পরীক্ষাটা নির্বাচন কমিশনের | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 24.01.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

পরীক্ষাটা নির্বাচন কমিশনের

বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই একটা টার্ম খুব আলোচিত হয়- লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলার জন্য মাঠ সমতল হওয়াটা প্রাথমিক শর্ত।

নির্বাচনও একটি খেলার মত, তাই নির্বাচনের মাঠটাও সমতল হওয়া জরুরি। খেলার মাঠে দুইদলের সমান সুবিধা নিশ্চিত করতে ফুটবল খেলায় বিরতির সময় প্রান্তবদল হয়। ক্রিকেটে টস করে সিদ্ধান্ত হয়, কে আগে ব্যাট বা বল করবে। আম্পায়ার বা রেফারি খেলায় দুইদল সমান সুযোগ পাচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করবে। খেলার নিয়মকানুন সবাই মেনে চলছে কিনা, তা মনিটর করবে; না মানলে শাস্তি দেবে। নির্বাচনী খেলায় রেফারি হলো নির্বাচন কমিশন। খেলার যেমন কিছু নিয়ম আছে, নির্বাচনেরও আছে আচরণবিধি, যেটা সবাইকে মেনে চলতে হয়। না মানলে শাস্তি পেতে হয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিষয়টি নির্বাচনের একদম প্রাথমিক শর্ত৷ অধিকাংশ দেশে এটা এমন স্বতসিদ্ধ বিষয় যে এটা আলাদা করে বলতে হয় না। বাংলাদেশেই কেবল নির্বাচন এলে মাঠ সমতল করার দাবি ওঠে, কিন্তু মাঠ আর সমতল হয় না।

সমতল হয় না, কারণ সমতল করার কাজটি যাদের; তারা ঠিকমত কাজটি করেন না। এটা ঠিক খেলার মত নির্বাচনেও সবাই জিততে চায়। সুযোগ পেলে নিয়ম ভেঙ্গেও এগিয়ে যেতে চায়। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাত দিয়ে গোল করেছিলেন। রেফারির চোখ এড়ালেও দর্শকদের চোখ এড়াতে পারেননি। ম্যারাডোনা  পরে গোলটিকে ‘ঈশ্বরের হাত' বলে বর্ণনা করেছিলেন। তেমনি বাংলাদেশের নির্বাচনেও প্রার্থীরা সুযোগ পেলেই আচরণবিধি লঙ্ঘণ করেন না। যেখানে যার গায়ের জোর বেশি সেখানে তিনি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। তবে বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো, সরকারি দলের গায়ের জোরই বেশি, বিরোধী দলের জোর নেই বললেই চলে। তাই এখানে বারবার মাঠটা একদিকে কাত হয়ে যায়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন দেখেও না দেখার ভান করে। তাই হেলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তেই থাকে।

বাংলাদেশে নির্বাচনী আইন-কানুন, বিধিবিধান যা আছে; তা একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তাও হয় না। কারণ নির্বাচন কমিশন নিজেদের ক্ষমতার প্রয়োগ করেন না। তারা নিজেরাই এমন দুর্বল ও নতজানু হয়ে থাকে; তাদের যে আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে; সেটাই আমরা টের পাই না। আমার ধারণা সবসময় সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাদের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, নতজানু হয়ে থাকতে থাকতে তাদের কোমরই বাঁকা হয়ে যায। তাদের যে কোমর শক্ত করে দাড়ানোর সামর্থ্য আছে, তাদের যে আইনের হাজারটা চোখ আছে; তা আসলে নির্বাচন কমিশন ভুলেই যায়। উদাহরণের জন্য বেশি দূর যেতে হবে না।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ভোট নেয়ার তারিখ নির্ধারণ করা ছিল ৩০ জানুয়ারি। কিন্তু সেদিন সরস্বতী হওয়ায় নির্বাচন পেছানোর দাবি ওঠে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সাফ জানিয়ে দেয় ভোটের তারিখ বদলানোর সুযোগ নেই। হাইকোর্টে ভোটের তারিখ বদলানোর রিট খারিজের পর তো নির্বাচন কমিশন আরো সুযোগ পেয়ে যায়। নির্বাচন কমিশন সচিব মো্ঃ আলমগীর এসন ভাষায় কথা বলতে থাকলেন, যেন ভোটের তারিখ বদলালে গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে, দেশ অচল হয়ে যাবে। ভোট গ্রহণের তারিখ বদলানোর দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের তিনি বললেন, এরা না বুঝে আন্দোলন করছে। কিন্তু যেই ক্ষসমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বললেন, ভোটগ্রহণের তারিখে পেছালে তাদের আপত্তি নেই, অমনি সুরসুর করে কমিশন তারিখ বদলে দিল।

ভোটগ্রহণের তারিখ ঠিক করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। একটা ভুল হয়েছিল। সেটা তাৎক্ষণিকভাবে শুধরে নিলে এত জটিলতা হতো না। কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনায় কমিশন বুঝিয়ে দিয়েছে, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকলেও সামর্থ্য নেই তাদের। নিজেদেরকে আইনীভাবে ক্ষমতায়িত করার সুযোগ থাকলেও সে সুযোগ নেয়ার ইচ্ছা তাদের নেই। সরকারের ইচ্ছামত নির্বাচন করাই যেন তাদের কাজ। অথচ নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের এই দুর্বলতা পুরোনো। বরাবরই নির্বাচন কমিশন সরকারের ধামাধরা; কেউ কম, কেউ বেশি। সমস্যার মূলে আছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিযোগে। কমিশন নিয়োগে আইন প্রণয়নের কথা সংবিধানেই আছে। কিন্তু ৪৮ বছরেও তা হয়নি। প্রতিবার কমিশন গঠনের সময় এই আইন নিয়ে কথা হয়। এরপর পাঁচবছর আমরা সেটা ভুলে যাই। সরকার তবু ভদ্রতা করে একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে কমিশন নিয়োগের ব্যবস্থা করেছে এবং বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিতি মাহবুব তালুকদারও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। 

আর এই মাহবুব তালুকদারের কল্যাণেই আমরা নির্বাচন কমিশনের অনেক অপকর্মের খবর জানতে পারি। একটা সময় ছিল যখন শুধু বিচারকেরাই প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ পেতেন। অনেকদিন অবশ্য আমলারাই প্রাধ্যান্য পাচ্ছেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও কমিশনার পদে নিয়োগ পাচ্ছেন। অবসরপ্রাপ্ত আমলা, বিচারক, সেনাকর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যে কমিশন গঠিত হয়; চাইলে তারা দৃঢ় কমিটমেন্টের ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার মাধ্যমে সম্মানজনক অবস্থান নিয়ে সমাজে থাকতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের অবসর জীবন কাটে প্রায় নিভৃতে। দায়িত্ব পালন করতে করতেই তারা গোটা জাতির ঘৃণার কেন্দ্রে চলে আসেন। অথচ মানুষের ভালোবাসায় বাঁচার সুযোগটা একদমই তাদের হাতে। তারা কীসের আশায় বা প্রলোভনে সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করে কে জানে। এখন পর্যন্ত কোনো সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা সাবেক নির্বাচন কমিশনারকে তখনকার কোনো সরকার কোনো পুরস্কার দেয়নি। আবার সরকার চাইলেও কাউকে অপসারণ করতে পারবে না। মাহবুব তালুকদার যে বরাবর ভিন্নমত পোষণ করে আসছে, সরকার তো তার কিছু করতে পারেনি। তারপরও তারা কেন সরকারের ধামাধরা হয়ে জনগণের ঘৃণায় বাঁচে কে জানে। আমার ধারণা এটা তাদের চিন্তার দাসত্ব। 

ধরুন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানী এখন প্রচারণায় মুখর। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও এখন আস্তে আস্তে নির্বাচনী প্রচারণা সহিংস হয়ে উঠছে। হামলা, অভিযোগের অন্ত নেই। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের যেন কিছু যায় আসে না। প্রার্থীরা যাতে লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহার করে পরিবেশ দূষিত করতে না পারে, সেটাও হাইকোর্টকে আদেশ দিতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনকে ভোটের মাঠে দৃশ্যমান মনে হয়নি। কারো বিরুদ্ধেই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কমিশন। অথচ কমিশনের সামনে ঘুরে দাড়ানোর একাধিক সুযোগ এসেছিল। সর্বশেষ ঢাকা উত্তরে বিএনপি প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। কমিশন চাইলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে রাঙামাটি বদলি করে দিতে পারতো। এই ক্ষমতা তাদের আছে। ক্ষমতা যে আছে, সেটা তারা জানেন তো? অথচ এমন একটা কঠোর ব্যবস্থা গোটা নির্বাচনের পরিবেশ বদলে দিতে পারতো। এই নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠছে ইভিএম। যথারীতি সরকারি দল ইভিএম এর পক্ষে, নির্বাচন কমিশনও পক্ষে। আর বিপক্ষে বিএনপি। নির্বাচন কমিশন আগে বলেছিল, সবার মতামতের ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। যদিও তারা বিএনপিকে আস্থায় নেয়ার চেষ্টাই করেনি। তবে আমি বরাবরই ইভিএম'এর পক্ষে। ইভিএম'এ কোনো ত্রুটি থাকলে সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, সেটা সমাধানানে মনোযোগ দেয়া যেত পারে। কিন্তু যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আগে আর পরে আমাদের ইভিএমএ যেতেই হবে। সমস্যা ইভিএমএ নয়, সমস্যা ইভিএম যারা চালাবেন তাদের মা্নসিকতায়। আস্থার মূল সঙ্কটটা নির্বাচন কমিশনের প্রতি। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তো ইভিএম ছিল না, তাতে কার কী লাভ হয়েছে? ধরে নিচ্ছি, নির্বাচন কমিশন এখন বিএনপির দাবি মেনে ইভিএম'এর বদলে ব্যালটে ভোট নিলো, কিন্তু ভোটটা হলো ৩০ ডিসেম্বরের মত; বিএনপি কি মানবে? তাই ইভিএমএ নষ্ট না করে সঙ্কটের গোড়ায় মনোযোগ দিতে হবে।

সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের বয়স যত বাড়ছে, প্রতিষ্ঠানগুলোও গড়ে ওঠার কথা। কিন্তু ঘটছে উল্টো ঘটনা। একে একে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ধ্বংস হয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের কাজ করার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা। বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি, কখনো হবেও না। যারা হারবে, তারা সবসময় বলবে, নির্বাচন ভালো হয়নি। তবুও সাধারণ মানুষের কাছে কমিশনের গ্রহণযোগ্যতার একটা ব্যাপার থাকে। সেটা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর নির্বাচন ব্যবস্থার ওপরই মানুষের আস্থা উঠে

গেছে। নির্বাচন যেমন খেলা, তেমনি একটা পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় একজনই পাশ করে। এক ভোট কম পেলেও তিনি পরাজিত। তার পাওয়া বাকি ভোটের কোনোই মূল্য থাকে না। এই পরীক্ষা তো দেয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। তবে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্যই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অনেক অনেক দূরে হারিয়ে যাওয়া আস্থা তারা ফিরে পাবে কিনা, সেই পরীক্ষা। পরীক্ষাটা ছোট্ট, মাত্র দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন, আর এই নির্বাচনে সরকারও বদলে যাবে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের জন্য পরীক্ষাটা অনেক বড়। খোদ রাজধানীতে গহণমাধ্যম, দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকদের চোখের সামনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই ভালো-মন্দ যাই হোক; আড়াল করা কঠিন; সবার চোখের সামনেই হবে। তাই এই পরীক্ষায় পাশ করাটা কমিশনের জন্য জরুরি। 

আমি বলছি না, বিএনপি প্রার্থী পাশ করলেই কমিশন জিতে যাবে। কে হারবে, কে জিতবে; সেটা জানা যাবে ১ ফেব্রুয়ারিতেই। কিন্তু জনগণ যেন ভোট দেয়ার সুযোগটা পায়। সেটা পেলে যেই জিতুক আর যেই হারুক; নির্বাচন কমিশন জিতে যাবে। এই জয়টা শুধু নির্বাচন কমিশনের জন্য নয়; গণতন্ত্রের জন্য, নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য, দেশের জন্য জরুরি। 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন