‘পথশিশুদের শিক্ষার আগে থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা দরকার′ | বিশ্ব | DW | 19.02.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘পথশিশুদের শিক্ষার আগে থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা দরকার'

বাংলাদেশে পথশিশুদের নিয়ে  ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন'-এর পরিচালক (শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার বিষয়ক সুশাসন) আবদুল্লা আল মামুন৷

ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশ পথ শিশুদের সংখ্যা কত? কোন পরিসংখ্যান আছে?

আবদুল্লা আল মামুন: সেরকম নিবিড়ভাবে করা কোনো পরিসংখ্যান আসলে বাংলাদেশে নেই যে যেখান থেকে বোঝা যাবে৷ কিন্তু বিভিন্ন খন্ডিত গবেষণা থেকে ধারণা করা হয় বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা আড়াই লাখ থেকে চার লাখ হতে পারে৷

এই পথশিশুরা কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে?

শিশুরা যত ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারে, তার সবই আছে পথশিশুদের৷  বিশেষ করে তাদের অধিকারের জায়গা থেকে, বঞ্চনার জায়গা থেকে, সব ধরনের ঝুঁকিতে থাকা শিশুরাই পথশিশু৷ এটাই আমরা মনে করি৷ যেমন ধরেন, একটা শিশুর সবার আগে বাসস্থানের অধিকার রয়েছে, নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে, খাদ্যের অধিকার রয়েছে, শিক্ষার অধিকার রয়েছে৷ এসব কিছুই কিন্তু পথশিশুদের জন্য প্রযোজ্য৷ এর কোনো অধিকারই তারা পাচ্ছে না৷ তার ওপর শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি থাকছে রাস্তা-ঘাটে৷ তাদের ওপর অর্থনৈতিক নিপীড়ন থাকছে এবং এর চেয়েও বেশি পরিমাণে যেটা, সেটা হচ্ছে মাদক এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে শিশুদের জাড়ানো হচ্ছে৷ ফলে সার্বিকভাবেই ভয়াবহ থেকেও ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পথশিশুরা রয়েছে৷

অডিও শুনুন 12:18

‘সব ধরনের ঝুঁকিতে আছে পথশিশুরা’

২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে৷ এই লক্ষ্য পূরণের পথে সরকার কতদূর এগিয়েছে?

আসলে ২০৩০ না, ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধ করার লক্ষ্য রয়েছে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রায়৷ সেই লক্ষ্যমাত্রায় সরকার অনেকখানি কাঠামোগতভাবে এগিয়েছে৷ কাঠামোগত বলতে আমরা যেটা বুঝি বা বলছি যে, এটা করার জন্য সরকারের যে ধরনের আইন-কানুন, পলিসি দরকার, যেমন ধরেন আমাদের একটা জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতিমালা রয়েছে৷ সেটা ২০১০ সালে হয়েছে৷ সেটির আলোকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি কর্মপরিকল্পনা রয়েছে৷ আমরা যদি বলি, ন্যাশনাল প্ল্যান অফ অ্যাকশন রয়েছে৷ জাতীয় পরিকল্পনা ২০২১ সাল পর্যন্ত এবং সম্প্রতি সরকারি অর্থায়নে একটি অর্থনীতি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে৷ শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে  নিয়ে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে৷ আসলে কাঠামোগতভাবে যেভাবে এগোচ্ছে, সেটুকু অনেক আশা জাগায়৷ কিন্তু শিশুশ্রম নিরসনে একটা জায়গায় মনে হয় আমরা কম গুরুত্ব দিচ্ছি৷ সেটি হচ্ছে, আমরা যেটা বলে থাকি সর্বশেষ জরিপে ১২ লাখ আশি হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে জড়িত৷ আমরা কেবল তাদের ওখানে নজর দিচ্ছি যে, এই বারো লাখ আশি হাজার শিশুকে সরিয়ে নিরাপদে নিয়ে যেতে পারি কিনা৷ কিন্তু আমাদের এটা মাথায় রাখতে হবে, নতুন করে যেন কোনো শিশু সেই জায়গায় না আসে৷ সেই ধরনের প্রতিরোধমূলক কাজ, অর্থাৎ নতুন করে শিশুদেরকে আমরা কাজে না এনে স্কুলে দিতে পারি৷ সেই কাজটা যদি বাড়ানো যায়, তাহলে ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব৷

পথশিশুদের উপর নির্যাতনের খবর প্রায়ই শোনা যায়৷আপনি একটু আগেই বলছিলেন যে, ধর্ষণের মতো অপরাধ হচ্ছে এই শিশুদের উপর৷ এই অবস্থা থেকে শিশুদের রক্ষায় করণীয় কি?

করণীয় হচ্ছে যে, আমরা তো চাই না প্রথমত শিশুরা পথে আসুক, পথে থাকুক৷ এ-রকম কোনো বিষয় থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে এইযে, বিপুল সংখ্যক শিশু পথে রয়েছে৷ সরকার পথশিশু উন্নয়ন কার্যক্রম নামে একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে৷ সেখানে শিশুদের থাকা-খাওয়া এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে৷ আমি মনে করি, সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে সারাদেশের যেখানে যত পথশিশু রয়েছে, তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন করা দরকার৷ প্রথমেই থাকার ব্যবস্থা এবং তাদের বয়সোপযোগী শিক্ষা এবং তারা যেন একটা বয়সে যখন বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ আছে, সেখানে সেই বয়স হলে তাদের ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে একটা জব, যা কোনরকম ঝুঁকিপূর্ণ নয়, এমন একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত করা৷ সরাসরি আমি যদি এক কথায় বলতে চাই, করণীয় রয়েছে শিক্ষা, বিনোদনসহ অন্যান্য যে বিষয়গুলো রয়েছে, সেটি নিশ্চিত করা এবং সকলের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা৷ 

শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার৷ কিন্তু সব পথশিশু স্কুলে যাচ্ছে না৷ তাদের শিক্ষার মধ্যে আনার পথে প্রতিবন্ধকতা কী?

দেখুন, বাধ্যতামূলক শিক্ষা, মানে আপনাকে যদি তিন ঘণ্টার জন্য বা চার ঘণ্টার জন্য স্কুলে আসতে বলা হয়, আপনি সেখানে আসতে বাধ্য৷ কিন্তু এই শিশুটা স্কুলে আসতে গেলে তাকে তো পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে আসতে হবে৷ পেট ভরে খেয়ে আসতে হবে৷ এখন দেখেন, একটি শিশুর থাকার জায়গা নেই, ভালো একটা কাপড় নেই, খাবারের কোনো নিশ্চয়তা নেই৷ তার জন্য পড়তে আসা বাধ্যতামূলক করা কতটা বাস্তবসম্মত? তার জন্য সেখানে শিক্ষার অবস্থান অনেক নীচেই৷ তার যদি বাকি চাহিদাগুলো পূরণ করা যায় এবং তার যদি একটি থাকার জায়গা থাকে এবং খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে এবং একটি পরিচ্ছন্ন পোশাক থাকে, তখন আমরা শিক্ষার কথাটা গুরুত্বের সাথে তাকে বলতে পারি৷ আমরা মনে করি বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনের কথা বলে পথশিশুদের অন্তর্ভূক্ত করা যাবে না, যদি না তাদের অন্যান্য চাহিদাগুলো পূরণ করা যায়৷  

নির্বাচিত প্রতিবেদন

পথশিশুরা নানাভাবে পর্নোগ্রাফিতে যুক্ত হচ্ছে৷ এই পরিস্থিতি থেকে তাদের  বের করায় সরকারি বা বেসরকারি কী কী উদ্যোগ আছে?

এখানে কিন্তু শুধুমাত্র পথশিশুরা পর্নোগ্রাফিতে যুক্ত হচ্ছে, তা নয়৷ সারাদেশেই শিশুদের ভিতরে প্রথমত নানা ধরনের তথ্য-প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটে আসক্তি বেড়ে গেছে৷ এই ইন্টারনেটের ভিতর নানা রকম পর্নো বা অশ্লীল কন্টেন্টগুলো প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে৷ এটা নিয়ে একটা গবেষণা হয়েছে৷ আমি সেই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম৷ সেখানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে ক্লাস এইট থেকে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত ৭৭ শতাংশ ছেলেরা ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি দেখে৷ এটা থেকে উত্তোরনে একটা সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন রয়েছে৷ পাশাপাশি সুস্থ এবং বিজ্ঞানসম্মত যৌন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে৷ এটা নিয়ে আমরা কথা বলি না৷ কিন্তু ঠিকই প্রত্যেক শিশু বড় হচ্ছে৷ যখন সে কৈশোর পার হয়, তখন নানা জায়গা থেকে যৌনশিক্ষা লাভ করে এবং সেটি অধিকাংশ সময় ভুল এবং ভয়ঙ্কর রকমের বাজে পথে তাদেরকে নিয়ে যায়৷ কাজেই সুস্থ যৌন শিক্ষা এবং পাশাপাশি শিশুদের যদি খেলাধুলাসহ নানা রকমের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তাহলে তাদের পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্ত করা সম্ভব বলে আমি মনে করি৷   

পথশিশুদের বড় একটা অংশ মাদকের সঙ্গে জড়িত৷ এ থেকে মুক্তির উপায় কী?

পথশিশুদের মধ্যে যে মাদকটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে বা তারা নিচ্ছে, সেটা হলো গ্রীস৷ এটা শিশুদের মধ্যে প্রবলভাবে ছড়িয়ে গেছে৷ তাদের কাছে কারা এগুলো ২০ টাকা করে বিক্রি করছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে৷ যারা এখন রোজগার করছে, তাদের দেখা যাচ্ছে ইয়াবার প্রতি আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে৷ কাজেই বিশেষ করে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের যে অবস্থান সরকারিভাবে নেওয়া হয়েছে, সেখানে অনেক মাদকব্যবসায়ী শিশুদের টার্গেট করে পণ্য বাজারজাত করছে৷

পথশিশুরা নানা ধরনের সংক্রামকব্যাধিতে আক্রান্ত হয়৷ তাদের চিকিৎসায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগ আছে?

সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগগুলো কেমন? যেমন ধরেন, সরকারি হাসপাতালে ৫ টাকা দিয়ে টিকিট করে যে কেউ ডাক্তার দেখাতে পারে৷ এই বাস্তবতায় কোথাও বাধা নেই৷ কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, এই শিশুরা আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে একটি সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ৫ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ডাক্তার দেখাবে, এরকম অবস্থার মধ্যে তারা নেই৷ কাজেই এখানে যা প্রয়োজন, সেটা হলো বেসরকারি সংগঠনগুলো এবং সরকারি সেবা প্রদানকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু মাঠ কর্মীকে এই কাজে ব্যবহার করা৷ তাঁরা নিয়মিতভাবে পথশিশুদের চিকিৎসার মধ্যে নিয়ে আসতে পারে৷ আমরা তো জানি, কোথায় পথশিশুরা বেশি একসাথে বসবাস করে৷ ট্রেন স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনালসহ কিছু জায়গা আগেই চিহ্নিত করা আছে৷ সেখানে যদি সাপ্তাহিকভাবে স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে শিশুদের চিকিৎসা সেবার মধ্যে আনা সম্ভব৷

Abdullah al Mamun

আবদুল্লা আল মামুন, পরিচালক, সেভ দ্য চিলড্রেন

পথশিশুদের পুনর্বাসনে সমস্যা কী?  এর কোনো পরিকল্পনা আছে?

রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে৷ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বছর দুয়েক আগে জাতীয় শিশু দিবসে ঘোষণা করেছিলেন যে, কোনো শিশু পথে থাকবে না৷ তারই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়, যেটি পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম নামে পরিচিত৷ এখনো সেটা চলমান রয়েছে৷ তবে সারা দেশে পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য বড় ধরনের প্রকল্পের প্রয়োজন রয়েছে৷ পরিকল্পিতভাবে সকল শিশুকে এটার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব৷ পথশিশুদের প্রতি আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, আমরা যারা নাগরিক রয়েছি, আমরা মনে করি, পথশিশুরা পথের শিশু, পথে-ঘাটে থাকছে, তার প্রতি আমরা কোনো দায়িত্বশীল আচরণ করি না৷ আমরা তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি৷ সবাইকে আরেকটু সংবেদনশীল হতে হবে৷ এটা করার জন্য সামাজিক আন্দোলন হতে পারে৷ কিন্তু সবার আগে শিশুদের পুনর্বাসনে বড় কর্মসূচি হাতে নিতে হবে৷

সরকার পথশিশুদের জন্য শেল্টারহোম করছে, কিন্তু সেখানে তারা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করা করা হচ্ছে৷ কেন তারা যাচ্ছে না? কী করা প্রয়োজন?

আপনাকে বুঝতে হবে, পথশিশুদের যে ধরনের মনস্তত্ত্ব, অর্থাৎ তারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে অভ্যস্ত৷ তাদের মতো করে তারা বন্ধু মহলে চলতে অভ্যস্ত৷ তার নিজের মতন করে মনস্তত্ত্ব গড়ে তুলেছে৷ সে তার ভালো-মন্দ নিজের মতো করে বোঝে৷ যখন এই ধরনের কার্যক্রমগুলো নেওয়া হয়, তখন কিন্তু সেটা অনেক সময় শিশুবান্ধব হয় না৷ তার চাহিদাকে পূরণ করে না৷ তার কাছে এটি বন্দিশালার মতো মনে হয়৷ তার কাছে এটাকে আকর্ষণীয় করতে হবে৷ তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি, সেটি হলো শিশুর ভিতর স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে হবে৷ আস্তে আস্তে তাকে বোঝাতে হবে৷ একটা পর্যায়ে সে নিজেই মনে করবে, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তার একটি ভালো জায়গায় থাকা প্রয়োজন৷ তখন সে নিজেই সেখানে চলে যাবে৷ এবং এ ধরনের কর্মসূচিগুলো তখন সফলতা পাবে৷ সারা বিশ্বে এ ধরনের কর্মসূচি কিন্তু আছে৷

সাক্ষাৎকারটি কেমন লাগলো জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন