পাকিস্তানে বছরে সহস্রাধিক বলপূর্বক ধর্মান্তর ও বাল্যবিয়ে | বিশ্ব | DW | 29.12.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান

পাকিস্তানে বছরে সহস্রাধিক বলপূর্বক ধর্মান্তর ও বাল্যবিয়ে

গির্জায় বাজনার সুর বেশ ভালো লাগতো নেহার৷ কিন্তু গত বছর থেকে সে অধিকার তিনি হারিয়েছেন৷ ১৪ বছরের নেহাকে জোর করে খ্রিস্ট ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়৷

জোর করে ধর্মান্তরের অভিযোগ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির পালটা অভিযোগও আনা হয়৷

জোর করে ধর্মান্তরের অভিযোগ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির পালটা অভিযোগও আনা হয়৷

৪৫ বছর বয়সের একজনের সঙ্গে জোর করে বিয়েও দেয়া হয় নেহাকে৷ সে ব্যক্তির আগের পক্ষের একটি সন্তানও রয়েছে৷ সে সন্তানই নেহার চেয়ে বয়সে প্রায় দ্বিগুণ৷

নেহা যখন বার্তাসংস্থা এপির সাংবাদিকের কাছে নিজের দুর্দশার কথা বলছিলেন, তার কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে উঠছিল৷ কিছুক্ষণ পরপর নিজের মুখ ও মাথা নীল স্কার্ফ দিয়ে ভালো করে ঢাকছিলেন তিনি৷ বাল্যবিয়ের অপরাধে তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে৷

কিন্তু এখনও নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না নেহা৷ তার স্বামীর ভাই আদালতে পিস্তল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন৷ নিরাপত্তাকর্মীরা তার কাছ থেকে সে পিস্তল জব্দ করতে সক্ষম হন৷ নেহা এপিকে বলেন, ‘‘এই বন্দুক সে আমাকে মারার জন্যই এনেছিল৷'' নেহার নিরাপত্তার জন্যই তার পুরো নাম প্রকাশ করেনি এপি৷

পাকিস্তানে প্রতি বছর নেহার মতোই সংখ্যালঘু পরিবার থেকে আসা প্রায় এক হাজার  মেয়েকে জোর করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয় বলে সংবাদে জানিয়েছে এপি৷ মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে করোনার মধ্যে লকডাউনে এ সংখ্যা আরো বেড়েছে৷ লকডাউনে মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না, অন্যদিকে কাজ বন্ধ হওয়ায় অনেক দরিদ্র পরিবারই অর্থ সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে৷

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ মাসেই পাকিস্তানের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে ‘বিশেষ উদ্বেগ' প্রকাশ করেছে৷ ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সংখ্যালঘু হিন্দু, খ্রিস্টান এবং শিখ সম্প্রদায়ের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ‘অপহরণ করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে, জোর করে বিয়ে করে ধর্ষণ করা হচ্ছে৷'

এসব ঘটনার বেশিরভাগই দক্ষিণের সিন্ধ প্রদেশের দরিদ্র হিন্দু পরিবারগুলোর সঙ্গেই হয়ে থাকে৷ তবে সম্প্রতি নেহাসহ একাধিক খ্রিস্টান মেয়ের সঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে৷

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আত্মীয় বা অন্য কারো মাধ্যমে মেয়েদের অপহরণ করা হয়৷ কখনও কখনও ধার দেনা শোধ করতে না পারায় জমির মালিক পরিবারের মেয়েকে জোর করে নিয়ে যান৷ পুলিশও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ নিয়ে মাথা ঘামায় না৷ পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ধর্মত্যাগে বাধ্য করার পর দ্রুতই তাদের বয়স্ক কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়৷

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনার সঙ্গে বেশ বড় একটি চক্র জড়িত রয়েছে৷ বিয়ে পড়ানোর জন্য ধর্মীয় যাজক যেমন আছেন, সেটাকে আইনি বৈধতা দেয়ার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটও এর সঙ্গে জড়িত৷ এমনকি অভিযোগ এলে তা তদন্ত না করে উল্টো অভিযোগকারীকে হয়রানি করে পুলিশও এসব ঘটনায় ভূমিকা রাখে৷ জিবরান নাসির নামে এক অধিকারকর্মী এই নেটওয়ার্ককে তুলনা করেছেন ‘মাফিয়ার' সঙ্গে৷

কম বয়সের কুমারী মেয়ে বউ হিসেবে পাওয়ার দিকেই এই নেটওয়ার্কের লক্ষ্য৷ এক্ষেত্রে সংখ্যালঘু দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা সহজ টার্গেটে পরিণত হয়৷ পাকিস্তানের  ২২ কোটি জনসংখ্যার তিন দশমিক ছয় শতাংশ সংখ্যালঘু বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী৷ তারা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন৷ অনেকক্ষেত্রে জোর করে ধর্মান্তরের অভিযোগ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির পালটা অভিযোগও আনা হয়৷

দক্ষিণ সিন্ধের কাশমোর অঞ্চলের ১৩ বছর বয়সি সোনিয়া কুমারি অপহরণের শিকার হন৷ একদিন পর পুলিশ তার বাবা-মাকে জানায় সোনিয়া হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছে৷ সোনিয়ার মা আর্জি জানান, ‘‘ঈশ্বর, কোরআন, যা বিশ্বাস করেন আপনারা, দোহাই লাগে আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন৷ তাকে জোর করে বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়েছে৷'' এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে৷

নিরাপত্তা নিয়ে ভীত এক হিন্দু অধিকারকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এপিকে জানিয়েছেন, তিনি পরিবারটির কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছেন৷ চিঠিতে সোনিয়া ‘স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন করে দুই সন্তানের বাবা এক ৩৬ বছর বয়সি ব্যক্তিকে বিয়ে করেছে' বলে দাবি করা হয়৷ এই চিঠিটি সোনিয়ার পরিবারকে জোর করে লিখতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সেই অধিকারকর্মী৷ মেয়েকে ফিরে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাবা-মাও হাল ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি৷

করাচির আরজু রাজা যখন নিখোঁজ হন, তখন তার বয়সও ১৩ বছর৷ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করে৷ দুদিন পর আরজুকে যখন পাওয়া যায়, তখন তার ধর্ম পরিবর্তন করা হয়েছে এবং ৪০ বছরের মুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে তার বিয়েও হয়ে গিয়েছে৷

সিন্ধ প্রদেশে বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর৷ আরজুর বিয়ের কাগজে তাকে ১৯ বছর বয়সি বলে দেখানো হয়েছে৷ আরজুর বিয়ে পড়িয়েছেন কাজি আহমেদ মুফতি জান রাহীমি৷ তার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে পড়ানোর অন্তত আরো তিনটি অভিযোগ রয়েছে৷ আরজুর বিয়ে পড়ানোর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও করাচির উপকণ্ঠে এক চালের বাজারের ওপরতলায় তিনি তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন৷

বার্তাসংস্থা এপি জানিয়েছে, তাদের প্রতিবেদক এই কার্যালয়ে পৌঁছালে রাহীমি পেছনের সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে যান৷ এই একই স্থানে কার্যালয় আছে অন্য বেশ কয়েকজন কাজির৷ তাদের একজন মোল্লা কাইফাত উল্লাহ জানান বাল্যবিয়ে পড়ানোর দায়ে এখন আরেকজন কাজি জেলে আছেন৷ কাইফাত উল্লাহ জানান, তিনি ১৮ বছরের নীচে কারো বিয়ে পড়ান না৷

এডিকে/কেএম (এপি)

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন