পিঠার আদ‌িঅন্ত | আলাপ | DW | 14.01.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

পিঠার আদ‌িঅন্ত

হাতের কাঁকন দিয়ে কেনা দাসী কাঁকনমালার কূটবুদ্ধিতে পরাজিত হলে রাণী কাঞ্চনমালার জীবনে নামে ঘোর অমানিশা৷ শেষে এক সুতাওয়ালার সাহায্যে চন্দ্রপুলী, মোহনবাঁশি, ক্ষীরমুরলী পিঠা বানিয়ে কাঞ্চনমালা প্রমাণ করেন যে তিনিই প্রকৃত রাণী!

আর দাসী কাঁকনমালা? আস্কে, চাস্কে আর ঘাস্কে পিঠা বানিয়ে বেচারি বেঘোরে নিজের পৈতৃক প্রাণটা খুইয়েছিলেন জল্লাদের হাতে৷

যে জনপদে পিঠা বানিয়ে নিজের পরিচয় এবং অধিকার ফিরে পাবার গল্প লোকমুখে ঘুরতে থাকে প্রজন্মান্তরে, সে জনপদের খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠা যে জনপ্রিয় আর গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, তা বলাই বাহুল্য৷

‘পিঠা' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পিষ্টক' শব্দ থেকে৷ আবার পিষ্টক এসেছে ‘পিষ্' ক্রিয়ামূলে তৈরি হওয়া শব্দ ‘পিষ্ট' থেকে৷ পিষ্ট অর্থ চূর্ণিত, মর্দিত, দলিত৷ হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ বইয়ে লিখেছেন, পিঠা হলো চাল গুঁড়া, ডাল বাটা, গুড়, নারিকেল ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি মিষ্টান্নবিশেষ৷ বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশষ্য ধান৷ ধান থেকে চাল এবং সেই চালের গুঁড়ো পিঠা তৈরির মূল উপাদান৷

ভারত উপমহাদেশীয় সভ্যতার প্রেক্ষাপটে কখন থেকে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তার কোনো লিখিত বিবরণ নেই৷ প্রচলিত গল্প, প্রাচীন বইপত্র থেকে এর প্রাচীনত্ব নির্ণয় করা কিছুটা কঠিনই বটে৷ সংস্কৃত সাহিত্যে ‘পিষ্টক' শব্দটির উল্লেখ মেলে৷ সেই সূত্রে বলা চলে ভারতীয় উপমহাদেশে পিঠা খাবার প্রচলন অনেক প্রাচীন৷ বাংলাভাষায় লেখা কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি কাব্য এবং ময়মনসিংহ গীতিকার কাজল রেখা আখ্যানের সূত্র ধরে গত আনুমানিক পাঁচশ' বছর সময়কালে বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠার জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করা যায়৷ যেহেতু প্রাচীন বইপুস্তকে পিঠার কথা এসেছে, তাই ধরে নেওয়া যায়, পিঠা খাবার প্রচলন বাঙালি সমাজেও অনেক প্রাচীন৷ বিশাল উপমহাদেশে বসবাস করা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পিঠা যে জনপ্রিয় খাবার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই৷ তবে আমরা আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো রাজনৈতিকভাবে পৃথক হয়ে যাওয়া বর্তমান বাংলাদেশের মধ্যে৷

বাংলাদেশে, এই একুশ শতকের শহুরে জীবনে সারা বছরই প্রায় পিঠা খাওয়া হয় দোকান থেকে কিনে৷ কিন্তু গ্রামীণ পরিসরে সারা বছর পিঠা খাওয়ার প্রচলন নেই৷ সেখানে শীতই হচ্ছে পিঠা বানানোর আদর্শ সময়৷ কৃষিসংস্কৃতির সাথে গ্রামীণ মানুষের প্রত্যক্ষ যোগাযোগই এর কারণ৷ অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান উঠে যাবার পর সেগুলো গোলাবন্দি করতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়৷ এই কর্মব্যস্ত সময়ে গ্রামীণ মানুষের ‘শখ' করার সময় থাকে না৷ নবান্ন করার পর ধীরেসুস্থে জাঁকিয়ে শীত পড়লে পৌষের সংক্রান্তিতে পিঠা তৈরির আয়োজন করা হয়৷ তারপর বসন্তের আগমন পর্যন্ত চলে হরেক পদের পিঠা খাওয়া৷ মূলত মাঘ আর ফাল্গুন এই দুই মাসই জমিয়ে পিঠা খাওয়া হয়৷ এর পরে আর পিঠার স্বাদ পাওয়া যায় না ঠিকমতো৷ নতুন ধান থেকে তৈরি চালে যে সুঘ্রাণ আর আর্দ্রতা থাকে, পিঠা বানানোর আটা তৈরিতে সেই চাল আদর্শ৷ ধান যত পুরাতন হতে থাকে ততই সে আর্দ্রতা হারাতে থাকে৷ ফলে সেই চালের আটায় তৈরি পিঠা আর সুস্বাদু থাকে না আগের মতো৷ হেমন্তে নতুন ধান উঠে গেলে নারীরা ঢেঁকিতে পিঠার জন্য চালের আটা বানাতো৷ ‘বানাতো' বলছি, কারণ, এখন আর ঢেঁকির প্রচলন নেই৷ এখন ‘কল' থেকে আটা তৈরি করে আনা হয়৷

বাংলাদেশের বিস্তীর্ন জনপদে ঠিক কত পদের পিঠা প্রস্তুত হয় তার সঠিক কোনো হিসাব নেই৷ পুরো বাংলাদেশে জনপ্রিয় কিছু পিঠার কথা আমরা বলতে পারি৷ এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, তেলের পিঠা, পুলি পিঠা, ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, দুধ পিঠা, রসের পিঠা, নকশি পিঠা ইত্যাদি৷ সব ধরনের পিঠার মূল উপাদান নতুন ধানের আতপ চালের গুঁড়ো৷ এর সাথে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরিতে বিভিন্ন উপকরণ যোগ করা হয়৷ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে তৈরি পিঠা রন্ধনপ্রণালীগতভাবে দুই প্রকার— ভাজা এবং ভাপা৷ এই ভাজা এবং ভাপা দু'ধরনের পিঠাকে কখনো দুধে চুবিয়ে দুধ পিঠা আবার কখনো চিনি অথবা গুড়ের শিরায় বা খেজুরের রসে ভিজিয়ে রসের পিঠা তৈরি করা হয়৷ নকশি পিঠা আদতে নকশা করা ভাজা পিঠা৷ এটিকে দুধ, খেজুরের রস, চিনি বা গুড়ের শিরায় ভিজিয়ে অথবা না ভিজিয়েও খাওয়া যায়৷

পিঠার আলোচনায় ‘পুলি পিঠা' বেশ গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ, পুলি পিঠা হচ্ছে একমাত্র পিঠা, যাতে পুর দেওয়া হয় বিভিন্ন উপাদানের৷ পুলি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পোলিকা' থেকে৷ প্রাচীন মতে, পোলিকা হলো ভারী রুটি৷ এদিকে হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ বইয়ে জানাচ্ছেন, পুলি/পুলী হচ্ছে নারকেলের পুর দেওয়া খাদ্যবিশেষ৷

পুলি পিঠার প্রধান পুর হচ্ছে নারকেল৷ তবে অঞ্চল ভেদে নারকেলের সাথে তিল, আখ বা খেজুরের গুড়, আদা, ক্ষীর ইত্যাদির পুর দেওয়ার প্রচলন রয়েছে৷ পুলি পিঠা তেলে ভেজেও খাওয়া হয়৷ আবার ভাপিয়ে দুধে ভিজিয়েও খাওয়া হয়৷ এছাড়া পুলি পিঠা হাতে নকশা করে অথবা ছাঁচেও নকশা করে তৈরি করা হয়৷ 

অনার্য তাপস

অনার্য তাপস, লোকসংস্কৃতিবিষয়ক গবেষক

আমরা ‘পিঠাপুলি' শব্দবন্ধটি ব্যবহার করি মূলত পুর ছাড়া এবং পুর দেওয়া পিঠাকে একসাথে বোঝাতে৷ ‘পিঠাপুলির আয়োজন' বলতে আমরা বুঝি, এই আয়োজনে যেমন চিতই পিঠা, তেলের পিঠা, নকশি পিঠা, দুধে বা রসে ভেজানো পিঠা থাকবে, তেমনি নারকেল বা অন্যান্য জিনিসপত্রের পুর দেওয়া ভাজা বা ভাপা পুলিও থাকবে৷ জানিয়ে রাখি, মূলত পাটিসাপটা পিঠাও উৎসগতভাবে পুলিপিঠার অন্তর্গত৷ এটাও জানিয়ে রাখি, একমাত্র ভাপা পিঠা বা ধুকি/ ধুপি পিঠা ছাড়া যে-কোনো ধরনের ভাজা বা ভাপা পিঠাকে দুধে বা রসে ভেজানো যায়৷

আদিতে পিঠা মিষ্টি খাবার হিসেবেই খাওয়া হতো৷ এখনো বাংলাদেশের বেশিরভাগ পিঠা মিষ্টি জাতীয় এবং গুড়সহযোগে খাওয়া হলেও কখনো কখনো ঝাল পিঠা খাওয়ারও প্রচলন রয়েছে৷ যেমন— চিতই পিঠা সরিষা বাটা কিংবা মরিচের ভর্তা বা শুটকির ঝাল ঝাল ভর্তা দিয়েও খাওয়া হয়৷ আবার ছিটা পিঠার আটায় মরিচ বাটা মিশিয়ে ঝাল করে ভাজা হয়৷ ছিটা পিঠা আবার হাঁসের মাংস দিয়েও খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে৷ তবে চিতই পিঠা খাবার আদি পদ্ধতি হলো ঝোলাগুড় সহযোগে খাওয়া৷ বেশিরভাগ পিঠা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাওয়া হলেও কিছু পিঠা আছে আঞ্চলিক, যেগুলো নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে তেমন একটা খাওয়া হয় না৷ যেমন— সিলেটের চুঙ্গি পিঠা, বিক্রমপুরের বিবিখানা পিঠা ইত্যাদি৷

মিষ্টি মণ্ডার চাইতে সম্ভবত প্রাচীন বাংলায় মিষ্টান্ন হিসেবে পিঠার জনপ্রিয়তা ছিল বেশি৷ চৈতন্যচরিতামৃতে দেখা যায়, ‘পঞ্চাশ ব্যাঞ্জনে'র সাথে তৈরি হচ্ছে ‘ক্ষীর পুলি নারিকেল পুলি আর পিষ্ট'৷ বাঙালি এক আধখানা পিঠা খায় না, খায় থালা ভরে৷ কাজল রেখা আখ্যানে এই থালা ভরে পিঠা খাবার নমুনা দেখা যায়— ‘চই চপরি পোয়া সুরস রসাল৷/ তা দিয়া সাজাইল কন্যা সুবর্ণের থাল৷' প্রাচীন বাংলার মতো এখনো বাঙালি থালা ভরে, গণ্ডা (৪ টায় এক গণ্ডা) গুনে পিঠা খায়৷ মিষ্টান্ন তো আর একা খাবার জিনিস নয়৷ তাই বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ে দেখা যায়, বছরের প্রথম দিনে বানানো প্রথম পিঠা ঘরের চালের উপর দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া হয় যাতে ‘শেয়াল-কুকুরে' তা খেতে পারে৷ কোনো কোনো অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়েও এই প্রথা দেখা যায়৷

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারীরাই বয়ে নিয়ে চলেছে পিঠা তৈরির পরম্পরাগত বিদ্যা৷ রন্ধনশিল্পে বিভিন্ন অংশে পুরুষের প্রবেশাধিকার থাকলেও পিঠা তৈরির ক্ষেত্রটি তাই নারীদের অধিকারেই থেকে গেছে সুদীর্ঘকাল ধরে৷ ঐতিহ্যের সাথে স্বাদের সমান বিন্যাসের গুপ্তবিদ্যাটি সেকারণে এখনো মেলে গৃহিণীদের অভিধানেই৷

তথ্য ঋণ ও কৃতজ্ঞতা:

১.  মিলন দত্ত, বাঙালির খাদ্যকোষ, দে'জ পাবলিশিং, কোলকাতা, ২০১৫৷

২.  হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, বঙ্গীয় শব্দকোষ, কলকাতা, ১৩৪১ ববঙ্গাব্দ৷

৩. দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, ঠাকুরমার ঝুলি, আর্টস ই বুক, বিডিনিউজ২৪.কম, ২০১১৷

৪.  বিধুভূষণ ভট্টাচার্য৷

অনার্য তাপসের লেখাটি কেমন লাগলো লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন