পরিকল্পনার অভাবে অবহেলায় শিক্ষাখাত | আলাপ | DW | 17.06.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

পরিকল্পনার অভাবে অবহেলায় শিক্ষাখাত

অর্থমন্ত্রী পাচার করা টাকা ফেরত আনায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় যতটা আন্তরিক ততটাই অনাগ্রহী শিক্ষাখাত নিয়ে৷ করোনার পর জাতির মেরুদণ্ড গঠনে এই শিক্ষাখাতই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল৷

এবার শিক্ষাখাতে বরাদ্দ সামান্যই বেড়েছে, আর জিডিপির তুলনায় কমেছে৷ ২০২০-২১ অর্থ বছরে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিলো ৭১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা৷ যা মোট বাজেটের ১১.৯২ শতাংশ৷ আর এবারের বাজেটে এই খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৮১ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১২.০১ শতাংশ৷ এবার শিক্ষাখাত আলাদা করা হলেও আগের দুই অর্থ বছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে এক করে দেখানো হয়েছে৷ তাই এবারো  শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত একসঙ্গে করলে এবার প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ কমেছে৷ এবারের বাজটে এই দুইটি খাত মিলিয়ে বরাদ্দ কমেছে শতকরা এক ভাগ৷ শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে চলতি বাজেটে বরাদ্দ আছে ৯৪ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা৷ প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৮৭ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা৷ যা চলতি বাজেটের চেয়ে সাত হাজার কোটি টাকা কম৷

আর জিডিপির হিসেবেও বরাদ্দ কমেছে৷ প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে যে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা জিডিপির ২.২৫ শতাংশ৷ আর চলতি অর্থ বছরের বাজেটে ২.৭৫ শতাংশ৷ এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছয় লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা৷

এইসব তথ্য উপাত্তে এটা স্পষ্ট যে শিক্ষাখাতে যে কম বাজেট দেয়া হয় তার মধ্যেই হিসাবের ফাঁকি আছে৷ আগের দুই বছর শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত এক করে বরাদ্দ বেশি দেখিয়ে সেখান থেকে অর্থ নেয়া হয়েছে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে৷

ইউনেস্কো তথা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মোট বাজেটের ২০ শতাংশ অথবা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থাকা উচিত৷ কিন্তু বাংলাদেশে তা  কখনোই বাজেটের ১২ শতাংশ বা জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি হয়নি৷

শিক্ষাখাতে বরাদ্দ নিয়ে ইউনেস্কোর তথ্য

বাজেটের শতাংশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭২ সালে৷ ওই বছর মোট ৭৮৬ কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে ১৭৩ কোটি টাকা শিক্ষায় বরাদ্দ দেয়া হয়৷ যা ছিল মোট বাজটের ২২ শতাংশ৷ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘‘একমাত্র বঙ্গবন্ধুর সময় ছাড়া আর কখনোই শিক্ষাখাততে গুরুত্ব দেয়া হয়নি৷ আন্তর্জাতিক মানের বরাদ্দ তো দূরের কথা আমরা আমাদের সমকক্ষ দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম বরাদ্দ দিচ্ছি৷’’ আর শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘এই বরাদ্দের মধ্যেও অনেক ফাঁকি আছে৷ যেসব খাতে বরাদ্দ প্রয়োজন সেখানে নাই৷ আর নানামুখী শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে সেটা ভাগ হচ্ছে নানাভাবে৷ কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষার উন্নয়নে এককভবে তা ব্যবহার করা যায় না৷’’

এমনিতেই বরাদ্দ কম, তার ওপর পরিকল্পনাহীন বরাদ্দ আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বোঝায় পরিণত করছে: ড. সিদ্দিকুর রহমান

শিক্ষায় কেন এই অবহেলা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান মনে করেন বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো উচিত৷ কিন্তু তার আগে দরকার বরাদ্দের অর্থ খরচ করার দক্ষতা অর্জন৷ তিনি বলেন, ‘‘আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন যা বরাদ্দ হয় তাও খরচ করতে পারে না৷ আর বরাদ্দের একটি অংশ দুর্নীতি খেয়ে ফেলে৷’’

তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো বাংলাদেশে শিক্ষা খাত নিয়ে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ ও যোগ্য লোক গড়ে তোলা যায়নি৷ ফলে শিক্ষার মাধ্যমে মানব সম্পদ উন্নয়ন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সঠিক পরিকল্পনা নেই৷

তিনি বলেন, ‘‘এখনো আমরা এমএ-বিএ পাস করানোর পরিকল্পনায় আছি৷ দেশের জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরির শিক্ষা পরিকল্পনা আমাদের নেই৷ যার ফলে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ে না৷ আর যারা বাড়তি বাজেট চান তারা পরিকল্পনা দিতে পারেন না৷’’

তার কথা, ‘‘সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক বাস্তবায়ন এবং যোগ্য লোক দরকার শিক্ষার উন্নতির জন্য৷ তাহলে বাজেট বাড়িয়ে কাজ হবে৷ তা না হলে বাজেট বাড়ালেও তা খরচ হবে না৷ আর যা খরচ হবে তার একটি অংশ দুর্নীতিবাজদের পকেটে যাবে৷’’

একমাত্র বঙ্গবন্ধুর সময় ছাড়া আর কখনোই শিক্ষাখাততে গুরুত্ব দেয়া হয়নি: ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ

শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘‘একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই৷ কিন্তু আমাদের এখানে আমরা কী করতে চাই তাই তো জানি না৷ সৃজনশীল প্রশ্নভিত্তিক শিক্ষা চালু করা হলো তাতে কোনো ফল হল না৷ এখন আবার শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করা হচ্ছে৷ তার কি প্রস্তুতি আছে? করোনার সময় টেলিভিশন ও অনলাইনে শিক্ষা ঠিকমত দেয়া গেল না৷ ডিভাইস না থাকায় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেনি৷ এই বাজেটে তাদের জন্য কোনো পরিকল্পনা নাই৷ মানব সম্পদই যে বড় সম্পদ এটা আমাদের বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি৷ আমরা যে বড় বড় প্রকল্প করব, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা  বাস্তবায়ন করব, তা কারা করবেন? সেটা স্পষ্ট হলে শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হত৷’’

শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা ধার করা জ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়েই চলবো কী না সেটার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না নীতি নির্ধারকেরা৷ তাই তারা শিক্ষাখাতকে অবহেলা করছেন৷ আগামী বছর থেকে যে শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে তার জন্য প্রচুর দক্ষ শিক্ষক লাগবে৷ বাজেটে তার জন্য বরাদ্দ কোথায়? আর শিক্ষকদের বেতন কাঠামো উন্নত না করলে তো মেধাবীরা শিক্ষক হতে চাইবেন না৷’’

যেসব খাতে বরাদ্দ প্রয়োজন সেখানে নাই: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো: মজিবুর রহমান

গন্তব্য কোথায়?

বাংলাদেশের সমান কাতারের কোনো দেশেই বাজেট অনুপাতে শিক্ষা খাতে এত কম বরাদ্দ দেয়া হয় না৷ জিডিপির শতকরা চার ভাগের বেশি বরাদ্দ ওইসব দেশে৷ অধ্যপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘‘আমাদের সম কাতারে থেকে কোরিয়া, সিঙ্গাপুর শিক্ষায় বিনিয়োগ করে কত উপরে উঠেছে৷ ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং-এ দেখা গেল ভারতের ৪৪ টি, পাকিস্তানের ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা করে নিয়েছে৷ আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই বছরের পর বছর সেখানে জায়গা পাচ্ছে না৷ এটা দেখেই তো বোঝা যায় শিক্ষাকে অবহেলা করে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি৷’’

বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে বাংলাদেশের অবস্থাও বেশ খারাপ৷ ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা ১১২তম৷ বাংলাদেশের উপরে রয়েছে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, ভারত, পাকিস্তান৷ মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘‘বাজেটের একটি দর্শন আছে৷ এই বাজেটে যে দর্শন আমরা দেখতে পাচ্ছি তার মধ্যে শিক্ষার দর্শন স্পষ্ট নয়৷ ফলে আমাদের বাইরে থেকে ধার করা জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চলতে হবে বছরের পর বছর৷ এটা হলো জ্ঞানের পরাধীনতা৷ আর সেটা যদি হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না৷’’

তার কথা, ‘‘শিক্ষা একটি সার্বিক বিষয়৷ এরজন্য গবেষণা, যোগ্য শিক্ষক এবং অবকাঠামো দরকার হয়৷ বাজেটে তার কোনো পরিকল্পনার ছাপ নেই৷ যার ফল হলো আমরা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছি৷’’

আর অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান মনে করেন, ‘‘এমনিতেই বরাদ্দ কম, তার ওপর পরিকল্পনাহীন বরাদ্দ আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বোঝায় পরিণত করছে৷ এক সময় হয়তো আমাদের কৃষি উৎপাদন, শিল্প উৎপাদনসহ আরো অনেক সেবা খাতে লোক পাওয়া যাবে না৷’’

সংশ্লিষ্ট বিষয়