পাহাড়ে মুখরিত ঈদ | আলাপ | DW | 06.05.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

পাহাড়ে মুখরিত ঈদ

সয়াবিন তেল যখন সোনার হরিণ, মুদ্রাস্ফীতি যখন চোখ রাঙাচ্ছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে নিত্যপণ্যের বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন গ্রীষ্মের খরতাপে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা নিম্ন আয়ের মানুষের৷ এর মাঝেই এলো ঈদ৷

রাঙামাটি শহর

রাঙামাটি শহর

এত্তসব যন্ত্রণার মাঝেও ঈদ উৎসবে বর্ণিল ছিল গোটা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ৷

উৎসবের আমেজের বাইরে ছিল না দেশের পার্বত্য জনপদও৷ বরং পুরো এলাকা জুড়ে ছিল উৎসব মুখরতা৷ এর অন্যতম কারণ গত দুটি বছর উৎসবের বাইরে ছিল পুরো দেশ৷

করোনা ভাইরাস মহামারি আঘাত হানলে সংক্রমণ ঠেকাতে মানুষকে আটকে থাকতে হয়েছে চার দেয়ালের মাঝে৷ লকডাউন, শাটডাউন, স্ট্রিক্ট ভিউ, সামাজিক দূরত্ব নানা নতুন নতুন শব্দ এসময় পরিচিত হয়ে ওঠে করোনা ভাইরাসকে মোকাবিলায়৷ পুরো দেশজুড়ে তৈরি হয় অচলাবস্থা৷ ফলে ঈদ এলে প্রিয়জনের কাছে ফেরা, বাড়ি ফেরার যে আকুলতা, উদ্বেলতা সেটাও দেখা যায়নি গত দু বছরে৷

চারটি ঈদ আর দুটি বর্ষবরণ উৎসবের আনন্দ আয়োজন থেকে বঞ্চিত হয় গোটা দেশের মতো পাহাড়ের মানুষ৷ কিন্তু পাল্টে গেছে সে দৃশ্যপট৷ করোনা প্রতিরোধী টিকার দ্বিতীয় ডোজ শেষে চলছে বুস্টার ডোজ, সংক্রমণও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, তাই নেই কোনো বিধিনিষেধ৷ মানুষ তার দুঃখ-কষ্ট, জীবন জীবিকার কথা ভুলে মেতে ওঠে উৎসবের রঙে৷ অন্তত বিপণি বিতান ঘুরে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে৷

অভিযোগ এসেছে এবারের পোশাকের মূল্য ছিল অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি৷ কিন্তু তাতে আটকায়নি ক্রেতারা৷ দুই বছর ধরে সন্তানদের জন্য কিছু কিনতে না পারার আক্ষেপ, তাদের শৈশবের ঈদ চুরি যাওয়া দুঃখ ভোলাতে অভিভাবকরা ছিলেন বেশ উদার৷ সন্তানদের বায়না পূরণে দ্বিতীয় কথাটি ভাবেননি তারা৷

পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল উৎসব বৈসুক-সাংগ্রাই-বিঝু৷ এবারও সেই উৎসবে মেতেছে সবাই৷ কারণ ছিল না কোনো বিধি-নিষেধ৷ কিন্তু রমজান মাস চলমান থাকায়, সেই উৎসবে কিছুটা ভাটার টান ছিল৷ বাঙালি সম্প্রদায়ের বড় অংশ ইসলামধর্মানুসারী হওয়ায় তাদের আথিতেয়তা করা সম্ভব হয়নি পাহাড়িদের পক্ষে৷

ধর্ম-বর্ণ ভুলে যে নতুন বছর বরণের এ উৎসবে সব আয়োজন থেকেও এসব কারণে রঙ ছিল কিছুটা ফ্যকাশে৷ কিন্তু সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিয়েছে ঈদ৷

রাঙামাটি শহরে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছেন তরুণ পরিবেশবাদী সংগঠক ফজলে এলাহী৷ তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল, ‘জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির যে মান-অভিমান’ (শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে টানাপড়েন), উৎসবকে ঘিরে সেটার খুব একটা প্রভাব এবার পড়েনি রাঙামাটিতে৷

‘‘এছাড়া গত দু বছরের হিসাবটা দেখলেও বোঝা যায়, বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোনো খবর আসেনি৷ ফলে পারস্পরিক আস্থা ও ভরসা দেখা গেছে এবার পাহাড়ে৷ আর এ কারণে পাহাড়ে ঈদ উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে এলেও এবার যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা৷’’

ঈদের আগের রাতে কালবৈশাখী মৃদু আঘাত হেনেছে রাঙামাটিতে৷ তাতেও উৎসবের বর্ণিলতায় কোনো প্রভাব পড়েনি৷ তবে বাহারি পোশাকে শিশু-কিশোর থেকে বয়স্করা ছুটে গেছেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে৷

পোশাকের কেনাকাটায় রাঙামাটিবাসী এখনও বারোয়ারি দোকানেরওপরই নির্ভরশীল৷ স্থানীয় টেক্সটাইল ছাড়া তেমন কোনো ব্র্যান্ডশপ এখানে গড়ে ওঠেনি৷ দেশীয় বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো আউটলেটও নেই এই শহরে৷ বেশিরভাগ পোশাক ব্যবসায়ী ঢাকা থেকে পাইকারি দরে নানা পোশাক কিনে এনে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করে৷

ব্যবসায়ীদের দাবি, পোশাক কেনা, পরিবহণখরচ, দোকান ভাড়া, কর্মচারির বেতন সব মিলিয়ে যেটুকু লাভ না করলে নয়, সেই লাভটুকু রেখে বিক্রি করছেন তারা৷ ফলে পোশাকের মূল্য কিছুটা বেশি হলেও সেখানে তাদের তেমন হাত নেই বলে জানালেন খুচরা ব্যবসায়ীরা৷

তাতে অবশ্য বিক্রি আটকায়নি৷ বর্ষবরণ উৎসব যেতে না যেতেই আবার ঈদ৷ সব মিলিয়ে জম্পেশ বিক্রি করেছেন তারা৷ তবে কেউ কেউ দাবি করেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দ না হলেও আশানুরূপ বিক্রিটা হয়নি৷ তবে বেশিরভাগ বলেছেন, দুই বছর পর এই রমজানে ব্যবসা হয়েছে৷ আর তাতেই দারুণ সন্তুষ্ট তারা৷

তবে রাঙামাটি শহরের কেনা-বেচা আসলে অর্থের অংকে কত দাঁড়িয়েছে তা অবশ্য জানা যায়নি৷ তেমন কোনো পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি৷

তবে নিত্যপণ্যের বাজার ভুগিয়েছে সাধারণ মানুষকে৷ এমনিতে বাজার চড়া, তার ওপর ঈদকে সামনে রেখে কাঁচা মরিচ, শসা, টমেটো, গাজরের মতো পণ্যের দাম কেজিতে প্রায় ১০ থেকে ৩০টাকা

পর্যন্ত বেড়ে গেছে৷ সেমাইর বাজার কিনতে গিয়ে চিনিতে কেজি প্রতি গুণতে হয়েছে ৮০ টাকা, যা ছিল মরার খাড়ার ঘা৷

তানজীর মেহেদী, সাংবাদিক

তানজীর মেহেদী, সাংবাদিক

রাঙামাটিতে ব্যবসার মূল প্রাণ কাঠ, বাঁশ আর মাছ৷ এদিকে প্রজনন সুবিধার্থে কাপ্তাই লেকে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন৷ ফলে অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছেন বিপাকে৷ মাছ বিক্রি করে তাদের আয় বন্ধ আছে৷ আবার অন্য দিকে স্থানীয় মাছ না থাকায়, মাছের দাম ছিল বেশ চড়া৷ এক কেজি রুই মাছের দাম সাড়ে তিনশ ছাড়িয়েছে৷

ব্যবসায়ী কিরো চৌধুরী বললেন, ‘‘মানুষের হাতে নগদ টাকার সংকট আছে৷ নগদ টাকা না থাকলে, কিসের উৎসব, কিসের কী? কিন্তু অনেকদিন পর উৎসবকে জমকালো করতে অনেকে ধার-দেনা করেও বাজার করতে কার্পণ্য করেনি৷’’

ঈদের পর ৫ মে ছুটি নিলে সরকারি চাকরিজীবীদের ছুটি দাঁড়িয়েছে ৯ দিনে৷ ফলে দারুণ উপভোগের চেষ্টা ছিল সবার মধ্যে৷ এই সময়ে ভ্রমণ পিয়াসী মানুষেরা ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের নানা প্রান্তে৷ যেহেতু রাঙামাটি পর্যটকদের তীর্থস্থান, ফলে ঈদের মধ্যে পর্যটকদের আনাগোণাও ছিল চোখে পড়ার মতো৷

রাঙামাটির স্থানীয় বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর মতে, ‘‘অনেক দিন পর এতটা উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে রাঙামাটিতে৷ গরমে কাপ্তাই লেকের জল শুকিয়ে গেছে৷ তাতে অবশ্য রূপ কমেনি লেকের৷ প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ বোট নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছে এদিকে সেদিক৷’’

এ ছাড়াও জীবিকা, কিংবা পড়াশোনার প্রয়োজনে যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকেন, ঈদ ছুটিতে তারাও ভিড় জমিয়েছেন পাহাড়ে নিজ বাড়িতে৷ সব মিলিয়ে জম্পেশ ঈদ কাটিয়েছে পাহাড়ের মানুষ৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়