প্রকল্পের নয়-ছয় ও গৌরী সেনের টাকা | আলাপ | DW | 16.10.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

প্রকল্পের নয়-ছয় ও গৌরী সেনের টাকা

বাংলাদেশে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম আর দুর্নীতি এখন আর অবাক করার মতো কোন খবর নয়৷ কত উপায়েই না প্রকল্পের অর্থ নয়ছয় হয়৷ অথচ স্বচ্ছতা আনা গেলে কত কিছুই না হতে পারে!

বালাদেশের সরকারের বাজেটে মোটা দাগে ব্যয়ের দুইটি অংশ থাকে-একটি উন্নয়ন আরেকটি অনুন্নয়ন ব্যয়৷ সড়ক, সেতু, রেলের মতো অবকাঠামো নির্মাণ এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে একটি বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় উন্নয়ন বাজেটে৷ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর অধীনে যার অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন চলে৷ প্রকল্পের এই অর্থায়ন সরকার দুইভাবে করে৷ একটি জনগণের দেয়া কর থেকে টাকা নিয়ে্ আর অন্যটি বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ উন্নয়ন সংস্থা বা দেশগুলো থেকে ঋণ নিয়ে৷ সেই ঋণের টাকাও বছর বছর সরকার জনগণের অর্থ থেকেই পরিশোধ করে৷ তাদের করের যাতে সদ্ব্যবহার হয় সেজন্য স্বাধীনতা উত্তর সরকারের পরিকল্পনা প্রণয়নকারীরা প্রকল্পের মনিটরিং ও মূল্যায়নের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন৷ একটি প্রকল্প তৈরি থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন তারা৷

একটি প্রকল্পের জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট বিভাগ, মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রস্তাবনা তৈরি করতে হয়৷ বেশ কয়েকটি ধাপ আর পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে সেটি পাশ হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেকে, যার সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী নিজে৷ 

এরপর বাস্তবায়নকালীন সময়েও কয়েক ধাপে প্রকল্প মূল্যায়ন চলে৷ এইজন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আলাদা অডিট বিভাগও রয়েছে৷ মোট কথা কোনো প্রকল্পই আসলে কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে বাস্তবায়ন হয় না৷ এরপরও জনগণের টাকার কতটা সদ্ব্যাবহার নিশ্চিত হয়?   

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যেতে পারে অডিট রিপোর্টগুলো থেকে৷ সংবাদমাধ্যমগুলো সেগুলো ধরে বা নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ 

অনিয়মের সূচনা হয় প্রকল্প প্রণয়ন থেকেই৷ অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচ দেখিয়ে বাড়তি টাকার ব্যবস্থা করে৷ কারণে-অকারণে ভ্রমণ, লাখ টাকার বালিশ কেনার মতো সংবাদগুলো তারই নমুনা৷ আবার শুধু কেনাকাটাতেই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই এমন প্রকল্পও নেয়া হয় শুধু অর্থ খরচের জন্য৷ স্থানীয় পর্যায়ে যেখানে নদী বা খাল নেই, সেখানেও ব্রিজ তৈরির প্রকল্প নেয়ার মতো ঘটনা আছে৷ গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটাতেও এমন সব দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে৷

শুধু বাড়তি খরচ ধরেই অনিয়মের শেষ হয় না৷ বাস্তবায়ন পর্যায়ে চলে আরেক ধাপ দুর্নীতি৷ নিম্ন মানের পণ্য সরবরাহ করা, প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না করা, এমনকি শেষ না করেই সমাপ্ত দেখিয়ে টাকা তুলে নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটে৷ যার কারণে কাজের মান খারাপ হচ্ছে, নয়তো প্রকল্পের সুবিধা মিলছে না৷ শুধু ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করতেই কয়েক হাজার কোটি টাকা এক দশকে খরচ করা হয়েছে৷ তার সুফল কতটা মিলেছে সেই প্রশ্নও এখন অবান্তর৷

প্রকল্পের অর্থ শ্রাদ্ধের আরেকটি ভালো উপায় সময়মতো কাজ শেষ না করা৷ বাংলাদেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপির অধীনে যত প্রকল্প পাস হয় তার একটি বড় অংশই সময়মতো শেষ হয় না৷ নতুন করে সেই প্রকল্পের আবার মেয়াদ বাড়ানো হয়৷ মেয়াদ বৃদ্ধি মানেই নতুন খরচের খাত বৃদ্ধি এবং আরো অর্থ বরাদ্দ৷ কথায় আছে, ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন'৷ এভাবে একেকটি প্রকল্প তৈরির সময় যে খরচ ধরা হয় শেষ পর্যন্ত দেখা যায় জনগণের টাকায় তা কয়েকগুণ ছাড়িয়ে যায়৷ সেটি পদ্মা সেতুর মতো ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প থেকে শুরু করে আবাসিক ভবন নির্মাণ সবক্ষেত্রেই ঘটছে৷ এমনকি বিটিসিএলের নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প পাস হওয়ার আগে প্রস্তাব পর্যায়েই পাঁচগুণ ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে (সূত্র: যুগান্তর, ১৮ সেপ্টেম্বর)৷ 

এমন সব কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম ব্যয়বহুল দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ৷ বিশ্বব্যাংক তাদের এক গবেষণায় দেখিয়েছিল, ইউরোপে চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি গড় ব্যয় হয় ২৮ কোটি টাকা, চীনে গড়ে ১৩ কোটি টাকা, ভারতে ১০ কোটি টাকা আর বাংলাদেশের তিনটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় ধরা হয়েছে কিলোমিটার প্রতি গড়ে ৫৯ কোটি টাকা৷ অথচ বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-২০১৯'-এ সড়ক অবকাঠামোর মানের সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল ছাড়া অন্য সব দেশের তুলনায় পিছিয়ে৷ (বাংলা ট্রিবিউন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)

‘গাড়ি ব্যবসায়ীকে স্বাস্থ্যের কাজ', ‘হাত ধোয়া শেখাতে ৪০ কোটি টাকা খরচ!', ‘অবসরের আগ মুহূর্তে বাগিয়ে নিতে ৩১ কোটির প্রকল্প!', ‘চড়া সুদের ঋণে উন্নয়ন, প্রকল্পে বিলাসী ব্যয়', ‘নির্মাণকাজ অসমাপ্ত রেখে দেশ ছেড়েছে বিদেশি কোম্পানি', ‘ব্যবহারের আগেই নষ্ট হচ্ছে ‘অপ্রয়োজনে' কেনা কোটি টাকার আসবাব'; বাংলাদেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত গত এক মাসের সংবাদ শিরোনাম এগুলো৷ 

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখন কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতি বা নয়ছয় তেমন খবরই মনে হয় না৷ এর বিপরীতে বরং এই শিরোনামটিতে নজর দেয়া যেতে পারে: ‘সাশ্রয় ২৮৬ কোটি টাকা, বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত'৷ ২০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনটি  প্রকাশ করেছে দ্য ডেইলি স্টার৷ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) অধীনে একটি প্রকল্পে ২৮৬ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে৷ সেই টাকা দিয়ে তারা আরো ১০টি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে৷ প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি সত্যিকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় তাহলে কত টাকা সাশ্রয় হতে পারে আর সেই টাকা দিয়ে দেশে আরো কত কিছু করা যেতে পারে এটি তারই উদাহরণ৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন