পশ্চিমবঙ্গে মদ নিয়ে বিতর্ক | বিশ্ব | DW | 20.10.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

পশ্চিমবঙ্গে মদ নিয়ে বিতর্ক

প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে মদ নিষিদ্ধ৷ সেখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দু' হাজারের বেশি মদের দোকান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ এ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক৷

একদিকে চোলাই মদের রমরমা, রাজ্যের গরিব মানুষ বিষাক্ত মদ খেয়ে প্রাণ হারাচ্ছে৷ অন্যদিকে রাজ্যের ঋণ শোধের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না পাওয়া৷ সব বিবেচনা করেই রাজ্য সরকার মদের দোকান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ প্রতি জেলায় প্রথমে একটি করে মদের রিটেল কাউন্টার খোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার৷ তারপরে নিজস্ব পানশালা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে৷    

অনেকেই ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন তুলছেন, তবে কি দক্ষিণের পথে হাঁটছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার? অন্ধ্রপ্রদেশের আবগারি খাতে পশ্চিমবঙ্গের থেকে অনেক বেশি টাকা রাজস্ব আদায় হয় মদের জন্য৷ অন্ধ্রপ্রদেশে প্রতি লক্ষ মানুষের জন্য মদের দোকান সাড়ে ১০, এই সংখ্যাটা আরো বেড়েছে তামিলনাড়ুতে ও কর্নাটকে৷ তামিলনাড়ুতে ১১ এবং কর্নাটকে ১৫৷

দমদম বেদিয়াপাড়ার বাসিন্দা পুষ্প সাহা অন্যের বাড়ি কাজ করেন৷ এমন সিদ্ধান্তের কথা শুনে পুষ্প রীতিমতো হতবাক৷ তিনি বলেন, ‘‘জানি না বাপু! আমার বর মদ খাবেই, তা সরকারি দোকান হোক বা না হোক!''

পুষ্পর স্বামী মাধবচন্দ্র সাহা, পেশায় রিকশাচালক৷ তিনি দিনান্তে দমদম রেলঝুপড়ির বস্তিতে বেআইনি মদের ঠেকে হাজির হন৷ তাঁর মতে, ‘‘দামটা কোথায় কম, আর কোন দোকানটা হাতের নাগালে, এ দুটোই আসল৷ সরকারি বা বেআইনি ওটা ব্যাপার না!''

নিম্নআয়ের মানুষেরা কম খরচে নেশার ঝোঁকে চোলাইয়ের উপর নির্ভরশীল৷ ২০১১ সালের মগরাহাটের বিষাক্ত মদ খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ১৭২-এ ঠেকেছিল৷ প্রশাসনের তরফে একের পর এক চোলাই মদের ভাটি ভাঙা হলেও ফের ছত্রাকের মতো গজিয়ে ওঠে এগুলি৷ এই ছবি রাজ্যের সর্বত্র৷    

অডিও শুনুন 03:29
এখন লাইভ
03:29 মিনিট

‘একটু সামাল দিয়ে তারপর এথিকস নিয়ে ভাবা উচিত’

একটা সময় পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার মনে করত, কম দোকান থাকলেই মানুষের মদ খাওয়াটা আটকানো যাবে৷ কিন্তু ‘দ্য ব্যুরো অফ অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক্স অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স'-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈধ দেশি মদের ক্রেতার চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি চোলাইয়ের ক্রেতা৷ কারণটাও স্বাভাবিক৷ মাধবের মতো প্রান্তিক সমাজের মানুষেরা সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর দূরের সরকারি মদের দোকানে যাওয়ার চেয়ে হাতের কাছে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা অবৈধ দোকানই পছন্দ করেন৷  

তাই কি এবার রাজ্যে যেখানে মদের দোকান নেই, সেই সব জায়গায় ২ হাজারের বেশি মদের দোকান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার? কিন্তু তাতেও কি সমস্যা মিটবে? নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্তা ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘শুধুমাত্র মদের দোকান খুললেই সমস্যার সমাধান হবে না৷ বেআইনি মদের দামটাও কম৷ তাই থাকছে নাগালের মধ্যে৷ অন্যদিকে সরকারি দোকানে মদের সঙ্গে জুড়ছে সরকারি কর৷ তাই করের পরিমাণ কমিয়ে তা প্রান্তিক মানুষদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে৷ প্রতি বছর বাজেটে আবগারি কর বাড়িয়ে রাজ্য সরকার করছে এর উল্টোটা৷''

তৃণমূল নেতা নির্বেদ রায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘কাছাকাছি বৈধ মদের দোকান না থাকায় গরিব মানুষ রেললাইনের পাশে বস্তিতে গিয়ে বেআইনি চোলাই মদ কিনে খান৷ এবার এটা সরকারি স্তরে খোলা হলে সেই প্রবণতা কতটা কমবে, সেটাই দেখার৷''

গতবছর এ রাজ্যে আবগারি শুল্ক থেকে আয় হয়েছিল ৭৮০০ কোটি টাকা, এই পরিসংখ্যান মাথায় রেখেই কি এবার এমন পরিকল্পনা?

বিশিষ্ট আইনজীবী ও কংগ্রেস নেতা অরুণাভ ঘোষের মতে, ‘‘পাইকারি ব্যবসা নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে রাজ্য৷ খুচরো বিক্রেতারা যখন সরকারের থেকে মদ কিনছেন, তখন ঘুষ নিচ্ছেন সরকারি কর্মীরা৷ অথচ রাজ্য ভাবছে, মদের ব্যবসা গ্রামাঞ্চলে শুরু করা গেলে চার হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব মিলবে৷''

নির্বেদ রায় অবশ্য বলেন, ‘‘তিন লক্ষ কোটি টাকার ওপর সরকারের যে বিপুল ঋণ রয়েছে, সেটা মেটানোর জন্য রাজস্বের চেষ্টা তো করতে হবেই৷ তবে আমার মনে হয়, একটু সামাল দিয়ে তারপর এথিকস নিয়ে ভাবা উচিত৷'' 

অডিও শুনুন 01:25
এখন লাইভ
01:25 মিনিট

‘এই পদক্ষেপ সংবিধানের বিরুদ্ধে’

অরুণাভ ঘোষ এ ব্যাপারে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷ কথাটা সরাসরিই জানালেন ডয়চে ভেলেকে৷ তিনি বলেন, ‘‘এই পদক্ষেপ সংবিধানের বিরুদ্ধে৷ আমাদের দেশে কোনো আইন সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির বিরুদ্ধে করা যায় না৷ রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত তাই অসাংবিধানিক৷ আমি পুজোর ছুটির পর এর বিরুদ্ধে মামলা করব৷''

শিক্ষামহলের অনেকেই মনে করছেন, ব্যাপারটা খুবই নেতিবাচক৷ ‘আমরা আক্রান্ত' সংগঠনের মুখপাত্র অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র কিন্তু ব্যাপারটিকে একটা রাজনৈতিক পরিকল্পনা বলেছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার৷ বেকার যুবসমাজকে মদে মাতিয়ে রাখা হবে, তারা চাকরি চাইবে না৷ এই বাহিনীই বুথ দখল করে ভোটে জেতাবে শাসকদলকে৷ এর পরিণতিতে শুধু নৈরাজ্যই হবে না, রাজ্য ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাবে৷''

শিক্ষাবিদ তথা অধ্যাপিকা মিরাতুন নাহারের মতে, এটা একটা ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যে দেশে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ভয়াবহ, সে দেশে নেশার জোগান দেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই৷ সরকারের উচিত ছিল সে সব নিয়ন্ত্রণ করা৷ সরকার যদি উদ্যোগ নিয়ে জেলায় জেলায় মদের জোগান দেয়, তাহলে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ভুলতে মানুষ ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটবে৷ সরকার চাইছে মদের নেশায় বুঁদ হয়ে মানুষ জীবনের প্রধান চাহিদা, অধিকার ও অভাব ভুলে যাক এবং বিবেক, বুদ্ধি, হুঁশ হারিয়ে ফেলুক৷ এতে ক্ষমতাধারীদের সুবিধা, তারা আরো ক্ষমতা ভোগ করবে৷''

একই সুরে অধ্যাপক মহাপাত্র বলেন, ‘‘শিল্প, কারখানা, কর্মসংস্থান রাজ্য সরকারের কর্মসূচির মধ্যে নেই৷ শিক্ষার পরিকাঠামো যা আছে, সেগুলি ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে৷ মানুষকে বিভ্রান্ত করে মদের নেশায় মজিয়ে রাখতে চায় সরকার৷ এটা রাজ্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল৷ মদ খাইয়ে, ক্লাবগুলিকে টাকা দিয়ে সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হচ্ছে৷''

তাঁর মতে, ‘‘আগে পাইকারি ও খুচরো মদের ব্যবসা বেসরকারি সংস্থা চালাতো৷ এখন কমিটি গড়ে পাইকারি ব্যবসায় নেমেছে রাজ্য৷ এবার খুচরো ব্যবসায় নামছে৷ গ্রামে-গঞ্জে শাসকদল যুব সমাজকে মদের নেশায় বেঘোর করে রাখছে৷ নেশাগ্রস্ত মানুষকে বৈধতা দিতে খুচরো ব্যবসায় নামছে রাজ্য৷ কলকাতাকে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়, সেই গৌরব আর থাকবে না৷''

অরুণাভ ঘোষ মনে করিয়ে দেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে নেশার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন৷ তিনি বলেন, ‘‘২০১১ সালে মমতা ক্ষমতায় এসেছেন৷ তিনি যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন, ২০১০ সালে অভিযোগ তুলেছিলেন, রাজ্যের বাম সরকার মদে ভাসিয়ে দিচ্ছে সমাজকে৷ তিনি ক্ষমতায় এলে এটা বন্ধ করবেন৷ অথচ এখন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বিপরীত কাজ করছেন৷''

অডিও শুনুন 04:30
এখন লাইভ
04:30 মিনিট

‘মানুষকে মদের নেশায় মজিয়ে রাখতে চায় সরকার’

এই প্রসঙ্গে আত্মসমালোচনার সুর শোনা যায় দীর্ঘদিন বামবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নির্বেদ রায়ের কথায়৷ তিনি বলেন, ‘‘বাম সরকার যখন বিজ্ঞাপন দিয়ে মদ বিক্রি করত, সে সময় আমরা সমালোচনা করেছি৷ কিন্তু এখন এটা বুঝি, লাইসেন্সহীন, বেআইনি মদের কারবার রুখতে একটা চেষ্টা চলছিল৷ সেটা সফল হয়নি৷''

সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর মত, ‘‘গ্রামের দিকে ছাত্র কম হলে স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে যে সরকার, সেই সরকার ঢালাও মদের দোকান খোলার বন্দোবস্ত করছে৷ মদের ব্যবসা সরকারি কাজ নয়৷ মদের ব্যবসা সরকারি কাজের মধ্যে দিয়ে সরকারের অকর্মণ্যতা স্পষ্ট করছে৷'' তিনি আরো বলেন, ‘‘এখন পশ্চিমবাংলার চাইতে বিহার এগিয়ে গেল৷ হিংসা অথবা অপরাধ আটকাতে বিহার যেখানে মদ বন্ধ করে দিল, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ মদের বিক্রি বাড়াচ্ছে৷ এটা চূড়ান্তভাবে মানুষ-বিরোধী মনোভাব৷''

এই যুক্তি মানছেন না নির্বেদ৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘বিভিন্ন জায়গায় নিষেধ করলেও লুকিয়ে কাজটা হয়৷ বিহারেও তেমনই হয়৷ সেটা বিপজ্জনক৷ আমাদের পরিকাঠামো বা পুলিশ অপর্যাপ্ত৷ ফলে লুকিয়ে-চুরিয়ে কাজটা হচ্ছে, সেটা চিন্তার৷''  

এভাবে ২০০০ দোকান খুলে সারা রাজ্যে মদ বিক্রি বাড়িয়ে দিলে সমাজে এর কী প্রভাব পড়তে পারে? সুজন চক্রবর্তীর মতে, ‘‘গ্রামের দিকে মহিলারা একজোট হয়ে মদের দোকান ভাঙতে চান৷ যেহেতু নেশার জেরে তাঁদের গার্হস্থ্য সঙ্কট বাড়ে৷ সরকার তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে নেশায় প্রশ্রয় দিচ্ছে৷ মহিলাদের বিপদ আরও বাড়াচ্ছে৷''

পুষ্প সাহার মতো মহিলারা অবশ্য চাইছেন, বিহারের মতো সব মদের দোকান উঠে যাক৷ নেশায় নিয়ন্ত্রণ জারি হোক৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন