1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

নূরজাহানদের পা মচকায়, কিন্তু তারা ভাঙেন না

HA Asien | Zobaer Ahmed
যুবায়ের আহমেদ
১২ নভেম্বর ২০২২

এ বছর মে থেকে জুলাই পর্যন্ত উত্তরপূর্বাঞ্চলে দফায় দফায় বন্যা হয়৷ জুলাই মাসে ১০০ বছরের মধ্যে রেকর্ড বৃষ্টিপাতে ভেসে যায় পুরো অঞ্চল৷ পানি প্রায় নেমে যাবার পর আমার সুযোগ হয় সিলেট ও সুনামগঞ্জের কিছু এলাকায় যাবার৷

https://p.dw.com/p/4JQT8
Bangladesch Nach der Flut | Nazirun Begum
ছবি: Zobaer Amed/DW

প্রথমে যাই সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায়৷ সেখানে দেখা হয় নূরজাহান বেগমের সঙ্গে৷ স্বামী নেই৷ থাকেন এক ছেলে ও তার পরিবারের সঙ্গে৷

আগেরদিনই নিজের ভিটেতে পা পিছলে পড়ে যান নূরজাহান৷ বয়স ৬৫৷ তবে শরীরে এখনো যথেষ্ট সামর্থ্য আছে৷ মচকে যাওয়া পা নিয়ে কলসি কাঁখে মাটির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে টিনের চালার ঘরে উঠছিলেন৷

নূরজাহানের ঘরটা মাটি থেকে ৬-৭ ফুট উঁচুতে৷ ঠিক ঘর বললে ভুল হবে, কতগুলো বাঁশের কঞ্চির মধ্যে ঢেউটিনের বেড়াগুলো কোনমতে সুতো দিয়ে বেধে রাখা৷

‘‘বন্যার পানি থেকে বাঁচতে আমরা ঘর উঁচু করে তৈরি করি,'' নূরজাহান বললেন৷ ‘‘কিন্তু এইবার পানি ঐ পর্যন্ত উঠেছে,'' ঘরের চালার দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন নূরজাহান৷ 

সীমান্তবর্তী কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় যেখানে নূরজাহান থাকেন সেখান থেকে ভারতের চেরাপুঞ্জির পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যায়৷ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় এখানে৷ গত জুলাই মাসে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়৷ সেই পানিতে ভেসে যায় ভারত ও বাংলাদেশের উত্তরাপূর্বাঞ্চল৷

একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ৯৭০ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে এবার
একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ৯৭০ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে এবারছবি: Zobaer Amed/DW

‘‘বন্যার পানি যখন ঘরের দুয়ারে চলে আসে, তখন আমরা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাই৷ দুই সপ্তাহ পর পানি নেমে গেলে ফিরে আসি,'' নূরজাহান ইশারা করেন ঘরের পেছন দিকটার দিকে৷ ‘‘ওখানে খালি দু'টো টিন পড়ে ছিল৷ বাকি সব ভেসে গিয়েছিল,'' বলেন তিনি৷

মাঝারি গড়নের এই নারী ও তার যুবক ছেলে আমাকে মূল রাস্তার দিকে নিয়ে যান৷ একটা খালি জায়গা দেখিয়ে বলেন যে, এখানে তার মেয়ে ও মেয়ের জামাইয়ের ঘর ছিল৷

‘‘আমরা বন্যার মধ্যেই তো থাকি৷ কিন্তু এই বন্যা আমি আমার জীবদ্দশায় আর দেখিনি,'' বলেন নূরজাহাজন৷

ভারতের আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের (৯৭০ মিলিমিটার বা ৩৮ ইঞ্চি) রেকর্ড হয়েছে এবার৷ দুই দেশের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ কিছুটা সময় পানিবন্দি হয়ে পড়েন৷ দুই দেশ মিলিয়ে শতাধিক মানুষ মারা যান৷

দুই দেশ মিলিয়ে শতাধিক মানুষ মারা যান
দুই দেশ মিলিয়ে শতাধিক মানুষ মারা যানছবি: Zobaer Amed/DW

নূরজাহানের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ধলাই নদী৷ তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেদিকটায় যাই৷ তীরবর্তী পুরো এলাকা পানির তলে চলে যায়৷ স্থানীয়রা বলেন, ঘরগুলোর চালার সমান পানি উঠেছিল এখানে৷ দেখা হয় ২১ বছর বয়সীিনাজিরুনের সঙ্গে৷ তার স্বামী বাকপ্রতিবন্ধী৷ দু'টি শিশুসন্তান আছে তার৷

‘‘আমরা খাটের ওপর ছিলাম৷ একটা বাচ্চা পানিতে পড়ে গিয়েছিল৷ আমি ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই পড়ে যাই পানিতে৷ পরে একটা নৌকা এসে আমাদের উদ্ধার করে,'' বলেন তিনি৷

এই পরিবারটি কিছু খাদ্যসাহায্য পেয়েছে৷ কিন্তু এখনো ঘর তুলতে পারেনি৷ সরকারের পক্ষ থেকে চারটি টিনশিট মিলেছে৷ কিন্তু তখনও ঘর তুলতে পারেনি৷ ভাড়া থাকে স্থানীয় মেম্বারের বাড়িতে৷

আমাকে দেখে অনেকেই এগিয়ে এলেন৷ ভাবলেন কোন উপকার বা সাহায্য করতে পারব৷ সাংবাদিক পরিচয় এগিয়ে এলেন স্থানীয় দোকানদার মোহাম্মদ আলম৷ ‘‘এই যে ছাদগুলো দেখছেন এগুলো সব পানির নীচে চলে যায়৷ আমি নৌকা নিয়ে বের হয়েছিলাম৷ হায় রে! কত মানুষের কত জিনিস সব ভেসে ভেসে চলে গেছে৷''

দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল৷ বলাই নদীতে সূর্যের প্রতিবিম্ব চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে৷ আশপাশ তখনও কর্মচঞ্চল৷ কয়েকজনের কাছেই দেখলাম দু'চারটি করে নতুন ঢেউটিনের শিট৷ সরকারি অনুদান৷ যে ঘর ভেঙেছে তাকে হয়তো নতুন করে তৈরি করবেন এরা৷ কিন্তু যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে ঘুরে দাঁড়াবে কবে এরা?

পরদিন সিলেট ছাড়িয়ে এবার আমার গন্তব্য হাওড়৷ সুনামগঞ্জ৷ গাড়িতে করে সিলেট শহর হয়ে সুনামগঞ্জের পথ ধরলাম৷ গন্তব্য বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা৷

উপজেলা পরিষদের কাছে আসতেই দেখি হাওড়ের পাশটা বেশ ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে উঠেছে৷ ভাসমান রেস্টুরেন্টও আছে৷ স্থানীয় চেয়ারম্যানেরও বেশ নামডাক৷ তিনি নাকি একটি ভাসমান ঘর বানিয়েছেন পরীক্ষামূলকভাবে৷ সেখানে সদ্যই একটি পরিবারকেও জায়গা দিয়েছেন৷ ঘরটি দেখতে যাওয়া দরকার৷ নৌকা ভাড়া করে রওনা হলাম৷

হাওড়ে দ্বীপের মত একটা জায়গায় বেশ কয়েকটা ঘর৷ কয়েক ডজন পরিবার থাকে থাকে৷ সেখানেই সেই ঘরটি৷

ঘরের বাসিন্দা সুখু রানি দাশ৷ চিকন গড়নের এই নারীর বয়সও ষাটের বেশি৷ ছেলে ও তার পরিবারসহ দুই রুমের এই ঘরটিতে উঠেছেন তিনি৷ ঘরটির নীচে বড় বড় পানির ড্রাম ও বাঁশ দেয়া, যেন পানি এলে ভেসে থাকে৷

‘‘আগের ঘরটি তো ভেঙ্গে গেছে৷ এখন এখানে থাকছি ভালোই লাগছে,'' বললেন সুখু রানি দাশ৷ ‘‘তারা তো বলেন যে এই ঘর ডুববে না কখনো৷''

HA Asien | Zobaer Ahmed
যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

এ সময় পাশের বাড়ি থেকে দুই নারী এলেন৷ নাম উষা রানি দাশ ও নিওতি রানি দাশ৷ আমাকে বললেন, ‘‘আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রতিদিন গিয়ে বসে থাকি৷ কর্মচারীরা বলে, আপনি ব্যস্ত৷'' প্রথমে বুঝতে পারিনি৷ পরে একজন বলল যে, তারা আমাকে উপজেলা চেয়ারম্যান ভেবেছেন৷ পরে তাদের বুঝিয়ে বলা হল যে আমি সাংবাদিক৷ তা শুনে ঊষা রানি দাশের সোজাসাপটা কথা, ‘‘চেয়ারম্যানকে বলেন আমাদেরও এমন ঘর দেবার জন্য৷ প্রতি বছর আমরা ঘর বানাই, বন্যায় সে ঘর ভেসে যায়৷ আমাদের আয় খুবই সীমিত৷ সেই টাকা দিয়ে আমরা খাব, না কাপড় পড়ব, না বন্যায় ভাঙ্গা ঘর আবার ঠিক করব৷''

শুনে চিন্তায় পড়ে গেলাম৷ আমি থাকি জার্মানিতে৷ এক বছর আগে বন্যায় সেখানে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হল৷ তখন তারা তুলনা করল বাংলাদেশের সঙ্গে৷ বাংলাদেশের মানুষ কতটা বন্যাসহিষ্ণু এবং বাংলাদেশ থেকে জার্মানির শেখা দরকার, এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল৷ কিন্তু এবারের বন্যায় আসলে সহিষ্ণুতার সীমা ভেঙ্গেছে৷ পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের বৃষ্টি আরো হবে, ভয়াবহ বন্যার হার আরো বাড়বে৷ তাহলে এই মানুষগুলোর সহিষ্ণুতার হার আরো বাড়াতে হবে৷

এসব যখন ভাবছি তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায়৷ ৫৭ বছর বয়সি মাঝি সাইদুর রহমান এলেন৷ হাসিমুখে বললেন, চলুন নৌকায় বেরিয়ে আসি৷ নৌকায় উঠলাম আমি আর সাইদুর৷ ‘‘আমাদের জীবন হল বন্যা আসবে ঘরে, আমরা যাব আশ্রয়কেন্দ্রে৷ আবার পানি নামবে৷ আমরা ফেরত আসব৷ কিন্তু এবার পানি এত ওপরেই উঠেছে যে, সামনে হয়তো আরো উঁচু করতে হবে ঘর,'' বলেন তিনি৷

‘‘কত উঁচু করবেন?'' আমার প্রশ্ন৷

‘‘ছয় ফুট৷ এর চেয়ে বেশি করার সামর্থ্য নাই,'' তার জবাব৷

‘‘যদি পানি এর চেয়ে বেশি উঁচু হয়? এবার যেমন হল অনেক জায়গায়?'' আমার পালটা প্রশ্ন৷

‘‘জানি না,'' সাইদুরের সরল স্বীকারোক্তি৷

 ৫৭ বছর বয়সি মাঝি সাইদুর রহমান
৫৭ বছর বয়সি মাঝি সাইদুর রহমানছবি: Zobaer Amed/DW

সাইদুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরলাম৷ এর ভেতর উপজেলা চেয়ারম্যান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা এদের সঙ্গেও দেখা হল৷ এসব সমস্যা নিয়ে কথাও হল৷ কারো কাছেই টেকসই সমাধানের খোঁজ পেলাম না৷ কিন্তু স্থানীয় অসহায় মানুষগুলোর মধ্যে যা পেলাম তা হল টিকে থাকার লড়াইয়ের অসীম শক্তি৷

সিলেট ও সুনামগঞ্জে অবস্থাপন্ন অনেককে দেখলাম, বাড়ি যেন ধসে না পড়ে সে জন্য মাটির বস্তা দিয়ে বাড়িকে ঠেস দেয়া হয়েছে৷ জলবায়ু বিজ্ঞানে এসব সমাধানের কিছু কেতাবি ভাষা আছে৷ কিন্তু এসব কেতাবি ভাষা জানেন না এই মানুষগুলো৷ কিন্তু তাদের এই অবস্থার জন্য প্রকৃতি যতটা দায়ী, পৃথিবীতে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা মানুষেরাও ততটাই দায়ী৷ আজকের বিজ্ঞান সেটি প্রমাণও করেছে৷

যুবায়ের আহমেদ (সিলেট, সুনামগঞ্জ)

স্কিপ নেক্সট সেকশন সম্পর্কিত বিষয়
স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

ডয়চে ভেলের শীর্ষ সংবাদ

চট্টগ্রামে ১২০ পাহাড় নিশ্চিহ্নকারীদের দাপট বাড়ছে

স্কিপ নেক্সট সেকশন ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ

ডয়চে ভেলে থেকে আরো সংবাদ

প্রথম পাতায় যান