পার্বত্য চুক্তির ১৯ বছর: অন্য চোখে দেখা একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা | আলাপ | DW | 13.12.2016
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

পার্বত্য চুক্তির ১৯ বছর: অন্য চোখে দেখা একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

ডিসেম্বর আসলেই পার্বত্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চোখে পড়ে৷ অর্থাৎ চুক্তির ভালো-মন্দ, সাফল্য-ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা৷ তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও বর্তমান প্রেক্ষাপটকে ভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস দেখি না৷

‘পিস ডাজ নট মিন জাস্ট টু স্টপ ওয়ার, বাট অলসো টু স্টপ অপরেশন অ্যান্ড ইনজাস্টিস'

শুরুতেই বলে নিই যে, এই লেখাটা কেবলমাত্র পার্বত্য চুক্তি নিয়ে লেখা নয়৷ আমি চুক্তিকেন্দ্রিকতার বাইরে কিছু বলতে চাই৷ এই লেখার সীমিত পরিসরে আমার আলোচনা অসম্পূর্ণ হতে পারে, তবে আমি মূল প্রসঙ্গ নিয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করে যাবো৷

চুক্তির ১৯ বছর পার হয়েছে৷ জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) বক্তব্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে৷ যদিও সরকারের তরফ থেকে ৪৮টি ধারা বস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা হয়৷ ১৯ বছরে চুক্তির মাত্র এক তৃতীয়াংশ বাস্তবায়িত হয়েছে! তাই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা দশ দফার ভিত্তিতে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন৷

সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি এ কথাও বলেন যে, চুক্তির কয়টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে তা অঙ্কের হিসাবে মেলানোর বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে চুক্তির মূল ‘স্পিরিট' বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা সেটা দেখা৷ তাঁর মতে, এই মূল বিষয়টি হচ্ছে পার্বত্য এলাকার অধিবাসীদের ক্ষমতায়ন৷ আমি মনে করি, চুক্তির মূল ‘স্পিরিট' শুধুমাত্র পার্বত্য এলাকার অধিবাসীদের ক্ষমতায়ন নয়, লেখার শুরুতে তাভাকোল কার্মান-এর উদ্ধৃত করা বাণীটিই হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সহ সকল শান্তি প্রক্রিয়ার আসল কথা৷ কেননা পাহাড়ে শান্তি আনার প্রত্যাশা থেকেই চুক্তি করা হয়েছিল৷ সকল নিপীড়ন, অনাচার, অত্যাচারের সমাপনী ঘটাতে চুক্তি হয়েছিল৷

চুক্তির অন্যতম প্রধান ত্রুটি হচ্ছে সেখানে সেটলারদের পূনর্বাসন নিয়ে কিছুই লেখা হয়নি৷ চুক্তির প্রাক্কালে জনসংহতি সমিতির দাবির প্রেক্ষিতে সেটলারদের সমতলে পূনর্বাসন করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘‘কথা দিয়েছিলেন''৷ না লিখে-পড়ে কথার দেওয়া-নেওয়ায় নিশ্চয় চুক্তি হয় না?! চুক্তির ত্রুটি ছাড়াও নানান অসংগতি, দূর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা আছে৷ এ সব নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়ে আসছে৷ তবে একটা বিষয় আমার নজরে আসেনি৷ সেটা হলো – বর্তমান যুগবাস্তবতায় আদিবাসীরা যে নতুন নতুন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, যে সংকট বিমোচনের কথা পার্বত্য চুক্তিতে উল্লেখ নেই, তার মোকাবিলা কীভাবে হবে? যেমন ধরা যাক, বর্তমান নিওলিবারেল বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় সারা দুনিয়ার আদিবাসীরা উন্নয়ন আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে৷ আজ চুক্তির ১৯ বছর পরে আদিবাসীদের সামনে হাজির হওয়া এই উন্নয়ন দানবকে কীভাবে সামলাতে হবে তা সেখানে উল্লেখ নেই৷ রাষ্ট্র তার জিডিপি-প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পাহাড়ে পর্যটনকে ‘প্রমোট' করছে, কিন্তু তার ফলে পাহাড়ে সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র (মনোপলি) ব্যবসা বাড়ছে৷ আদিবাসীরা তাদের মাটি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে৷ টুরিজম ‘ডেভেলপ' হবার সাথে সাথে গোটা পাহাড়-প্রকৃতি-মানুষ-সংস্কৃতি সবকিছুর পণ্যায়ন হচ্ছে৷ যদিও চুক্তি অনুযায়ী পর্যটন খাত জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, কিন্তু জেলা পরিষদের এখতিয়ার বা ক্ষমতা দূর্বল করে রাখা হয়েছে৷

চুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন আলোচনায় আরেকটা বিষয় অনুপস্থিত৷ তা হচ্ছে চুক্তি নিয়ে রাজনীতি বা চুক্তির রাজনীতি (পলিটিক্স অফ অ্যাকর্ড) আর তার প্রতিরাজনীতি (কাউন্টার পলিটিক্স)৷ অনেকের মতে, চুক্তি পালনের পূর্বশর্তাবলী, যেমন রাষ্ট্রের আইন-সংবিধান-প্রতিষ্ঠানের সংগতি বিধান না করে, সারা দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একাত্ম না করে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি করে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে৷ ফলে এই ত্রুটিপূর্ণ শান্তিপ্রক্রিয়ায় তার রেশ থেকে গেছে৷ গত ১৯ বছরে দেখা গেছে যে সরকার একদিকে চুক্তি বাস্তবায়ন করে, অন্যদিকে তার সাথে সাংঘর্ষিক কোনো ব্যবস্থা তৈরি করে৷ সরকার চুক্তি মেনে ভূমি কমিশন গঠন করেছিল, অথচ তার বিধানাবলি এমনভাবে রচিত হয়েছে যা চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক৷ চলতি বছরে যখন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধন করা হলো, সাথে সাথে কায়েমী মহলের ইশারায় সেই আইনের বিরোধী শক্তিকে হরতাল-ধর্মঘট করতে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হলো৷ এটাই হচ্ছে রাষ্ট্রের পলিটিক্স ও কাউন্টার পলিটিক্স৷

ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে আশির দশকের শুরুতে যে চার লাখ সেটলারকে সেটলমেন্ট করানো হয়েছে, তারাই এখন পাহাড়ে সংখ্যাগুরু হয়ে গেছে৷ তারা এখন পাহাড়ে রাজনীতির নীতিনির্ধারণী জায়গাতে আছে৷ আন্তর্জাতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনকে এই কায়েমী মহল কাজ করতে দিচ্ছে না৷ ফলে সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, গবেষকরা কাজ করতে পারছেন না৷ আজ পর্যন্ত কোথাও কোনোদিন সরকারের কাউন্টার পলিটিক্সের এই ক্রীড়নকদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে দেখা যায়নি, অথচ ইউপিডিএফ-এর ছাত্রনেতা বিপুলকে ক্যানসার আক্রান্ত মুমূর্ষু মায়ের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়ছে৷ ইউপিডিএফ-এর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দদের অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে৷ একইভাবে বান্দরবানে জেএসএস-এর নেতৃবৃন্দদের জেল-জুলুম-হুলিয়ার হুমকিতে রাখা হয়েছে৷

পাইচিংমং মারমা

ব্লগার পাইচিংমং মারমা

কাউন্টার ইনসারজেন্সির সময়ের মতোই এখনো সামরিক শাসন চলছে পাহাড়ে৷ পাহাড়িরা কোনো বিদেশির সাথে কথা বলতে পারে না৷ এর মধ্যেই সরকার চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে৷ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তোয়াক্কা না করে জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করেছে৷ জমনত উপেক্ষা করে মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে৷ স্থানীয় জনগণের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থার বিবেচনা না করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হচ্ছে, যা আদিবাসীদের জীবনে উন্নয়নের বদলে বিপর্যয় ঘটাতে পারে৷

চুক্তি, আইন, বিধি-বিধানের অসংগতি, রাষ্ট্রীয় বিধান, প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন মহলের প্রভাব এইসব নানান অসংগতি, ত্রুটি, সীমাবদ্ধতাকে কেন্দ্র করে চুক্তির রাজনীতিতে আর তার প্রতিরাজনীতির আবর্তে ঘুরছে পাহাড়িদের নিয়তি৷ স্থায়ী বাসিন্দা নির্ণয়, তার ভিত্তিতে ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভূমি জরিপ, ভূমি আইনের অসংগতি দূরীকরণ, স্থানীয় সরকারের আইন সংশোধন, ভূমি কমিশন কার্যকর করা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা ইত্যাদি সব প্রক্রিয়া-পদ্ধতির জটিলতা আজ যেন জটিলতার জটিলতা জনিত জটিলতায় পরিণত হয়েছে৷ চুক্তির ক'টা ধারা বাস্তবায়ন হলো, ক'টা হয়নি, কেন হয়নি, কোথায় সমস্যা – এ সব প্রশ্নে মানুষকে ব্যতিব্যস্ত রাখার রাজনীতি আর প্রতি রাজনীতির মধ্যে মৌলিক প্রশ্নগুলোই সবার অলক্ষ্যে থেকে গেছে৷ আজ পর্যন্ত আঞ্চলিক পরিষদ নীতিমালাই প্রণিত করা হয়নি৷ চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি অসাড় হয়ে আছে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সম্প্রতি এক টিভি আলোচনায় দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক তাই মত প্রকাশ করেছেন যে, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিরসনে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজন হয়েছে৷

এই ঊনিশ বছর ধরে শুধু চুক্তি নিয়ে রাজনীতি আর প্রতিরাজনীতি হয়েছে৷ কিন্তু তাতে চুক্তির মূল ‘স্পিরিট' – পাহাড়ে শান্তি আসেনি৷ চুক্তির মৌলিক  দিকগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি বলে চুক্তির কার্যকারিতা, প্রয়োজনীয়তাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ৷

চুক্তির পরপরই জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর সংঘর্ষে শত শত তাজা প্রাণ ঝড়ে গেছে৷ প্রায় প্রতি বছরই আদিবাসীদের গ্রামে হামলা-লুটপাট করেছে সেটলাররা৷ ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা বেড়েছে৷ শান্তি চুক্তির আগের সময়ের মতো কখনো কোনো ঘটনায় অপরাধীর শাস্তি হয়নি৷ এই ১৯ বছরে চুক্তি বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়ায় চুক্তির দূর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, সংকট, ত্রুটি দূর করে পাহাড়ে শান্তি আসার কথা৷ অথচ তার বদলে দিনে দিনে রাষ্ট্র যেন পাহাড়িদের একটা জায়গাতে কোণঠাসা করে দিয়েছে৷ একেই বলে কিনা ‘এক্সিসটেন্স' বা ‘রেসিসটেন্স'৷

(এ লেখায় লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণই প্রকাশিত৷ ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগ এ লেখার কোনো বক্তব্য বা তথ্যের জন্য দায়ী নয়৷)

পাইচিংমং মারমা

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন