারুশিল্পের মতো প্রদর্শিত হোক দেয়ালে দেয়ালে৷ 

প্রচ্ছদ কেন এখনো শিল্প হয়ে ওঠেনি? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন