পুরস্কারে প্রণোদনা, নাকি প্রলোভন? | আলাপ | DW | 14.02.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

পুরস্কারে প্রণোদনা, নাকি প্রলোভন?

‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?' পথিক পথ হারায় অজ্ঞতায়৷ কিংবা বিভ্রমে৷ আর বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বপ্নপূরণের অগ্রপথিকদের পথ হারানোর ভয় কিনা পুরষ্কারের প্রলোভনে!

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ের পর অনুমেয় উচ্ছাসের ঢেউ মানচিত্রজুড়ে৷ অবধারিত পার্শ্চপ্রতিক্রিয়ায় ক্রিকেটারদের গণসংবর্ধনা, আর্থিক প্রণোদনা, এমনকি সংসদে জমি উপহার দেয়া নিয়ে পর্যন্ত হয় আলোচনা৷ ১৭-১৮-১৯ বছরের বিজয়ী বীররা এতে কক্ষচ্যূত-লক্ষচ্যূত হবেন কিনা, সে প্রশ্নটি আশঙ্কার ছোট্ট বিন্দু থেকে আতঙ্কের বিশালাকার নিয়ে ফুলেফেঁপে উঠছে ক্রমশ৷

দীর্ঘ এক জীবন ক্রিকেটের সঙ্গে কাটিয়ে দেয়া জালাল আহমেদ চৌধুরী পুরষ্কারে দোষ খুঁজে পান না৷ এ ক্রিকেট কোচ ও বিশ্লেষক বরং খুঁজতে আগ্রহী পরিমিতিবোধ, ‘‘এটি তো সংস্কৃতি হয়ে গেছে যে, কোনো অর্জনে আমরা তাঁদের পুরস্কৃত করি৷ সে ধারাবাহিকতায় এবারও কোনো ক্ষতি হবে আমার কাছে মনে হয় না৷ তবে এতে পরিমিতিবোধ চাই৷ আমি পরিমাণের কথা বলছি না; বলছি উচ্ছাসের পরিমিতিবোধের কথা৷ কারণ অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়েই তো জীবন শেষ না৷ এটিকে পুঁজি করে ভবিষ্যতকে আরো শক্ত করতে হবে৷ সেজন্য প্রতিটি ধাপেই সুপরিকল্পিত চিন্তাভাবনা থাকা উচিত৷’’

অডিও শুনুন 06:10

‘পয়সাকড়ি যেন ওদের ক্রিকেটচর্চাকে আরো বেগবান করে’

অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে, লাফালাফি হচ্ছে৷ সত্তরের সচেতন চোখে সেটি বেখাপ্পা লাগে না জালালের কাছে৷ তবে ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে সচেতন হবার তাগিদ দেন ঠিকই, ‘‘এখন এদের পুরষ্কার দেবে, এটি খুব স্বাভাবিক৷ কারণ বিশ্বকাপ জয়ের মতো কিছু আমাদের আগে হয়নি৷ উচ্ছাসটা থাকবেই৷ এখন এ ক্রিকেটাররা অর্থকে নানাভাবে ব্যবহার করতে পারে৷ অর্থকে আরো অর্থ পাবার জন্য বিনিয়োগ করতে পারে৷ আবার যে কাজটি তাকে এ অর্থ এনে দিল, সে কাজটির প্রতিও যত্নবান করতে পারে৷ ওরা যেন মৌলিক বিষয় থেকে বিচ্যুত না হয়, সেদিকে ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থার দৃষ্টি রাখা উচিত৷’’

বিশ্বজয়ের অর্জনে ক্রিকেটারদের বৈষয়িক প্রাপ্তির ভিন্ন এক মানেও খুঁজে পান এ ক্রিকেট বিশ্লেষক৷ প্রজন্মের মালা গাঁথেন তিনি এভাবে, ‘‘আগের প্রজেন্মর খেলোয়াড়রা তো কিছুই পায়নি৷ সে প্রজন্মগুলোর পাওনা যদি ওরা আদায় করতে পারে, মন্দ কী! পাক, পয়সাকড়ি আরো পাক৷ কিন্তু সে পয়সাকড়ি যেন ওদের ক্রিকেটচর্চাকে আরো বেগবান করে এবং তা দেখে পরবর্তীতে যারা খেলায় আসবে তাদের যেন আকৃষ্ট করে৷’’ 

তেমনই এক পূর্বপ্রজন্মের প্রতিনিধি নাফীস ইকবাল৷ দুটো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ তিনি খেলেছেন৷ কিন্তু সাফল্যের সোনালি সূর্যটা ছিনিয়ে আনতে পারেননি৷ উত্তরসূরীদের অর্জন তাঁর কাছে তাই ধরা দেয় স্বপ্নপূরণের অনুভূতি নিয়ে, ‘‘আমি ২০০২ এবং ২০০৪ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছি৷ এর আগেও যাঁরা খেলেছেন, দেশের জন্য মাইলফলক কোনো সাফল্য আনতে চেয়েছেন৷ আমিও চেয়েছিলাম৷ কিন্তু  আমাদের সময়ের ক্রিকেট পর্যায়, সুবিধা, মানসিকতা সব ছিল ভিন্ন৷ ২০০৬ সালের তামিমদের সময় থেকে তা বদলে গেছে৷ এরপর সব সময় আশাবাদী ছিলাম যে, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিততে পারব৷ সেটি হয়নি৷ এবার তা হওয়ায় স্বপ্নপূরণের মতো ব্যাপার৷ এটিকে আমি মনে করি, এ বিশ্বকাপ জয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অর্জন৷’’

সে অর্জনে উৎসবের রঙ ছড়াবে, উদযাপনের আলোয় ভরে উঠবে সেটি স্বাভাবিক মনে হচ্ছে নাফীসের কাছে৷ তাতে আকবর-রাকিবুল-শরিফুলদের পা হড়কানোর আশঙ্কা দেখছেন না খুব, ‘‘ওরা অনেক বড় অর্জন নিয়ে এসেছে৷ উদযাপন-উপভোগের হক ওদের রয়েছে৷ এই দলের অধিনায়ক এবং আরো কয়েকজনের সাক্ষাৎকার দেখেছি৷ আমার মনে হয়েছে, এই ছেলেগুলো অনেক পরিণত৷ ওরা জানে, নিজেদের লক্ষ্য কী! সবাই তো এরপর ‘এ' দল, জাতীয় দলে খেলতে চাইবে৷ উল্লাস হবে, উৎসবের আমেজ হবে৷ ওদের ওরা এত পেশাদার যে, এর সঙ্গে ঠিকই মানিয়ে নেবে৷’’

অডিও শুনুন 04:36

‘ওদের পা মাটিতেই থাকবে’

অনূর্ধ্ব-১৯ তো একটি ধাপ মাত্র৷ আর ক্রিকেটার মাত্রই সবচেয়ে বড় স্বপ্ন দেখেন, জাতীয় দলে খেলার৷ যুব বিশ্বকাপ জয়ে উপচে পড়া পুরষ্কারও তা ফিকে করে দিতে পারবে না বলেই সাবেক এই ব্যাটসম্যান নাফীসের বিশ্বাস, ‘‘অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা উৎসব শেষে আবার খেলায় ফিরবে৷ ওদের পা মাটিতেই থাকবে৷ এবং সত্যিকারের যে স্বপ্ন, তা পূরণের চেষ্টা করবে৷ এই উদযাপন ওদের প্রাপ্য৷ আমার কোনো ভয় নেই যে, এটির পর ওরা বিগড়ে যাবে৷’’

আরেক সাবেক ক্রিকেটার তারেক আজিজের মনের গহীনে কিন্তু ভয়ের সে চোরাস্রোত বইছে৷ পুরষ্কার-পুরষ্কারে খেলোয়াড়দের অতি মূল্যায়ন নিয়ে চিন্তিত তিনি, ‘‘ধরুন আমি আইফোনের যোগ্য না৷ কিন্তু আমার হাতে আপনি আইফোন ধরিয়ে দিলেন৷ তাহলে এর ব্যবহারের ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকটা তো ভেবে দেখতে হবে৷ আমরা যেন তাই এ ক্রিকেটারদের অতি মূল্যায়ন না করি৷ কোনো সন্দেহ নেই, এ বিশ্বকাপ জয় আমাদের ক্রিকেটের সেরা অর্জন৷ কিন্তু এটিকে যদি অতি মূল্যায়ন করি এবং তাতে মূল জায়গা ক্রিকেটে যদি ক্রিকেটাররা মনোযোগ রাখতে না পারেন, তাহলে তা বুমেরাং হতে পারে৷ অতীতে আমরা তা দেখেছি৷’’

পুরস্কারকে তিরষ্কার করছেন না তারেক৷ তবে তা যেন ক্রিকেটে ক্ষতি না করে, সেদিকে নজরের আকুতি সাবেক এই পেসারের, ‘‘পুরস্কার দেয়া দোষের কিছু না৷ যে কোনো পুরস্কারই কাজে গতি আনে৷ কিন্তু মিডিয়া, বোর্ড, সাধারণ মানুষ, ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট লোকজন মিলে যেন এ ছেলেগুলোর মূল মনোযোগ নাড়িয়ে না দেয়৷ দামী বাড়ি-গাড়ি, ফোন যেন ওদের ক্রিকেটে ক্ষতি না করে৷ আর এ বিষয়ে ক্রিকেটারকেই সবচেয়ে বেশি সজাগ থাকতে হবে৷’’

অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে এমন সাফল্যশিখর আগে স্পর্শ করেনি বাংলাদেশ৷ এমন পুরষ্কারের ডালিও সাজনো ছিল না কখনো৷ তবু এখান থেকে টুপটাপ ঝরে গেছে কত প্রতিশ্রুতিশীল! পথ হারিয়েছে কত কত প্রতিভা!

পুরস্কারের শঙ্কাটা তো সেখানেই পরিষ্কার৷ প্রণোদনার বদলে সেটি না প্রলোভনের ফাঁদ হয়ে যায়! 

 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন