‘‌নোটবন্দির′ পর এবার ‘‌নোটমন্দা′‌, নগদ-‌শূন্য এটিএম | বিশ্ব | DW | 20.04.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

‘‌নোটবন্দির' পর এবার ‘‌নোটমন্দা'‌, নগদ-‌শূন্য এটিএম

চিকিৎসার জন্য এক মহিলার অর্থের প্রয়োজন ছিল৷ কিন্তু টাকা থাকা সত্ত্বেও বার বার ফিরিয়ে দিচ্ছিল ব্যাংক৷ বলছিল, ‘‌নগদ নেই'‌৷ শেষে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ যায় তাঁর৷ বছর দেড়েক আগের ঘটনার পুণরাবৃত্তি যেন৷ নগদের জন্য হাহাকার ভারতে৷

বিগত কয়েকদিন ধরে অর্ধেক ভারতজুড়ে শুরু হয়েছে নোটমন্দা, যা স্মরণ করাচ্ছে নোটবন্দি‌র দুর্দশা৷ সাধারণ মানুষকে দেওয়া হচ্ছে শুধুই আশ্বাস৷ দেশবাসীকে ধৈর্য ধরতে বলছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও তাঁর মন্ত্রকের আমলারা৷ কিন্তু নোটের আকালে ঘরপোড়া গরুর মতো সিঁদুরে মেঘ দেখছে আম জনতা৷ কর্ণাটক, উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগঢ় ও পশ্চিমবঙ্গ-‌সহ দেশের অন্তত ১০ রাজ্যের বেশিরভাগ এটিএম কার্যত ‘‌নো-ক্যাশ'‌ হয়ে রয়েছে৷ ওদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদী রয়েছেন বিদেশ সফরে৷

অভিযোগ উঠছে, আগামী বছর দেশে লোকসভা নির্বাচন৷ তাই নির্বাচনে টাকা ছড়ানোর জন্যই এখন থেকে ২০০০ টাকার নোট তুলে জমিয়ে রাখতে শুরু করেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল৷ কর্ণাটকে আগামী মাসেই ভোট৷ লক্ষণীয়, বাজার থেকে উধাও হয়েছে সবচেয়ে বড় অঙ্কের ২০০০ টাকার নোটই৷ বিপুল অঙ্কের টাকা মজুত করতে হলে বড় অঙ্কের নোটই তো ভরসা! বলা বাহুল্য, এদেশে নির্বাচনি প্রচারে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমারেখার থেকে কয়েক'শ গুণ বেশি অর্থ খরচ করার নজির যত্রতত্র৷

এরই মধ্যে দুঃখজনক একটি ঘটনা সামনে এসেছে৷ চিকিৎসার জন্য এক অসুস্থ বৃদ্ধা ব্যাংকে নিজের জমানো টাকা তুলতে গিয়েছিলেন৷ নির্দিষ্ট ‘টাকা তোলার ফর্ম'‌ পূরণ করে প্রায় প্রতিদিনই ব্যাংকের লাইনে দাঁড়াচ্ছিলেন নূরজাঁহা বিবি৷ কিন্তু গত চার দিনেও টাকা দিতে পারেনি ব্যাংক৷ শেষ পর্যনত নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন নূরজাঁহা৷ তাঁর ছেলে লাল মহম্মদ ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন৷ বলছেন, ‘‌‘‌মায়ের চিকিৎসার জন্য ১৭ হাজার টাকার প্রয়োজন ছিল৷ চার দিন পর গতকাল ব্যাংকের কোষাধ্যক্ষ মাত্র ৫ হাজার টাকি দিতে রাজি হন৷'‌'‌

অডিও শুনুন 02:13
এখন লাইভ
02:13 মিনিট

‘ব্যাংকে সঞ্চিত আছে টাকা, অথচ নিত্যদিনের জিনিস কেনার টাকা নেই’

এদিকে, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের (আরবিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে পরবর্তী দু'বছরে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলি দেশে ৪৫ হাজারের বেশি এটিএম চালু করে৷ ২০১৭ সালের মার্চ থেকে দেশে প্রতিমাসে গড়ে পাঁচটি করে এটিএম বন্ধ হয়েছে৷ ২০১৬-১৭ সালে, নোটবাতিলের পর মাত্র তিন হাজার এটিএম চালু করা গেছে৷ ‘‌নন পারফর্মিং অ্যাসেট'‌, অনাদায়ী ঋণ, তছরুপ প্রভৃতির কারণে বহু ব্যাংকই নাকি তাদের এটিএমের সংখ্যা বাড়াতে পারেনি৷

নতুন দিল্লির হুমায়ুন রোডের বাসিন্দা ড.‌ অতসী চ্যাটার্জির রয়েছেন দুশ্চিন্তায়৷ তাঁর মতে, দেশের সাধারণ নাগরিককে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে গোটা দেশে অর্থনৈতিক অরাজকতা তৈরি করা হচ্ছে৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, ‘‌‘আমি নিজে এটিএম কম ব্যবহার করি৷ কিন্তু ‌আশেপাশের সবাইকে দেখছি এটিএম-‌এ গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসছেন৷ নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার টাকা নেই৷ অথচ ব্যাংকে সঞ্চিত আছে টাকা৷ এ সব দেখে মনে হচ্ছে, ‘‌বেঁচে আছি তো!‌'‌ মানুষ মরে যাচ্ছে৷ কিন্তু সরকার উদাসিন৷ প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের কথা ভাববেন না?‌ গরিব মানুষের কথা শুনবেন না?‌ গোটা দেশে যেন অর্থনৈতিক অরাজকতা শুরু হয়েছে৷ আগামীদিনে আমরা কীসের ওপর ভরসা করব, জানি না৷ আমাদের অনুরোধ, এই সমস্যা নিয়ে সরকার ভাবুক৷ সুস্থ-‌স্বাভাবিক জীবনযাপনে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে ন্যূনতম এইটুকু সহযোগিতা না পেলে জীবন যে অতিষ্ট হয়ে ওঠে৷''‌

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একদিকে যখন এমন সংবাদ আসছে তখন নতুন দিল্লিতে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল জানাচ্ছেন, ‘‌‘‌কেন এটা ঘটল আমরা জানি৷'‌'‌ কিন্তু তা খোলসা করতে রাজি নন তিনি! তবে তিন-চার মাস আগে সরকার যে খরচ বাঁচাতে ২০০০ টাকার নোট ছাপানো বন্ধ করতে বলে রিজার্ভ ব্যাংককে, সেটা তিনি স্বীকার করেন৷ দেখা যাচ্ছে, তার পরই নগদ টাকা তোলার হার বেড়ে গেছে৷ ২০০০ টাকার নোট ছাপা বন্ধ করে ২০০ টাকার নোট ছাপছিল রিজার্ভ ব্যাংক৷ কিন্তু বহু জায়গাতেই এটিএম-এর মাপ সেইমতো বদলানো হয়নি৷ ২০০ টাকার নোট পৌঁছেছে কম৷ ২০০০ টাকার অভাব এতে কিছুই মেটেনি৷

অডিও শুনুন 03:26
এখন লাইভ
03:26 মিনিট

‘যাদের নগদ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই খেটেখাওযা মানুষ পথে বসেছেন’

কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের সচিব সুভাসচন্দ্র গর্গ বলছেন, ‘‘এই সমস্যার সমাধানে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ২৫০০ কোটি ৫০০ টাকার নোট ছাপা হবে৷'' সরকারি সূত্র বলছে, নোট বাতিলের পর গত দেড় বছরেও নতুন নোট সরবরাহ করার মতো এটিএমগুলির পরিকাঠামো তৈরি করা হয়নি৷ তবে নোট বাতিলের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বাজারে যেখানে ১৭ দশমিক ৬ লক্ষ কোটি নগদের জোগান ছিল, এখন তা ১৮ দশমিক ৪ লক্ষ কোটি৷ তা সত্ত্বেও এই নগদ-‌‌যন্ত্রণা কেন?‌ জোগানের ঘাটতি নাকি অপ্রত্যাশিত নগদ মজুত করা?‌ অর্থনীতি বিশারদরা অবশ্য এর পেছনে রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন৷ গত কয়েকদিনে শুধুমাত্র বিহারে ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা তোলা হয়েছে এটিএম মারফৎ৷ এতকিছুর মাঝে মধ্যপ্রদেশের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের অভিযোগ, ‘‌দু-হাজারি নোটের ঘাটতি আসলে ষড়যন্ত্র৷' তাঁর অভিযোগের আঙুল বিরোধী কংগ্রেসের দিকে৷

নতুন দিল্লির বাঙালি প্রধান অঞ্চল চিত্তরঞ্জন পার্ক৷ দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত উৎপল ঘোষ একটি বাংলামাধ্যম বিদ্যালয়ও চালান৷ নগত সমস্যায় ভুক্তভোগী হয়ে বেজায় ক্ষুব্ধ তিনি৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, ‘‌‘‌নোটবন্দি থেকে নোটমন্দায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট ও ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে প্রকৃত স্বচ্ছতা বজায় রাখা সাধারণ মানুষ৷ স্বাধীনতার পর থেকে আজও পর্যন্ত কখনও সংবাদপ্তের হেডলাইন চোখে পড়েনি যে রিজার্ভ ব্যাংক কী ধরনের কতগুলো নোট ছাপছে৷'‌'

সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দিকে আঙুল তুলেছেন উৎপল৷ তাঁর অভিযোগ, ‘‌‘‌সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই৷ গরিব মানুষকে এটিএম-এ গিয়ে ঘুরে আসতে হচ্ছে৷ দৈনন্দিন জীবনে যাদের নগদ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই খেটেখাওযা মানুষ পথে বসেছেন৷ বাস্তবে আমি নিজে এটিএম-এ গিয়ে টাকা না পেয়ে ফিরে এসেছি৷ এর দায় কে নেবে?‌ দায় নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে৷ তা তিনি যেখানেই থাকুন না কেন৷ তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের অসুবিধার কথাও অস্বীকার করতে পারবে না সরকার৷ সেক্ষেত্রে গোটা বিশ্বে মুখ পুড়ছে ভারতের৷'‌'‌

অন্যদিকে, নোট বাতিলের মতোই আরও একবার অর্থমন্ত্রক ও রিজার্ভ ব্যাংকের কর্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়েছে৷ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পেশ করেছে উভয়েই৷ গতকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় নোটমন্দা নিয়ে হইচই শুরু হওয়ার পর তাড়াহুড়ো করে অর্থমন্ত্রক, রিজার্ভ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক উপদেষ্টা-সহ বিভিন্ন স্তর থেকে সাফাই দেওয়া শুরু হয়েছে৷ কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে প্রথমে অর্থমন্ত্রক সাফাই দিয়ে জানায়, ‘‌নোটের কোনো অভাব নেই৷'‌ এর কিছুক্ষণ পরেই রিজার্ভ ব্যাংক প্রেস রিলিজ দিয়ে জানায়, দেশে প্রায় পাঁচটি রাজ্যে ১২-১৩ দিন ধরে অপ্রত্যাশিতভাবে নোট সংগ্রহ করেছেন গ্রাহকরা৷ এ জন্যই নোটের আকাল দেখা দিয়েছে৷ আরবিআই একটি আন্তঃরাজ্য কমিটি গঠন করেছে যা নোট-‌‌সংকটে থাকা রাজ্যগুলিতে বেশি পরিমাণ নগদ পাঠানোর কাজে নজরদারি রাখবে৷ ঘটনা হলো, বারবার দাবি করা হয়েছে, সরকারের কোষাগারে যথেষ্ট নোট রয়েছে৷ কিন্তু তারপরেও কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয়, সরকার আরবিআই-কে যত শিগগির সম্ভব ৫০০ টাকার নোট ছাপার নির্দেশ দিয়েছে৷ প্রশ্ন উঠছে, নোট যদি থাকেই তবে নতুন নোট ছাপার নির্দেশ কেন?

সমাজবাদী পার্টি প্রধান তথা উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব আবার এর পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র দেখছেন৷ তাঁর কথায়, ‘‌‘‌নোট ছাপার মেশিন, কাগজ, কালি-‌‌সহ যাবতীয় সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়৷ নিশ্চয় সেখানেই ষড়যন্ত্রের শিকড় লুকিয়ে আছে৷'‌' তবে‌ কারণ যা-‌ই হোক, গত কয়েকদিন ধরে দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে নগদের যে হাহাকার চলছে, তা অগ্রাহ্য করা যায় না কিছুতেই৷

আপনার কী মনে হয়? ভারতে নোটমন্দার কারম কী? লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন