প্রকৃতিপ্রেমী এক ‘গাছমাস্টার′ | বিশ্ব | DW | 28.11.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

প্রকৃতিপ্রেমী এক ‘গাছমাস্টার'

শিক্ষারত্ন এবং রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও আছে তাঁর ঝুলিতে৷ পুরস্কারগুলো শুধুই গাছপ্রেমের স্বীকৃতি৷ তাঁর জীবন এবং কর্মে গাছ এত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যে পূর্ব বর্ধমানের অরূপকুমার চৌধুরীর অন্য নাম এখন ‘গাছমাস্টার'৷

এ যেন ‘আরণ্যক'-এর যুগলপ্রসাদ৷ তবে বিভূতিভূষণের লবটুলিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তবে পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী-১ ব্লকের নাদনঘাট রামপুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরেই মিলবে এই যুগলপ্রসাদের দেখা৷ এই স্কুলের দেওয়াল জুড়ে শুধুই গাছ নিয়ে লেখা, যাঁর উদ্যোগে এসব, তিনি শিক্ষক অরূপকুমার চৌধুরী৷ তাঁকে বর্ধমানের মানুষ চেনেন ‘গাছমাস্টার' নামে৷

জঙ্গলের বুক চিরে কংক্রিটের স্থাপত্য রুখতে ভারতের চিপকো আন্দোলন ইতিহাসে প্রসিদ্ধ৷ ২০১৮ সালে তারই ৪৫ বছর পূর্তি হলো৷ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের অধিকাংশ মানুষই পরিবেশ সম্পর্কে অসচেতন৷ নিরন্তর গাছ কাটা বা নগরায়নের পরিকল্পনা যে প্রতি মুহূর্তে বিশ্ব উষ্ণায়নের সম্ভাবনা কয়েক লক্ষ গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেটা অনেকেই খেয়াল করেন না৷ বন দপ্তরের প্রাক্তন আধিকারিক প্রশান্ত কুমার রায়ের কথায়, ‘‘উত্তরবঙ্গে গাছ কমে যাওয়ার জন্য আবহাওয়ার পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়৷ গাছ লাগানো ছাড়া পরিবেশ রক্ষার আর কোনো উপায়ই নেই৷ সবাইকে এ নিয়ে ভাবতে হবে৷''

পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে গাছ লাগানোর বিকল্প সত্যিই নেই৷ অনেক শৈশবেই এ কথা বুঝেছিলেন গাছমাস্টার অরূপ চৌধুরী৷ শুরু হয়ে গিয়েছিল গাছ ঘিরে জনচেতনা গড়ে তোলার প্রাথমিক কাজ৷ তিনি বুঝেছিলেন, গাছ লাগানো একমাত্র লক্ষ্য, যেটা পূরণ করলে পরিবেশ দূষণ, অ্যাসিড বৃষ্টি বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের মতো জ্বলন্ত ইস্যুগুলিকে আটকানো যায়৷

অডিও শুনুন 08:38

‘নদীর ধারে ছাত্রদের গাছ লাগাতে বলি, সেগুলি নিজের মতো বেড়ে ওঠে'

স্কুলগুলিকে বা ছাত্রদের গাছ লাগানোয় নিয়মিত উৎসাহিত করেন গাছমাস্টার৷পাশাপাশি নানাভাবে বৃক্ষসৃজনকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছেন৷ মগ্ন বৃক্ষতপস্বী এই শিক্ষক বলেন, ‘‘বর্ষার পর নদীর ধারে ধারে ছাত্রদের গাছ লাগাতে বলি৷ সেগুলি নিজের মতো বেড়ে ওঠে৷ তার পরিচর্যাও করতে বলি৷'' জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীর মতো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলিতে এই শিক্ষকের উপহার থাকে গাছ৷আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সহকর্মীদের বিয়ের আসরে তিনি গাছের চারা উপহার নিয়ে হাজির হন৷ এমনই একটি বিয়ের কনে ইন্দিরা কুণ্ডু ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘বিয়েতে স্যারের দেওয়া মেহগনি গাছের চারা পেয়ে সত্যি অভিভূত হয়েছি৷ এই অভিনব উপহার আমার জন্য যেমন, তেমনি সমাজের জন্যও ভালো৷ গাছের চারাটি আমার নতুন শ্বশুরবাড়িতে লাগানো হয়েছে৷ সবচেয়ে আশ্চর্য, এই গাছ লাগানো দেখে এক প্রতিবেশীও গাছরোপণ করেছেন৷''

বাদ থাকে না অন্তোষ্টিও৷ উজ্জ্বল দে, স্বপন সামন্ত, মমতারানি মণ্ডল বা বাগবুল ইসলামের প্রিয়জনের পারলৌকিক কাজেও অরূপ চৌধুরী বার্তা দিয়েছেন বৃক্ষরোপণের৷ বর্ধমানের ব্যবসায়ী স্বপন মণ্ডল বললেন, ‘‘বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে অরূপবাবু একটি মেহগিনি গাছের চারা দেন৷ বলেন, বাবাকে হয়তো ফেরত পাবো না, কিন্তু বাবার স্মৃতিতে বৃক্ষরোপণ করে বাবার উপস্থিতি হয়তো পাওয়া যাবে৷ তাছাড়া পরিবেশ বা সমাজের জন্য গাছ তো ভালো৷ গাছের বিকল্প নেই৷''

সরকারের তরফ থেকে এ নিয়ে কিছু ভাবা হচ্ছে না? প্রশান্তকুমার রায় বলেন, ‘‘বনদপ্তর থেকে সারা বছর যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি থাকে, সেগুলো পালন করা হয়৷ নন-ফরেস্ট এলাকায় গাছের চারা বিতরণ করা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে৷ পুরুলিয়ার ঊষর ভূমিতে এমন প্রকল্প চলে৷ বাঁকুড়া, মেদিনীপুরের বিভিন্ন ব্লকেও খালের ধারে গাছ লাগানোর প্রবণতা বাড়ছে৷'' তাঁর ভাষায়, ‘‘গত ১৫ বছর ধরে গ্রিন কভারেজ বাড়ছে৷ বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে স্কুলগুলি খুব কাজ করছে৷ তবে প্লাস্টিকের দৌরাত্ম্যে গাছ বিপন্ন৷ সে ক্ষেত্রে অরূপ কুমার চৌধুরীর বৃক্ষসৃজন এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷''  

অডিও শুনুন 03:16

‘এলাকায় গাছ লাগানোর ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ছে’

আজকের দিনে যেখানে রাজ্যের শিক্ষকদের ঘিরে কর্মসংস্কৃতির নানা অভিযোগ ওঠে, সেখানে বর্ধমানের কালনা গেটের বাসিন্দা অরূপকুমার চৌধুরী শিক্ষক মহলে একটা নজির৷ কবিগুরুর শিক্ষাদর্শে প্রকৃতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ৷ সেই পথেই চলেছেন অরূপ চৌধুরী৷ রাজ্য সরকারের দেওয়া শিক্ষারত্ন ও রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নেওয়া জাতীয় শিক্ষকের পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে৷ ইতিমধ্যে কবিগুরুর শান্তিনিকেতনে কবির সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে তিনি বৃক্ষরোপণ করে এসেছেন৷ ছুটে গিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও গাছ লাগাতে৷ শুধুমাত্র গাছ লাগানোতেই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি৷ গাছ লাগানোর পরে সেই গাছগুলো কেমন থাকে, তারও খোঁজও রাখেন তিনি৷স্কুল শিক্ষকেরা একাদশ বা দ্বাদশ শ্রেণির প্রকল্প বা নবাগত পড়ুয়াদের নবীন বরণে গাছ বিতরণ করেন৷ নাদনঘাট রামপুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুকুমার গড়াই বলেন, ‘‘ওঁর পুরস্কারের টাকা দিয়ে স্কুলে গ্রিন ফান্ড তৈরি করতে সাহায্য করেছেন৷ সেখানে থেকে যে সুদ পাওয়া যায়, তা দিয়ে গাছ কেনা হয়৷ আমাদের স্কুলে প্রতি বছরই শিক্ষক দিবসে বা পরীক্ষায় কৃতী ছাত্রদের গাছ দিয়ে বরণ করার রেওয়াজ আছে৷''

অনেক দেশেই সবুজায়ন নিয়ে অনেক সচেতনতা গড়ে উঠেছে ইতিমধ্যে৷‘গাছমাস্টার' সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে গড়ে তুলেছেন তাঁর গাছ লাগানোর লাগাতারআন্দোলন৷ অনেকের কাছে এখন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন গাছমাস্টার৷ বর্ধমানের পরিবেশপ্রেমী এবং রায়ান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘গাছমাস্টারের উদ্যোগে আমাদের স্কুলেই গঠিত হয়েছে স্কুল নার্সারি যোজনা৷ এখানে আমরা চারাগাছ তৈরি করি ও ছাত্রদের বিলি করি৷ ছাত্ররাই এসব চারাগাছ তৈরি করে ও রক্ষণাবেক্ষণ করে৷ এর মধ্যে ২৫০ মেহগিনি গাছ, ১০০ পেঁপেঁ গাছ বিলি করা হয়েছে স্কুল থেকে৷ অরূপবাবুও এখান থেকে প্রচুর গাছ নিয়ে যান৷'' তাঁর মন্তব্য, ‘‘এলাকায় গাছ লাগানোর ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ছে৷ আমাদের স্কুলের মতো আরো কিছু স্কুলে নার্সারি চালু হয়েছে৷ ছাত্ররা বাড়ি নিয়ে গিয়ে গাছ লাগাচ্ছে৷ তা দেখে গ্রামবাসীরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছে বৈকি!''

ব্যক্তিজীবনে এই শিক্ষকের নিঃসঙ্গতা গাছই দূর করে৷ অনেক বছর আগে স্ত্রী বিয়োগের পর থেকে তিনি আরো গাছের সংসারে ডুবে থাকেন৷ একমাত্র পুত্র সুশোভন চেন্নাইয়ে কর্মরত৷ ডয়চে ভেলেকে সুশোভন বলেন, ‘‘আমি ছোট থেকেই বাবাকে দেখেছি গাছ নিয়ে কাজ করতে৷ ক্রমশ সে কাজের পরিধি বাড়ছে৷ এতে আমি গর্বিত এবং আনন্দিত৷'' গাছ নিয়ে অনেক ভাবনা মাথায় রয়েছে অরূপ চৌধুরীর৷ এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্বপ্নটি বাংলাদেশকে ঘিরে৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘বাংলাদেশে ভাষা শহীদদের স্মরণে আমি বৃক্ষরোপণ করতে চাই৷ প্রত্যেক শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক একটি গাছ৷ সেটা আগামী প্রজন্মের প্রেরণা হয়ে উঠবে৷'' নোবেল কমিটির জন্যও প্রস্তাব আছে গাছমাস্টারের৷ তিনি বলেন, ‘‘গাছই দূষণের হাত থেকে বাঁচার অস্ত্র৷ এটাই আমাদের পৃথিবীকে বাঁচাবে৷ নোবেল কমিটি যদি নোবেল প্রাপকদের একটি করে গাছ উপহার দেয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী গাছের গুরুত্ব প্রচারিত হবে৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন