প্রচারসর্বস্বতা গ্রাস করছে সংগীতচর্চাকে, আক্ষেপ স্বপ্না চক্রবর্তীর | বিশ্ব | DW | 14.12.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

প্রচারসর্বস্বতা গ্রাস করছে সংগীতচর্চাকে, আক্ষেপ স্বপ্না চক্রবর্তীর

১৯৭৮ সালে প্রকাশিত একটি রেকর্ড বাংলার লোকসংগীতের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে রয়েছে৷ ঐ রেকর্ডের একপিঠে ছিল ‘বড়লোকের বিটি লো', অন্যদিকে ‘বলি ও ননদী'৷ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে এই গান, অথচ সেই শিল্পী আছেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে৷

কেন তাঁর এই সরে যাওয়া? আজকের লোকসংগীত নিয়ে তাঁর অভিমতই বা কী? বীরভূমের সিউড়িতে লোকশিল্পী স্বপ্না চক্রবর্তীর মুখোমুখি হয় ডয়চে ভেলে৷ ৮০-৯০ দশকে রেকর্ডের কভারে ছাপা সেই তরুণীর সঙ্গে আজকের মানুষটির মিল খুঁজে পাওয়া ভার৷ সিউড়ি বাসস্ট্যান্ডের কাছে একতলার সুন্দর অ্যাপার্টমেন্টে তাঁকে পাওয়া যায়৷ সঙ্গে ছিলেন স্বামী সুরকার ও গীতিকার মানস চক্রবর্তী৷

ডয়চে ভেলে: ১৯৭৮ সালে আপনার জয়যাত্রা শুরুর গল্পটা বলুন৷ সেটাই সবাই শুনতে চায়...

স্বপ্না চক্রবর্তী: যাত্রা শুরু যদি বলতে হয়, তাহলে তা ৭৮-এর আগেই৷ ১৭ বছর বয়সে ফুড অ্যান্ড সাপ্লাই রিক্রিয়েশন ক্লাবের মঞ্চে আমার গান মানুষের পছন্দ হয়৷ সেখান থেকেই আমার নাম হয় ‘বীরভূমের লতা'৷

না, আমি সেই গোড়ার কথা বলছি না৷ বলছি ‘বড়লোকের বিটি'-র কথা....

সেই সালটা ভোলার না৷ ১৯৭৮৷ বিরাট বন্যা হয়েছিল৷ সে বছর প্রথম এই দুটো গান রেকর্ড করি৷ অশোকা কোম্পানির ঈগল কমার্শিয়াল রেকর্ড করে৷ যদিও দু'বছর আগে জেলা বেতার অনুষ্ঠানে এই দু'টো গান গেয়েছিলাম৷ সবাই পছন্দ করেছিলেন৷ রেডিওতে সরাসরি ‘বি-হাই' শিল্পীর মর্যাদা পেয়েছিলাম৷ প্রত্যেক মাসে অনুষ্ঠান করেছি৷ কিন্তু দু'বছর পর রেকর্ড যে এত জনপ্রিয় হবে, সেটা ভাবতেও পারিনি৷ পুজোর আগেই আমার রেকর্ড বেরিয়েছিল৷ চারদিকে সে গান বাজত৷ ওই দু'টি গানই স্বপ্না চক্রবর্তীকে চিনিয়ে দিলো৷ সে সময় আমার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘বড়লোকের বিটি'৷

অডিও শুনুন 14:12

‘‘বড়লোকের বিটি', ‘বলি ও ননদী' গেয়ে মাত্র ১৫ টাকার চেক পেয়েছিলাম’

তখন তো টিভিই আসেনি৷ মানুষ আপনাকে চিনতে পেরেছিল?

না, মুখ চেনার সুযোগ ছিল না৷ ‘বড়লোকের বিটি'-র কভারে আমার ছবিও ছিল না৷ কিন্তু জনপ্রিয়তাটা বুঝতে পেরেছি নানা ঘটনায়৷

তেমন দু-একটা ঘটনার কথা বলুন না...

(হেসে) সে তো নানা মজার ঘটনা৷ একবার ট্রেনে ফিরছি৷ শুনছি দু-তিনজন প্রবীণ মানুষ আমাকে নিয়ে আলোচনা করছেন৷ একজন বলছেন, ‘যে মেয়ে গানটা গেয়েছে, তার একটা চোখে নষ্ট হয়ে গেছে৷' আমি ভাবলাম বলি, মোটেই তা নয়৷ কিন্তু আমাকে তো চেনে না কেউ৷ বললে যদি পাগল ঠাওরায়, সেই ভয়ে বলিনি৷ একবার একটা গ্রামে গেছি অনুষ্ঠান করতে৷ গ্রামের মহিলারা আমার কাছে এসে মুখের ওপর আলো ধরেছেন৷ তারপর আমার গা টিপে টিপে দেখছেন৷ সেটা দেখে নিজেদের মধ্যে ওঁরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছেন, এ তো আমাদের মতোই গো! এ সব ঘটনা এখনও ভাবলে ভালো লাগে!

‘ফোক', মানে লোকসংগীতে এলেন কেন?

ফোকের তখন এমন চর্চা ছিল না৷ তেমনভাবে শোনা হতই না৷ তবে আমার ফোক ভালো লাগত৷ তাছাড়া আমাদের ‘আনন' নামে একটা গোষ্ঠী ছিল, এখনও আছে৷ সেখানে সংস্কৃতি চর্চা হতো৷ আমি গানের দিকটা দেখতাম৷ আমাদের বীরভূমের লুপ্তপ্রায় ফোক ঝুমুর, ভাদু, মনসা, কোঁড়া – এ সব যাতে আরও প্রচার পায়, সে জন্য আমরা গাইতাম৷ এভাবেই একদিন স্বপ্না চক্রবর্তী হয়ে গেলাম৷

সে সময় কত গান আপনার — ‘বর এলো মাদল বাজায়ে', ‘কাঠ কুড়াতে বেলা যায়', ‘বনমালী তুমি', ‘আমার কচি ছানাটা বড়' – এমন কত গান৷ ওপার বাংলায় আপনার গান কি পৌঁছেছিল সে সময়?

নিশ্চয়ই গিয়েছিল৷ তার প্রমাণ একটা ঘটনায় পেয়েছিলাম৷ ‘বড়লোকের বিটি' রেকর্ড বেরোনোর বছর দু-তিনেক পর বোলপুরের পৌষমেলায় গেছি৷ মেলায় একটা রেকর্ডের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছি৷ দু'জন ভদ্রলোক এলেন৷ তাঁরা নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে আমার রেকর্ডখানা চাইলেন৷ বিক্রেতা বললেন, বাড়তি দাম দিতে হবে৷ কত দাম জানেন?

কত?

২৭৫ টাকা৷ তখন একটা রেকর্ড ১৬ টাকায় বিক্রি হতো৷ কালোবাজারি বলতে পারেন৷ বিক্রেতার আরও একটি শর্ত ছিল — স্বপ্না চক্রবর্তীর গান কিনলে সঙ্গে আরও একটি রেকর্ড কিনতে হবে!

স্বপ্না চক্রবর্তী

স্বামী সুরকার ও গীতিকার মানস চক্রবর্তীর সঙ্গে স্বপ্না চক্রবর্তী

ওঁরা কিনলেন?

হ্যাঁ, কিনলেন তো! ওপার বাংলার ওই দু'জন ভদ্রলোক ২৭৫ টাকাতেই আমার রেকর্ড কিনলেন এবং সঙ্গে অন্য রেকর্ডটিও৷ আরও অবাক লাগার মতো ঘটনা, সেই রেকর্ডই আমাকে কিনতে হয়েছিল, কোম্পানি দেয়নি৷

সৌজন্য হিসেবে শিল্পীর কপি দেয়নি?

না৷ রেকর্ড চাইতে ঈগলের কলকাতা অফিসে গিয়েছিলাম৷ তাঁরা তো আমাকে চিনতেই পারেন না! ওই যে বললাম, কভারে ছবি ছিল না৷ শেষমেশ বাজার থেকে একটা রেকর্ড কিনে বাড়ি ফিরে শুনেছি৷ আজকের দিনে এটা ভাবা যাবে?

মিডিয়ার দাপটে আজ সংস্কৃতিচর্চার চেহারাটাই বদলে গেছে৷ তারা শুধু প্রচার করে শিল্পী তৈরি করছে বলে অভিযোগ ওঠে৷ তাঁরা জনপ্রিয়তা ও পুরস্কারও পাচ্ছেন৷ আপনার সেই জনপ্রিয়তার পাশে আজকের এই মিডিয়া নির্ভর প্রচারকে কোন জায়গায় রাখেন?

অভিযোগ নয়, এটাই সত্যি৷ আজ সবাই রিয়েলিটি শোতে এসে শিল্পী হয়ে যাচ্ছে৷ তাদের ঠিকঠাক চর্চাই নেই, সাধনা দূরের কথা৷ এই তো সেদিন দেখলাম, একটি মেয়ে আমার একটা গান গাইল৷ বিচারক তাকে ডিজ্ঞেস করলেন, এটা কার গান? মেয়েটা স্পষ্ট বলল, সে জানে না৷ এরা কার গান গাইছে, সেটারও খোঁজ রাখার প্রয়োজন মনে করে না৷ এ সব দেখলে খারাপ লাগে৷ তাও ওই মেয়েটার বাড়ি বোলপুর, নাম বলতে চাইছি না৷

আপনাদের সময়ে চর্চা নিশ্চয়ই সাধনা হয়ে দাঁড়াত...

ভিডিও দেখুন 00:37

সাধনা নেই, আছে শুধু প্রচারসর্বস্বতা

তখন চর্চা না করলে বড় হওয়া যেত না৷ তাই রীতিমতো সাধনা দরকার ছিল৷ বড়দের কাছ থেকে শেখার আগ্রহ ছিল৷ পাঁচ বছর শান্তিনিকেতনে সংগীত শিক্ষার সময় কত ভালো শিক্ষককে পেয়েছি৷ পরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভি বালসারা, নির্মলেন্দু চৌধুরীদের কাছ থেকে শিখেছি৷ আমরা যেমন সম্মান করতাম, অগ্রজরা তেমনই প্রাণ ঢেলে শেখাতেন৷

স্বর্ণযুগের এই শিল্পীদের সঙ্গে আপনার তো প্রচুর স্মৃতি রয়েছে...

হ্যাঁ, সে সব বলতে শুরু করলে আর শেষ হবে না৷ নির্মলেন্দু চৌধুরী একবার বলেছিলেন, ‘স্বপ্না, তুই লোকসংগীতকে আবার জনপ্রিয় করে তুলেছিস৷ শহরের মানুষেরা লোকগান শুনলে রেডিও বন্ধ করে দিত৷ তুই ছোটলোকদের গান শুনতে বাধ্য করিয়েছিস৷' এর থেকে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে! মানবদা (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়) মনসামঙ্গল-এর রেকর্ডিংয়ের সময় যে কথাটা বলেছিলেন, এখনও মনে আছে৷ আশির দশকের শেষভাগ৷ মানবদা বললেন, ‘তোমার বড়লোকের বিটি দশ বছর পরও মানুষ শুনছে৷ আরও কয়েক বছর টিকে থাকলে বলা যাবে, এই গান কালজয়ী হয়েছে৷

আজ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় নেই৷ কিন্তু তার কথা সত্যি হয়ে গেছে৷

হ্যাঁ, এত বছর পরও সেই রেকর্ডের গান দু'টোর চাহিদা রয়েছে৷

এই সময়ের গান কতটা শোনেন? সেগুলি কতটা কালজয়ী হতে পারে বলে মনে হচ্ছে?

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এর উত্তর মিলবে অনেক বছর পর৷ তবে আমাদের পরে যাঁরা গান করেছেন, তাঁদের কিছু গান তো থাকবেই৷ যেমন নচিকেতার ‘বৃদ্ধাশ্রম'-এর কথাই ধরুন৷ লোকগানের ক্ষেত্রে স্বপন বসু, গোষ্ঠগোপাল দাসের কথা বলব৷ শুভেন্দু মাইতি, তপন রায় যেমন শিল্পী, তার থেকেও বড় মাপের শিক্ষক৷ আধুনিকে লোপামুদ্রা, শুভমিতা৷ এঁদের গান আমি শুনি৷

এই প্রজন্মের সংগীতচর্চার সার্বিক মান নিয়ে তাহলে আপনি খুশি?

না, কয়েকজন শিল্পীকে বাদ দিলে বাকি ছবিটা কিন্তু তেমন আশাপ্রদ নয়৷ এই যে এত শিল্পী উঠছে, কত দিন টিকবে এরা? নিজস্ব গান নেই, অন্যের গান গাইছে৷ এমনকি নিজস্বতাও নেই৷ ওই যে বললাম, সাধনার অভাব আর চটজলদি খ্যাতি পাওয়ার চেষ্টায় মানের অবনতি হচ্ছে৷ এর মধ্যেও অবশ্য ব্যতিক্রম আছে৷ কালিকা (দোহার-এর কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য) কত ভালো কাজ করছিল, ও আমাদের ছেড়ে চলে গেল৷

তাই কি আপনি এত উদাসীন, নিজেকে গুটিয়ে রেখেছন?

ঠিকই৷ এখনকার এই ব্যাপারগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি না৷ তাই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি৷ এখন আর কোনো অনুষ্ঠানে গান করি না৷ বরং বীরভূমে গানমেলার মতো পার্বণ আয়োজনে একটু সক্রিয় থাকার চেষ্টা করি৷

আজকের এই প্রচারের আলো পেলে আপনার কেমন লাগত?

খারাপ লাগত না৷ কিন্তু গানের সঙ্গে আপস না করে সেটা করতে হতো৷ তাছাড়া আর্থিকভাবেও লাভবান হতাম৷ তখন শিল্পীদের সাম্মানিক সামান্যই ছিল৷ জেলা বেতারে ‘বড়লোকের বিটি' আর ‘বলি ও ননদী' গেয়ে প্রথম ১৫ টাকার চেক পেয়েছিলাম৷ আজকে ভাবা যায়!

এ জন্য কোনো আক্ষেপ...

তা নেই৷ তাই তো পরের জন্মেও আমি শিল্পী হতে চাই৷ সাধনা করে সত্যিকারের শিল্পী৷ মানুষের ভালোবাসা প্রচুর পেয়েছি, ঈশ্বরের আশীর্বাদও৷ তা নিয়ে খেদ নেই৷

সাক্ষাৎকারটি কেমন লাগলো আমাদের লিখে জানান, নীচের ঘরে৷

বিজ্ঞাপন