নোবেলের জন্য করুণা | আলাপ | DW | 09.08.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

নোবেলের জন্য করুণা

তখন নাইন-টেনে পড়ি৷ গ্রামের ছেলে আমি, নিজের মতো করে বড় হয়েছি৷ তাই যখন ফেলুদা' পড়ার কথা, তখন আমি ফেলুদা' এবং 'বনলতা সেন' সমান গুরুত্বের সঙ্গে পড়তে শুরু করেছি, ‌'রূপসী বাংলা'ও পড়া হয়ে গেছে৷

বড় হওয়ার ওই সময়ে একদিন মনে প্রশ্ন এল, কাজী নজরুল ইসলামকে কেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি করা হলো? নজরুলের চেয়ে জীবনানন্দ দাশ অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হতেন বলে ভাবলাম আমি৷

এমন হাজারও প্রশ্ন তখন মনে আসত৷ প্রশ্নগুলো হয়তো সহজ৷ কিন্তু উত্তর দেবার মানুষ নেই৷ প্রশ্নটা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করা অবান্তর৷ তাই জয়দুল ভাইয়ের শরণাপন্ন হলাম৷ জয়দুল হোসেন আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উদীয়মান কবি, তখন তিনি ছিলেন সাহিত্য একাডেমির সম্পাদক এবং আমি তাঁর প্রশ্রয়ধন্য৷ আমার প্রশ্ন শুনে বললেন, 'হ্যাঁ, জীবনানন্দকে জাতীয় কবি করা যেত৷' জয়দুল ভাই কখনোই কিছুতে না বলতে অভ্যস্ত নন৷ তবে তাঁর সম্মতি শেষে প্রায় সবসময়ই একটা 'তবে' থেকে যায়৷ তাই আমি যখন বললাম, 'চলেন আমরা জীবনানন্দের পক্ষে জনমত গঠন করি'; তখন তিনি বললেন, 'তা করাই যায়, কিন্তু নজরুল তো ছোট কবি নন৷'

সেদিন আমি জয়দুল হোসেনের কাছ থেকে রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা সাহিত্যে নজরুলের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাই৷ জয়দুল ভাই আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, রাবীন্দ্রিক কাব্যবলয় ভেঙে তিরিশের দশকের কবিদের কাব্যভাষা নির্মাণে নজরুলের অবদান৷ তিনি আমাকে জানাতে চেষ্টা করেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং বাঙালি মুসলমানের মানস গঠনে নজরুলের অবদান এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের গান-কবিতা কিভাবে আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে, তা-ও৷ 

তবু আমি নাছোড়৷ 'রূপসী বাংলা'র মতো কবিতাগুলো যে কবি লিখেছেন, তাঁকেই বাংলাদেশের জাতীয় কবি করা উচিত৷ কয়েক দিন পর আবার জয়দুল ভাইকে কাবু করার জন্য যুক্তি দিই, 'পশ্চিমবঙ্গের কাজী নজরুল ইসলাম কেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হবেন? বরং বরিশালের জীবনানন্দ অনেক প্রাসঙ্গিক৷' তিনি বোঝান, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল অবিভক্ত বাংলার কবি৷ বাংলা ভেঙে ভাগ হয়েছে৷ অখণ্ড বাংলার একখণ্ডে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছ৷ তাই বলে নজরুলের ভাগ ছেড়ে দেব কেন?

অন্নদাশঙ্কর রায়ের 'ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/ আর সব কিছু/ ভাগ হয়ে গেছে/ শুধু ভাগ হয়নি কো/ নজরুল৷' তখন জয়দুল ভাই শুনিয়েছিলেন কিনা মনে নেই৷ বোধ হয় না৷ অনেক পরে নিজেই এই ছড়াটি পড়েছি৷ অবশ্য রবীন্দ্র-নজরুলের ভাগ যে ছাড়া যাবে না, এই অনুভব তখনই করতে শিখেছি৷ জাতীয় কবি নিয়ে ভাবনাটা ছাড়িনি৷ সেই কৈশোরেই আমার মনে হয়েছিল, একটা দেশের জন্য জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতের হয়তো প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু জাতীয় কবি, জাতীয় ফল, জাতীয় মাছ ইত্যাদি নির্ধারণ করার দরকারটা কি? কাঁঠালের চেয়ে আম প্রিয় আমার৷ আমি দুর্ভাগাদের একজন, যে ইলিশ খেয়ে মজা পায় না, তবু খায়, নিজেকে 'সর্বভুক' দাবি করতে পারার জন্য৷

তাই কেউ যদি কোনো একদিন এসে বলেন, 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটা তাঁকে অতটা তৃপ্ত করতে পারে না, যতটা তিনি দেশকে ভালোবাসেন, অথবা কেউ যদি অরুন্ধতীর রায়ের মতো বলেন, 'পতাকা হচ্ছে এমন এক রঙিলা কাপড়, যা দিয়ে রাষ্ট্র প্রথমে জনগণের চেতনাকে কাফনের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়িয়ে ফেলে, অত:পর আনুষ্ঠানিকভাবে মৃতদের দাফন করে৷' আমি খুব আহত হব না, বরং ভাবব৷ যেমন ভাবাচ্ছে অরুন্ধতীর ভাবনা, জাতীয়তাবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য, ইন্সপায়ার্ড করার জন্য জাতীয় সংগীত, পতাকা, যুদ্ধ, কিছু বীর, নানা দিবস ইত্যাদি থাকা লাগে৷ কিন্তু কেউ 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'র বিপরীতে যদি জেমসের গাওয়া প্রিন্স মাহমুদের 'বাংলাদেশ'কে দাঁড় করিয়ে দেন, তাহলে তাঁর মুর্খতায় ব্যথিত বোধ না করে উপায় থাকে না৷ বলে রাখা ভালো জেমস আমার প্রিয় শিল্পীদের একজন৷ প্রিন্স মাহমুদ অত্যন্ত প্রিয় গীতিকার৷ প্রিন্সের 'বাংলাদেশ' গানের শুরুটা দারুণ 'তুমি মিশ্রিত লগ্নমাধুরীর জলে ভেজা কবিতায়'৷ তবে পুরো গানটার আবেদন এক পংক্তিতে বঙ্গবন্ধু আর জিয়াকে আনায় আমার কাছে ম্লান হয়ে গেছে৷ 'তুমি বঙ্গবন্ধুর রক্তে আগুনজ্বলা জ্বালাময়ী সে ভাষণ' শেষে কেমন করে আসে 'তুমি ধানের শীষে মিশে থাকা শহীদ জিয়ার স্বপন' ভেবে পাই না৷

ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল 'জি বাংলা'র সংগীতবিষয়ক রিয়েলিটি শো ‘সা রে গা মা পা'র বদৌলতে হঠাৎ তারকা বনে যাওয়া নোবেল 'আমার সোনার বাংলা'র সঙ্গে 'বাংলাদেশ' গানটিকে টেনে এনে এই অর্বাচীন কাজটাই করেছেন৷ ওই রিয়েলিটি শোতে তৃতীয় হয়েছেন বাংলাদেশের মাঈনুল আহসান নোবেল৷ ওখানেই শেষ হয়েছে নোবেলের ‘সা রে গা মা পা' জার্নি৷ ‘সা রে গা মা পা' চলছিল যখন আমার ওতে একটুও মনোযোগ দেওয়া হয়নি৷ শোটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোবেল প্রথম না  হওয়ায হাহাকার দেখেছি৷ যৌথভাবে তৃতীয় হয়েছেন নোবেল৷ তাঁর অনুরাগীদের বিবেচনায় নোবেলেরই প্রথম হওয়ার কথা৷ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে মন্তব্য করব না বলে একটা পোস্ট দিয়ে নোবেল উসকে দিয়েছিলেন তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের৷ তবে এই সব কিছু ছাড়িয়ে গেছে তাঁর বলা ‘আমি মনে করি আমাদের জাতীয় সংগীত ‘‘আমার সোনার বাংলা'' আমাদের দেশটাকে যতটা এক্সপ্লে­ইন করে, তার থেকে কয়েক হাজার গুণ বেশি এক্সপ্লেইন করে প্রিন্স মাহমুদের লেখা ‘‘বাংলাদেশ'' গানটি৷' নোবেল অবশ্য শুরুতেই বলে নিয়েছিলেন, এটা তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত৷ নিজের অভিমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরো বলেছেন, আমাদের জাতীয় সংগীতে সমসাময়িক ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ইতিহাসের নায়কদের নাম উল্লেখ করা নেই৷ প্রিন্স মাহমুদের লেখা গানটিতে সরোয়ার্দী, শেরেবাংলা, ভাসানী, বঙ্গবন্ধু, জিয়া, জসীমউদদীন, আবদুল আলীম, আব্বাসউদ্দীন, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী প্রমুখের কথা আছে৷ নোবেলের সরল সমাধান, রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা'র চেয়ে প্রিন্স মাহমুদের 'বাংলাদেশ' জাতীয় সংগীত হিসেবে বেশি উপযুক্ত৷ 

সেই থেকে নোবেল বারবার খবরের শিরোনাম হচ্ছেন৷ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খ্যাত-অখ্যাত বহুজন তাঁকে নিয়ে লিখেছেন৷ ওই সব লেখার একটি লেখক কুলদা রায়ের, যা থেকে নোবেলদের পুরো পরিবারটিকে চিনতে পারা যায়৷ কুলদা রায় লিখেছেন, 'নোবেলের বাবা মোজাফফর হোসেন নান্নু আমার সহপাঠী৷ একই স্কুলে পড়েছি৷ নান্নু খুবই শান্তশিষ্ট অমায়িক মানুষ৷ খুব সুন্দর গানের গলা ছিল৷ হারমোনিয়াম বাজাতে পারতো না৷ কিন্তু গাইতো মিষ্টি করে৷ এখনো আমার কানে লেগে আছে ছেলেবেলায় নান্নুর গলায় শোনা গান, ''আমারে সাজাইয়া দিও নওশারও সাজে৷'' স্কুলের অনুষ্ঠানে সেদিন উপস্থিত ছিলেন কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীম৷ এই গানটি শুনে নান্নুকে বুকে জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করেছিলেন আব্দুল আলীম৷''

নোবেলদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে মধুমতী নদী তীরের ঘোষের চরে৷ কুলদা রায়ের লেখা থেকে জেনেছি, নোবেলদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত৷ নোবেলের বাবা নান্নুর চাচা শহীদ আব্দুল লতিফ গোপালগঞ্জের কিংবদন্তিতুল্য মুক্তিযোদ্ধা, তাঁর নামে তাদের ইউনিয়নের নাম হয়েছে লতিফপুর৷ ‘সা রে গা মা পা' অধ্যায়ের আগে নোবেলের জীবন কেটেছে গোপালগঞ্জে, পাড়াগাঁয়ে বড় হলেও তাঁর পরিবারে রয়েছে সাংগীতিক ঐতিহ্য৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রিন্স মাহমুদের সাধারণ একটি গানকে রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত গানের সঙ্গে তুলনা কেন করলেন নোবেল? সত্যি বলতে আমি কিন্তু খুব একটা বিস্মিত হইনি নোবেলের কথায়৷ কেন? আমি মনে করি আমাদের রাষ্ট্র, রাজনীতিবিদগণ, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন তারা সবাই এর জন্য দায়ী৷

যে নষ্ট রাজনৈতিকসংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছি, বিগত এবং বর্তমান সরকারের সময়ে যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, যে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের মধ্যে দেশকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, সর্বোপরি যেভাবে বিভিন্ন সরকারের সময়ে ইতিহাসকে তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতন পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরা হয়েছে, এতে করে আমরা সবাই মিলে একটা কনফিউজড জেনারেশন গড়ে তুলেছি৷ একটা জেনারেশন বেড়ে উঠেছে ভুল ইতিহাস জেনে, উদার সংস্কৃতির পরিবর্তে একটা সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ভেতরে৷ এমনকী বর্তমান সরকারে যারা আছেন, যে দলটিকে প্রগতিশীল শক্তির ধারক-বাহক মনে করা হতো, যাদের নেতৃত্বে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই আওয়ামী লীগও কিন্তু বিভিন্ন সময়ে ধর্মকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য, হেফাজত ইসলামীর মত একটা ধর্মভিত্তিক দলকে তোষণ করেছে ক্ষমতা পোক্ত করতে, তাদের নির্দেশে সরকার বই থেকে সরিয়ে দিয়েছে প্রগতিশীল লেখকদের লেখা৷ আমাদের ছেলে-মেয়েরা একটা দমবদ্ধ পরিবেশে বড় হচ্ছে৷ যেখানে পুরো সমাজ, রাষ্ট্র ব্যবস্থাই এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সেখানে নোবেলের মতো অন্যদের ভাবনার জগৎ ভুলদিকে পরিচালিত হবে এতে আর বিস্ময়ের কী আছে? 

Bangladesch Journalist Rajib Noor

রাজীব নূর, সাংবাদিক, দৈনিক সমকাল

তবে এত সমালোচনার পরও নোবেল নির্বিকার৷ আমি খুঁজেপেতে দেখলাম আগস্টের শুরুতে একটি দৈনিকের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপে তিনি বলেছেন, জাতীয় সংগীত বিষয়ক ওই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন ৮-৯ মাস আগে৷ তাঁর প্রশ্ন, 'কেন এতদিন পর এ কথা নিয়ে এত বিতর্ক, তা আমার বোধগম্য নয়৷ তাছাড়া আমি প্রথমেই বলেছি, এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত৷ আমার মতের সঙ্গে অনেকেই একমত না-ও হতে পারেন৷' শুধু তাই নয়, বিতর্কের জবাবে তিনি বলেন, 'আমাদের জাতীয় সংগীত যেটা আছে সেটা হয়তো রূপক অর্থে অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়৷ কিন্তু বাংলাদেশ গানটি সরাসরি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, আবেগের স্থানটাকে ভালোভাবে তুলে ধরে৷'

নোবেলের ব্যক্তিগত মতটি যে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সময়ে যারা জাতীয় সংগীত বদলে দিতে চেয়েছে, হিন্দু কবির গান গাইতে যাদের আপত্তি তাদের সঙ্গে মিলে যায়, তা তিনি বুঝতে পারছেন না৷ নোবেলের জন্য আমার করুণা হচ্ছে৷ শুধু গলা থাকলেই শিল্পী হওয়া যায় না৷ ক্লোজ আপ ওয়ানের শুরুতেই আমরা নোলক বাবু নামে একজন শিল্পী পেয়েছিলাম, নোলক ওই রিয়েলিটি শোতে সবার সেরা হয়েছিলেন, তাঁর খোঁজ কয় জন জানেন? নোবেল যৌথভাবে তৃতীয় হয়েছেন৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলতে চান? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন