পেশিশক্তিতে টিকে ছিল ডায়মন্ড হারবার মডেল?
২৭ মে ২০২৬
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্র দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার। তৃণমূলের দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত ছিল এই এলাকা। ক্ষমতা যাওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে সেই গড় ধূলিসাৎ।
ডায়মন্ড হারবার মডেল
পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে এই ডায়মন্ড হারবার প্রচারে-প্রভাবে একপ্রকার মডেল হয়ে উঠেছিল। রাজ্যের বাকি এলাকা থেকে এই কেন্দ্রকে আলাদাভাবে তুলে ধরার প্রয়াস দেখা গিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যেই। এর মাথায় ছিলেন সাংসদ অভিষেক।
সেবাশ্রয় প্রকল্পের মাধ্যমে ডায়মন্ড হারবারে পৃথক স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বছরের জানুয়ারিতে প্রথম পর্যায়ের শিবির অনুষ্ঠিত হয় ওই সংসদীয় এলাকায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি উন্নততর পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ ছিল। জটিল রোগ ধরা পড়লে অন্যত্র চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাহায্য করা হত সেবাশ্রয় প্রকল্পে। গত ডিসেম্বরে সেবাশ্রয়-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিষেবা শুরু হয়। সেই সময়ে রাজ্যের অন্যান্য সংসদীয় এলাকায় এই পরিষেবা শুরু করেন সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রীরা। নাম দেয়া হয় সেবাশ্রয়।
২০২৪ সালে অভিষেকের উদ্যোগে ডায়মন্ড হারবার সংসদীয় এলাকায় শুরু হয় বার্ধক্যভাতা দেয়ার কাজ। সরকারের বদলে কোনও সাংসদের উদ্যোগে এভাবে ভাতা দেয়ার প্রকল্প অভিনব। ৮৫ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল। তথ্য যাচাইয়ের পরে ৭৬ হাজারের বেশি প্রবীণকে ভাতা দেয়া শুরু হয় জানুয়ারি থেকে। অভিষেক ঘোষণা করেন, আজীবন তাঁর সংসদীয় এলাকার প্রবীণরা এই ভাতা পাবেন। প্রকল্পের নাম দেয়া হয় শ্রদ্ধার্ঘ্য।
কোভিড অতিমারী নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ডায়মন্ড হারবার মডেল কাজে এসেছিল বলে অভিষেক দাবি করেছিলেন। ২০২২-এ সংক্রমণের সময়ে এই এলাকায় বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়। কন্ট্রোল রুম খোলা হয় পঞ্চায়েত এলাকায়। ডক্টর অন হুইলের মাধ্যমে দুয়ারে পৌঁছে যায় মেডিক্যাল টিম। গণহারে কোভিড পরীক্ষা করানো হয়। অভিষেক দাবি করেন, এর ফলে পজিটিভিটি রেট অর্থাৎ সংক্রমণের হার এক শতাংশের নীচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।
রাজ্যের মধ্যে রাজ্য
ডায়মন্ড হারবার এলাকায় এমন কিছু কর্মসূচি অভিষেক নিয়েছিলেন, যা রাজ্যের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠেছিল বলে অনেকে মনে করেন।
এ নিয়ে সাংসদ অভিষেকের আত্মবিশ্বাসের পরিচয় মেলে তার বিভিন্ন ভাষণে। ফলতায় কারচুপির অভিযোগ কোথায় ২৯ এপ্রিলের ভোট বাতিল করে দিয়েছিল কমিশন। এর প্রতিবাদে অভিষেক সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বলেন, "দশ জন্ম আমার ডায়মন্ড হারবার মডেলকে দমাতে পারবে না। বাংলা বিরোধী গুজরাটি গ্যাং এই মডেলকে হারাতে পারবে না। ক্ষমতা থাকলে এখানে লড়ে দেখান।"
যদিও চার মে ফল প্রকাশের পরে আর অভিষেকের হুংকার শোনা যায়নি। বরং তার সেনাপতি, তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান নিজেই ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তৃণমূল জানিয়েছে এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, দলীয় নয়।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এ নিয়ে সমালোচনা শোনা গিয়েছে। দলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ সংবাদমাধ্যমে বলেন, "কোথাও একটা তো গলদ ছিল। একশোবার গলদ ছিল। এটা দলের আত্মসমালোচনার জায়গা। দলের নেতৃত্ব নিশ্চয়ই এটা দেখবেন। একজন গত লোকসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে ওই বিধানসভা থেকে দেড় লক্ষের বেশি ভোটে লিড দিয়েছিলেন। সেই জাহাঙ্গির খান হাতজোড় করে বলছেন, মুখ্যমন্ত্রীর প্যাকেজ দেখে তিনি সরে যাচ্ছেন। এই মডেলে দলের মুখ পুড়েছে।"
সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "আমি মনে করি এসব ডায়মন্ড হারবার মডেল বলে কিছু হয় না। ডায়মন্ডহারবারে সমান্তরাল প্রশাসন তৈরির চেষ্টা ছিল। আসলে যে মডেল বলে কিছু ছিল না, সেটা ফলতার উপনির্বাচন থেকে যেভাবে জাহাঙ্গর পালালেন, তা দিয়েই পরিষ্কার। এটা একটা খারাপ মডেল যেখানে প্রশাসনিক এবং পেশিশক্তিকে ব্যবহার করে এক ধরনের দুষ্কৃতীরাজ তৈরি করা হয়। এটা আদতে দলের উপকার করে না। মানুষেরও উপকার করে না।"
ভেঙে পড়ার চিত্র
ডায়মন্ড হারবার লোকসভার মধ্যে সাতটি বিধানসভা রয়েছে। ডায়মন্ড হারবার, ফলতা, সাতগাছিয়া, বজবজ, মেটিয়াবুরুজ, মহেশতলা ও বিষ্ণুপুর। এই বিধানসভায় ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ১০ লক্ষ ৪৩ হাজার। সব বিধানসভায় লিড ছিল সাবেক শাসক দলের।
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে এই সাতটি কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ৭ লক্ষ ৩৮ হাজার। অর্থাৎ তিন লক্ষের বেশি ভোট কমেছে। এবারের নির্বাচনে ফলতা ও সাতগাছিয়ায় বিজেপি জিতেছে। বাকি আসনগুলি দখলে রেখেছে তৃণমূল।
এই মডেলের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছে ফলতার পুনর্নির্বাচন। এই কেন্দ্রে গত লোকসভা নির্বাচনে অভিষেকের লিড ছিল এক লক্ষ ৬৮ হাজারের বেশি। কিন্তু এবার বিধানসভায় তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট আট হাজারের কম। এক লক্ষ নয় হাজারের বেশি ভোটে বিজেপি প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।
তার থেকে বড় কথা, এখানকার সাবেক বিধায়ক, যিনি নিজেকে চন্দন দস্যু 'পুষ্পা'র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সেই জাহাঙ্গির ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। শুধু তাই নয়, যে সংখ্যালঘুরা গত দেড় দশকে তৃণমূলের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, তারা জোড়াফুল চিহ্নের বদলে বড় সংখ্যায় বেছে নিয়েছেন কাস্তে-হাতুড়িকে।
কলকাতা হাইকোর্ট মঙ্গলবার জাহাঙ্গিরের রক্ষাকবচ প্রত্যাহার করায় তার গ্রেপ্তারি অনিবার্য বলে মনে করা হচ্ছে। গ্রেপ্তারির ভয়ে বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল গা ঢাকা দিয়েছেন। ডায়মন্ডহারবার পুরসভার আট তৃণমূল কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন। এভাবেই নানা ঘটনায় পরিষ্কার হচ্ছে ভাঙনের চিহ্ন।
অতীতে বাম জমানায় কেশপুর ও আরামবাগে এ ধরনের মডেল গড়ে তোলা হয়েছিল যা পালাবদলের পরে ভেঙে পড়ে। ২০০১ সালে সিপিএমের নন্দরানি দল কেশপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ২০০৪ সালে আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রে সিপিএমের অনিল বসু প্রায় ছয় লাখ ভোটে জিতে নজির তৈরি করেন। ২০১১ সালে পরিবর্তনের পরে এই দুটি জায়গায় সবার আগে বামেরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ডায়মন্ডহারবারে কি তৃণমূলের সেই পরিণতি হতে চলেছে?
সুমন বলেন, "প্রশাসন এবং পুলিশ যেদিন পাশে থাকে না, সেদিন দুষ্কৃতীরাজ মুখ থুবড়ে পড়ে। সেটাই জাহাঙ্গীরের পালানো দিয়ে বোঝা গেল। এটা আসলে একটা ক্ষমতার আস্ফালন ছিল। আরামবাগ বা কেশপুরের যখন তথাকথিত পতন হল, দেখা গেল সেটা একেবারে উল্টো দিকে চলে গিয়েছে। আমার ধারণা, সামনের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবারের ফলাফল দেখলে মানুষ বুঝতে পারবেন যে আসলে এই মডেল কী ছিল।"
বাম উত্থানের ইঙ্গিত
গত লোকসভায় ফলতা কেন্দ্রে দুই হাজারের কিছু বেশি ভোট পেয়েছিল সিপিএম। এই বিধানসভা ভোটে ৪০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছে। প্রায় ২০ শতাংশ তাদের প্রাপ্ত ভোট। তৃণমূলের প্রার্থী পেয়েছেন তিন শতাংশের কিছু বেশি ভোট। ১০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছে কংগ্রেস, যা প্রদত্ত ভোটের প্রায় পাঁচ শতাংশ।
ফলতায় সংখ্যালঘু ভোট ৩০ শতাংশের মতো। তাদের অধিকাংশই যে তৃণমূল থেকে বাম ও কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন, তা প্রাপ্ত ভোটের হার দেখে বোঝা যাচ্ছে।
আগামীতে দুটি বিধানসভা ও একটি লোকসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হবে। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ও মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা ও উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট লোকসভা।
নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারী ও রেজিনগরে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর জিতেছিলেন। তারা দুজনেই দুটি আসনে জেতায় একটি কেন্দ্র ছেড়ে দিয়েছেন। বসিরহাট কেন্দ্রে গত লোকসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বরে সাবেক সাংসদ হাজি নুরুল ইসলামের প্রয়াণে আসনটি শূন্য হয়।
সিপিএমের ভোট ফলতায় এক লাফে অনেকটা বাড়লেও এ সব উপনির্বাচনে বিজেপি বিরোধী শিবির কীভাবে লড়াইয়ে নামবে, সেটা স্পষ্ট হতে সময় লাগবে।
নন্দীগ্রামে প্রায় ১০ হাজার ভোটে জেতেন শুভেন্দু। তৃণমূল দ্বিতীয় স্থানে ছিল। বামফ্রন্টের পক্ষে এই কেন্দ্রে লড়ে সিপিআই। রেজিনগরে বামফ্রন্টের কোনও প্রার্থী লড়াইয়ে ছিলেন না। বসিরহাট লোকসভায় বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী লড়লেও তারা ছিল চতুর্থ স্থানে। এখানে আইএসএফ তৃতীয় স্থানে ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক মইদুল ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, "ফলতার ফল দেখে বলা যাবে না বামেরা এখনই বিজেপি বিরোধী পরিসরের অনেকটা দখল করে ফেলেছে। তারা ২০ শতাংশ ভোটও পায়নি। বিজেপি ৭১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সুতরাং এটাকে তুলনা করা যায় না। শুধু সংখ্যালঘু নয়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিরোধী যে উদারনৈতিক, ধর্মনিরপেক্ষ, বামমনস্ক ভোট আছে, সেই ভোট কোন দিকে যায় দেখতে হবে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যেই ভোট চুরির প্রশ্নে তৃণমূলের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন। সেই সম্ভাবনার কী পরিণতি হয় সেটা সময় বলবে।"
তৃণমূলের অস্তিত্ব নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও মইদুল বলেন, "এখনই বলা যাবে না তৃণমূল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সেটা বলার সময় এখনো আসেনি। ঈদের পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাস্তায় নামবেন বলেছেন। তিনি স্ট্রিট ফাইটার। বিরোধী দলের ভূমিকা ফিরে পেয়েছেন। এছাড়া রাজ্য সরকার যে জমি নীতি আনতে চলেছে, সেটা শিল্প বান্ধব হবে বলেই মনে হচ্ছে। অতীতে মমতার জমির আন্দোলন করার অভিজ্ঞতা আছে। এখনকার ধাক্কায় যদি বেনোজল বেরিয়ে যায় তাহলে পুরনো নেতৃত্ব ও নতুন মুখ নিয়ে তৃণমূল ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ফলে পুরসভা, পঞ্চায়েত ও ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত সম্ভাবনা আছে।"