1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

‘পছন্দের বিষয়টি ভুয়া হলেও মানুষ শুনতে চায়'

সমীর কুমার দে ঢাকা
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভুয়া সংবাদ প্রচারের বিষয়টি নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন, সেন্টার ফর গর্ভনেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক ও উপস্থাপক জিল্লুর রহমান।

https://p.dw.com/p/4WO9y
ভুয়া প্রচারণা ও খবরে সুবিধা পাওয়া যায়, কারণ মানুষকে সহজে বিভ্রান্ত করা যায়, দাবি জিল্লুর রহমানের
ভুয়া প্রচারণা ও খবরে সুবিধা পাওয়া যায়, কারণ মানুষকে সহজে বিভ্রান্ত করা যায়, দাবি জিল্লুর রহমানেরছবি: Oleksandr Latkun/Zoonar/picture alliance

ডয়চে ভেলে : সামনে নির্বাচন, এমন সময়ে ভুয়া প্রচারণার গুরুত্ব কতটা?

জিল্লুর রহমান : প্রথম কথা হচ্ছে, এটি গুরুত্বের বিষয় নয়। ভুয়া প্রচারণা হচ্ছে এবং হবে। এটা আশঙ্কার একটা বিষয় বলে আমি মনে করি। এটা যে শুধু বাংলাদেশেই হচ্ছে তা তো নয়, এটা আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে দেখেছি, সুইডেনের নির্বাচনে দেখেছি, ভারতের নির্বাচনে দেখেছি, বিভিন্ন দেশে এটা আছে। কিন্তু এটা তো খুব বিপজ্জনক। এই প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী যে রাজনৈতিক দল আছে তাদের দুই দিক থেকেই হচ্ছে। যাদের শক্তি সামর্থ্য বেশি, আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তারা হয়ত একটু বেশি সুবিধা পাবে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করা হচ্ছে, বিভিন্ন ওয়েবসাইটকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং মূল ধারার মিডিয়াও এই ফাঁদের মধ্যে পড়ে গেছে। আমি মনে করি, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে মূল ধারার সংবাদমাধ্যম এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। সাংবাদিকতা যদি না থাকে, মিডিয়া যদি পাপেট মিডিয়া হয়, তাহলে এই প্রবণতা অনেক বেশি বাড়তে থাকবে, যেটা কোনো অবস্থাতেই আমাদের কাম্য নয়। কোনো অবস্থাতেই এটা একটা ভালো নির্বাচনের গ্যারান্টি দেবে না। আমি মনে করি, আমাদের রাজনীতিবিদরা যদি মাইন্ডসেটটা ঠিক করতে পারেন বা এই জায়গায় তাদের মধ্যে একটা ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেন যে, তারা একটা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করবেন এবং এই বিষয়ে যদি তাদের সদিচ্ছাটা থাকে, তাহলে এই প্রবণতা কমে আসবে। একদম থাকবে না, এটা আমি বলবো না।

ভুয়া প্রচারণা চালিয়ে কতটুকু সুবিধা পাওয়া যায়?

সুবিধা অবশ্যই পাওয়া যায়। একটা বড় সময় পর্যন্ত এক ধরনের সুবিধা তো থাকে। মানুষকে সহজে বিভ্রান্ত করা যায়। অনেকেই যে ভুয়া তথ্য পেলেন, সেটা রিচেক করতে পারেন না। অনেকটা সময় তার মাথার মধ্যে এটা থাকে। যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনি সঠিক তথ্যটা পাচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত একটা বড় ভূমিকা রাখে। মানুষের একটা সহজাত প্রবণতা আছে, সেটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। মানুষ সাধারণত সেই তথ্য পছন্দ করেন, যেটা তিনি শুনতে চান। আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে গেলেও দেখবেন একজন মানুষ সেটাই দেখছে, যেটা তার আকাঙ্খার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

সম্প্রতি এএফপি একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সরকারের গুণগান করে অনেক লেখার লেখক ভুয়া। তাদের আসলে অস্তিত্ব নেই। এর অর্থ কী দাঁড়ায়?

সরকার এটা করেছে, সেটা তো এএফপিই বলেছে। আপনি যদি আর্টিকেলগুলো দেখেন, সেগুলো যেহেতু সরকারের প্রশংসা, তাই ধারণা এমন হওয়াই স্বাভাবিক যে, সরকার এটি করিয়েছে বা সরকারের সমর্থকরা এটি করিয়েছে। এটা রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করেও হতে পারে, আবার ব্যয় না করেও অনেক টুলস আছে, সেটা সরকার ব্যবহার করতে পারে। বিরোধীরাও পারে। তাদের সমর্থক অনেক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আছে, তারাও এখানে অর্থায়ন করে থাকতে পারেন। যেহেতু এগুলো সরকারের পক্ষের লেখা, ফলে সরকার এটা করতে পারে। আপনার স্মরণ থাকার কথা, বেশ কিছুকাল আগে আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, এই ধরনের লেখা দরকার। অবশ্যই ভুয়া লেখক বা লেখার কথা তারা বলেননি। কিন্তু সরকারের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা দরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, সাইবার ওয়ার্ল্ডে তাদের আরও বেশি সক্রিয় হওয়া দরকার। তারা যে ভালো কাজ করে, সেটা শুধু জনসভায় গিয়ে বললে হবে না, সামাজিক মাধ্যমে এটা আরো বেশি করে প্রচারকরতে হবে। এটা কতটা ইতিবাচকভাবে করবেন বা নেতিবাচকভাবে করবেন, সেটা যারা করবেন তাদের ব্যাপার।

বিরোধীদের সমর্থকরাও তো মিথ্যা প্রচারণা চালান। সেগুলো কি সামনে আসে?

অবশ্যই বিরোধীরাও করেন। আপনি লক্ষ্য করবেন যে, সম্প্রতি জি-২০ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর একটা সেলফিকে কেন্দ্র করে সরকার সেখান থেকে মাইলেজ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সরকারবিরোধীরাও ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় এটি জোর করে তোলা হয়েছে- এমন একটি সংবাদকে ভাইরাল করেছে, যার ন্যূনতম জ্ঞান আছে, তার বোঝার কথা যে, আনন্দবাজারের মতো পত্রিকার প্রথম পাতায় এই ধরনের নিউজ ছাপা হওয়ার কথা না। অনেক মানুষ হয়ত প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসও করেছেন। অনেকের বিশ্বাস এখনও ভঙ্গ করা যায়নি। তারা হয়ত জানেও না যে, এটা আসলে ‘ফেক'। এটা নতুন কিছু নয়। আপনি জানেন যে, এক সময় একজনকে চাঁদে দেখা গেছে, সেই প্রচারণা হয়েছে। এক সময় কাবা শরীফের গিলাফ নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা হয়েছে। এগুলো বিরোধীরা যে করছেন না, তা নয়, বরং ভালোভাবে করছেন। আমি আগেই বলেছি, দু'পক্ষ থেকেই আছে। এখন সেটা নির্ভর করছেন কার শক্তি বেশি, সামর্থ্য বেশি। কারণ, এর জন্য অর্থেরও প্রয়োজন হয়, লোকবলেরও প্রয়োজন হয়। এগুলো যাদের বেশি, তারা একটু এগিয়ে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে যে ভুয়া লেখকের নাম লেখা ছাপা হচ্ছে, সেখানে কেন তারা ফ্যাক্টচেক করে না?

আপনি জেনে থাকবেন যে, সংবাদমাধ্যমগুলোতে ছাপা হয়েছে, সেগুলো যে খুব একটা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত তা নয়। আমাদের কাছে মনে হয়, ভারতের কোনো নিউজ পোর্টাল বা পাকিস্তানের কোনো নিউজ পোর্টাল বা আফ্রিকার কোনো দেশের নিউজ পোর্টাল হলেই সেটা আন্তর্জাতিক। বিষয়টি কিন্তু আসলে সেরকম নয়। একটা স্টাডিতে দেখা গেছে, শুধু ভারতেই ৩০০টির মতো ফেক নিউজ পোর্টাল খোলা হয়েছে। এটা কিন্তু সারা বিশ্বজুড়েই হচ্ছে। আমি নিজেও চেক করে দেখেছি, এমন অনেক নিউজ পোর্টল আছে, তারা যদি কোনো নিউজ সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে একটা দুইটা লাইকও পড়ে না অনেক সময়। ওই নিউজ পোর্টালে গেলে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা এই নিউজগুলো সংগ্রহ করে বা কেউ তাদের অর্থায়ন করছে। আসলে এই নিউজ পোর্টালগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই বলে আমার কাছে মনে হয়। বিদেশি হলেই যে আন্তর্জাতিক সেটা না। আমি মনে করি, বিদেশি অনেক নিউজ পোর্টালের চেয়ে বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যম শক্তিশালী।

সারা বিশ্বেই তো ভুয়া প্রচারণার বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। সেগুলো নিয়ে কি খুব বেশি আলোচনা হয়?

আলোচনাটা তো হয়, ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন বা নির্বাচন করছিলেন, তখন তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমকে কীভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। সেটা মূল ধারার গণমাধ্যমকে। আবার তিনি টুইটারের উপর কতটা নির্ভরশীল ছিলেন। এগুলো তো সারা বিশ্বজুড়েই হয়। হয় না যে তা নয়। যেখানে হয়ত মিডিয়া লিটারেসি বেশি বা মানুষ শিক্ষিত বেশি, সচেতন বেশি, সোসাইটিটা গণতান্ত্রিক, সেখানে হয়ত এটা কম হয়। আর যে মানুষের কথা বলার সুযোগ সীমিত, শিক্ষার হার সীমিত, মিডিয়া লিটারেসি কম, মিডিয়া অত বেশি শক্তিশালী না, সেখানে এটা হয়ত বেশি। বাংলাদেশে মিডিয়ার তো অনেক বড় দুর্বলতা আছে। সেটা মালিকপক্ষের কারণেই হোক, আর রিসোর্সের কারণেই হোক, ক্যাপাসিটির কারণে হোক- সেই সীমাবদ্ধতা আছে। এই লেখাগুলো তো বাংলাদেশের প্রধান প্রধান কাগজ ছেপেছে। তারা সেগুলো তুলেও নিয়েছে এএফপির রিপোর্টটা যখন বের হলো।

ভুয়া প্রচারণায় মানুষ বেশি প্রভাবিত হয়, নাকি সত্যি প্রচারণায় বেশি প্রভাবিত হয়?

মানুষ যেটা শুনতে পছন্দ করে, সেটা দ্রুত গ্রহণ করে। সেটা ভুয়া হলেও বা সত্যি হলেও। এটা মানুষের সহজাত প্রবণতা। সরকারের দিক থেকে যদি কোনো প্রচারণা হয় এবং সেটা যদি সঠিকও হয়, বিরোধীরা অনেক সময় গ্রহণ করতে চায় না। বিরোধীরা যদি কোনো মিথ্যা প্রচারণা করে, সেটা অনেক সময় অনেকে গ্রহণ করতে চাইবেন, কারণ, অনেকে মনে করেন যে, হয়ত এই সরকারের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে, এই সরকারের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা সেরকম না। আমি ভোট দিতে পারলাম কিনা৷ যারাই যখন ক্ষমতায় থাকে, মানুষ তাদের এভাবে বিবেচনা করে। আমি মনে করি, ভুয়া প্রচারণা বা সত্য প্রচারণা যে যেটা পছন্দ করে, সেটা গ্রহণ করে। তবে শেষ পর্যন্ত সত্য বিজয়ী হয়।

'বাইডেন-শেখ হাসিনার সেলফি কেন্দ্র করে মাইলেজের চেষ্টা হয়েছে'

ভুয়া প্রচারণার কোনো শাস্তি আছে?

ভুয়া প্রচারণার অর্থ হচ্ছে মানুষকে প্রতারণা করা। পৃথিবীর সব দেশের আইনেই প্রতারণার সাজার ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশেও আপনি চাইলে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। সেটা নির্ভর করবে এই আইন আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন, প্রয়োগ করবেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে তো সাইবার নিরাপত্তা আইন হলো। এই আইন দিয়ে কি ভুয়া প্রচারণা রোধ করা সম্ভব? বা ভুয়া প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব?

আমি যেভাবে দেখি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ডিজিটাল সিকিউরিটির জন্য করা হয়নি। সেটা হলে আমাদের যে ৫ লাখ মানুষের তথ্য বিদেশিদের কাছে চলে গেল সেটা হতো না। এই আইন যদি ঠিকঠাক মতো কাজ করতো তাহলে আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে টাকাটা চলে গেল, সেটাও হতো না। আসলে ধারণা দাঁড়িয়েছে যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে, ভিন্নমতকে দমনের জন্য। সরকারের কর্তা ব্যক্তিরাও এটা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, এটার অপপ্রয়োগ হয়েছে। আসলে এই আইনটা একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক নানা চাপের কারণে বলা হচ্ছে, এটা রহিত করা হচ্ছে। আমি যেটা বুঝি রহিত করার অর্থ হলো বাতিল করা। কিন্তু বলা হচ্ছে, এই আইন সংশোধন হচ্ছে, আইনমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এটা আমরা বাতিল করছি না। কারণ, এই আইনের অধীনে মামলাগুলো চলমান থাকবে। আসলে ওই আইনটা বাতিল হচ্ছে না। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট আসলে নতুন বোতলে পুরোনো মদ বা আপনি যেভাবেই বলেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে খুব বেশি মামলা হয়েছে, তা কিন্তু না।

আইনটাই এমন যে, এই আইনের অধীনে পুলিশকে যেভাবে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, এখানে অনেক মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। এখানে পুলিশকে একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল রিপোর্ট দেওয়ার জন্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ সেই সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দেয়নি। আইনটাই এমন যে, আইনে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এই কারণে হয়ত সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি জেলে থেকেছেন, বা পরিবার ভয়ে থাকে। আইনের ব্যবহারটা হয়েছে এইভাবে। সাইবার সিকিউটি অ্যাক্টে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তি লাঘব করা হয়েছে, কিন্তু আইনের যে মূল লক্ষ্য, সেটা অপরিবর্তিতই থাকছে। এটা আমি শুধু বলছি না, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও বলছে, সিভিল সোসাইটটি বা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন, তারাও বলছেন।