নেতা-মন্ত্রীরাই দাঙ্গার বিচার করে শাস্তি দিচ্ছেন | আলাপ | DW | 22.04.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

নেতা-মন্ত্রীরাই দাঙ্গার বিচার করে শাস্তি দিচ্ছেন

সব বদলে যাচ্ছে৷ প্রচলিত সব ধ্যানধারণা বদলাচ্ছে৷ এখন তো দেখছি, নেতা-মন্ত্রীরাই দাঙ্গার বিচার করে শাস্তি দিচ্ছেন৷

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে এক ধর্ষণের ঘটনার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আপনি রেপ বলবেন, না কি প্রেগনেন্ট বলবেন, না কি লাভ অ্যাফেয়ার বলবেন... মেয়েটার না কি লাভ অ্যাফেয়ার ছিল, শুনেছি৷’’

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে এক ধর্ষণের ঘটনার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আপনি রেপ বলবেন, না কি প্রেগনেন্ট বলবেন, না কি লাভ অ্যাফেয়ার বলবেন... মেয়েটার না কি লাভ অ্যাফেয়ার ছিল, শুনেছি৷’’

সাংবাদিকতা যখন শুরু করেছিলাম, তখন একটা কথা বারবার পাখিপড়ার মতো শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল, যতক্ষণ আদালতে শাস্তি না হচ্ছে, ততক্ষণ একজন অভিযুক্ত, অপরাধী নয়৷ এখন দেখছি, সব উল্টে গেছে৷ প্রশাসন যাকে দোষী বলবে, সেই দোষী৷ সেই অপরাধী৷ ফলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে৷ আগে তাও প্রশাসনের মানুষদের, মন্ত্রীদের বলতে শুনিনি, ‘‘ওরা দাঙ্গা করেছে, সরকারি সম্পত্তি ভেঙেছে৷ ওদেরও বাড়ি ভাঙা হবে৷’’ এখন দিব্যি বলছেন৷ মন্ত্রী বলছেন, দলের রাজ্য সভাপতি বলছেন৷ দাঙ্গার পর অভিযুক্ত দাঙ্গাকারীদের ঘরবাড়ি বুলডোজার চালিয়ে ভাঙাও হচ্ছে৷ আগে উত্তরপ্রদেশে হয়েছে, মধ্যপ্রদেশে হলো কিছুদিন আগে৷ এবার দিল্লিতে হলো৷ তাহলে প্রশাসনই বিচার করে ফেলছে, কে অপরাধী, তারাই শাস্তির বিধান দিয়ে দিচ্ছে৷

উত্তরপ্রদেশে ভোটের আগে ৮০-২০-র একটা গল্প শুনিয়েছিলেন যোগী আদিত্যনাথ৷ হিন্দু বা মুসলিম এই সব শব্দ তিনি মুখে আনেননি৷ কিন্তু আকারে ইঙ্গিতে ঠিকই বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলেন, তার কাছে ভোটের লড়াইটা হবে, ৮০ শতাংশ হিন্দু বনাম ২০ শতাংশ মুসলিমের৷ আর তারপর রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তীর মিছিলকে কেন্দ্র করে যে কাণ্ড ঘটছে, তাতে ওই ৮০-২০-এর লড়াইয়ের দীর্ঘ ছায়া দেখা যাচ্ছে৷

প্রথমেই বলে নেয়া ভালো, তালি এক হাতে বাজে না৷ ভারতে সচরাচর দাঙ্গাও একতরফা হয় না৷ যে কোনো সহিংসতাই সমান নিন্দনীয়, তা যেই করুক না কেন৷ উসকানি দেয়া যেমন নিন্দনীয়, তেমনই নিন্দনীয় উসকানির পর বন্দুক, পাথর, বোতল মেরে সহিংসতা৷ আর এই নিন্দনীয় কাজটা আমরা এখন সমানে হতে দেখছি৷ আর তেমনই দেখছি, নেতা-মন্ত্রীদের কাজকারবার, প্রশাসনের বিচার৷

জাহাঙ্গিরপুরির ঘটনারকথাই ধরা যাক৷ মঙ্গলবার যখন আমরা জাহাঙ্গিরপুরিতে খবর করার জন্য যাই, তখন পুরো জায়গাটা ব্যারিকেড দিয়ে আটকানো৷ সি ব্লকে যে জায়গায় সহিংসতা হয়েছিল, সেখানে কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না৷ যেতে গেলেই পুলিশ কর্মীরা বলছেন, ব্যারিকেডের ওপারে আপনারা পা রাখলেই আমাদের চাকরি চলে যাবে৷ শুনশান রাস্তায় কাউকে দেখা যাচ্ছে না৷ সেখানেই বৃহস্পতিবার সকালেই চলে এল পুরসভার বুলডোজার৷ শুরু হলো দোকান, বাড়ি ভাঙার ঘটনা৷ শুরু হলো উত্তেজনা৷ 

এই ভাঙার আগের কাহিনিটা হলো, রাজ্য বিজেপি সভাপতি পুরসভার চেয়ারম্যান আদেশ গুপ্তা একটা চিঠি লেখেন উত্তর দিল্লি পুরসভার মেয়র রাজা ইকবাল সিং ও চেয়ারম্যান সঞ্জয় গোয়েলকে৷ তার অনুরোধ ছিল, শনিবারের সহিংসতায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের বেআইনি বাড়ি, দোকান ভেঙে দেয়া হোক৷ তার পরের দিনই সেখানে পুরসভার বুলডোজার চলে এল৷ ভাঙা শুরু হয়ে গেল৷ সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়ার পরেও বুলডোজার সেখানে ভাঙাভাঙির কাজ চলেছে বলে অভিযোগ৷

একটা কথা বলে নেয়া ভালো, যদি কেউ বেআইনিভাবে সরকারি জমি জবরদখল করে দোকান বা বাড়ি করে বসে থাকেন, সেই জায়গা জবরদখলমুক্ত করার অধিকার পুরসভার আছে৷ কিন্তু তার একটা প্রক্রিয়া থাকা দরকার৷ আগে থেকে জানানো দরকার৷ নোটিশ পাওয়ার পর তাদের জবাব শোনা দরকার৷ তারপর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া উচিত, কোন তারিখে বেআইনি নির্মাণ ভাঙা হবে৷ যারাই এই নির্মাণ করেছেন, তাদের বাড়ি, দোকান ভাঙা পড়বে৷  আমরা কেউই চাইব না আমাদের জমি জবরদখল হয়ে যাক৷ সরকার বা পুরসভাও চাইবে না৷ কিন্তু যে গরিব মানুষেরা ফুটপাথে ছোট দোকানঘর করে গ্রাসাচ্ছাদন করছেন, তাদের এইভাবে বুলডোজার দিয়ে তুলে ফেলা উচিত কি না, সেটা অন্য প্রশ্ন, আমাদের প্রশ্ন সীমাবদ্ধ অন্য প্রশ্ন নিয়ে, শুধু কি জাহাঙ্গিরপুরিতে বেআইনি নির্মাণ আছে? নাকি দিল্লি জুড়েই আছে? তাহলে শুধু জাহাঙ্গিরপুরিকে বেছে নেয়া হলো কেন? উত্তর দিল্লি পুরসভা এলাকায় আর কোথাও জবরদখল নেই?

সে সব কিছুই ভাঙা হলো না৷ জাহাঙ্গিরপুরিতে হলো৷ কীভাবে হলো? রাজ্য বিজেপি সভাপতি চিঠি লিখতেই অ্যাকশন শুরু হয়ে গেল৷ বলতেই পারেন, এ হলো কাকতালীয় ব্যাপার৷ একটা সমাপতন মাত্র৷ কিন্তু বড় সময়োচিত কাকতালীয় ঘটনা৷ আর এখানেই প্রশ্নটা ওঠে, রাজ্য বিজেপি সভাপতি তো প্রশাসন নয়, আদালত নয়, তাহলে তার একটা চিঠি যাবে আর বুলডোজার গিয়ে বাড়ি ভাঙা হবে? তার অনুরোধটা ছিল, যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দাও৷ দল, পুরসভা, সাম্প্রদায়িকতা সব বিভাজনরেখা সরে গেল৷ শুরু হয়ে গেল বুলড়োজার-অ্যাকশন৷ তাহলে কি ধরে নিতে হবে, যার কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতাই নেই তার অনুরোধ বা নির্দেশ এক্ষেত্রো সর্বোপরি৷

সরকার, প্রশাসন, পুরসভা তো শান্তি রাখার কাজ করে৷ শান্তি বিগড়ানোর কাজ নয়৷ আর এটা তো বহুধর্মের ভারতবর্ষ৷ দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অনেক রক্ত ঝড়েছিল৷ তখন একটা উত্তেজনাকর সময়৷ সেসময় সংবিধান তৈরি করতে বসে যদি সংবিধানকাররা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করে দিতেন, তাহলে প্রতিবাদের তেমন ঝড় উঠত বলে মনে হয় না৷ কিন্তু তারা অত্যন্ত আধুনিক একটা ধারণাকে অনুসরণ করলেন৷ ভারতের রাষ্ট্রধর্ম বলে কিছু থাকবে না৷ সবাই তার নিজের ধর্মাচরণ করতে পারবে৷ প্রতিবেশী অনেক দেশই তো নিজের মতো করে রাষ্ট্রধর্ম বেছে নিয়েছে৷ কিন্তু সেই জায়গায় ব্যতিক্রমী পথে হেঁটেছিলেন জওহরলাল নেহরু, বি আর আম্বেডকর, বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদরা৷ বিশালকায় সংবিধানে অন্য অনেক আধুনিক বিষয়ের মতো, ধর্মনিরপেক্ষতাকে তারা মান্যতা দিয়েছিলেন৷ যেমন দিয়েছিলেন প্রত্যেকের সমান ভোটাদিকার, আইনের সামনে সমানাধিকারের৷

কিন্তু ওই ধর্মনিরপেক্ষতার চরিত্রটাই এখন বদলে যাচ্ছে৷ এখন প্রকাশ্যে উসকানি দেয়া হয়৷ প্রকাশ্যে মারামারি করা হয়, দিনেদুপুরে বুলডোজার সদম্ভে ঘরদোর ভাঙে৷ সংবাদসংস্থা এএনআই ১২ এপ্রিল জানিয়েছে, মধ্যপ্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুলডোজার-কাণ্ডের পর বলেছেন, দাঙ্গাকারী ও জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে৷ আইন মেনে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে৷ অর্থাৎ, কে দাঙ্গাকারী তা চিহ্নিত করে, আদালতের রায়ের আগেই প্রশাসন অ্যাকশন নিয়ে ফেললো৷

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে, নতুন দিল্লি

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে, নতুন দিল্লি

এরকম ঘটনার কোনো শেষ নেই৷ এ এক অদ্ভূত সময়৷ পশ্চিমবঙ্গে ধর্ষণ হয়, মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, ‘‘আপনি রেপ বলবেন, না কি প্রেগনেন্ট বলবেন, না কি লাভ অ্যাফেয়ার বলবেন... না কি শরীরটা খারাপ ছিল, না কি কেউ ধরে মেরেছে? ... মেয়েটার না কি লাভ অ্যাফেয়ার ছিল, শুনেছি৷’’ তদন্ত, মামলা, বিচার কিছুই হলো না৷ মুখ্যমন্ত্রী তার রায় দিয়ে দিলেন৷ এভাবেই মন্ত্রীরা, মুখ্যমন্ত্রীরা, মেয়ররা, পুরসভার কমিশনাররা রায় দিয়ে দিচ্ছেন৷ চিহ্নিত করে ফেলছেন কে দাঙ্গাকারী, কে অপরাধী, তারপর অ্যাকশন নেয়াও হয়ে যাচ্ছে৷ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা ছেড়ে দিন, বিচারবিভাগের কাজটাও সেরে ফেলছেন তারা৷ এর পরিণতিতে উত্তেজনা বাড়ছে, উসকানি বাড়ছে, সহিংসতা বাড়ছে, বাড়ছে ঘৃণা৷

আর বিরোধী রাজনীতিকরা? তারা তো টুইট-রাজনীতি করেন৷ এই যে জাহাঙ্গিরপুরি হয়ে গেল, সেখানে রাহুল গান্ধী গিয়ে দাঁড়াতে পারলেন না? একটা সময় অরবিন্দ কেজরিওয়াল কথায় কথায় বিক্ষোভ দেখাতে রাস্তায়, মাঠেঘাটে বসে পড়তেন৷ তিনি একবার যেতে পারলেন না? বামেরা যতই অপ্রাসঙ্গিক হোক, বৃন্দা কারাট তো বুলডোজার যখন চলছে, তখন সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ দেখানোর সাহস দেখিয়েছেন৷ বাকিরা মনে হয় ৮০-২০-র গণনা করতে ব্যস্ত ছিলেন৷ দাঙ্গা হয়- তারা টুইট করেন, ধর্ষণ হয়- টুইট করেন, ব্যাপক মারধর হয়- তারা টুইট করেন৷ টুইট করতেই থাকেন৷ আর দেশের চরিত্র বদল হতে থাকে৷ দেশের চরিত্র একবার বদলে গেলে সংবিধানের চরিত্র বদল করতেও যে দেরি হয় না, এটাও তারা বুঝতে পারেন না৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়