পেশাগত নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশের সাংবাদিকরা | বিশ্ব | DW | 14.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

পেশাগত নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশের সাংবাদিকরা

পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনা যেন বেড়েই চলেছে বাংলাদেশে৷ আর সে কারণে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকরা ভুগছেন নিরাপত্তাহীনতায়৷

সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে হওয়া ছাত্র আন্দোলনের সময় সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনা বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি আবারো আলোচনায় টেবিলে নিয়ে এসেছে৷

সপ্তাহব্যাপী চলা এ ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ৪০ জনেরও অধিক সংবাদকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ইউকে ভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ‘আর্টিকেল ১৯'৷ সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আহত ৪০ জন সংবাদকর্মীর মধ্যে ২২ জন ফটো সাংবাদিক ও চারজন নারী সাংবাদিক আছেন৷

ছাত্র আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আহত হওয়া দ্য ডেইলি স্টার-এর সাংবাদিক সুস্মিতা পৃথা ‘আর্টিকেল ১৯'-কে জানান, তিনি ফুটওভার ব্রিজ থেকে একটি মিছিলের ছবি তুলতে গেলে মিছিলে আংশগ্রহণকারীদের কয়েকজন অস্ত্র হাতে তাঁকে ধাওয়া করে৷ শুধু তা-ই নয়, তারা তাঁকে আটকে রেখে মিছিলের ছবিগুলো মুছে ফেলতে বাধ্য করে৷ অস্ত্রধারীরা এ সময় তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে বলেও জানান পৃথা৷

গত মার্চ মাসে বরিশালের পুরাতন বিউটি হলের সামনে ডিবি পুলিশের এক অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন স্থানীয় সাংবাদিক সুমন হাসান৷ অভিযানের বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বাকবিতণ্ডা হয়৷ এক পর্যায়ে পুলিশ তাঁকে নির্যাতন করা শুরু করে৷ বেধড়ক মারধরের পর তাঁর অণ্ডকোষ চেপে ধরা হয়৷ তখন তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন৷ পরে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার পর জ্ঞান ফিরে এলে আবারো নির্যাতন করা হয় তাঁকে৷

অডিও শুনুন 07:56

‘সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, এ কাজটি করতে চাইলেই তাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন’

এর আগে সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল ছবি তোলার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান৷

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আরো হুমকির মুখে পড়েছে এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পথ ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে৷ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর ২০১৮ সালে প্রকাশিত প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বালাদেশের অবস্থান ১৪৬তম৷ প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান ১৩৮তম ও নেপালেন অবস্থান ১০৬তম৷ পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার অবস্থান যথাক্রমে ১৩৯ ও ১৩১তম৷ অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নীচে রয়েছে বাংলাদেশ৷ সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ ধীরে ধীরে কমে আসছে৷ গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক এ সংস্থাটি বলছে, ২০১২ সালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের তুলনামূলক অবস্থান ছিল ১২৯৷ পরে ২০১৩  সালে দেশটির অবস্থান নেমে দাঁড়ায় ১৪৪তম অবস্থানে৷ আর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে দেশটির অবস্থান ছিল যথাক্রমে ১৪৬ ও ১৪৪তম৷ একই কথা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউস৷ সংস্থাটির ২০১৭ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বর্তমানে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ‘আংশিক স্বাধীনতা' ভোগ  করছে বলে জানানো হয়৷

কেন হামলা হয় সাংবাদিকদের উপর

শুধু বাংলাদেশে নয়, পাশ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনা ঘটছে৷ বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে যেখানে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি, সে দেশগুলোতে সাংবাদিকদের উপর প্রায়ই হামলার ঘটনা ঘটে থাকে৷  জনগণের জন্য নিয়োজিত এই পেশাজীবীদের উপর কেন হামলা হয় এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘সাপ্তাহিক'-এর সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা বলেন, ‘‘বাংলাদেশে সাংবাদিকদের উপর হামলা নতুন কোনো ঘটনা নয়৷'' তাঁর কথায়, ‘‘সরকার কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, জনগণের কোনো দাবি-দাওয়া বা সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং পুলিশ ও দলীয় কর্মীদের দ্বারা দমন-পীড়নের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে চায়৷ পেশাগতভাবেই সাংবাদিকরা এসব দমন-নিপীড়নের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরেন৷ সরকার যা চাপা দিতে চায়, সাংবাদিকরা তা প্রকাশ করে দেন৷ এতে ক্ষিপ্ত হয় সরকার৷'' সাংবাদিকদের এ পেশাগত আচরণের কারণেই পুলিশ কিংবা দলীয় কর্মীরা সাংবাদিকদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের উপর হামলা চালায় বলে মন্তব্য করেন গোলাম মোর্তোজা৷

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক খ. আলী আর রাজী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘অপকর্ম যেন কখনো প্রকাশিত না হয় সে পথটি নিশ্চিত করতেই সাংবাদিকদের উপর হামলা হয়৷ বাংলাদেশে সাংবাদিকদের উপর হামলার ইতিহাস নতুন নয়৷ এক্ষেত্রে নতুন বিষয়টি হলো যে, সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনা বাড়ছে৷'' কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে সাংবাদিকতার নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো নাগরিক সাংবাদিকতা৷ সাংবাদিকতার বহুমুখী এ বিস্তারের ফলে সাংবাদিকরা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে আগের চেয়ে অনেক বেশি৷ ফলে সাংবাদিকদের উপর হামলার সংখ্যাও বাড়ছে৷'' তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকের কাজ হলো ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা৷ কিন্তু যখনই এ কাজটি তাঁরা করতে চাইছেন, তখনই আক্রান্ত হচ্ছেন৷

কীভাবে নিরাপত্তা দেয়া যেতে পারে সাংবাদিকদের

সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন মূলত তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়৷ তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি তাই সারা বিশ্বেই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়৷ বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যেতে পারে – এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম মোর্তোজা বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি মূলত রাষ্ট্রের চলমান রাজনৈতিক পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত৷ একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি৷

তবে আইনগত নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি বাংলাদেশে সাংবাদিকতা চর্চায়ও পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন আর রাজী৷ তিনি বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের শক্তি অর্জন করতে হবে জনগণের কাছ থেকে৷ বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অনেকটাই রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে বন্দি হয়ে গেছে, জনগণের সাথে তাঁদের সম্পৃক্ততা ধীরে ধীরে কমে আসছে৷ সাংবাদিকতা যদি সাধারণ মানুষের নিবর্তনের চিত্র তুলে ধরতে না পারে, তাহলে জনগণ তাঁদের কথা বলবে না৷ পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা তখন দূর্বল হয়ে পড়বে, হুমকির মুখে পড়বে এ পেশাটি৷''

রাহাত রাফি

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন