পদ্মা সেতু: শুধু কংক্রিটের কাঠামো নয় এ আমার আবেগ | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 01.07.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

পদ্মা সেতু: শুধু কংক্রিটের কাঠামো নয় এ আমার আবেগ

ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে দুই বাচ্চা রেডি করে সাড়ে চারটায় গাড়িতে উঠি; যাব মাওয়া, পদ্মা সেতু দেখতে৷ ২৬ জুন ছয়টায় প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হবে পদ্মা সেতু৷ এ ইতিহাসের সাক্ষী হতেই এত আয়োজন৷

সাড়ে পাঁচটার দিকে আমরা যখন মাওয়া পৌঁছাই ততক্ষণে দুই কিলোমিটার লম্বা গাড়ির লাইন দাঁড়িয়ে গেছে৷ ভিড় হবে জানতাম, কিন্তু এতটা ভাবিনি৷

চারিদিকে কেমন সাজ সাজ রব৷ উড়ছে নানা রঙের পতাকা৷ জীবনে এই প্রথম লম্বা গাড়ির লাইন দেখেও বিরক্ত হয়নি৷ বরং কেমন জানি খুশি খুশি লাগছিল৷ সঙ্গে কিছুটা আফসোস, কেনো আরো আগে রওয়ানা হলাম না৷ তাহলে লাইনে আরো আগে থাকতে পারতাম৷

গাড়ি থেকে নেমে ঝটপট কিছু ছবি তুলে নিলাম৷ অনেকেই তুলছে৷ সবার মুখে হাসি৷ কয়েকজন ড্রোন দিয়ে ছবি তুলছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যে খুলে দেবে পদ্মা সেতু৷ ঘড়ির কাঁটা যেন নড়ছেই না৷ আরো পাঁচ মিনিট আগে ছয়টা বেছে গেছে কিন্তু গাড়ি তো এগোচ্ছে না৷ তবে কি খোলার সময় পিছিয়ে গেলো!

কচ্ছপ গতিতে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত সকাল ৭টা ৩৩ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে টোল দিয়ে আমরা স্বপ্ন ছোঁয়ার পথে যাত্রা করি৷ টোলের রশিদটি যত্ন করে রেখে দিয়েছি৷ এ যে আমার অবিশ্বাস্য এক ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার প্রমাণ৷

দুরুদুরু বুকে ভাবছি একটু নামার সুযোগ পাব তো, ছবি তোলার৷ কর্তৃপক্ষ যে বলেছে, সেতুতে গাড়ি থামানো বা গাড়ি থেকে নামা বারণ৷ মূল সেতুতে উঠে কিছু দূর যেতেই দেখি লোকজন গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলছে৷ ছেলের বাবাকে বললাম ওই তো সবাই নামছে, আমিও নামবো, গাড়ি থামাও৷ নেমে নানা ভঙ্গিতে ছবি তুললাম৷ নিচে বর্ষার প্রমত্তা পদ্মা বইছে৷ আমি সেতুর উপর দাঁড়িয়ে৷ এ খুশি ভাষায় প্রকাশ করার মত না৷

ভাবছেন কেন এত আদিখ্যেতা করছি৷ কেউ কেউ নিশ্চয় এটাও বলছেন, নিষেধ সত্ত্বেও সেতুতে নেমে আমি তো অন্যায় করেছি৷ হুম, নিয়মের হিসেবে দেখলে তা খানিকটা করেছি বইকি৷ পদ্মার ওপাড়ের মেয়ে আমি, নিজের আবেগকে সেদিন নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে রাখতে পারিনি৷

পদ্মা সেতু খুলে দেয়ার পর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই তরুণ মারাও গেছেন

পদ্মা সেতু খুলে দেয়ার পর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই তরুণ মারাও গেছেন

এই সেতু আমার কাছে শুধু ইস্পাত-কংক্রিটের অবকাঠামো নয়৷ এ আমার আবেগ৷ এ আমার স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার, সত্যি হতে দেখার আবেগ৷

এ আবেগ শুধু আমার একার নয়, এ আবেগ কোটি বাঙালির৷ টোল প্লাজার সামনে লাম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় কথা হয় বাগেরহাটের মোহাম্মদ ফারুকের সঙ্গে৷ পেশায় ট্যাক্সি চালক৷ বয়স ৪০/৪৫ হবে৷ নিজের হলুদ ট্যাক্সি নিয়েই চলে এসেছেন পদ্মা সেতু দেখতে৷ মুখে হাসি ধরছে না৷ আমাদের গাড়ির পাশেই ওনার ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল৷

কথা হয় ওনার সঙ্গে৷ এই রুটের নিয়মিত যাত্রী, নিজের ট্যাক্সিতে যাত্রীও পার করেন৷ বলেন, ‘‘এতদিন অন্তত ২/৪ ঘণ্টা ঘাটে আটকে থাকতেই হতো৷ এখন ৫ মিনিট, বড়জোর ১০ মিনিটে পার হয়ে যাব৷”

ফাঁকা ট্যাক্সি নিয়ে শুধু সেতু দেখতে এসেছেন৷ এজন্য তাকে দুই বারে ৭৫০ টাকা করে ১৫০০ টাকা টোল দিতে হবে৷ নিশ্চয়ই তার জন্য সহজ নয় বিষয়টা, কিন্তু ওই যে আবেগ৷

এই পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে অনেক অনেক ঘটনা ঘটেছে৷ সবাই সেটা জানে, আমি আর সে আলাপে না যাই৷

আমি বরং আজ পদ্মা সেতু নিয়ে আমার উচ্ছ্বাস আপনাদের সঙ্গে ভাগ করি৷ ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যানটি বাসানোর খবর বাংলাদেশের সব সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ পায়৷ ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর ৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্যদিয়ে পুরো সেতু দৃশ্যমান হয়৷

পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্প্যান বসানো নিয়ে সব সংবাদমাধ্যমে খবর প্রচার হয়েছে৷ এ যদি শুধু কংক্রিটের অবকাঠামোই হতো তবে কেনো এর এত প্রচার৷ যেদিন জানলাম ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন, মনে মনে পরিকল্পনা করেছিলাম সেদিনই যাবার৷ একটা সবুজ জামদানি শাড়ি টকটকে লাল রঙের ব্লাউজ দিয়ে পরে যাব৷ তারপর সেতুর উপর দাঁড়িয়ে ছবি তুলবো৷

সাধারণ মানুষ হিসেবে সেদিন যাওয়ার সুযোগ ছিল না৷ তবে খবরে দেখেছি মানুষ কীভাবে নিয়ম ভেঙে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে পদ্মা সেতুতে উঠেছে৷ তাদের উচ্ছ্বাস দেখে কারো কারো খুব রাগ হয়েছে৷ আমারও হয়েছিল৷ এ কি কাণ্ড, পারলে তো সেতুটা মাথায় তুলে বাড়ি নিয়ে যাবে এরা!

কিন্তু পরদিন যখন আমি সেতুর সামনে দাঁড়িয়ে৷ অপেক্ষা করছি টোল প্লাজায় টোল দিয়ে কখন সেতুতে উঠবো৷ বিশ্বাস করেন, আমারও মনে হচ্ছিল দৌড়ে গিয়ে সেতুতে উঠে পড়ি৷ মাত্র পাঁচ/সাত মিনিটে পদ্মা পেরিয়ে যাব!

অথচ এই পদ্মা পাড়ি দেওয়া নিয়ে কত কত ভয়াল স্মৃতি, বিশেষ করে দক্ষিণের মানুষের৷ প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে রাতদুপুরে প্রিয় মানুষের লাশ নিয়ে পদ্মাপাড়ে ফেরির অপেক্ষা করেছেন? পরদিন সকাল হয়, ৮টা, ৯টা, ১০টা বেজে যায়৷ কিন্তু ফেরি আদৌ ছাড়বে কিনা সেই উত্তর কারো কাছে নেই৷ সঙ্গে ছোট বাচ্চাদের খাবার নেই, ওয়াশরুমে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই৷

এ স্মৃতি শুধু আমার নয়, পদ্মার ওপাড়ের বহু মানুষের৷ কিংবা ডুবোচরে ফেরি আটকে সারারাত সেখানেই পার৷ ঝড়ের দিনে মাঝ নদীতে লঞ্চের উথাল-পাথাল নাচন৷

আমার এক সহকর্মী, বাড়ি বাগেরহাট৷ পদ্মা সেতু নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘পদ্মা, মায়ের সাথে দূরত্ব কমাবে৷ মাঝে মাঝেই মাকে দেখতে যাবো সেতু পেরিয়ে৷”

মাদারীপুরের কলেজ ছাত্র ফয়সাল বন্ধুদের নিয়ে রাত ২টা থেকে সেতুর জাজিরা প্রান্তে অপেক্ষা করেন৷ কথা হয় মাওয়া প্রান্তে৷ বলেন, ইচ্ছা ছিল প্রথম টোল দেবেন, কিন্তু হয়েছেন দ্বিতীয়জন৷ এ নিয়ে তার কত আক্ষেপ!

ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে দুই বাচ্চা রেডি করে সাড়ে চারটায় গাড়িতে উঠি; যাব মাওয়া, পদ্মা সেতু দেখতে৷ ২৬ জুন ছয়টায় প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেয়া হবে পদ্মা সেতু৷ এ ইতিহাসের সাক্ষী হতেই এত আয়োজন৷

শামীমা নাসরিন, সাংবাদিক

প্রথম দিন পদ্মা সেতু দিয়ে ৬১ হাজারের বেশি গাড়ি পারাপার হয়েছে৷ টোল আদায় হয়েছে দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকার বেশি৷ এই ৬১ হাজার গাড়ির কয়টি আসলে সেদিন নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাবে বলেই পদ্মা পাড়ি দিয়েছে? বরং মানুষ রীতিমত বাস, মাইক্রোবাস ভাড়া করে সেগুলোকে সাজিয়ে বন্ধু বা পরিবারের সাথে এসেছে পদ্মা সেতু দেখতে৷ যেমন আমি গিয়েছিলাম৷ এসেছে হাজার হাজার মোটরসাইকেল৷

মানুষ হেসেছে, ছবি তুলেছে, হেঁটেছে, গান গেয়েছে, নেচেছে৷ কেউ কেউ অবশ্য সেতুর নাট খোলার চেষ্টা করে খবরের জন্ম দিয়েছেন৷ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই তরুণ মারাও গেছেন৷ সেতুর উপর গতিসীমা ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার, অথচ তারা মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন ১০৫ কিলোমিটার বেগে৷ এ দায় আসলে কার৷ হাতেগোণা কয়েকজনের উদ্ভট কাণ্ড লাখো মানুষের উচ্ছ্বাসকে কীভাবে কলঙ্কিত করতে পারে?

প্রথম দিন পদ্মা সেতুতে গাড়ি থামিয়ে, দাঁড়িয়ে ছবি বা ভিডিও করা নিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমত গালির বন্যা বইয়ে দিয়েছেন৷ মূর্খ বাঙালি যা পায় তাই নিয়ে অতি আদিখ্যেতা করে! কেউ কেউ প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়েছেন হাভাতে ওই বাঙালিদের পিটিয়ে পশ্চাদ্দেশ লাল করে দিতে৷

তাদের বলছি, আপনাদের এ রাগের কারণ কিছুটা হলেও বুঝতে পারছি৷ প্রথম দিন যদি আপনারাও সেতুতে উঠতে পারতেন তবে অবশ্যই একটা হলেও ছবি তুলতেন৷ ইতিহাসের এমন মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হওয়ার স্মৃতি ধরে রাখার লোভ সামলানো বড় কঠিন, এ সুযোগ আর পাব কিনা কে বলতে পারে৷

আর নতুন সেতু খুলে দিলে তা দেখতে ভিড় করা মানুষ শুধু বাঙালি হয় না৷ তারা আমেরিকান হয়, অস্ট্রেলীয় হয়, এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে ভদ্র জাতি বলে পরিচিত জাপানিরাও হয়৷ অনলাইনে এমন প্রচুর ছবি ভিডিও রয়েছে৷ যে অবকাঠামো নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গর্ব করা যায় সেটা দেখতে মানুষ ভিড় করবে এটাই তো স্বাভাবিক৷

আমিতো বলবো পদ্মা সেতু ঘুরে দেখার জন্য টুরিস্টবাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে৷ এমন কিছু স্পট তৈরি করা যেতে পারে যেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুললে ছবিতে সেতুর কাঠামো চমৎকারভাবে ধরা পড়বে৷ নদীর পাড়ে বসে চা-ফুসকা খেতে খেতে মানুষ সেতু নিয়ে গর্ব করবে আর পদ্মা পাড়ি দেওয়ার ভয়াল স্মৃতির কথা স্মরণ করবে৷

পদ্মা দিয়ে প্রতিঘণ্টায় কত ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়, আমাজনের পর এটা পৃথিবীর সবচেয়ে খরস্রোতা নদী কিনা এ তথ্য সেদিন সেতু দেখতে আসা বেশিরভাগ মানুষেরই জানা ছিল না৷ কিন্তু তারা এটা জানে, এবার ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় ১০/১২ ঘণ্টা ফেরির অপেক্ষা করতে হবে না৷ বাড়িতে বুকে উৎকণ্ঠা চেপে প্রিয়জনের নিরাপদে পদ্মা পেরিয়ে বাড়িতে ফেরার অপেক্ষা করতে হবে না স্বজনদের৷

পদ্মা সেতু আমাদের জাতীয় গর্ব৷ এ নিয়ে আমরা নাচবো, গাইবো, প্রথম দিনই সেতুতে উঠতে পারার খুশিতে ছবিও তুলবো, নাহলে আমি গিয়েছি তার প্রমাণ রইলো কই৷ এ ছবিতো নাতি-নাতনিদের দেখাতে হবে৷ এখনতো আর সেটা করছি না৷ সেতু খোলার ৪৮ ঘণ্টার মাথাতেই সেই ভিড়, সেই নিয়ম ভাঙ্গা আচরণ কিছুই নেই৷

এ যে আমার টাকায় আমার সেতু৷ এ আবেগ আমি কী করে সামলাই!

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়