পক্ষপাতদুষ্ট ছায়াযুদ্ধের ফাঁদ | আলাপ | DW | 10.01.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

পক্ষপাতদুষ্ট ছায়াযুদ্ধের ফাঁদ

বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী দেশগুলো ছায়াযুদ্ধের ফাঁদে ফেলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা লুটে নেয়৷ সাধারণ মানুষের সামাজিক বা ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে একজনকে লেলিয়ে দেয় অন্যের বিরুদ্ধে৷

পক্ষপাতিত্ব মানুষের বৈশিষ্ট্য৷ কেউই পক্ষপাতিত্বের বাইরে নন৷ সেটা কেমন? ধরুন, আপনার চোখের সামনে একটি মানবশিশু ও একটি কুকুরছানা ডুবে যাচ্ছে৷ আপনি একজনকে বাঁচাতে পারবেন৷ কাকে বাঁচাবেন? নিশ্চয় মানবশিশুকে৷ কিংবা আপনার চোখের সামনে দু'টি মানবশিশু মারা যাচ্ছে৷ একজনকে আপনি চেনেন, তিনি আপনার কোনো আত্মীয়ের ছেলে বা মেয়ে এবং একজনকে আপনি চেনেন না৷ একজনকে বাঁচাতে হলে আমি নিশ্চিত আপনি পরিচিত শিশুটিকেই বাঁচাবেন৷ আর এমন যদি হয়, এদের একজনের মা বা বাবা আপনিই, তাহলে আরো নিশ্চিত করে বলা যায়, আপনি নিজের শিশুটিকেই বাঁচাবেন৷ রিচার্ড ডকিন্স তাঁর ‘দ্য সেলফিশ জিন' বইতে এর জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন৷ ডারউইনের বিবর্তনবাদের ব্যাখ্য দিতে গিয়ে জিনের ‘প্রপাগেশন অফ মিউটেশন' প্রবণতাকে দায়ী করেছেন৷ প্রায় সাড়ে চার দশক আগে প্রকাশিত তাঁর এই তত্ত্ব হয়তো তিনি আজও বিশ্বাস করেন৷ তবে এমন আচরণের সামাজিক মনস্তত্ত্বও আছে৷

ওপরের এই দুই শিশুকে যদি ধর্মে বিভাজন করা হয়, কিংবা ভাষায়, সংস্কৃতিতে, বর্ণে, তাহলেও মানুষের সাধারণ পছন্দগুলো যার যার বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি বা ধর্ম অনুযায়ীই হবে৷ সেখানে পক্ষপাতিত্ব থাকবে৷ আমাদের চারপাশের পৃথিবীতে এই পক্ষপাতিত্ব একদম স্পষ্ট৷ এটা আজ থেকে নয়৷ আদিকাল থেকে৷

মানুষের এই পক্ষপাতিত্বমূলক বৈশিষ্ট্যে সবচেয়ে বড় উপকার হয়েছে হয়তো কর্তৃত্ববাদীদের৷ খুব সহজেই তারা বিভাজন ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন এবং এর সুযোগে বেড়েছে তার প্রভাব৷ এই যেমন, শিয়া-সুন্নি বিভাজন৷ মুসলিমদের মাঝে এই বিভেদ মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক৷ এর ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে৷ কিন্তু এই বিভাজন কেমন করে দেখুন ছড়িয়ে পড়েছে আধুনিক আফগানিস্তানে কিংবা পাকিস্তানে৷ যেই বাংলাদেশে শিয়া-সুন্নি বিভাজন নিয়ে কখনো বিদ্বেষমূলক আলোচনা দেখিনি, সেখানেও ২০১৫ সালে হামলার ঘটনা ঘটেছে৷ অর্থাৎ যুদ্ধ বা সংঘাত চলছে এক জায়গায়, তার কালো ছায়া পড়েছে অন্যখানে৷

পৃথিবীর এই মেরুকরণের রাজনীতির ফায়দা সবসময় নিয়েছে বড় বড় যুদ্ধবাজ ও কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রগুলো৷ এই যেমন মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি গোষ্ঠীর বিবাদ বা কর্তৃত্বের লড়াই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, যা শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকেছে ইরান-সৌদিআরব লড়াইয়ে৷ একদিকে সুন্নি অধ্যুষিত রাষ্ট্র সৌদিআরব ও অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো এবং অন্যপ্রান্তে শিয়া অধ্যুষিত রাষ্ট্র ইরান, গোষ্ঠী লেবাননের হেজবুল্লাহ ও ইরাকের শিয়াপ্রধান সরকার৷ এই মেরুকরণে সৌদিআরবের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অধিকাংশ সময়েই ইরানবিরোধী৷ তবে সাদ্দাম হোসেনের পতনের মধ্য দিয়ে ইরাকে শিয়া শক্তির উত্থানের পেছনে আবার যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আছে৷ এই সাদ্দাম হোসেনকে মদত দিয়েই অবশ্য ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সহযোগিতা করেছিল সেই একই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব৷

HA Asien | Zobaer Ahmed

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

সে যাই হোক, জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে যখন এমন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলছে, তখন বাংলাদেশে শিশুদের নাম রাখা হচ্ছে ‘সাদ্দাম'৷ কাউকে পিঠ চাপড়ে বলা হচ্ছে, ‘বাপের ব্যাটা সাদ্দাম'৷ অর্থাৎ সুন্নি অধ্যুষিত বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই এই সুন্নি শাসককে একজন নায়কের মর্যাদা দিয়েছেন৷ সৌদি আরবের শাসকেরা যতই ইয়েমেনে মুসলিমদের হত্যা করুন না কেন, কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ঐক্যে বাধা হয়ে দাঁড়াক না কেন, কিংবা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে কখনো উচ্চবাচ্য না করুন না কেন, তাদেরকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে রাজি নন বাংলাদেশের মুসলিমরা৷ এখন যখন ইরানের ওপর আঘাত এসেছে, তখনও শিয়া অধ্যুষিত রাষ্ট্র বলে হয়তো অনেকে এর বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য করছেন না৷ অথচ ইতিহাস বলছে, শিয়া শাসকরাও এখানে ছিলেন৷ বলা হয়, সুলতানি আমল থেকে শুরু করে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পর্যন্ত অনেক শাসকই ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ের৷

তবে সুন্নি ইসলামের প্রভাবই বেশি এখানে, তবে তা প্রধানত সুফিদের হাত ধরে৷ হিন্দুধর্মের কাস্ট বা বর্ণপ্রথার যাঁতাকলে জর্জরিত এখানকার বাসিন্দারা মানুষ হিসেবে সবাই সমান হয়েছেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে৷ সুফি ইসলামের সহনশীলতা পরবর্তীতে কেমন করে অতিরক্ষণশীলতা ও অসহনশীলতায় পরিণত হয়েছে তা ভেবে দেখা দরকার৷ কারা তাদের অসহনশীলতার রাজনীতি এখানে রপ্তানি করছেন? তবে বাংলার মানুষ মোটা দাগে অসাম্প্রদায়িক৷ তারা শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষকে অন্য গ্রহের মানুষ বলে মনে করেন না৷ এটা শুধু শিয়াদের জন্য নয়, সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যই এই সহনশীলতা বজায় রাখা দরকার৷

সবাইকে যার যার ধর্ম পালন করতে যেমন দিতে হবে, তেমনি বেশি প্রয়োজন সকলকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা৷ কারণ পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক বা কর্তৃত্বপরায়ণ মতবাদ ছড়িয়ে দিয়ে ফায়দা লোটার জন্য ধর্মের ওপর চেপে বসে৷ আর সাধারণ ধর্মপরায়ণ মানুষগুলো সহজমনে এই চক্রে বাধা পড়েন৷ তাই অন্য কোনো যুদ্ধের ছায়াযুদ্ধে আমরা যেন নিজেদের জড়িয়ে না ফেলি তাতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন