পেঁয়াজের দরবৃদ্ধি, ভারতনির্ভর আমদানি ও সরকারের সমন্বয়হীনতা | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 08.11.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

পেঁয়াজের দরবৃদ্ধি, ভারতনির্ভর আমদানি ও সরকারের সমন্বয়হীনতা

দেশে প্রতিবছরই কোন না কোন খাদ্যপণ্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে সঙ্কট৷ অল্প ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে৷ যার কারণে দাম চলে যাচ্ছে ক্রেতার নাগালের বাইরে৷ এইজন্য সরকারের সমন্বয়হীনতা ও প্রস্তুতির অভাবই অনেকটা দায়ী৷

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদা বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন৷ চলতি বছর দেশে উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ টনের মত৷ কিন্তু পঁচে যাওয়াসহ নানা কারণে ৮-১০ লাখ টন পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে৷ সেই ঘাটতি পূরণে প্রতিবছরই সাত থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, যার সিংহভাগই আসে ভারত থেকে৷ এবারও আমদানি হচ্ছিল, কিন্তু গত মাসে হঠাৎ দেশটি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে৷ ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের হিসাবেই এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম এক লাফে  ৬৫ ভাগ বেড়ে গেছে৷ বছরের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির হার ২৮৩ ভাগ৷ এখন মিয়ানমার থেকে আমদানি করেও সেই দর নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না৷ মিশর থেকে আসার আগে আপাতত ১০০ টাকার নিচে পেঁয়াজ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী৷

পেঁয়াজ নিয়ে এমন ঘটনা যে এবারই প্রথম ঘটেছে তা নয়৷ ২০১৭ সালের শেষ দিকেও বাংলাদেশে এই পণ্যটির সংকট দেখা দিয়েছিল৷ ভারত তখন পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য ৪৩০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার করে৷ তার প্রভাবে বাংলাদেশে ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি ৭৫ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা হয়েছিল৷ আট দশ লাখ টনের ঘাটতি মেটাতে গিয়েই সরকারকে বারবার এমন হিমশিম খেতে হচ্ছে৷ ২০১৭ সালে আকষ্মিক বন্যার কারণে চাল সঙ্কটেও ঠিক একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল৷

পেঁয়াজ ছাড়াও বাংলাদেশ ভারত থেকে চাল, ডাল, মরিচ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সবজি ও ফল আমদানি করে৷ প্রতিবেশী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দেশটি থেকে আমদানি লাভজনক৷ স্থলপথে দ্রুত আর সহজে পণ্য পৌছানো যায়, সেই সঙ্গে খরচও পড়ে তুলনামূলক কম৷

কিন্তু কিছু খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের উপর অতি নির্ভরতায় বারবারই সঙ্কট তৈরি হচ্ছে৷ দেশে কোন পণ্য কতটুক উৎপাদন হয়েছে, কতটুকু আমদানি প্রয়োজন এবং তা কোন দেশ থেকে আমদানি করা যেতে পারে সেই বিষয়ে সরকারের সমন্বয়ের ঘাটতিও এক্ষেত্রে লক্ষণীয়৷ যার কারণে ভারত কোন পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করলে বা শুল্ক বাড়িয়ে দিলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে৷ এই পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেয়ার মত কোন ব্যবস্থা থাকে না সরকারের হাতে৷ এলসি খুলে নতুন করে অন্য কোন দেশ থেকে পণ্য আমদানি এবং সরবরাহে যেই সময়টুকু লাগে তাতেই বাজার হয়ে ওঠে অস্থির৷ সেই পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটময় করে তোলেন অসাধু ব্যবসায়ীরা৷ 

প্রশ্ন হল এই ক্ষেত্রে সরকারের কী করণীয় আছে৷ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সংস্থা টিসিবি৷ তাদের কাজ,  ‘‘নিদিষ্ট কিছু সংখ্যক নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আপদকালীন মজুদ গড়ে তুলে প্রয়োজনীয় সময়ে ভোক্তা সাধারণের নিকট সরবরাহ করার মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভুমিকা রাখা৷'' পাশাপাশি তারা বাজারে দ্রব্যের দাম মনিটরিং করে, খাদ্য পণ্যের চাহিদা, মজুদ, আমদানির হিসাব নিকাশও রাখে৷ অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিট বা এফপিএমইউ৷ দেশে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব৷ এক্ষেত্রে চাল, গমের উ‍ৎপাদন, মজুদ ও বিশ্ব বাজারের পরিস্থিতি তারা র্পযবেক্ষণ করে৷ দেশে কৃষি পণ্যের উৎপাদন দেখভাল করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর৷ মাঠ পর্যায় থেকে উৎপাদনের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসও৷ দেশে কৃষি বা খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করা এতগুলো সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব আছে৷ একসাথে কাজ করাতো দূরের অনেক সময় একই বিষয়ে তাদের তথ্যেরও মিল থাকে না৷ যেমন এবার পেঁয়াজের উৎপাদন নিয়েই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিবিএসের রয়েছে দুই ধরনের তথ্য৷ যার মধ্যে তফাৎ প্রায় পাঁচ লাখ টনের মত৷

এই বিষয়ে সরকারের আরও মনযোগ দেয়ার সময় এসেছে৷ এই সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে প্রতিবছর খাদ্যপণ্য উৎপাদনের হিসাব ও আমদানির একটি প্রাক্কলন করা উচিত৷ কোন পরিস্থিতিতে কোন দেশ থেকে কতটুকু আমদানি করা যেতে পারে তারও একটি দিক নির্দেশনা ও প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন৷

শুধু আমদানি নয়, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদনে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ৷ দেশে এক একবার কৃষকেরা এক একটি পণ্য উৎপাদন করে বিপদে পড়েন৷ কোনোবার হয়তো চালের দাম কম পেয়ে তারা ঝুঁকলেন আলুতে৷ আলুর বাম্পার ফলনের পর তার দাম হয়তো পড়ে গেল৷ এবারের সঙ্কটের কারণে সামনে হয়তো অনেক কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদনের ঝুঁকতে পারেন৷ কিন্তু পরের বছর হয়তো তার দাম কমে যেতে পারে৷ এই ক্ষেত্রেও সরকারের কেন্দ্রীয়ভাবে একটি পরিকল্পনা থাকা জরুরি৷ কৃষকদের ভর্তুকি দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করে বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ও দাম নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, যেমনটা এখন ইউরোপ করছে৷ ‘কমন এগ্রিকালচার পলিসির' অধীনে কৃষকদের বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি দিচ্ছে তারা৷ যার মূল লক্ষ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষির উপর মানুষের নির্ভর মানুষের ন্যায্য জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা, বাজার স্থিতিশীল রাখা, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সহনীয় দামে ভোক্তাদের কাছে খাদ্যপণ্য পৌছে দেয়া৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন