পাপিয়াদের ‘ট্রায়াল′ মিডিয়ায় নয়, আদালতে হোক | বিশ্ব | DW | 28.02.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

পাপিয়াদের ‘ট্রায়াল' মিডিয়ায় নয়, আদালতে হোক

একজন ব্যক্তি যত বড় অপরাধ করুক যতক্ষণ তিনি আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হন ততক্ষণ তাকে অপরাধী বলা যাবে না৷ এই সময়ে তাকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করাও উচিত নয়৷ কিন্তু বাংলাদেশে এই নিয়ম মানা হচ্ছে কোথায়? 

সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত যুবলীগ নেত্রী পাপিয়াকে নিয়ে গণমাধ্যমে নানা তথ্য আসছে৷  তার অপরাধের মুখরোচক সব কাহিনি তুলে ধরছে  ব়্যাব ৷ নানা কায়দায় তাকে উপস্থাপন করা হচ্ছে গণমাধ্যমের সামনে৷ 

ফেসবুকে একটি ভিডিওতে দেখলাম পাপিয়াসহ আটক আরে দুই জনকে নিয়ে  ব়্যাবের কর্মকর্তারা একটি সড়কে (সম্ভবত বাহিনীর কার্যালয়ে) হাঁটছেন৷  বলা বাহুল্য, এই হাঁটাহাঁটি তাদের স্বাস্থ্যের ক্থা বিবেচনা করে নয়৷ সামনে ছিল টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ক্যামেরা, তাদের ছবির চাহিদা মেটানোর জন্য৷ কিভাবে হাঁটতে হবে, কোনদিকে তাকাতে হবে ক্যামেরাম্যানরা তা বলে দিচ্ছেন৷ তা শুনে  ব়্যাবের একজন কর্মকর্তা গ্রেপ্তারকৃতদের সে অনুযায়ী আদেশ দিচ্ছেন৷ একবার হাঁটায় চাহিদামাফিক ছবি হয়নি, তাই দ্বিতীয়বার একই পথে একই কায়দায় হাঁটিয়ে ছবি তোলা হলো৷ ব্যাপারটি কি সাংঘাতিক মনে হয় না! জানি, অনেকেরই মনে হবে না৷ পাপিয়ার বিরুদ্ধে এরইমধ্যে যত গল্প প্রকাশ হয়েছে তাতে তার বা অন্য গ্রেপ্তারকৃতদের কোনো অধিকার থাকতে পারে এমনটা তারা হয়ত মানতেই চাইবেন না৷ 

কিন্তু এই বিষয়ে আদালত কী বলে? ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হওয়া কোনো ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির না করার নির্দেশ দেন৷  সেসময় আদালত একটি রুলও দেন৷ প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না আদালত সংশ্লিষ্টদের কাছে তা জানতে চান৷ জানতে চান গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার নির্দেশও কেন দেওয়া হবে না৷ 

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক,  ব়্যাবের মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল৷ কী জবাব তারা দিয়েছিলেন সেটি এখন জানা সম্ভব হচ্ছে না৷ তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণে কোনো পরির্বতন আমরা দেখিনি৷ বরং আটক ব্যক্তির অপরাধের তদন্ত বা বিচারের আগেই 'মিডিয়া ট্রায়ালের' ঝোঁক উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে৷ সাম্প্রতিক 'ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান' থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়  ব়্যাবের অস্ত্র বা মাদক উদ্ধার কিংবা সবশেষ পাপিয়াকে গ্রেপ্তারেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে৷ সবচেয়ে বড় বিষয় গণমাধ্যমের কাছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এবং অপরাধের বৃত্তান্ত হাজির করছে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনে দূরে থাক, এমনকি মামলাতেও উল্লেখ থাকছে না৷ 

এবার নজর দেয়া যাক হাইকোর্টের আরেকটি রায়ে৷ বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী মিন্নিকে দেওয়া জামিন সংক্রান্ত রায়ে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিচারকরা একটি পর্যবেক্ষণ দেন৷ সেখানে তারা বলেছেন, ‘‘ইদানীং প্রায়ই লক্ষ করা যায়, বিভিন্ন আলোচিত অপরাধের তদন্ত চলার সময় পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করার আগেই গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়, যা অনেক সময় মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অমর্যাদাকর এবং অ-অনুমোদনযোগ্য৷''

দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী আদালত আরো বলেন, ‘‘আমাদের সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত অভিযুক্ত বিচার প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে বলা যাবে না যে তিনি প্রকৃত অপরাধী বা তার দ্বারাই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে৷ গণমাধ্যমের সামনে গ্রেপ্তার কোনো ব্যক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা সঙ্গত নয় যাতে তার মর্যাদা ও সম্মানহানি হয়৷ তদন্ত চলাকালে, অর্থাৎ পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের আগে গণমাধ্যমে গ্রেপ্তার কোনো ব্যক্তি বা মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে এমন কোনো বক্তব্য উপস্থাপন সমীচীন নয়, যা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে বিতর্ক বা প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে৷''

DW-Mitarbeiter Porträt Faisal Ahmed

ফয়সাল শোভন, ডয়চে ভেলে

কোনো মামলার তদন্ত চলার সময় তদন্তের বিষয়ে কতটুকু তথ্য গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করা সমীচীন হবে সে সম্পর্কে একটি নীতিমালা দ্রুত প্রণয়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশও দেন আদালত৷ 

আদালতের এই স্পষ্ট ব্যাখ্যার পরও কারো টনক নড়েনি৷ না আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের, না গণমাধ্যমের৷ ইচ্ছামতো আমরা কাউকে অপরাধী বানিয়ে ফেলছি, তার মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার হরণ করে নিচ্ছি৷

যেই পাপিয়া, সম্রাটরা দিনের পর দিন ক্ষমতাবানদের প্রিয়ভাজন হয়ে থাকতে পারেন, যারা বিরাট দাপটে ধণাঢ্য পাড়াগুলো মাতিয়ে রাখেন, গ্রেপ্তার হলেই তারা হয়ে যান অপাঙ্কতেয়৷ তাদের দায়-দায়িত্ব নেয় না সংগঠন, তাদের কর্মকাণ্ডের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়েন তাদেরই ঘনিষ্ঠজন৷ সেই ফাঁকে মিডিয়া ট্রায়াল দিয়ে কিছুদিন মাঠ গরম রাখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী৷ পাপিয়া, সম্রাটদের তৈরির জন্য যারা দায়ী তাদের খুঁজে বের করা কিংবা যেই ব্যবস্থাটি এই অপরাধ চক্রের জন্ম দেয়, তা ধ্বংসে তেমন কোনো উৎসাহ লক্ষ্য করা যায় না৷ 

অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বিচার হোক বা না হোক, তা নিয়ে সাধারণ মানুষও এখন খুব একটা মাথা ঘামান না৷ পাপিয়া, সম্রাটদের গ্রেপ্তার, তাদের নিয়ে বের হওয়া গাল-গল্পে এক ধরনের বিনোদন তো আছেই! সেই বিনোদনের রেশ শেষ হতে না হতে নতুন কাউকে হয়তো ধরবে  ব়্যাব বা পুলিশ৷ তাকে নিয়েও চলবে মিডিয়া ট্রায়াল৷ সবাই নতুন কাহিনিতে মগ্ন হবেন৷ এক বছর পর আমাদের গোল্ডফিশ ‌মেমোরিতে আগের পাপিয়া, সম্রাটদের আর জায়গা হবে না৷ তদন্ত, বিচারের খোঁজ কে রাখে? বিচারব্যবস্থা বলে যে কিছু আছে সে তো আমরা সম্মিলিতভাবেই ভুলে গেছি৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন