প্যাকেজ আছে, চাকরি নেই | বিশ্ব | DW | 13.05.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

প্যাকেজ আছে, চাকরি নেই

করোনা-কালে বিপুল আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু তাতে চাকরি যাওয়া থামবে কি? গত কয়েক মাসে দেশে ১২ কোটি লোক কাজ হারিয়েছেন।

ভারতের মতো দেশে ২০ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা নিঃসন্দেহে বিপুল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হলো পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম আর্থিক প্যাকেজ। অ্যামেরিকা এবং জাপানের পরে। কিন্তু এই প্যাকেজে শেষ পর্যন্ত উপকৃত হবেন তো দেশের গরিব এবং মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী মানুষ? প্রশ্নটি উঠছে কারণ, সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, বড় অঙ্কের আর্থিক প্যাকেজও সাধারণ মানুষের চাকরি বাঁচাতে পারেনি।

মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছেন, এই প্যাকেজ থেকে সমাজের সমস্ত শ্রেণি উপকৃত হবে। বিশেষ করে ছোট এবং মাঝারি শিল্প, শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিক এবং মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী এই প্রণোদনার সরাসরি সুবিধা পাবে। নিঃসন্দেহে আশার কথা। সাধারণ মানুষ কী ভাবে এর থেকে উপকৃত হবেন তা অর্থমন্ত্রী ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, করোনা-কালে এটাই তো প্রথম প্যাকেজ নয়! এর আগে গত মার্চ মাসেই এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন দেশের অর্থমন্ত্রী। তার ঠিক পর পরই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল। কী লাভ হয়েছিল তাতে?

সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমির (সিএমআইই) সাম্প্রতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। গত কয়েক মাসে, বিশেষত করোনার প্রকোপ এবং লকডাউন চালু হওয়ার পরে গোটা দেশে ১২ কোটিরও বেশি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। কাজ হারানোর পরিস্থিতিতে আছেন আরও বহু মানুষ। শুধু তাই নয়, এর বাইরে বিপুল পরিমাণ চাকরিজীবীর বেতন কমেছে। সমীক্ষা বলছে, এই ১২ কোটি কাজ হারানো মানুষের মধ্যে ২৬ দশমিক তিন শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে কাজ করতেন এবং ২৩ দশমিক নয় শতাংশ মানুষ গ্রামে কাজ করতেন। এর মধ্যে শ্রমিক যেমন আছেন, তেমনই আছেন ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কর্মজীবী। আবার শহরের তথাকথিত হোয়াইট কলার জবের কর্মীরাও এর মধ্যে আছেন। অর্থাৎ, দেশের সবরকম ক্ষেত্র থেকেই কর্মী ছাঁটাই হয়েছে।

ফেরা যাক মার্চ মাসে। লকডাউনের ঘোষণা প্রথম যে দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী করলেন, সে দিন তাঁর বক্তৃতায় উঠে এসেছিল একটি আশ্বাসের কথা। এই কঠিন সময়ে কেউ যাতে কাজ না হারান, সরকার তা দেখবে। কী ভাবে দেখবে? ওই বক্তৃতাতেই সরকার ব্যবসায়ী এবং কর্পোরেট মালিকদের অনুরোধ করেছিলেন, কারও যাতে কাজ না যায়, তা সুনিশ্চিত করা হোক। এ তো গেলো মুখের কথা। মার্চের শেষ সপ্তাহেই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। এপ্রিলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ৫০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করে। বোঝাই যাচ্ছে, সেই প্রণোদনা সাধারণ মানুষের চাকরি বাঁচাতে পারেনি। ছোট ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে পারেনি। শ্রমিকদের প্রাণ বাঁচাতে পারেনি। ছোট চাষীর ফসল বিক্রিতে সাহায্য করতে পারেনি। মধ্যবিত্তকে নিশ্চিন্ত করতে পারেনি।

প্রবীণ অর্থনীতিবিদ দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ''এই ধরনের সময়ে বড় আর্থিক প্যাকেজ নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু সেই প্যাকেজে সাধারণ মানুষের উপকার হচ্ছে না, সেটা এত দিনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। তা হলে টাকাটা যাচ্ছে কোথায়? কাদের হাতে প্রণোদনার টাকা পৌঁছচ্ছে, সেটাই সব চেয়ে বড় প্রশ্ন।'' আরও স্পষ্ট ভাষায় কার্যত সরকারকে আক্রমণ করেছেন কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ ইন্দ্রজিৎ রায়। তাঁর বক্তব্য, ''সরকার যে প্যাকেজ ঘোষণা করে তার মধ্যে নানা রকম অঙ্কের খেলা থাকে। যে টাকা ঘোষণা করা হয়, সেই পরিমাণ টাকা আসলে খরচ হয় না।'' শুধু তাই নয়, ইন্দ্রজিৎবাবুর বক্তব্য, সরকারি প্যাকেজের টাকার একাংশ এক শ্রেণির লোকের হাতে পৌঁছয়। কিন্তু তাদের মাধ্যমে তা গরিব মানুষের কাছে সব সময় পৌঁছয় না। সে জন্যই এত কিছুর পরেও সাধারণ মানুষের দুর্দশার এই ছবি দেখা যাচ্ছে।

ইন্দ্রজিৎবাবুর মতোই অর্থনীতিবিদদের একাংশের বক্তব্য, সরকারের এই প্রণোদনা আসলে বড় কর্পোরেট সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দেয়। সেই সংস্থাগুলি এই প্রণোদনা থেকে মুনাফা করে, আবার পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে চাকরিও কেড়ে নেয়। সিএমআইই-র রিপোর্ট থেকেই তা স্পষ্ট। ফলে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণার পরেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ এবং দেশের বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ আশ্বস্ত হতে পারছে না। সকলেরই বক্তব্য, শেষ পর্যন্ত এই অর্থ কী ভাবে বিলি হবে এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলি কর্মীদের সঙ্গে কী আচরণ করবে, তার উপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

মঙ্গলবার নরেন্দ্র মোদীর প্রণোদনা প্যাকেজ শুনে দেশের কর্পোরেট দুনিয়া যে খুশি তা বুধবার সকালেই বোঝা গিয়েছে। শেয়ার বাজারে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের ভাগ্যও কি ঊর্ধ্বমুখী হবে? উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ। তবে অনেকেরই ধারণা, সাধারণ মানুষের অবস্থা যে তিমিরে ছিল, সে তিমিরেই থাকবে।

বিজ্ঞাপন